মনস্তাত্ত্বিক রহস্যের আখ্যান ‘উত্তরের খেপ’

আশরাফ উদদীন আহমদ

মনুষ্যজীবনের সীমাহীন বৈচিত্র্যকে নিজ প্রকরণ-কাঠামোয় ধারণ করার আন্তগর্রজেই উপন্যাস হয়ে উঠেছে বিশ্বজনীন-বহুমাত্রিক, আধুনিককালের জীবন-জিজ্ঞাসাকে সবর্ত্রভাবে ধারণ করেই উপন্যাসের শুভযাত্রা, এবং শিল্পপ্রকরণকে সঠিকভাবে প্রয়োগের ভেতর দিয়ে, সভ্যতার আর্কষণীয় অভিযান যে মানুষকে আবিস্কার করেছে, যা উপন্যাসে জীবনকে বাস্তবসম্মতভাবে চিহিৃত করে আমাদের একটা বৃহৎতর জায়গায় সন্নিবেশিত করে এবং সেখানেই তার চরম সার্থকতা। বাংলাসাহিত্যে প্যারিচাঁদ মিত্রের (১৮১৪—১৮৮৩) প্রথম উপন্যাস ‘আলালের ঘরের দুলাল’ (১৮৫৮) কেই যদি বাংলা উপন্যাসের যাত্রাবিন্দু বলে ধরেই নিতে হয়, সেখানেও কিছু বাঁধা-বাধ্যকতা আছে, যা হয়তো উপন্যাসের অবরয় ধরা পড়ে না, কিন্তু সফল উপন্যাসিক হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮—১৮৯৪) কে বাংলাসাহিত্যে স্থান ছেড়ে দিতে হয়, যার ফলে তাকে সাহিত্যসম্রাট উপাধি দেওয়া, তিনি জীবনের বিশাল কলরবকে নতুন আঙ্গিকে উপন্যাসে তুলে এনেছেন মানতেই হয়, গভীরভাবে জীবনকে অনুধাবণ-চরিত্রের মনোগভীরে পৌঁছানো-মনস্তাত্বিক জটিলতাকে বিশ্লেষণ এবং উন্মোচনের প্রবল দক্ষতার মধ্যেই বিকাশিত হয় তার সামর্থ্য। তার পরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১—১৯৪১) কে শ্রেষ্ট এবং সার্থক উপন্যাসিক হিসেবে মনে করা হয়, তার ‘গোরা’(১৯১০) উপন্যাসটিকে আধুনিক উপন্যাসের একটা মডেল হিসেবে চিহিৃত হয়েছে, পরবর্তি সময়ে বাংলাসাহিত্যে আরো অনেক সাহিত্যিক উপন্যাস জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন, বাংলা উপন্যাসকে সার্থক রূপ দিয়েছেন সে’ সমস্ত সাহিত্যিক, আধুনিক বাংলা উপন্যাসের বয়স শত বছর হয়ে গেছে, বঙ্কিম পরবর্তি রবীন্দ্রনাথের হাতে যেহেতু উপন্যাসের বিকাশ-প্রকাশ এবং প্রকৃত জনয়িতা বলা হয়ে থাকে, তার পথ ধরেই পরবর্তীসময়ে শরৎচন্দ্র-প্রভাতকুমার-প্রমথ চৌধুরী-তারাশঙ্কর-মানিক-বিভূতি-প্রেমেন্দ্র মিত্র-কাজী নজরুল ইসলাম-অচিন্ত্যকুমার-বুদ্ধদেব বসু-প্রবোধকুমার স্যানাল-জগদীশগুপ্ত-সতীনাথ-সন্তোষকুমার-জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী-নরেন্দ্রনাথ-সমরেশ বসু-কমলকুমার-অমিয়ভূষণ-সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ প্রমূখ, যদিও বাঙালী মুসলমান সমাজ তখনো সেভাবে উঠে দাঁড়াতে পারেনি, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক কারণে পশ্চাৎপদ ছিলো, আর তাই সাহিত্যেও তাদের অংশগ্রহণ সেভাবে চোখে পড়েনি, ছিঁটেফোঁটা যা ছিলো, তা অকিঞ্চিৎকর, কিন্তু তিরিশ-চল্লিশ দশকে