অ্যান কারসনের গদ্য কবিতা

অনুবাদ: বিদ্যুত খোশনবীশ


[কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের পণ্ডিত অ্যান কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ জুন, টরন্টোতে। শৈশব কেটেছে অন্টারিওর বিভিন্ন শহরে। গ্রিক ও লাতিন ভাষার অধ্যয়ন তার লেখকজীবনের মূল প্রস্তুতি। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং ১৯৮১ সালে পিএইচডি করেছেন; সেন্ট অ্যান্ড্রুজেও ধ্রুপদী ভাষা ও সাহিত্য পড়েছেন। নব্বইয়ের দশকে অ্যান কারসনের ব্যতিক্রমী সমসাময়িক কবিতা তাঁকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার এনে দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৬ সালের ল্যানান অ্যাওয়ার্ড এবং ১৯৯৭ সালের পুশকার্ট প্রাইজ। এর এক বছর পর প্রকাশিত হয় ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: আ নভেল ইন ভার্স’। গ্রিক পৌরাণিক দানব গেরিয়ন ও হেরাক্লেসের গল্পকে আধুনিক যুগের ত্রিভুজ প্রেমের রূপ দেওয়া এই কাব্য-উপন্যাস ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। ভালোবাসা, কামনা ও হতাশা নিয়ে লেখা সাহিত্যকর্মগুলোতে তিনি প্রাচীন ঐতিহ্য ও রহস্যবাদের সঙ্গে আধুনিকতার চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।
২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অ্যান কারসনকে নতুন করে বিশ্বপাঠকের সামনে নিয়ে এলো। সুইডিশ একাডেমি তার সাহসী, উদ্ভাবনশীল রচনাভুবন এবং ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে কৌতুকময় কথোপকথনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। একটি মানুষের জীবন কতখানি জানা সম্ভব? কারসনের লেখায় প্রশ্নটি বারবার ভিন্ন চেহারা পেয়েছে। কাউকে ভালোবেসে আমরা কতখানি নিজের কল্পনায় তাকে সাজিয়ে নিই? মৃত মানুষের চিঠি ও ছবি থেকে তার কতখানি উদ্ধার করা যায়? একটি পুরোনো কবিতাকে সহজবোধ্য করতে গিয়ে কী মুছে ফেলি? এসব প্রশ্ন তার রচনার গঠন পর্যন্ত বদলে দেয়। তার কবিতা পাঠককে নিজের বোঝার কাজে প্রবৃত্ত করে। কোথায় কাঁদতে হবে, কোথায় বিমুগ্ধ হতে হবে, তার সংকেত তিনি কমিয়ে দেন। ফলে, পাঠকের নিজের স্মৃতি ও বিচার সক্রিয় হওয়ার অবকাশ বাড়ে। লেখার শীতল বলে মনে হওয়া পৃষ্ঠতলের ভিতরে আবেগের এই জটিল কাজটি চলে। জ্ঞান এখানে শ্রম চায়, অনুভবও।
অ্যান কারসনের ‘কিছু কথা’ পর্বের এই কবিতাগুলো প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে দ্য ইয়েল রিভিউ ম্যাগাজিনে। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে কবিতাগুলো অন্তর্ভুক্ত হয় তাঁর প্রকাশিত একই নামের কাব্যসংকলনে ।]

উল্টো দিকে হাঁটা প্রসঙ্গে কিছু কথা

মা আমাদের উল্টো দিকে হাঁটতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি বলতেন, এভাবে মৃতরা হাঁটে। কোথা থেকে যে তিনি এই ধারণা পেয়েছিলেন? হয়তো কোনো ভুলভাল অনুবাদ থেকে। মৃতরা আসলে উল্টো দিকে হাঁটে না, তারা আমাদের পেছন পেছন হাঁটে। তাদের ফুসফুস নেই এবং তারা আমাদের ডাকতেও পারে না, তবে তারা খুব ব্যাকুলভাবে চায় আমরা যেন পেছন ফিরে তাকাই। তারা আসলে ভালোবাসার শিকার, তাদের অনেকেই।

সংশোধন প্রসঙ্গে কিছু কথা 

কাফকা তার ঘড়ির কাঁটা দেড় ঘণ্টা এগিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন। ফেলিস প্রতিনিয়ত তাতে সঠিক সময় ফিরিয়ে আনতেন। তা সত্ত্বেও আমরা একে অপরকে তার স্বরূপেই ভালোবাসি—কথাগুলো কাফকা তার ডায়রিতে লিখেছিলেন, সঙ্গে ছিল ফেলিসের সোনার দাঁত নিয়ে কিছু মন্তব্যও। ১৯১২ সালে দাঁতগুলোর ঝিলিক তার চোখে ছিল নরকের দীপ্তির মতো। প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিয়ে করব করব বলেও তারা করেননি। বিয়ের পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তির একটি তালিকা তিনি তৈরি করেছিলেন। নিজের জীবনের কাছ থেকে পাওয়া আঘাত সহ্য করার অক্ষমতা (পক্ষে), রাত ১০:৩০-এ মা-বাবার বিছানার ওপর সাজিয়ে রাখা রাতের পোশাকগুলোর দৃশ্য (বিপক্ষে) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। রক্তক্ষরণ তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। চিকিৎসাকেন্দ্রে ডাক্তাররা যখন তাকে কথা না বলার পরামর্শ দিলেন, তিনি মেঝেজুড়ে রেখে গেলেন কাচের মতো কিছু বাক্য। তার একটিতে লেখা ছিল, ফেলিসের মধ্যে অতিরিক্ত নগ্নতা ছিল। সুস্থ দাঁত? সেগুলোও নিজস্ব কায়দায় ভয়ংকর।

