সেপ্টেম্বর ৫, ২০০২ | অন্যভাষার গল্প | ০ টি মন্তব্য

লু স্যুনের চীনা গল্প

অনুবাদ: মাহফুজ উল্লাহ

১৯১৮ সালের মে মাসে সে সময়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সবচে প্রভাবশালী পত্রিকা ‘নতুন যৌবন’ এ প্রকাশিত ‘এক পাগলের ডায়রী’ গল্পটি ছিল চীনা সামন্ত সমাজের বিরুদ্ধে কয় ডয়শ(১৮৮১-১৯৩৬)’র যুদ্ধের ঘোষণা। এ গল্পটি আধুনিক চীনা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম ছোট গল্প। চীনে’র আধুনিক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রধান সেনাপতি লু সু্যন শুধু একজন মহান চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক ভাষ্যকারই ছিলেন না, তিনি আধুনিক চীনা সাহিত্যে’র স্থপতিও। প্রথম জীবনে লু সু্যন ছিলেন বিপ্লবী গণতন্ত্রী। পরবর্তী পর্যায়ে কমিউনিষ্ট হয়েছেন। তাঁর লেখা গল্পগুলো থেকে সে সময়ে তাঁর সৃজনশীল লেখার এবং সমালোচনামূলক বস্তুবাদের প্রতিত্রি্কয়া বিশদভাবে বোঝা যায়। এই প্রত্রি্কয়া তাঁর প্রথম জীবনে সৃজিত সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

ব্যক্তিগত কথকতনে লু সু্যন বলেছেন যৌবনে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। যার অনেক কিছু পরে ভুলে যান, কিন্ত্ত তা নিয়ে তাঁর কোন দুঃখবোধ ছিল না। অতীতের স্মৃতিচারণায় আনন্দ পেতেন, কিন্ত্ত কখনো কখনো বড় নিঃসঙ্গতায় কাঁতরাতেন। ফেলে আসা দিনগুলোকে আঁকড়ে ধরার অনিচ্ছা সত্তে্বও পুরোপুরি ভুলে যেতে পারতেন না। আর যেসব স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি তা থেকেই মূলত তাঁর গল্পগলোর জন্ম।

অসুস্থ বাবা, ডাক্তারের অস্বাভাবিক ঔষধ- শীতকালে ঘৃতকুমারীর শেকড়, তিন বছর ধরে শিশির ভেজা আখ, দম্পতি ঝিঁঝিঁ পোকা এবং বীজ পোকা আর্ডিসিয়া … … … যে গুলো সংগ্রহ করা কষ্টসাধ্য। সমাজের নিন্মমুখী চিন্তা চেতনা ও প্রযুক্তি তাঁকে ভিষণ আন্দোলিত করতো। সম্ভবত এসব পরিবেশ পরিবর্তনের জন্যই তিনি নানজিং এ জিয়াংনান নৌ একাডেমী স্কুলে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্ত্ত যারা ‘বিদেশী বিষয়ে’ পড়েছে, সবাই তাদেরকে নিষ্কর্মা হিসাবে খাটো করে দেখতো। সবাই বলতো, হতাশায় বাধ্য হয়ে বিদেশী শয়তানদের কাছে আত্মা বিক্রী করছে। এতৎসত্তে্বও তিনি স্কুলে ভর্তি হ’য়ে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, অংক, ভূগোল, ইতিহাস, ছবি আঁকা এবং শারীরিক শিক্ষা’র বিষয় সহ ‘মানবদেহ সম্পর্কে নতুন পাঠ’ এবং ‘রসায়ন ও স্বাস্থ সম্পর্কে রচনা’র মত নতুন নতুন বিষয়ের সাথে পরিচিত হন। এসব বিষয়ে পড়ার পর তাঁর চেনা ডাক্তারদেরকে বোকা ও হাতুড়ে ডাক্তার বলে মনে হয়। তিনি এসব ডাক্তারদের হাতে নিগৃহীত পঙ্গু জনগণ ও পরিবারগুলোর জন্য সমবেদনা বোধ করেন এবং জাপানের একাটি প্রাদেশিক মেডিকেল কলেজে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

