অন্ধকারের ওপারে আলো
প্রিয়ব্রত চক্রবর্তী
এক.
শহরটার নাম ছিল অন্ধপুর।
নামটা শুনলে মনে হতে পারে, শহরটা বুঝি সবসময় অন্ধকারে ডুবে থাকে। আসলে তা নয়। দিনের বেলায় অন্ধপুরে রোদের অভাব ছিল না। সকাল হলে পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠত, ছাদের কার্নিশে পাখিরা বসত, রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে কেটলির ধোঁয়া উঠত, স্কুলের ঘণ্টা বাজত, বাস-ট্রাম-রিকশার শব্দে শহর জেগে উঠত।
তবু শহরটার মানুষ বলত—
“এ শহরে আলো নেই।”
কারণ আলো শুধু আকাশ থেকে নামে না।
কখনও কখনও মানুষের বুকের ভিতরেও একটা প্রদীপ জ্বলে। আর অন্ধপুরের মানুষের বুকের সেই প্রদীপগুলো একে একে নিভে যাচ্ছিল।
শহরের মাঝখানে ছিল একটা পুরোনো ঘড়িঘর। বহু বছর ধরে তার ঘড়ির কাঁটা থেমে ছিল রাত আটটা সতেরো মিনিটে। কেউ জানত না কেন। কেউ ঠিক করার চেষ্টাও করত না।
ঘড়িঘরের নীচে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসত এক বৃদ্ধ।
তার নাম ছিল হেমন্ত দাদু।
বয়স কত, কেউ জানত না। কেউ বলত সত্তর, কেউ বলত আশি। আবার কেউ কেউ বলত, “ওই বুড়োকে এই শহর তৈরি হওয়ার সময় থেকেই দেখছি!”
কথাটা সত্যি ছিল না, কিন্তু হেমন্ত দাদুর চোখের দিকে তাকালে কথাটা মিথ্যেও মনে হতো না।
তার একটা ছোট কাঠের বাক্স ছিল। বাক্সের মধ্যে থাকত কয়েকটা পুরোনো বই, একটা মরচে ধরা কম্পাস, একটা কাচের শিশি, আর একটা ছোট পিতলের প্রদীপ।
প্রতিদিন সূর্য ডোবার পর তিনি প্রদীপটা জ্বালাতেন।
শহরের মানুষ হাসত।
“দাদু, এইটুকু আলো দিয়ে কী হবে?”
হেমন্ত দাদু মৃদু হেসে বলতেন,
“একজন মানুষ যদি পথটা দেখতে পায়, তাতেই হবে।”
“তারপর?”
“তারপর সে আরেকজনকে দেখাবে।”
“তারপর?”
“তারপর একদিন দেখবে, পুরো শহরটাই দেখতে পাচ্ছে।”
লোকেরা হেসে চলে যেত।
হেমন্ত দাদু হাসতেন না।
তিনি অপেক্ষা করতেন।
কারণ তিনি জানতেন—অন্ধকার যত গভীরই হোক, মানুষের ভিতরের আলো পুরোপুরি কখনও মরে না।
শুধু তাকে কেউ একজন মনে করিয়ে দিতে হয় যে, সে আলো এখনও জ্বলছে।
দুই.
অন্ধপুরের এক প্রান্তে ছিল একটা ছোট্ট বাড়ি।
সেখানে থাকত অয়ন।
বয়স চব্বিশ।
চেহারায় বিশেষ কিছু ছিল না। খুব লম্বা নয়, খুব খাটো নয়। চোখদুটো সবসময় যেন কোথাও দূরে তাকিয়ে থাকত।
অয়ন একসময় খুব স্বপ্ন দেখত।
ছোটবেলায় সে ভাবত, বড় হয়ে শিক্ষক হবে।
তারপর ভাবল লেখক হবে।
তারপর ভাবল, শহরের মানুষের জন্য কিছু করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সে একটা ছোট পত্রিকা বের করেছিল। নাম দিয়েছিল—“আগামীকাল”।
পত্রিকার প্রথম পাতায় সে লিখেছিল—
“আজ যতই কঠিন হোক, আগামীকাল আমাদের হাতে।”
বন্ধুরা হাসাহাসি করেছিল।
কেউ বলেছিল—
“বড় বড় কথা লিখে কী হবে?”