ভ্যান গঘ প্রসঙ্গে কিছু কথা

আমি মদ পান করি হলুদ আকাশটাকে বোঝার জন্য, বিশাল হলুদ আকাশটাকে, ভ্যান গঘ একবার বলেছিলেন। তিনি যখন পৃথিবীর দিকে ফিরে তাকালেন, দেখতে পেলেন পেরেকগুলোকে, যেগুলো দিয়ে বস্তুর সাথে রংগুলোকে গেঁথে রাখা হয়েছিল এবং দেখলেন পেরেকগুলোই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।

মোনালিসা প্রসঙ্গে কিছু কথা 

প্রতিদিন সে তার প্রশ্ন ঢেলে দিত মোনালিসার ভেতর, প্রত্যুত্তরে মোনালিসাও আবার ঢেলে দিত সেই প্রশ্ন তার ভেতর, ঠিক যেভাবে আপনি এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে জল ঢালেন। আমাকে বলতে আসবেন না যে সে তার মাকে আঁকছিল, আঁকছিল কামনা কিংবা ইত্যাকার কিছু। এমন এক মুহূর্ত আসে, যখন জল এ-পাত্রে থাকে না, ও-পাত্রেও থাকে না—সে কী তৃষ্ণা! সে ভেবেছিল, ক্যানভাসটা যখন পুরোপুরি শূন্য হয়ে যাবে, তখনই সে থামবে। কিন্তু নারীরা দৃঢ়চেতা। মোনালিসা পাত্র চিনেছিল, জল চিনেছিল, চিনেছিল নশ্বর তৃষ্ণাকেও।

সংগ্রহ সমগ্র প্রসঙ্গে কিছু কথা 

শৈশব থেকেই তার স্বপ্ন ছিল বইয়ের তাক ও আলমারিতে পৃথিবীর সমস্ত কিছু থরে থরে সাজিয়ে রাখার। অভাব, বিস্মৃতি এবং এমনকি সংগৃহীত কোনো কিছু হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকেও সে অস্বীকার করত। নূহের কাছ থেকে শৃঙ্খলা প্রবাহিত হতো নীল ত্রিভুজাকারে, এবং নিজস্ব শ্রেণিবিন্যাসের বিশুদ্ধ উন্মাদনা তার জীবনকে গ্রাস করতে করতে ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠেছিল, অন্যেরা সেটাকেই ডাকতে শুরু করেছিল ঢেউ নামে, তারা ডুবে গিয়েছিল, ডুবে গিয়েছিল তাদের মতো মানুষের পৃথিবী।

অর্কিড প্রসঙ্গে কিছু কথা 

আমরা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বেঁচে থাকি, কারণ আমরা এমন একদল মানুষ যাদের জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল। আমার কাছে তোমাদের খোঁড়া সুড়ঙ্গগুলোকে অদ্ভুতভাবে লক্ষ্যহীন মনে হবে, শিকড় উপড়ানো অর্কিডের মতো। তবে তাদের সুবাস অবিনশ্বর। কিছুদিন আগে ছোট্ট একটি ছেলে অ্যামহার্স্ট থেকে পালিয়ে গেছে, ১৮৮৩ সালের এক চিঠিতে এমিলি ডিকিনসন লিখেছেন। ছেলেটি কোথায় যাচ্ছিল, জিজ্ঞেস করা হলে সে উত্তর দিয়েছিল, ভারমন্ট অথবা এশিয়ায়।

আশ্রয় প্রসঙ্গে কিছু কথা 

মাছের হৃৎপিণ্ড দিয়ে তুমি দেয়ালে লিখতে পারো, কারণ ওতে ফসফরাস আছে। ওরা মাছের হৃৎপিণ্ড খায়, নদীর ধার ধরে ভাটির দিকে কিছু খুপরিঘর আছে। তোমার কাছে যতটা সম্ভব ভুল প্রতীয়মান হওয়ার জন্যই লিখছি এসব। চলে যাওয়ার সময় দরজাটা বদলে দিয়ে যেয়ো, দেয়ালে এমনটাই লেখা আছে, এখন তুমিই বলো কথাটা কতটুকু ভুল। কতক্ষণ জ্বলজ্বল করবে সেই লেখা। বলো আমাকে।

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।