মেঘেদের শাড়ি বদল
শরৎ চৌধুরী
মেঘেরা শাড়ি শুকাতে দিয়েছে আকাশে।
ছাই ছাই বুকে তার
বুনো হুংকার।
ডাকে বৃষ্টি, জল, কোলাহল।
নীচের পৃথিবী জেগে উঠছে খুব।
পিতারা পুকুরে—
মাছ নিয়ে ফিরবে বলে
হেলেঞ্চা শাক দুলে দুলে হাসছে।
গুলজারের গজল শুরু হয় রেডিওতে।
চিংড়ি ভর্তার ঘ্রাণে শিরশির করে উঠান।
মেঘেরা ভাঁজ খুলবে বলে
মিটিমিটি হাসে।
কোমরে তার অদ্ভুত আকাশ।
পিতারা মাছ নিয়ে ফেরে।
উনুনে উল্লসিত সরষের তেল।
কাসার থালায় দম নেয় খিচুড়ি।
কড়কড়ে মাছ ভাজার উপর
আজ একটু স্পর্শ দেয় লাস্যময়ী ঘি।
ঘরের ভেতর বাতাস
ঘুরে ঘুরে আনন্দ করে।
তারপর—
লিপস্টিক থেঁতলে যায়।
শিউলিরা মুচকি হাসে।
শুকনো মরিচের ঝালে
ওষ্ঠ গলে যাওয়ার আগে
কেউ ফিসফিস করে বলে—
“আরে, দরজাটা তো বন্ধ করবে।”
তোফাজ্জল এক বছর ধইরা ভাত খাইলেন
তোফাজ্জল এক বছর ধইরা ভাত খাইলেন
তিনি যে খাওয়া শেষ করলেন,
তা তিনি জানলেন কি।
জেনে লাভই বা হইল কি।
ভাত তার মেরুদণ্ড বরাবর
নালী দিয়া নামতে নামতে
একটা পতাকা খুলে গেল।
সেই পতাকা সুন্দর।
বাটির মধ্যে হাত ধোয়ার মত সুন্দর।
সাদা পেটিকোটের মত সুন্দর।
সেইখানে লেখা আছে—
আদর কইরা পিটায়া মারা জায়েজ।
তোফাজ্জল ভাত না খাইলে
আমাদের আদর কই যাইতো?
আমাদের দামী আদরগুলা
কোন পতাকার নিচে লুকাইতাম?
মজলুমের আদরগুলা এমনি।
তোফাজ্জল তো মজলুম না—
কারণ তিনি এক বছর ধইরা ভাত খাইলেন।
কারণ মজলুম আদর শিখছে।
সামনের আরও অনেক বছর ধইরা তিনি খাবেন।
আর ফৎফৎ উড়বে
পতাকার মত আদর।
দিনাজপুর থেকে ফিরে
নাহ, দিনাজপুর আমি ছবি তুলতে যাইনি।
সবকিছুর ছবি তোলা যায় না।
ছবি সবকিছুকে ছোট করে ফেলে।
মূলবিন্দুর কিছুই থাকে না।
অথচ মূলবিন্দু বলেও কিছু নেই।
যেমন নেই আলো।
নেই অন্ধকার।
কখনো বেদনা, কখনো ভালোবাসা
এমন তীব্র হয়
যে তীব্রতাই ম্লান হয়ে আসে।
তারপর আর কিছু মনে থাকে না।
এখানেই মানুষের ক্ষমতা শেষ।
সে ফিরেও আসে,
আবার থেকেও যায়।
কখনোই সে চলে আসেনি।
কখনোই সে ফিরে যায়নি।
কিংবা যেমনটা স্রষ্টা বলে দিয়েছেন
অনেক দিবস শেষে
আকাশের পরে
আমাদের হল দেখা।
ততদিনে চক্ষু নাই,
দৃষ্টি প্রখর।
ওঁত পেতে থাকা বুনো সাপের
হুংকার নাই।
হৃদয়ে নাই কোন্দল।
স্বচ্ছ জল।
বাতাস হিল্লোল।
মৃদু বিথী গালিবের।
রুমি বৃক্ষের সুগন্ধি ছাল।
কোরানের বাণী এল মনে—
তোমরা নেমে যাও,
পরস্পরের শত্রু হিসেবে।
দৃষ্টি প্রখর,
আকাশেরও পর।
এখনো শত্রু,
যেমন ছিলাম।
কিংবা যেমনটা স্রষ্টা বলে দিয়েছেন।
মিঠাপানি নোনাপানি
জাদুকাটা জলে
আমাকে কেটে কেটে ছড়িয়ে দিয়েছি।
আশায় আছি, ভেসে উঠব সমুদ্রে।
তবে এর মাঝে
মিঠাপানির মাছের খাবার হয়ে
ঢুকে পড়ব তোমার ঘরে—
যে ঘর আমার হয় নাই কখনো।
তবু আমি ডুবে ডুবে ভেসে থাকব।
কবিতারা যেমন
তোমার বুকের উপর
হালকা মেঘের মতো বসে থাকে—
কেউ দেখে না।
আমি সেই জীবন্ত মেঘ।
সবচক্রে, সবচন্দ্রে,
তোমার নাভীতে বসে থাকি
ভূতের মতো।
আমি সেই বেসংসারি ভূত।
আজানের সাথে সাথে চলে আসি।
আমি ভেসে থাকি।
আমাকে তাড়ানো যায় না।
জাদুকাটা জলে
দেহ বিসর্জনের পর থেকে
দুনিয়ার তাবৎ নারীর
গোপনতম উৎকণ্ঠায় আমার বসবাস।
আমি থাকি না,
আমি আছি।
মিঠা থেকে নোনা পানি পর্যন্ত যাত্রায়
তোমাকে দর্শন দেবো—
কিংবা দেবো না। আমি তোমার শাস্তি।
কোরানের আয়াত আমাকে ডাকে—
মেঘকে ধরো দেখি।
ফিউডাল মাংসের স্বাদ
বুকভরা রেমাক্রির অভিমান।
নাফাখুমে ডুবে যাচ্ছে
বিনয়ী মাছের দল।
ওষ্ঠ-নর্তকীর স্পষ্ট লিপস্টিকে
অনিবার্য পাখিরা বসে আছে
ভূত হয়ে।
তাদের বন্ধুদের লাশ
ব্যাগভর্তি করে
ফেরত নেবে
জলপাই জিপ
আর পত্রিকার অফিস।
যদিও কবর কোথায় হবে
কেউ জানবে না।
ফিউডাল মাংসের স্বাদ
বমরা জানে না।
মঙ্গলগ্রহে শোভাযাত্রা
কলোনি বাড়াচ্ছো, আমেরিকা।
যুদ্ধ তোমার দেহ-ব্যবসা।
লাল গ্রহের মাটিতে নামবে
আরেক কলম্বাস।
নাভাহো, চেরোকি, আপাচে, হোপিরা
দেহ হারিয়েছে আগেই।
আত্মারাও উবে গেছে।
এক লক্ষ একটি লাল গোলাপ নিয়ে
মঙ্গলের মাটিতে হবে শোভাযাত্রা।
কলোনির কাঁচের দেয়ালগুলি
ভরে উঠবে চুমুতে।
শব্দ রয়ে যাবে
ঘামধরা কাঁচের এপারেই।
লিপস্টিক গলে যাবার আগে
উড়ে যাবে
পৃথিবীর অন্তর্বাস।


০ টি মন্তব্য