অয়ন তখন বলেছিল,
“কিছু একটা তো করতে হবে।”
কিন্তু জীবন খুব ধীরে ধীরে তাকে শিখিয়ে দিল—শুধু ভালো ইচ্ছা থাকলেই সবকিছু ভালো হয় না।
তার বাবা মারা গেলেন হঠাৎ।
মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
চাকরির পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হল সে।
যে বন্ধুরা একসময় তার সঙ্গে স্বপ্ন দেখত, তারা একে একে শহর ছেড়ে চলে গেল।
কেউ বিদেশে।
কেউ বড় শহরে।
কেউ এমন এক জীবনে, যেখানে অয়নের জন্য আর কোনো জায়গা নেই।
“আগামীকাল” পত্রিকাও বন্ধ হয়ে গেল।
শেষ সংখ্যায় অয়ন একটা লাইন লিখেছিল—
“হয়তো আগামীকাল বলে কিছু নেই।”
তারপর থেকে সে আর কিছু লেখেনি।
মায়ের ওষুধ কিনে দেওয়া, বাজার করা, ঘরের ভাঙা জিনিস সারানো—এই ছিল তার জীবন।
স্বপ্নগুলো যেন একটা পুরোনো আলমারির ভিতর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
একদিন সন্ধ্যায় অয়ন ঘড়িঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।
হেমন্ত দাদু তখন প্রদীপ জ্বালাচ্ছিলেন।
অয়ন থেমে দাঁড়াল।
বৃদ্ধ তাকিয়ে বললেন,
“কী খবর?”
অয়ন বলল,
“কীসের খবর?”
“তোর ভিতরের খবর।”
অয়ন বিরক্ত হয়ে বলল,
“ভিতরে কিছু নেই।”
হেমন্ত দাদু প্রদীপের শিখাটার দিকে তাকালেন।
“আছে।”
“কী?”
“ছাইয়ের নীচে আগুন।”
অয়ন হেসে ফেলল।
“আপনি সবাইকে একই কথা বলেন?”
“না।”
“আমাকে কেন বলছেন?”
“কারণ তুই শুনতে চাইছিস।”
অয়ন মাথা নাড়ল।
“আমি কিছু শুনতে চাই না।”
“তাহলে চলে যা।”
অয়ন চলে গেল।
কিন্তু সেদিন রাতে তার ঘুম এল না।
বারবার তার মনে হচ্ছিল—
ছাইয়ের নীচে আগুন।
তিন.
পরদিন সকালে অয়নের মা বললেন,
“বাজার থেকে একটু ওষুধ নিয়ে আসবি?”
অয়ন মাথা নাড়ল।
বাজারে যাওয়ার পথে সে দেখল একটা মেয়ে রাস্তার পাশে বসে আছে।
বয়স দশ-এগারো।
তার সামনে একটা পুরোনো খাতা।
মেয়েটা আঁকছিল।
অয়ন একটু দাঁড়িয়ে দেখল।
একটা বাড়ি।
বাড়ির চারদিকে কালো মেঘ।
কিন্তু বাড়িটার জানালা দিয়ে হলুদ আলো বের হচ্ছে।
অয়ন জিজ্ঞেস করল,
“এটা কী?”
মেয়েটা বলল,
“বাড়ি।”
“কালো মেঘ কেন?”
“কারণ বৃষ্টি হবে।”
“আর আলো?”
মেয়েটা অবাক হয়ে তাকাল।
“আলো থাকবে না?”
অয়ন উত্তর দিতে পারল না।
মেয়েটা বলল,
“আপনি কি আঁকতে পারেন?”
“না।”
“তাহলে?”
“কিছু না।”
মেয়েটা আবার আঁকায় মন দিল।
তার নাম ছিল তুলি।
সেদিন অয়ন চলে গেল।
কিন্তু পরের দিন আবার তাকে দেখতে পেল।
তুলি একই জায়গায় বসে।
আবার ছবি আঁকছে।
এবার ছবিতে একটা রাস্তা।
রাস্তার দুপাশে অনেক অন্ধকার।
দূরে একটা ছোট আলো।
অয়ন বলল,
“ওই আলোটা কী?”
তুলি বলল,
“ওদিকে যেতে হয়।”
“কেন?”
“কারণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকলে তো আলো পাওয়া যাবে না।”
অয়ন চুপ করে গেল।
মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি কি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছেন?”
