অদৃশ্য নেটওয়ার্ক

শাদমান শাহিদ

জেসিকার সঙ্গে পরিচয় হয় ময়মনসিংহে। কবি-লেখকদের একটি সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। দেখি সে পেন্ডেল থেকে বেরিয়ে একটু নিরাপদ দূরত্বে মেড্ডা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে, চোখ তার ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে, যেখানে দিকচিহ্নহীন দূর বহুদূর।
আমি তার সিগারেট টানার ভঙ্গি দেখছিলাম। মেয়েরা ধুমপান করলে অন্যরকম লাগে। কে যেন বলেছিল, পৃথিবীতে দুই শ্রেণির লোকের সঙ্গে নাকি খুব সহজেই ভাব জমানো যায়। এক ধূমপায়ী দুই জুয়াড়ি। ধূমপায়ীর সঙ্গে কথা বলতে হলে তার দিকে সিগারেটের পেকেট বাড়িয়ে দাও আর জুয়াড়ির সঙ্গে মিশতে হলে পারো বা না পারো তার সঙ্গে এক দান খেলতে বসে যাও।
জেসিকার সিগারেট টানার দৃশ্য দেখে মনে হলো, এ সেই ধুমপায়ী, যার সঙ্গে সহজেই ভাব জমানো যাবে। আর এরজন্যে প্রয়োজন একটা সিগারেট। সেখানে বেনসন হলে তো কথাই নেই। আমি একটা সিগারেট আঙুলের চিপায় বসিয়ে কাছে গিয়ে লাইটার চাইলাম। দেখি তার পরনে মোবাইল প্যান্ট। যার থাকে অজস্র পকেট। সেখান থেকে একটা হাতড়ে লাইটার বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। আমি তার হাতের দিকে তাকালাম। কাপড়ের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা পুতুলের হাতের মতো চিকনচাকন। চট করে সিগারেটটা জ্বালিয়ে বললাম, আপনার লাইটারটা অসাধারণ।
সে ছুঁ মেরে লাইটারটা কেড়ে নেয়। কোনো কথা বলেনি। হয়তো ভাবছিল ওটা আমি মেরে দিতে পারি। কিন্তু কেন এমন ভাবতে যাবে? আমি তো বাহানা করে মেরে দেওয়ার মতো তেমন কোনো পরিচিত কেউ নই।
তার এমন আচরণে আমার কোথাও যেন একটু লাগলো।
তার কাছ থেকে সরে এসে ব্রহ্মপুত্রের ওপারে দিগন্ত জুড়ে বিস্তৃত ধান ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে সিগারেট ফুঁকতে লাগলাম। চুপচাপ। আর খেয়াল করতে লাগলাম ও কী করে। এমনও তো হতে তার সঙ্গে আরও কেউ রয়েছে। হয়তো তাদের মধ্যে অভিমান পর্ব চলছে। যেজন্য তার মন ভালো না, ফলে কোলাহল থেকে সরে এসে এখানে নিরিবিলি দাঁড়িয়ে নিজেকে নিয়ে ভাবছে।
যা ভেবেছিলাম তাই। সিগারেট শেষ করে আবার লাইটারের বাহানায় তার দিকে পা বাড়াবো, ঠিক তখন দেখি আমারই বয়সি এক যুবক এসে তার পাশে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে নেড়ে কী যেন বোঝাচ্ছে। দেখলাম মেয়েটা নরম হয়ে গেল। তখন আমার অবস্থা রবীন্দ্রনাথের ক্যামিলয়া কবিতার কথকের মতো, বুঝে গেলাম এখানে ঢুকবার সব রাস্তাই বন্ধ।