আলোর একটা বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায়, মোজাম্মেল হক(শান্তিপুরী)-কাজী আবদুল ওদুদ-নজিবর রহমান-কাজী ইমদাদুল হক-হুমায়ন কবির প্রমূখ সাহিত্যিক বাংলাসাহিত্যের আলোর মশাল হাতে এগিয়ে আসেন, পরবর্তী সময়ে সার্থক কয়েকজন উপন্যাসিক আমাদের দৃষ্টি কাড়ে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-আবু রূশদ-সরদার জয়েনউদদীন-আবু ইসহাক-শওকত ওসমান-শামসুদদীন আবুল কালাম-আলাউদ্দীন আল আজাদের এবং শওকত আলী প্রমূখ সাহিত্যিক বাংলা উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করেছেন, এবং দিয়েছেন প্রাণশক্তি, এনেছেন বিষয়ের বৈচিত্র্য-চরিত্রের ভিন্নতা-বর্ণনায় অভিনবত্ব-চিন্তার গহনে হয়েছে উৎকর্ষমন্ডিত।

পূর্ববাংলার জীবনভিত্তিক উপন্যাস, যেখানে সাহিত্যিক সীমিত হলেও সচেতনভাবে প্রকৃতিকে-জীবনবৈচিত্র্যকে উপস্থাপন করেছেন প্রতীকি ব্যঞ্জনায় নানান চিত্রকল্পের সমন্বয়ে, একটি সুনির্দিষ্ট কাল পরিপ্রেক্ষিতকে স্পষ্ঠতর বাস্তবানুগ ও জীবননিষ্ট করে তোলার ক্ষেত্রে এই প্রয়াস যথেষ্ট ফলবতী হযেছে, তবে উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে চমৎকার নৈপূণ্যের পরিচয় দিলেও ইতিহাস আশ্রিত জীবনের চেয়ে সমকালের জীবনই যে সমকালীন উপন্যাসিক সত্ত্বাকে অধিক আলোড়িত করে। শ্রেণীসচেতন শিল্পী, তাই বস্তুবাদী সমাজচিন্তার আলোকে তুলে ধরেন গ্রামীণ মহাজনশ্রেণীর শোষণের চিত্র, নির্মাণ করেন সর্বহারা মানুষের সংগ্রাম ও উত্তরণের জয়গাঁথা। শাসন নামক শোষণ যেন একপ্রকার নিপীড়ন, সে কথা বোঝাতেই তাদের প্রতিবাদী বাঁক।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শওকত আলী (১৯৩৬—২০১৮) জীবনবাদী ধারার অন্যতম শক্তিমান এক পুরোধা, ষাটের দশকে অত্যন্ত সচেতন সাহিত্যিক হিসেবে ‘পিঙ্গল আকাশ’ দিয়ে তার যাত্রা শুরু ১৯৬৪’তে, সৎ বাপের সংসারে একটি মেয়ের বেড়ে ওঠা এবং তার পারিবারিক ও সামাজিক ভূমিকা নিয়েই এই উপন্যাসটি নির্মিত, অথচ ১৯৮৪’এ এসে একেবারে অন্যরকম ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক উপন্যাস ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ লিখে বাংলা সাহিত্যকে নাড়িয়ে দিলেন চরমভাবে এবং জানিয়ে দিলেন উপন্যাসে শওকত আলী রৌদ্রোজ্জ্বল বিস্ময়কর এক প্রতিভার নাম। সংস্কৃতবহুল ও সমাসবদ্ধ অপ্রচলিত শব্দে, লালিত্যময় বাক্যে শাসিত হয়েছে তার উপন্যাসের ভাষা-ভাবনা, একটি সুনির্দিষ্ট কাল পরিপ্রেক্ষিতকে স্পষ্ঠতর বাস্তবানুগ ও জীবননিষ্ট করে তোলার ক্ষেত্রে এই প্রয়াস যথেষ্ট ফলবতী হয়েছে, তবে তার ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে চমৎকার নৈপূণ্যের পরিচয় দিলেও ইতিহাস আশ্রিত জীবনের চেয়ে সমকালের জীবনই যে শওকত আলীর উপন্যাসিক সত্ত্বাকে অধিক আলোড়িত করে, পিঙ্গল আকাশ (১৯৬৩) যাত্রা(১৯৭৬) অপেক্ষা(১৯৮৭) দক্ষিণায়নের দিন(১৯৮৫) প্রদোষে প্রাকৃতজন (১৯৮৪) সম্বল(১৯৮৫) ওয়ারিশ(১৯৮৯) উত্তরের খেপ(১৯৯১) দলিল(২০০২) বসত(২০০৫) প্রভৃতি উপন্যাসে রয়েছে তারই মোক্ষম স্বাক্ষর এবং রৌদ্দাজ্জ্বল ঝলমলে উপস্থিতি। তেমনি ছোটগল্পে আছে তার ঢের সাফল্য ‘উন্মুল বাসনা’(১৯৬৮) ‘লেলিহান সাধ’(১৯৭৮) ‘শুন হে লখিন্দর’(১৯৮৮) ‘বাবা আপনে যান’(১৯৯৪) এবং মৃত্যুর পর প্রকাশিত ‘বামন’(২০১৮) ‘সাক্ষাৎ আর মার্জনার গল্প’(২০২০)।

ছয়টি গল্পগ্রন্থের আশিভাগ গল্পের পটভূমি গ্রামীণ জীবন অবলম্বী। বাংলাভাষার উপন্যাস সাহিত্যের ধারায় শওকত আলীর অবদান বিশিষ্ট ও ব্যতিক্রম ধর্মচিহ্নিত, নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের বহুমাত্রিক অসংগতির চিত্র-অঙ্কনের ষাট দশকী মৌল প্রবণতার পথ ছেড়ে গল্পে তিনি বিচরণ করেছেন গ্রামীণ জীবনতটে, গ্রামের নিরন্ন-নিঃস্ব খেটে খাওয়া মানুষের জীবন যন্ত্রণা-সংগ্রাম ও দহনের পোড়োজমিতে, শওকত আলী শ্রেণীসচেতন শিল্পী, তাই বস্তুবাদী সমাজচিন্তার আলোকে তিনি তুলে ধরেন গ্রামীণ মহাজনশ্রেণীর শোষণের চিত্র, নির্মাণ করেন সর্বহারা মানুষের সংগ্রাম ও উত্তরণের জয়গাঁথা। শাসন নামক শোষণ যেন একপ্রকার নিপীড়ন, সে কথা বোঝাতেই তার প্রতিবাদী বাঁক। শওকত আলীর কথাসাহিত্যে দুটি ধারার উদ্ধিত, একটি ছোটগল্পের এবং অন্যটি উপন্যাসের, এ’ দুই আঙ্গিকে তিনি রূপায়িত করেছেন দুই জীবনকে, তার ছোটগল্পের ভূবন গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের গ্রামীণজীবন, গ্রামের প্রেম-অপ্রেম-দ্বন্ধ-সংঘাত সামাজিক আচার-অনাচার প্রভৃতি দেখতে পাওয়া যায় গল্পের ভূগোলে, সে গ্রাম যেন তার ভালোবাসার কেন্দ্র, নিজের নির্মিত ভূবন গড়ে ওঠে গল্পের আদলে, আর উপন্যাসের জগত গড়ে উঠেছে নগরজীবনের উঠতি কালচার-দুঃখ সংঘাত প্রেম ভালোবাসা আর হাহাকারের চিত্র নিয়ে, সেখানে তার কোনো ভনিতা নেই, নেই কোনো কৃত্রিমতা। শওকত আলীর উপন্যাসে গ্রাম এসেছে নাগরিক জীবনের সংলগ্ন অনুষঙ্গ হিসাবে, আবার যেহেতু নগরের সঙ্গে গ্রামের মানুষের যোগাযোগ হয়ে উঠেছে ওতপ্রোত, সেহেতু গ্রাম জীবনের কথা বলতে-বলতে নগর-জীবনানুষঙ্গও চলে এসেছে তার ছোটগল্পে।