অয়ন একটু হেসে বলল,
“হয়তো।”
তুলি বলল,
“তাহলে হাঁটুন।”
এত সহজ?
হয়তো।
কিন্তু অয়ন বহুদিন হাঁটেনি।
চার.
অন্ধপুরে একটা পুরোনো লাইব্রেরি ছিল।
নাম—জনতার পাঠাগার।
কখনও সেখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসত।
এখন দরজায় ধুলো জমে থাকত।
বইয়ের তাকগুলোতে মাকড়সার জাল।
কাঠের জানালা ভাঙা।
বৃষ্টির জল পড়ে অনেক বই নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
লাইব্রেরির দেখাশোনা করতেন মীরা দিদি।
বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।
চোখে চশমা।
চুলে কয়েকটা সাদা রেখা।
মুখে সবসময় ক্লান্তি।
অয়ন একদিন সেখানে ঢুকে বলল,
“লাইব্রেরি বন্ধ?”
মীরা তাকালেন।
“খোলা।”
“কেউ আসে?”
“কখনও কখনও।”
“কতজন?”
“আজ তুমি।”
অয়ন একটা বই তুলে নিল।
পাতাগুলো হলুদ হয়ে গিয়েছে।
মীরা বললেন,
“তুমি আগে এখানে আসতে।”
“হ্যাঁ।”
“অনেক বই পড়তে।”
“হ্যাঁ।”
“তারপর?”
অয়ন বইটা বন্ধ করল।
“তারপর জীবন পড়তে শুরু করলাম।”
মীরা একটু হাসলেন।
“জীবনের বইটা সবচেয়ে কঠিন।”
“আর শেষটা?”
“কেউ জানে না।”
অয়ন তাকাল।
মীরা বললেন,
“তাই পড়তে হয়।”
সেদিন অয়ন একটা বই নিয়ে বাড়ি ফিরল।
বইটা ছিল মানুষের গল্প নিয়ে।
রাতে সে পড়তে বসেছিল।
কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা পরেই বই বন্ধ করে ফেলল।
তার মনে হল—
এইসব গল্পে আলো আছে।
তার জীবনে নেই।
ঠিক তখনই বাইরে একটা শব্দ হল।
কারও কান্না।
অয়ন জানালা দিয়ে তাকাল।
রাস্তার ধারে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন।
সম্ভবত পড়ে গিয়েছেন।
অয়ন বাইরে গেল।
লোকটাকে উঠিয়ে দিল।
বৃদ্ধ বললেন,
“ধন্যবাদ।”
অয়ন বলল,
“এতে ধন্যবাদ দেওয়ার কী আছে?”
বৃদ্ধ বললেন,
“অন্ধকারে কেউ হাত বাড়িয়ে দিলে ধন্যবাদ দিতে হয়।”
অয়ন থেমে গেল।
হেমন্ত দাদুর কথা মনে পড়ল।
পাঁচ.
পরদিন অয়ন হেমন্ত দাদুর কাছে গেল।
“আপনি এসব কোথা থেকে শিখেছেন?”
দাদু হাসলেন।
“কী?”
“মানুষের অন্ধকার।”
“নিজেরটা দেখেছি।”
অয়ন বসে পড়ল।
দাদু বললেন,
“তুই কি জানিস, মানুষ সবচেয়ে বেশি কখন হারিয়ে যায়?”
“যখন পথ থাকে না?”
“না।”
“যখন টাকা থাকে না?”
“না।”
“যখন মানুষ পাশে থাকে না?”
“সেটাও না।”
দাদু প্রদীপে তেল ঢাললেন।
“মানুষ তখন হারিয়ে যায়, যখন সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার কোনো মূল্য নেই।”
অয়ন চুপ।
দাদু বললেন,
“অন্ধকার মানুষকে প্রথমে পথ থেকে সরায় না। প্রথমে তাকে বোঝায়—তুই হাঁটলেও লাভ নেই।”
“তারপর?”
“তারপর সে বসে যায়।”
“আর যদি কেউ তাকে বলে উঠে দাঁড়াতে?”
“তাহলে সে প্রথমে বিশ্বাস করবে না।”
“তারপর?”
“বারবার বলতে হয় না। একবার হাত বাড়াতে হয়।”
অয়ন বলল,
“সবাইকে কি বাঁচানো যায়?”
দাদু মাথা নাড়লেন।
“না।”
“তাহলে?”