পরে আবার একদিন দেখা। ইত্তেফাক অফিসে একটা চেক পাওনা ছিল। ওটা গ্রহণ করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিলাম, হঠাৎ চোখে পড়ে। দেখি দোতলার সিঁড়ির কাছে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মোবাইলে আঙুল চালাচ্ছে। কাছে গিয়ে হ্যালো বললাম, কিন্তু চিনতে পারলো না। পরে ময়মনসিংহ, সম্মেলন, সিগারেট, লাইটার ইত্যাদি মিশিয়ে বলতেই চিনতে পারলো। তারপর পকেট থেকে সিগারেটের পেকেটটা বের করে বাড়িয়ে ধরতেই অনেকটা সহজ হয়ে গেল। বললো, চলুন, নিচে যাই। চা খেতে ইচ্ছে করছে।
এভাবেই শুরু জেসিকার সঙ্গে আমার পথ চলা। সে কবিতা লেখে। প্রথম দিকে আর সব মেয়েদের মতো তারও কবিতার বিষয় ছিল ফুল, প্রকৃতি, প্রেম, বিরহ, যাতনা ইত্যাদি। আমিই তাকে জানালাম, এজন্যই নারী কবিরা এখন পর্যন্ত মেইনস্ট্রিমে উঠতে পারেনি। দেশ-সমাজের চোখ পড়ে আছে ‘ফাইভ জি’তে আর তারা এখনও পড়ে আছে আন্দামান দ্বীপে। ফলে নারী লেখকরা ক্রমেই পার্শ্বে পড়ে যায়। আমি বললাম, লিঙ্গ দিয়ে নয়, মানুষের চোখ দিয়ে সমাজ দেখার চেষ্টা করো, দেখবে তোমার কবিতা পথ পেয়ে গেছে।
সে আমার কথা রাখে। তারপর থেকে আমার ফর্মুলা ধরেই চলতে থাকে। এবং টের পায় রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গের মতো তারও অসংখ্য বেড়া খুলে পড়ে গেছে। নিজেকে দেখতে পায় অপার বিস্ময়ের এক জগতের সামনে দাঁড়িয়ে। যেখানে ঢুকে সে স্যাটেলাইটের মতো উড়ে আর বিস্মিত হয়।
আমি দেখি সে উড়ছে কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে না। যাকে বলে পাখির মতো। সবদিকেই উড়ে আবার এও জানে কতটুকু যেতে হবে, কখন ফিরে আসতে হয়।

আমরা যারা সাহিত্যের মানুষ, তাদের সামনে কেউ গলি, খুপরি ইত্যাদি উচ্চারণ করলে কেন জানি একটু বেশিই বুঝে ফেলি। সেই ডোম্বি থেকে আমিন বাজারে এক খুপরিতে কুবের-কপিলার রাত্রি যাপন। চোখের ভেতর এক নিমেষে সব দৃশ্য ভেসে ওঠে।
বললাম, সরল বলেছো, ঠিক আছে। কিন্তু বোকা নই। তুমি যে অন্ধকারের কথা বলছো, ওটার সবটুকু না চিনলেও কিছু কিছু তো অবশ্যই জানি। আমরা ছেলেরা যখন আড্ডায় বসি, তখন অনেককিছুই ওঠে আসে। কোন পোকা কোন গর্ত থেকে বেরিয়ে কোন গর্তে ঢোকে, মোটামুটি সবই আমাদের কথাবার্তায় চর্চিত হয়। হাসাহাসি করি। আবার কষ্টও পাই।