‘উত্তরের খেপ’(১৯৯১) মূলতঃ মনস্তাত্বিক উপন্যাস, কাহিনীর বাঁকে-বাঁকে জটিল জীবনের হাহাকার ফুটে উঠেছে, জীবন যেমন কঠিন, তেমনি জীবনের আনুষঙ্গিক বিষয়াদিও মারাত্মক, এখানে কোনো ছাড় নেই, হয়তো হাজারো জিজ্ঞাসা আছে, কিন্তু সমস্ত জিজ্ঞাসার কোনো সঠিক উত্তর নেই, একটা অন্ধকার চাপ-চাপ অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে হাজার জিজ্ঞাসার ভেতর, মরিয়ম যেমন একদিন শুধু খেয়ালের বশে স্বেচ্ছায় হায়দারকে ছেড়েছে, সেটা আভিজাত্যের অহংকার নাকি পুরানো প্রেমের আর্কষণ তার পষ্ট রেখাচিত্র অংকন করেছেন সাহিত্যিক শওকত আলী। কিন্তু যে মোহে বা দূর্বার আকর্ষণে মরিয়ম সংসার ভেঙে আপন খালাতো ভাই আজাহারকে বিয়ে করে, হায়দারকে অস্বীকার করে সন্তান মিঠুকে হায়দারের না বলে পাকাপোক্ত একটা যুক্তি দাঁড় করায় তা মাত্র কয়েক বছরের মাথায় আশাভঙ্গ হয়, মস্ত একটা যাঁতাকলে নিজেকে আবিস্কার করে, তাহলে কি সবই ফাঁকি, এই ফাঁকির ভেতর সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।

দেশভাগের ফলে দেশত্যাগের মতো উদ্ভূত পরিস্থিতি, পরবর্তী সময়ের ঘটনার প্রেক্ষপটে শওকতের কলমে উঠে এসেছে বিখ্যাত সৃষ্টি, উত্তরের খেপ-ওয়ারিশ-দলিল প্রভৃতি উপন্যাসে যেমন দেশভাগের মমস্পর্শী কাহিনী রচিত হয়েছে, তেমনি ছোটগল্পেও উঠে এসেছে ভিনদেশি শরণার্থী হয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। সে সংগ্রামমুখর জীবন মৃতপ্রায়, তারপর এসেছে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালীর স্বাধীকারের যুদ্ধ, সে যুদ্ধ বাঙালী সমাজের নিজস্ব, এখানে অবাঙালী মানেই বাঙালীর শত্রু, এমন কি কঠিন অংকের জটিল আবর্তে কাহিনীমালা রচিত হয়েছে, মাহমুদুল হকের ‘কালো বরফ’ হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’ আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘ইছামতির এপার-ওপার’ ‘ভাঙানৌকা’ ‘আধুনিক পুতুল নাচের ইতিকথা’র মতো আখ্যানগুলোতে দেশভাগের মর্মস্পর্শী কষ্টের কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে, দেশভাগ কেনো হলো, যদি নাই বা হতো তাতে এমন কি ক্ষতি ছিলো, অথবা দেশভাগের ফলে আমাদের আত্মা দ্বিখন্ডিত হলো, এই দ্বিখন্ডিত করার অধিকার কে দিলো, এমন হাজারো প্রশ্নে জর্জরিত হয়েছে কাহিনীর পাত্র-পাত্রী, যেন দেশভাগকে একটা জিজ্ঞাসার মধ্যে রাখাটাই বড় কথা, প্রকৃতপক্ষে দেশভাগ বা বাংলা ভাগ আপাময় তৃণমূল মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রধান মাধ্যম, হাজার বছরের লাঞ্চনা-গঞ্জনা বা না পাওয়ার মুক্তিসনদ ছিলো সাতচল্লিশের দেশভাগ, যার ফলে বাঙালী মুসলমান ক্রমে-ক্রমে খোলস ছেড়ে বাইরে বের হওয়ার মোক্ষম সুযোগ পায়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সামাজিকভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে, শওকত আলী প্রতিষ্ঠা পাওয়া মানুষের গল্প মানুষের দিনলিপি অংকিত করেছেন দক্ষ কলমে। তার কলমের কোমল স্পর্শে দেশভাগের তাৎপর্য ফুটে উঠেছে নতুন মাত্রায়। তারপরও তিনি আপদমস্তক অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন, নির্মমতা-পেষবতা বা বন্যতা উগ্র ধর্মান্ধতা তার মস্তিক্যে কখনো বাসা বাঁধেনি, দেশ-কাল পাত্র ভেদে শওকত আলী বাঙালী মনস্তত্ব চেতনার সাহিত্যিক ছিলেন সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষাপটে।

উত্তরের খেপ মানবমনের বিকরণের যে জটিলতা এবং সেই টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে আরেক বৃত্তে নিজেকে দৃশ্যগত প্রত্যাবর্তন উপন্যাসের আখ্যানকে বেগবান করেছে, কাহিনীকে দিয়েছে পুরোদস্তুর শিল্পমান। মরিয়ম তারপর নিজেকে খোলসের ভেতর রাখতে চায়নি, সে বাইরে বের হয়ে নিজের হাহাকারের কথা ব্যক্ত করেছে, নারী শরীর লোভী লম্পট অর্থলোভী জোচ্চর মদপ্য স্বামী আজাহারকে অস্বীকার করতে চাইলেও সে নানান ভয়ে মরিয়মকে নিজের করে রাখতে চেয়েছে, মরিয়ম শুধু হায়দারের সাবেক স্ত্রীই নয়, মিঠুর মা এবং আজাহারের স্ত্রী মুন্নির মা, সমস্ত পরিচয়ই তার অস্তিত্বকে বাংবার কাঁটার আঘাত দিলেও বেগবান থেকেছে জীবনের প্রয়োজনে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। হয়তো এখানেই নারীকে ধয্য ধরতে হয় ভালো কিছুর জন্য, একটা ভুলকে ঢাকতে আরেকটি ভুল করা কারো সমীচিন নয়, আর সে’ কারণে হায়দার গ্রহণ করতে পারেনি পূনরায় মরিয়মকে।

‘গড় শ্রীখন্ড’ উপন্যাস অমিয়ভূষণ মজুমদারের মানবপ্রবাহের জীবনসংগ্রামের মহাকাব্যিক শিল্পরূপ। সাম্প্রাদায়িক দাঙ্গা-দেশ ভাগের ফলে দুই বাংলার সীমান্তবতী এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের বিপর্যস্ত ও ঘূণে ধরা জীবনচর্চার পটভূমিতে রচিত উপাখ্যান, এর পাত্র-পাত্রি সমাজের বিভিন্ন স্তরের, গ্রামাঞ্চলের নানান শ্রেণীর চরিত্রের সমাবেশে ও একটি অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশ, সমাজচেতনার বিশ্বস্ত ভঙ্গীকে ও জীবন চিত্রণের দক্ষতায়, লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায়, বিশেষ কাকুতি মিশ্রিত এই উপন্যাস। পাশাপাশি কমলকুমার মজুমদার বাস্তবতার নতুন মাত্রা ও স্ব-উচ্চারিত গদ্যরীতির ব্যবহার তার ‘অন্তর্জলী যাত্রা” উপন্যাস, দেশভাগের নানান রাজনৈতিক-সামাজিক সমস্যা নিয়ে তার এই লেখা, এখানেও দেশবিভাগের মর্মবেদনা প্রজ্জলিত। প্রফুল¬ রায়ের ‘কেয়া পাতার নৌকা’(১ম-২য় খন্ড) অতীন বন্দ্যেপাধ্যায়ের ‘নীল কন্ঠ পাখির খোঁজে’ রমাপদ চৌধুরীর ‘বনপলাশীর পদাবলী’ মহাশ্বেতা দেবীর ‘আঁধার মানিক’ উপন্যাসে যেমন দেশবিভাগের হাহাকার ফুটে উঠেছে, তেমনি মাহমুদুল হকের ‘কালো বরফ’ হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’ আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘ইছামতির এপার-ওপার’ ‘ভাঙানৌকা’ ‘আধুনিক পুতুল নাচের ইতিকথা’র মতো আখ্যানগুলোতে দেশভাগের মর্মস্পর্শী কষ্টের কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে, দেশবিভাগের পটভূমিকা যেভাবে তুলে ধরেছেন, এবং বুকের ভেতরের কষ্টকে নিংড়ে-নিংড়ে পাঠককে জানিয়েছেন, উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষের জীবন এবং তার যন্ত্রণা কতো গভীর তাও অংকিত করেছেন, তেমনি উদ্বাস্তু মানুষের মনস্তাতিক জটিলতার ছবি অংকিত করেছেন সফলতার সঙ্গে।

উত্তরের খেপ মানবমনের বিকরণের যে জটিলতা এবং সেই টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে আরেক বৃত্তে নিজেকে দৃশ্যগত প্রত্যাবর্তন উপন্যাসের আখ্যানকে বেগবান করেছে, কাহিনীকে দিয়েছে পুরোদস্তুর শিল্পমান। মরিয়ম তারপর নিজেকে খোলসের ভেতর রাখতে চায়নি, সে বাইরে বের হয়ে নিজের হাহাকারের কথা ব্যক্ত করেছে, নারী শরীর লোভী লম্পট অর্থলোভী জোচ্চর মদপ্য স্বামী আজাহারকে অস্বীকার করতে চাইলেও সে নানান ভয়ে মরিয়মকে নিজের করে রাখতে চেয়েছে, মরিয়ম শুধু হায়দারের সাবেক স্ত্রীই নয়, মিঠুর মা এবং আজাহারের স্ত্রী মুন্নির মা, সমস্ত পরিচয়ই তার অস্তিত্বকে বাংবার কাঁটার আঘাত দিলেও বেগবান থেকেছে জীবনের প্রয়োজনে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। হয়তো এখানেই নারীকে ধয্য ধরতে হয় ভালো কিছুর জন্য, একটা ভুলকে ঢাকতে আরেকটি ভুল করা কারো সমীচিন নয়, আর সে’ কারণে হায়দার গ্রহণ করতে পারেনি পূনরায় মরিয়মকে।

শওকত আলী উত্তরের খেপ উপন্যাসে সাধারণ নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর গল্প ফেঁদেছেন, যারা জীবনকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করে এবং সহজ-সরল জ্ঞানে সেখান থেকে উত্তরণের পথ বেছে নেয়। সাতচল্লিশের দেশভাগের ফলে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ উপন্যাসের আখ্যানভূমিকে বেশ বড় জায়গা দিয়েছে, কাহিনী অবয়বে শওকত আলী দেশভাগের পর উদ্বাস্তু পরিবারকে আখ্যান কাঠামোয় নির্মাণ করেছেন, অসময়ে পরিবারটি সাম্প্রদায়িক হানাহানির কবল থেকে পালিয়ে আসে হায়দারের বাবা সবদর অর্থাৎ সবদরের বাবা আসগর আলী জলপাইগুড়ি থেকে দিনাজপুর অন্যদিকে উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্র নিশাতের বাবা মাজাহার খান, মরিয়মের পিতামহ মীর আবেদ আলী। এভাবে মানুষ একে অপরের সঙ্গে মনের অজান্তে গাঁটছড়া বাঁধে।