“সবাইকে বাঁচানো আমাদের কাজ নয়।”
“তাহলে কী কাজ?”
দাদু তার দিকে তাকালেন।
“যতক্ষণ পারিস, কারও অন্ধকারে একটা প্রদীপ ধরিয়ে দে।”
ছয়.
অয়ন সেই দিন থেকে লাইব্রেরিতে যেতে শুরু করল।
প্রথমে সপ্তাহে একদিন।
তারপর প্রতিদিন।
সে বই পরিষ্কার করত।
ভাঙা তাক মেরামত করত।
পুরোনো পত্রিকা গুছিয়ে রাখত।
একদিন মীরা দিদি বললেন,
“তুমি আবার লিখছ?”
অয়ন বলল,
“না।”
“লিখবে না?”
“কী লিখব?”
“যা দেখছ।”
অয়ন বলল,
“দেখার মতো কিছু নেই।”
মীরা দিদি একটা জানালা খুলে দিলেন।
বাইরে রাস্তায় কয়েকজন ছেলে ফুটবল খেলছে।
একজন বৃদ্ধ খবরের কাগজ পড়ছেন।
একজন মহিলা সবজি কিনছেন।
দূরে একটা কুকুর ঘুমাচ্ছে।
তিনি বললেন,
“সবকিছু দেখার চোখ না থাকলে পৃথিবী ফাঁকা লাগে।”
অয়ন বলল,
“আর যদি পৃথিবীটাই ফাঁকা হয়?”
“তাহলে একটা ছোট ঘর ভরাও।”
সেদিন অয়ন একটা খাতা খুলল।
প্রথম পাতায় লিখল—
“আজ থেকে আবার শুরু।”
শুধু চারটি শব্দ।
কিন্তু চারটি শব্দের ওজন ছিল অনেক।
সাত.
কয়েকদিনের মধ্যে অয়ন একটা ছোট উদ্যোগ শুরু করল।
লাইব্রেরির এক কোণে সন্ধ্যায় সবাই বসবে।
যে যার কথা বলবে।
কেউ নিজের দুঃখের কথা।
কেউ নিজের স্বপ্নের কথা।
কেউ শুধু চুপ করে থাকবে।
নাম দেওয়া হল—
“আলোর ঘর।”
প্রথম দিন এল মাত্র পাঁচজন।
তুলি।
তার মা।
মীরা দিদি।
অয়ন।
আর হেমন্ত দাদু।
দ্বিতীয় সপ্তাহে এল আটজন।
তৃতীয় সপ্তাহে বারোজন।
এক মাস পরে পঁচিশজন।
একজন রিকশাচালক এসে বলল,
“আমি পড়তে জানি না। কিন্তু আমার ছেলেকে পড়াতে চাই।”
একজন বেকার যুবক বলল,
“আমি কাজ শিখতে চাই।”
একজন বিধবা মহিলা বললেন,
“আমি রান্না ভালো পারি। কিন্তু কোথায় বিক্রি করব জানি না।”
একজন বৃদ্ধ বললেন,
“আমার পুরোনো বই আছে। কাউকে দিতে চাই।”
একজন স্কুলছাত্র বলল,
“আমি গণিতে দুর্বল। কেউ কি আমাকে পড়াবে?”
একজন তরুণী বলল,
“আমি গান গাইতে পারি। কিন্তু অনেকদিন গান গাইনি।”
কেউ কাউকে বাঁচানোর বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিল না।
তারা শুধু শুনল।
কখনও কখনও মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সমাধান নয়।
একজন শ্রোতা।
আট.
কিন্তু অন্ধপুরে সবাই এই পরিবর্তন পছন্দ করল না।
শহরের কিছু মানুষ বলল,
“এগুলো করে কী হবে?”
কেউ বলল,
“গল্প শুনে পেট ভরে?”
কেউ বলল,
“মানুষের দুঃখের আসর বসিয়ে শহর বদলানো যায়?”
কেউ বলল,
“ছেলেটা আবার পাগলামি শুরু করেছে।”
অয়ন শুনত।
কিন্তু আগের মতো ভেঙে পড়ত না।
কারণ এবার সে বুঝেছিল—
মানুষের কথার চেয়ে কাজের পথ অনেক দীর্ঘ।
এক রাতে হেমন্ত দাদু বললেন,
“আজ তোর মন খারাপ।”
অয়ন বলল,
“লোকজন হাসছে।”
“হাসুক।”
“মনে হয় কিছুই বদলাবে না।”
দাদু প্রদীপটা অয়নের হাতে দিয়ে বললেন,
“এটা ধর।”
অয়ন ধরল।
“এখন বল, আলো কতদূর যায়?”