তার এমন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা আর উড়ার প্রতি অদম্য বাসনা দেখে একদিন বিয়ের প্রস্তাব দিলাম। বললাম, জোরাজোরি নয়, যদি রাজি হও, প্লাসে প্লাসে প্লাস হতে পারে। যেমনটা হয়েছে সৈয়দ হক আর আনোয়ারা আপার মধ্যে। তাহলে রফিক আজাদ-দিলারা হাফিজ, রুদ্র-তাসলিমা, শাহরিয়ার-মানিরা কায়েস, আমিন-মুন্নীদের সঙ্গে আরও একটা লেখক জুটি যোগ হয়। যার নাম যিশু-জেসিকা।
এমন সুন্দর করে বলার পরও দেখি তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই। চেইনস্মোকারদের মতো একটার পর একটা সিগারেট টানছে আর উদাসীনতার এক অজানা গহিনে তলিয়ে যাচ্ছে। আর আমিও নাছোড় বান্দা। অপেক্ষা করতে থাকি। এবং আমি ওটা পারিও। কারণ আমি জানি, কখন কোথায় কী করতে হয়। আর তাকে তো বলতে গেলে আমিই তৈরি করেছি। সাহিত্যের কারিগর হিসেবে যদ্দুর নিজে রপ্ত করেছি, সবই তাকে উজাড় করে দিয়েছি, হাতে রাখিনি কিছুই। আবার ইনকামের দিক ভাবলে, আমি বেকারও নই। একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিটির জ্ঞান দান করি, তাতে যা পাই ঢাকা শহরে সংসার পেতে বসার জন্য যথেষ্ট।
সবকিছু জানার পরও যখন তার উদাসীনতা কাটে না, তখন কেন জানি মনে হলো, এ মুহূর্তে ওঠে পড়া উচিত। প্রস্তাব যখন দিয়েছি, তাকেও ভাবার জন্য সময় দেওয়া দরকার। ভাবুক। ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিক। কারণ ব্যাপারটা আবেগ দিয়ে সূত্রপাত হলেও সম্পর্কটা চিরস্থায়ী। সেটা বিয়ের হাত ধরে পরিণতি পাক বা না পাক।
বললাম, আজ তাহলে উঠি। আর আমার যা বলার তা তো বললামই। এখন তোমার পালা। যা বলার ভেবেচিন্তেই বলিও।
না, উঠো না। বসো।
চট করে হাত ধরে ফেলে। ফলে আমার আর সোজা হয়ে দাঁড়ানো হয় না।
তার মুখের দিকে তাকাই। দেখি কোন ফাঁকে চোখে নদী ঢুকে গেছে টের পাইনি। তার মানে ভেতরে এমনকিছু আছে, যা আমি জানি না। আর সেও হয়তো কোনো এক অজানা আশঙ্কায় বলার সাহস পাচ্ছে না।
বললাম, তোমার সঙ্গে এতদিন ধরে মিশেছি, কোনো প্রকার প্রশ্ন ছাড়াই। আর এতদিনে আমরা একে-অপরকে অনেকভাবেই দেখেছি বুঝেছি, সেখানে যদি আমার ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন থাকে, তাহলে অবশ্যই বলতে পারো। কারণ আমি যা, তাই তোমার সামনে বসে। এর বেশিকিছু আমার নেই। গ্রামে আমার অবস্থা হেলাল হাফিজের মতো। বাবার আরেকটা সংসার আছে, যেখানে আমি নিজেকে ঢুকাতে চাই না। এ কথা তোমাকে একবার নয়, অনেকবার বলেছি।
তুমি অনেক সরল যিশু। সাহিত্যের অলিগলি সবই চেনো, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে- রাতের অন্ধকারে এ পাড়ার কোনো খুপরি তো দূরের কথা একটা গলিও তুমি চেনো না।
আমরা যারা সাহিত্যের মানুষ, তাদের সামনে কেউ গলি, খুপরি ইত্যাদি উচ্চারণ করলে কেন জানি একটু বেশিই বুঝে ফেলি। সেই ডোম্বি থেকে আমিন বাজারে এক খুপরিতে কুবের-কপিলার রাত্রি যাপন। চোখের ভেতর এক নিমেষে সব দৃশ্য ভেসে ওঠে।