উপন্যাসের শেষে দেখা যায় হায়দার আর মরিয়মের মধ্যে কথোপথনে হায়দার বলে, মানুষের জীবন এমনই, কখনো নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়, কখনো পাওয়া যায় না। এভাবেই জীবনকে বিশ্লেষণ করার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনের সান্নিধ্যে পৌছে যায়। মরিয়মের পাওয়া অপূর্ণ রয়ে যায়, সে যেন শুধুই ছবির মতো একটা দগদগে স্বপ্ন নিয়ে বসবাস করে। শরৎচন্দ্রের কথায় বলতে হয়, বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, কখনো হয়তো দূরেও সরিয়ে দেয়। পঙ্গুত্ব জীবন নিয়ে হায়দার শেষ জীবনটা আর মরিয়মের দয়ার পাত্র হতে চায়নি, সে ফিরে যায় নিজের ভেতরে, জনস্রোতের অনুকুলে হাঁটতে থাকে, সে তারপর ঢাকার বাস ধরে পরিচিত পরিবেশ বা মানুষের সহচার্য ছেড়ে পালিয়ে যাবে।

উত্তরের খেপ উপন্যাসটিকে নানানভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে ইতোপূর্বে কিন্তু মনোত্ত্বাত্বিক এই টানাপোড়েনটিকে সবাই বরাবরের মতো পাশ কাটিয়ে গেছে। জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো এক সাহসী মুক্তিযোদ্ধার জীবন প্যাঁচালী বড়ই করুণ, এখানে মানুষের জীবনের মূল্যের চেয়ে তার আমিত্বকে বড় করা হয়েছে, একটা ভুলকে বুকে নিয়ে তারপরও মানুষ বাঁচে কিন্তু সে বাঁচা কি বাঁচা বলে সঠিকভাবে, মিঠুকে বুকে চেপে নিলেও তার দায়িত্ব নিতে চায়নি, যদিও মরিয়ম স্বামী সংসার ফেলে হায়দারের সঙ্গে পূনরায় জুটি বাঁধতে চেয়েছিলো কিন্তু সে অভিপ্রায় বাস্তবে পল্লবিত হয়নি, যা হওয়া সম্ভব নয়, সে বিষয়ে হায়দারের ভ্রূক্ষেপ নেই। যে হায়দার একদিন মাকে ফেলে চলে গিয়েছিলো মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে, সেই রকমই আরেকটি পাপ সে করবে মিঠুকে ফেলে সাবেক স্ত্রী মরিয়মের কথা অগ্রাহ্য করে চলে যাবে, কারণ জীবনে যখন সাধ-স্বপ্ন আশা-ভালোবাসা খসে যায়, অন্ধকার হয়ে যায় ভবিষ্যত, স্ত্রী থাকে না, সন্তান থাকে না, তখন তার আর কি থাকে নিজের বলে, ফেরার জায়গাটাও কেমন ধূসর হয়ে যায়, মরিয়মকে একেক সময় বড় বেশি ঘেন্না হয়েছে কিন্তু তারপরও কেনো জানি ভুলতে পারেনি, ভোলা কি যায় বর্ষার প্রথম কদম ফুলের সেই দিনগুলোর কথা! অথচ বউ তার অন্য পুরুষের কাছে চলে গেছে, পুরানো ভালোবাসা! ছেড়েছে তাকে, অস্বীকার করেছে মিঠুর জন্মপরিচয় নিয়েও, কোনোক্রমে হায়দারের নয় বলে যে উচ্চকন্ঠে ঘোষণা দিয়েছে, এবং তার সংসারটিকে এভাবে যদি দেখা যায় তো মনে হবে হায়দার সত্যিই একজন মহান ব্যক্তি, স্বাধীনতা যুদ্ধের শুধু সাহসী যোদ্ধাই নয়, সত্যিকার একজন শ্রেষ্ট মানুষও বটে, যে কোনো লোভের কাছে মাথা নত করেনি, জীবনের বহমান স্রোতের ভেতর দিয়ে নিজেকে স্বতন্ত্র রাখার চেষ্টা করেছে।