জাপানে পড়ালেখা চলাকালে সব সময়ে স্বপ্ন দেখতেন যুদ্ধ বাঁধলে সেনাবাহিনীর ডাক্তার হিসাবে কাজ করবেন। তখন জাপান-রাশিয়া যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের বিভিন্ন ছবি ছাত্রদের মাঝে প্রদর্শন হতো- ছাত্ররা ছবি দেখে আনন্দ প্রকাশ করতো, কিন্ত্ত একদিন একটি ছবিতে বেশ কিছু চীনা’কে দেখেন, যাদের একজন বন্ধী এবং তার পাশে বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধী লেকটি ছিল রাশিয়ার গুপ্তচর, অন্যদের সাবধান করার জন্য সৈন্যরা লোকটির মাথা কেটে ফেলবে। সেখানে সমাবেত চীনারা এই মজা দেখতে এসেছে।

একটি দুর্বল এবং অনুন্নত দেশের লোক যত শক্তসামর্থই হোক না কেন, তারা নির্মম উদাহরণ হিসাবে ব্যবহূত হ’তে পারে- এটা দেখে তাঁর আর চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়া জরুরী বলে মনে হয়নি। পড়া শেষ না করেই তিনি দেশে ফিরেন। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর জন্য যে মানুষের মানষিকতার পরিবর্তন ঘটানো জরুরী, এটা বুঝতে তাঁর বেশী ভাবতে হয়নি। সেই থেকেই উপলব্ধি করেন এ কাজে সাহিত্যই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম পন্থা। এ চিন্তা থেকেই দু’একজন সমমনাকে সাথে নিয়ে শুরু করেন ‘নতুন জীবন’ পত্রিকা। কিন্ত্ত অল্প সময়ের মধ্যেই ‘নতুন জীবনে’র অনাকাঙ্খিত অপমৃতু্য ঘটে। এতে কিছু সময়ের জন্য নিঃসঙ্গ ও হতাশাগ্রস্থ হন, কিন্ত্ত শেষ পর্যন্ত আশা ছাড়েননি। প্রচন্ড নিঃসঙ্গতার মাঝে লেখেন নিজের লেখা প্রথম গল্প ‘এক পাগলের ডায়েরী’ যা সে সময়ের সামন্ত সমাজের উপর প্রথম আঘাত।

সাহিত্যও যে যুদ্ধের হাতিয়ার এটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন এবং কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণও করেছেন। নিজের কথা বলতে গিয়ে বলেন, 

‘নিজেকে প্রকাশ করার জন্য আমি আর বিশেষ কোন পে্ররণা অনুভব করিনা। সম্ভবতঃ অতীতের নিঃসঙ্গতার বেদনা পুরোপুরি ভুলতে পারিনা ব’লে, নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে যারা লড়ছে তারা যেন সাহস না হারায় সে জন্য চীৎকার করে সাহস জোগাই। আমার সে চীৎকার সাহসের না বেদনার, বিরক্তির না হাস্যকর তাতে পরোয়া করিনা। যেহেতু এটা যুদ্ধের ডাক, তাই আমাকেও সেনাপতির আদেশ মানতেই হবে।’

লু স্যুনের’র গল্পগুলো পড়ে তৎকালিন চীনা সামন্তীয় সমাজ সম্পর্কে গভীরভবে উপলব্ধী করা সম্ভব, সেইসাথে চীনের নয়া গণসাহিত্যে’র ভিত্তি সম্পর্কেও ধারনা লাভ করা যাবে। লু সু্যনে’র চিন্তা চেতনা সাহিত্যকে গণমানুষের প্রতিদিনের … … … প্রতিমুহূর্তের অনুভূতির সারিতে দাঁড় করানোর ইচ্ছাকে প্রলুব্ধ করে।

৩ বর্ষ. ৬ সংখ্যা. ভাদ্র ১৪০৯. সেপ্টেম্বর ২০০২

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।