বললাম, সরল বলেছো, ঠিক আছে। কিন্তু বোকা নই। তুমি যে অন্ধকারের কথা বলছো, ওটার সবটুকু না চিনলেও কিছু কিছু তো অবশ্যই জানি। আমরা ছেলেরা যখন আড্ডায় বসি, তখন অনেককিছুই ওঠে আসে। কোন পোকা কোন গর্ত থেকে বেরিয়ে কোন গর্তে ঢোকে, মোটামুটি সবই আমাদের কথাবার্তায় চর্চিত হয়। হাসাহাসি করি। আবার কষ্টও পাই।
তুমি কোন ধরনের পোকার কথা বলছো, আমি এখনও ক্লিয়ার হতে পারছি না। তুমি কি দলীয় লেজুড়বৃত্তির কথা বলতে চাচ্ছো? ওটা যদি হয়ে থাকে, তাহলে আমি বলবো, ওটা তেমন দোষের কিছু নয়। দেশের সবকিছুই যখন রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন একজন লেখক তার স্বীকৃতির জন্যে এটুকু বেপথু হতেই পারে। কারণ উপনিবেশ জাতিকে এভাবেই তৈরি করে তোলে। সেখানে কর্ম চেয়ে স্বীকৃতিটাকেই বড় করে দেখানো হয়, আর তৈরিকৃত নির্বোধরা স্বীকৃতি দিয়েই বিচার করে সবকিছু।
আমি এটা বোঝাতে চাইনি জেসিকা। এটা আমি জানি। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই রাজনীতি আছে। যারা নোবেল জয় করে, শুনেছি তারাও লবিস্টদের পেছনে ছুটতে ছুটতে জুতোর তলা হারিয়ে ফেলে। আমি বোঝাতে চাচ্ছি অন্যকিছু। আর তা নিশ্চয়ই তুমি এখন বুঝতে পেরেছো।
হুঁ। বুঝতে পেরেছি। তবে তুমি যতটা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলেছো, ব্যাপারটা এরকম নয় যিশু। এই জেন-জি’র যুগে বিষয়টা এভাবে দেখলে হয় না। একটা সময় ছিল, একটু খ্যাতি কিংবা স্বীকৃতি লাভের আশায় কেউ কেউ কারো কারোর বিছানায় গিয়েছে বা যেতে হয়েছে।
একটা সময় বলছো কেন, এখন যায় না?
যায় তো অবশ্যই। এমনকি তোমার এই জেসিকাও গিয়েছে। কিন্তু কীভাবে গিয়েছি কেবল এটা কেউ জানে না। স্বীকৃতিদাতারা দেশজুড়ে এমন একটা নেটওয়ার্ক সেট-আপ দিয়ে রেখেছে, আমরা কিছু একটা বুঝে ওঠার আগেই আটকা পড়ি। আর খ্যাতির উত্তাপে বলো কিংবা সমাজ-সংসারের ভয়েই বলো, বুুড়ি-কড়া-মাঝারি সকলেই চেপে যাচ্ছি। এবার বলো, এরপরও কি আমাকে বিয়ে করবে?
বললাম, এরপরও করব।
না যিশু, এখন যা বলছো, এ তোমার আবেগের কথা। তুমি আরও ভাবো।
ঠিক আছে। ভেবেই বলবো নে। তাহলে বিকালে আবার আসছো তো?
সে হাসে। সাহিত্যের ভাষায় যাকে বলে কাষ্ট হাসি।
বললাম, এভাবে হাসছো যে?
হাসছি না, বুঝতে পেরেছি, তুমি এখন ভেবেচিন্তেই বলতে চাও। যদি তাই হয়, তাহলে আজকেই একটা ক্যালকুলেটর কিনে নাও। তারপর দেখো, কত ঘণ্টার পর বিকেল আসে, কত যুগের পর।
সে কী! তুমি ব্যাপারটা এভাবেই নিচ্ছো কেন? আমি কি এতসব বুঝে বলেছি?
এখন আর কোনো কথা শুনতে চাই না। যা বলার বিকেলেই বলো। এখন ওঠো।

দুই

সেই বিকেল আর আসেনি। “ঠিক আছে, ভেবেই বলবো নে”, কথাটার জন্য কি সে এভাবে উধাও হয়ে গেল? নাকি ওটা একটা অজুহাত? আমি পরিষ্কার হতে পারছি না। তারপরও অপরাধীর কাঠগড়ায় নিজেকেই দাঁড় করাই প্রতিদিন। মোবাইল হাতে নিয়ে ফোন দিই আর অপর প্রান্ত থেকে জানায়, আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।