অয়ন বলল,
“কয়েক হাত।”
“তাহলে?”
“এটা দিয়ে পুরো শহর আলোকিত হবে না।”
দাদু বললেন,
“কে বলেছে এক প্রদীপের কাজ পুরো শহর আলোকিত করা?”
“তাহলে?”
“তার কাজ হল পরের প্রদীপটা জ্বালানো।”
অয়ন প্রথমবার বুঝল—
আলো ছড়ায় না।
আলো দেওয়া হয়।
একজন থেকে আরেকজনকে।
নয়.
সেই শীতের রাতেই শহরে বড় বিপদ হল।
অন্ধপুরের পুরোনো বস্তিতে আগুন লাগল।
রাত তখন প্রায় দুইটা।
মানুষ ঘুমিয়ে।
হঠাৎ চিৎকার।
“আগুন!”
“বাঁচাও!”
“জল আনো!”
অয়ন ছুটে গেল।
আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
কেউ বালতি আনছে।
কেউ শিশুদের বের করছে।
কেউ বৃদ্ধদের কাঁধে তুলে নিচ্ছে।
অয়ন একটা ঘরের ভিতর ঢুকে দেখল—একজন ছোট ছেলে বিছানার নীচে লুকিয়ে আছে।
ছেলেটা কাঁপছে।
অয়ন বলল,
“ভয় পাস না।”
ছেলেটা বলল,
“আমি বের হলে আগুন আমাকে পুড়িয়ে দেবে।”
অয়ন তার হাত বাড়িয়ে বলল,
“আমার হাত ধর।”
“আপনি পারবেন?”
অয়ন এক মুহূর্ত থেমে বলল,
“জানি না।”
ছেলেটা তাকিয়ে রইল।
অয়ন বলল,
“কিন্তু আমরা চেষ্টা করব।”
ছেলেটা হাত ধরল।
তারা বেরিয়ে এল।
সেদিন রাতের আগুনে অনেক ঘর পুড়ে গেল।
অনেক মানুষ সব হারাল।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে একটা জিনিস পুড়ল না—
মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ানোর ক্ষমতা।
পরদিন “আলোর ঘর”-এর সবাই কাজে নেমে পড়ল।
কেউ কাপড় দিল।
কেউ খাবার।
কেউ ওষুধ।
কেউ টাকা।
কেউ শুধু নিজের দুটো হাত।
তুলি তার আঁকার খাতা খুলে বসেছিল।
অয়ন বলল,
“তুই কী করছিস?”
তুলি বলল,
“যাদের ঘর পুড়েছে, তাদের জন্য নতুন ঘর আঁকছি।”
অয়নের চোখ ভিজে গেল।
দশ.
কয়েক মাস পর অন্ধপুরে পরিবর্তন দেখা দিল।
বড় কোনো বিপ্লব নয়।
কোনো মিছিল নয়।
কোনো বিশাল ঘোষণা নয়।
ছোট ছোট পরিবর্তন।
লাইব্রেরিতে আবার বই পড়া শুরু হল।
স্কুলের কয়েকজন ছাত্র মিলে সপ্তাহে একদিন ছোটদের পড়াতে লাগল।
বেকার যুবকেরা মিলে একটা মেরামতির দল বানাল।
মহিলারা মিলে রান্না করে বিক্রি করতে শুরু করলেন।
রিকশাচালক নিজের ছেলেকে নিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় লাইব্রেরিতে আসতে লাগলেন।
তুলি ছবি আঁকত।
তার ছবিগুলো লাইব্রেরির দেয়ালে ঝুলতে লাগল।
প্রথম ছবির নাম—
“অন্ধকারের পর”।
দ্বিতীয়—
“একটা হাত”।
তৃতীয়—
“যে মানুষটা অপেক্ষা করেছিল”।
শেষ ছবিটায় ছিল একটা শহর।
অসংখ্য জানালা।
প্রতিটি জানালায় আলো।
কিন্তু আকাশ এখনও কালো।
অয়ন ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।
তুলি এসে বলল,
“কেমন?”