সাতচল্লিশের দেশভাগ প্রান্তিক বাঙালী মুসলমানের জন্য যদিও বড় একটা আর্শিবাদ ছিলো, কারণ বঙ্গভঙ্গের ফলে যে জাতি একটু স্বপ্ন দেখেছিলো, একটু সামনে আসার চিন্তায় মগ্ন ছিলো কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে সে স্বপ্ন আর দানায়িত হলো না, সমূলে বিনাশ হলো, সেখানে আশ্রয় নিলো ক্ষোভ-হিংসা-আক্রোশ, এভাবেই একটা জাতি দীর্ঘদিনের কষ্ট বুকে নিয়ে তিমির অন্ধকারে কাটালেও দেশভাগ আবার এনে দিলো স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা। যার ফলে দেশভাগ এ’ অঞ্চলের বাঙালী মুসলমানকে শিক্ষিত হয়ে দেশ শাসনের মতো গুরুদায়িত্ব অর্পণের সুযোগ করে দিলো, সাহিত্যিক শওকত আলী তার সাহিত্যে দেশভাগকে এ’ কারণে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চিত্রায়িত করেছেন। কেনো দেশভাগ বা বাংলাভাগ অবশ্যম্ভাবী! বাঙালী মুসলমান হাজার বছর ধরে পশ্চাৎপদ, তাকে ম্লচ্ছ-যবন-নেড়ে হিসেবে তুচ্ছজ্ঞান করা হতো, শুধু তুচ্ছ জ্ঞানই নয় বরং অবহেলায় দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিলো, বর্ণবাদী ব্রাহ্মণ্য হিন্দু সমাজ বরাবরই রক্ষণশীল নাক-উছা। তারা নিম্নবিত্ত বা দলিত অথবা মুসলমানদের মানুষের মর্যাদায় দেখতো না, ভারতবর্ষ মুসলমানেরা শত-শত বছর শাসন করলেও বাঙালী মুসলমানের ব্যাপারে ধনঢ্য-বর্ণবাদী হিন্দুদের উপেক্ষার দৃষ্টি বরাবরই পরিলক্ষিত ছিলো, যার ফলস্বরুপ ভারতবর্ষ ভাগ বা বাংলাদেশের স্বাধীনতা তরান্বিত হয়েছিলো বলতে হয়। শওকত আলী বাঙালী মানস পটের সাহিত্যিক, তার দৃষ্টিভঙ্গি তার চেতনায় বাঙালী মুসলমান সমাজ একটা স্বতন্ত্র স্থানের দাবী করে, সে স্থান তিনি তার সাহিত্যে বারবার এনেছেন মমতা মাখানো স্পর্শে, নষ্ট রাজনীতি বা তোষামদের নীতিকে কখনো গ্রহণ করতে পারেননি, নিজে একজন উদ্বাস্তু হওয়া স্বর্ত্ত্বেও মানুষের প্রতি মমত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায় তার সাহিত্যে, উলঙ্গ মানসিকতায় নিজেকে সমার্পণ করেননি, গভীর চিন্তাশীল একজন সাহিত্যিক ছিলেন বলেই সাবলীলভাবে নিজের অভিজ্ঞতার দাগগুলো ছড়িয়ে দিতে কসুর করেননি, বরং অভিজ্ঞতার সাত রঙে আখ্যানের চরিত্রগুলো প্রাণ ফিরে পেয়েছে, এখানেই একজন সাহসী সাহিত্যিক হিসেবে তার চরম স্বার্থকতা। তারপরও বলতেই হয় দেশভাগের ফলে বৃহৎ মানুষের অর্থাৎ বাঙালী মুসলমানের যে জীবন-যাপনের সাফল্য এবং সমগ্র জাতির জীবনে পরিবর্তনই দেশভাগের মহত্ব, হয়তো তা কিছুটা নির্মম শোনালেও সত্যকে মেনে নিতে হবে বাস্তবতার খ্যাতিরে।

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।