“সুন্দর।”
“কিন্তু আকাশ কালো কেন?”
“জানি না।”
তুলি বলল,
“কারণ আলো থাকলেই তো বোঝা যায়, চারদিকে অন্ধকার আছে।”
অয়ন হাসল।
“তুই বড় হয়ে কী হবি?”
তুলি বলল,
“আমি বড় হব না।”
“কেন?”
“বড়রা অনেক কিছু ভুলে যায়।”
“কী?”
“স্বপ্ন।”
অয়ন কিছু বলল না।
তার মনে হল, একটা দশ বছরের মেয়ে তাকে আজ জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্যটা শিখিয়ে দিল।
এগারো.
একদিন হেমন্ত দাদু আর ঘড়িঘরের নীচে এলেন না।
প্রথম দিন কেউ গুরুত্ব দিল না।
দ্বিতীয় দিন অয়ন খোঁজ নিল।
দাদুর ঘর খালি।
বিছানায় একটা চাদর।
টেবিলের ওপর কাঠের বাক্স।
অয়ন বাক্সটা খুলল।
ভিতরে ছিল পুরোনো বই।
কম্পাস।
কাচের শিশি।
আর সেই পিতলের প্রদীপ।
তার নীচে একটা চিঠি।
অয়ন চিঠি খুলল।
লেখা—
“অয়ন,
যেদিন তুই প্রথম বলেছিলি, ‘আমার ভিতরে কিছু নেই’, সেদিন আমি বুঝেছিলাম তুই অনেক আলো নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস।
যারা নিজেদের ভিতর অন্ধকার দেখে, তারা সাধারণত অন্যের আলো খুঁজতে শেখে।
মনে রাখিস—
মানুষকে সবসময় পথ দেখাতে হয় না।
কখনও কখনও শুধু তার পাশে হাঁটতে হয়।
কেউ পড়ে গেলে তাকে উঠিয়ে দিস।
কেউ কাঁদলে শুনিস।
কেউ স্বপ্ন হারালে তার স্বপ্নটা তার হয়ে দেখিস না—শুধু তাকে মনে করিয়ে দিস, স্বপ্ন দেখার অধিকার এখনও তার আছে।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
নিজের প্রদীপটাও জ্বালিয়ে রাখিস।
কারণ যে নিজেই সম্পূর্ণ নিভে যায়, সে অন্যের হাতে আগুন তুলে দিতে পারে না।
আমি যাচ্ছি।
কিন্তু তুই থাকিস।
কারণ আলো কখনও একজন মানুষের সম্পত্তি নয়।
ভালো থাকিস।
—হেমন্ত”
অয়ন অনেকক্ষণ চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
তারপর প্রদীপটা নিয়ে ঘড়িঘরের নীচে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় সে নিজেই প্রদীপ জ্বালাল।
বার.
বছর কেটে গেল।
অন্ধপুর আর আগের মতো রইল না।
শহরটা ধনী হয়ে গেল না।
সব মানুষের দুঃখ শেষ হয়ে গেল না।
বেকারত্ব চলে গেল না।
অন্যায় বন্ধ হল না।
কেউ আর কখনও কাঁদবে না—এমনও হল না।
বরং জীবন তার স্বাভাবিক কঠিনতায় চলতে থাকল।
কেউ হারাল।
কেউ পেল।
কেউ ব্যর্থ হল।
কেউ নতুন করে শুরু করল।
কেউ চলে গেল।
কেউ ফিরে এল।
কিন্তু একটা জিনিস বদলে গেল।
মানুষ আর একা দুঃখ পেতে চাইত না।
শহরের অলিগলিতে ছোট ছোট “আলোর ঘর” তৈরি হল।
কোথাও বই পড়া হতো।
কোথাও গান।
কোথাও বাচ্চাদের পড়ানো।
কোথাও বৃদ্ধরা গল্প করতেন।
কোথাও চাকরি খোঁজার মানুষরা একে অন্যকে সাহায্য করত।
কেউ কাউকে বলত না—
“তোমার দুঃখ ছোট।”
বরং বলত—
“তোমার দুঃখ তুমি যতটা অনুভব করছ, ততটাই সত্যি। কিন্তু তুমি একা নও।”
এই কথাটাই শহরের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়ে দাঁড়াল।
তের.
অয়ন আবার লিখতে শুরু করল।
সে একটা নতুন পত্রিকা বের করল।
নাম—
“আগামীকাল”।
কেউ কেউ অবাক হয়ে বলল,
“এত বছর পর?”
অয়ন হাসল।
“আগামীকাল কখনও শেষ হয়নি।”
প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে সে লিখল—
“আমরা প্রায়ই ভাবি, পৃথিবী বদলাতে হলে বড় কিছু করতে হয়।
কিন্তু পৃথিবী আসলে অসংখ্য ছোট কাজের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
একজন শিক্ষক একটা শিশুর প্রশ্নের উত্তর দেন।
একজন মা ক্লান্ত সন্তানের মাথায় হাত রাখেন।
একজন বন্ধু ফোন করে জিজ্ঞেস করে—‘কেমন আছিস?’
একজন অপরিচিত মানুষ রাস্তায় পড়ে যাওয়া মানুষটাকে উঠিয়ে দেয়।
একজন ব্যর্থ মানুষ পরদিন আবার চেষ্টা করে।
একজন বৃদ্ধ একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন।
এই ছোট কাজগুলো ইতিহাসের পাতায় লেখা হয় না।
কিন্তু মানুষের জীবন এগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
তাই যদি আজ পৃথিবীকে খুব অন্ধকার মনে হয়—
পুরো পৃথিবীটা আলোকিত করার চেষ্টা করো না।
শুধু তোমার সামনে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, তার হাতটা ধরো।
তারপর দুজনে মিলে একটু এগিয়ে যাও।
হয়তো সেখানেই আলো।”
চৌদ্দ.
অনেক বছর পর তুলি বড় হল।
সে শিল্পী হল।
তার ছবির প্রদর্শনী হল দেশের বিভিন্ন শহরে।
একবার এক সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করল,
“আপনার ছবিতে আলো এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?”
তুলি একটু ভেবে বলল,
“কারণ আমি ছোটবেলায় অন্ধকারের মধ্যে আলো এঁকেছিলাম।”
“কে আপনাকে আলো চিনতে শিখিয়েছিল?”
তুলি মৃদু হেসে বলল,
“একজন বৃদ্ধ।”
“হেমন্ত দাদু?”
“হ্যাঁ।”
“তিনি কী বলেছিলেন?”
তুলি জানালার বাইরে তাকাল।
“তিনি বলেছিলেন, এক প্রদীপের কাজ পুরো পৃথিবী আলোকিত করা নয়।”
সাংবাদিক জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে?”
তুলি বলল,
“পরের প্রদীপটা জ্বালানো।”
পনের.
এক সন্ধ্যায় অয়ন আবার সেই পুরোনো ঘড়িঘরের নীচে বসেছিল।
তার বয়স এখন পঞ্চাশের কাছাকাছি।
চুলে পাক ধরেছে।
চোখে চশমা।
হাতে সেই পিতলের প্রদীপ।
হঠাৎ একটা ছোট ছেলে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
ছেলেটা বলল,
“দাদু, এটা কেন জ্বালানো?”
অয়ন একটু হেসে বলল,
“তুই কি জানিস আলো কী?”
ছেলেটা বলল,
“বাল্ব।”
অয়ন হেসে ফেলল।
“আর কিছু?”
“সূর্য।”
“আর?”
ছেলেটা ভাবল।
তারপর বলল,
“মানুষ?”
অয়ন চমকে তাকাল।
“কে বলেছে?”
ছেলেটা বলল,
“আমার দিদা।”
অয়ন আকাশের দিকে তাকাল।
সন্ধ্যার আকাশে প্রথম তারা উঠেছে।
তার মনে হল, হেমন্ত দাদু হয়তো কোথাও বসে হাসছেন।
ষোল.
সেদিন রাতে অয়ন বাড়ি ফেরার পথে দেখল, ঘড়িঘরের পুরোনো ঘড়িটা চলছে।
কেউ ঠিক করেছে।
কখন?
সে জানত না।
ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে।
টিক।
টিক।
টিক।
বহু বছর ধরে থেমে থাকা সময় যেন আবার হাঁটতে শুরু করেছে।
অয়ন দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হল—
সময় কখনও থেমে থাকে না।
আমরাই কখনও কখনও থেমে যাই।
কোনো ব্যর্থতার সামনে।
কোনো মৃত্যুর সামনে।
কোনো বিচ্ছেদের সামনে।
কোনো অপমানের সামনে।
কোনো অসম্ভব স্বপ্নের সামনে।
আমরা ভাবি—
“এখানেই শেষ।”
কিন্তু জীবন চুপচাপ বলে—
“না।
এটা একটা অধ্যায় মাত্র।”
সতের.
বাড়ি ফিরে অয়ন পুরোনো আলমারি খুলল।
ভিতরে তার প্রথম “আগামীকাল” পত্রিকার একটা কপি এখনও ছিল।
পাতাগুলো হলুদ হয়ে গিয়েছে।
প্রথম পাতায় সেই পুরোনো বাক্য—
“আজ যতই কঠিন হোক, আগামীকাল আমাদের হাতে।”
অয়ন অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর পুরোনো কলমটা বের করল।
নতুন একটা খাতা খুলল।
লিখল—
“যে মানুষটা ভাবছিল তার জীবনে আর কোনো আলো নেই, সে একদিন বুঝতে পারল—সে নিজেই কারও জন্য আলো হয়ে উঠেছিল।”
তারপর কলম থামিয়ে দিল।
জানালার বাইরে তাকাল।
শহরে অসংখ্য আলো।
কোথাও রাস্তার বাতি।
কোথাও দোকানের সাইনবোর্ড।
কোথাও জানালার আলো।
কোথাও রান্নাঘরের হলুদ আলো।
কোথাও পড়ার টেবিলের ছোট বাতি।
কোথাও হাসপাতালের জানালা।
কোথাও একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে বসে আছে।
অয়ন বুঝল—
হেমন্ত দাদু ভুল বলেননি।
একটা প্রদীপ দিয়ে পুরো শহর আলোকিত হয় না।
কিন্তু একটা প্রদীপ থেকে আরেকটা প্রদীপ জ্বলে।
তারপর আরেকটা।
তারপর আরেকটা।
আর একদিন পিছনে তাকালে দেখা যায়—
যে শহরটাকে একসময় অন্ধকার মনে হয়েছিল, সেই শহরের প্রতিটি জানালায় আলো জ্বলছে।
শেষ.
পৃথিবী আজও অন্ধকারে ভরে যায়।
মানুষ আজও হতাশ হয়।
স্বপ্ন ভেঙে যায়।
প্রিয় মানুষ চলে যায়।
চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
অন্যায় ঘটে।
কখনও কখনও মনে হয়—
“আর পারছি না।”
সেই মুহূর্তে হয়তো তোমার দরকার পুরো পৃথিবীর উত্তর নয়।
হয়তো দরকার শুধু একজন মানুষ, যে তোমার পাশে বসে বলবে—
“চল, আরেকটু হাঁটি।”
হয়তো দরকার একটা ছোট্ট প্রদীপ।
হয়তো দরকার একটা হাত।
হয়তো দরকার একটা শব্দ—
“আমি আছি।”
আর যদি এমন কাউকে তুমি খুঁজে না পাও—
তাহলে নিজেই সেই মানুষটা হয়ে ওঠো।
নিজের জন্য।
তারপর অন্য কারও জন্য।
কারণ আলো মানে অন্ধকারের অনুপস্থিতি নয়।
আলো মানে—
অন্ধকারের মাঝেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস।
আর আশা মানে এই বিশ্বাস নয় যে আগামীকাল সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
আশা মানে—
আগামীকালকে একটু ভালো করার জন্য আজ আমি কিছু একটা করব।
তাই পৃথিবী যতই হতাশাময় হোক,
তোমার হাতে যদি একটা ছোট প্রদীপ থাকে,
তাকে নিভতে দিও না।
হয়তো তুমি জানো না—
ঠিক তোমার আলোটার অপেক্ষাতেই
কেউ একজন
অন্ধকারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
আর তুমি যখন তার দিকে এক পা বাড়াবে,
হয়তো সেও তোমার দিকে এক পা বাড়াবে।
তারপর দুজন।
তারপর দশজন।
তারপর একশো জন।
আর একদিন—
হয়তো পুরো পৃথিবী নয়,
কিন্তু তোমাদের ছোট্ট পৃথিবীটা
আলোর দিশা খুঁজে পাবে।
কারণ অন্ধকার যতই দীর্ঘ হোক,
একটা প্রদীপের জন্য রাত কখনও চিরস্থায়ী নয়।








০ টি মন্তব্য