লাবণ্যবৌদি

স্বাতী রায় চৌধুরী

আজ সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছিল না একেবারেই। কি এক আলস্য যেন সারা শরীরে জড়িয়েছিল। জানালাটা খুলে দিতেই দেখি বাইরের প্রকৃতিতেও সেই আলস্য। সকাল সাতটাতেও সূর্যের সেই মহিমান্বিত রূপের দেখা নেই। বরং মেঘের আলোয়ান গায়ে চড়িয়ে সেও যেন আরেকটু আলসেমি করে নিতে চাইছে।

―কিগো আজ কি উঠবে টুটবে না নাকি? চা হয়ে গেছে তো। উঠে মুখটা ধুয়ে এসো, টেবিলে দিচ্ছি।

গিন্নি দিনের প্রথম হুইসেলটা বাজিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে ফিরে গেলেন। যদিও ছেলের বউ এসে গেছে কিন্তু গিন্নির আর রান্নাঘর থেকে ফুরসৎ মেলেনি। বিছানা ছেড়ে একেবারেই উঠতে ইচ্ছা না করলেও পাছে চা টা মিস হয়ে যায় এই ভয় উঠতেই হল। এরপর রান্না চড়ে গেলে আর  ও জিনিস সহজে পাওয়া যাবে না।  ছেলে, ছেলের বউ দুজনকেই অফিসের ভাত দিতে হয়। নাতনির স্কুলের টিফিন তৈরি করে ওর মা।  তাই চায়ের জন্য গ্যাস স্টোভ খালি পাওয়ার আর সম্ভাবনা নেই। গায়ে চাদরটা জড়িয়ে উঠে মুখ ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে বসতেই গিন্নি চা আর আজকের  খবরের কাগজ খানা দিয়ে গেল। এটা আমার দীর্ঘকালের অভ্যাস সকালে গরম চায়ের সাথে টাটকা টাটকা খবর না হলে সারাদিনটাই যেন নিরামিষ হয়ে যায়। খবরের কাগজের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত খুঁটিয়ে পড়াটাও আমার একটা অভ্যাস। শুধু হেডলাইন পড়ে রেখে দিলে মনে হয় পেপারের পয়সাটাই উসুল হলো না। যাইহোক সেই অভ্যাস মত পেপারের খবরগুলো গলাধঃকরণ করতে করতে হঠাৎ পাঁচ নম্বর পাতায় বাঁদিকের কোণে একটা ছোট্ট খবরে চোখটা আটকে গেল। বারাসাতের এক বৃদ্ধাশ্রমের খবর। খবরে লেখা আছে একসময়ের অফিসপাড়া এবং গ্রুপ থিয়েটারের মঞ্চ কাঁপানো সুন্দরী প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী লাবণ্যদেবী গতরাতে পরলোকগতা হয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায়  আশি বছর। তাঁর নিজের বলতে কেউ ছিলনা, তাই আশ্রমের বাসিন্দারাই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছেন। খবরটি পড়েই ঝট্ করে উঠে পড়ে মোবাইলটার সন্ধান করতে লাগলাম। ছেলে গত বছর আমার জন্মদিনে ওই বাটন মোবাইলটা আমায় দিলেও আজ পর্যন্ত ওই বস্তুটার সাথে আমার ভাব ঠিকমতো জমেই উঠল না। প্রয়োজনের সময় কখনো ওটিকে আমার হাতের কাছে পাই না। শুধু তাই নয় আমার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের অভিযোগ আমাকে নাকি ফোনে কখনো পাওয়া যায় না। অভিযোগ যে সম্পূর্ণ মিথ্যা তা নয়; তবে এই গাফিলতি যে আমার ইচ্ছাকৃত নয় সেটা আমি তাদের বোঝাতে পারি না। যখন ফোন আসে তখন হয় ওই বস্তুটা আমার কাছে থাকে না, নয়তো লেখায় অতিরিক্ত মনোসংযোগ করার জন্য বা বয়সজনিত কারণে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়াতে সেই শব্দ শুনতে পাই না। এই মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে ফোনটা খোঁজার পিছনেও সেই কারণ। ফোনটা কোথাও খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত গিন্নির শরণাপন্ন হতে হল। শোয়ার ঘর, বসার ঘর, খাওয়ার ঘর সব চিরুনি তল্লাশি করেও না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ফোনটি উদ্ধার হল স্নানের ঘরে র‍্যাকের মধ্যে থেকে। ওটি ওখানে কি করে গেল সেটা বুঝতে পারলাম না। যাই হোক ফোনটা হাতে পেয়েই তার কললিস্টে চোখ বোলালাম আর দেখলাম পাঁচ পাঁচটি মিসড্ কল এসেছিল গতকাল রাত ন’টা থেকে বারোটার মধ্যে। আশ্চর্য! এতটা সময় যে ফোনটা আমার কাছে নেই এটা আমি খেয়ালই করিনি। খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে শোয়ার ঘরে জানালার পাশে আমার লেখার টেবিলে এসে বসলাম। জানলা দিয়ে চোখ গেল বাইরে। মনে হল আজ বাইরের প্রকৃতিও কেমন বিষাদগ্রস্ত। আকাশের বুকে জলভরা মেঘের ঘনঘটা ঝরে পড়ার অপেক্ষায় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। আর ওই মেঘের দিকে তাকাতেই যার মুখটা ভেসে উঠলো সে আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে দেখা টানাটানা দুচোখ আর শরতের প্রথম শিউলির স্নিগ্ধতা মাখানো একটি মুখ; লাবণ্যময়ী ঘোষাল ওরফে থিয়েটারের লাবণ্যদেবী ওরফে আমার লাবণ্য বৌদি। তখন কত আর বয়স হবে আমার, বড়জোর ছাব্বিশ – সাতাশ।  থাকতাম উত্তর কলকাতার একটি ভাড়া বাড়িতে। বাড়িটিতে একতলা, দোতলা আর চিলেকোঠা মিলিয়ে প্রায় দশ ঘর ভাড়াটে ছিল। তার মধ্যে আমার ঘরটি ছিল চিলেকোঠায়। সবচেয়ে সস্তার ঘর, হাওয়া বাতাস ঢোকার জন্য একটি ছোট জানালা ছিল তাও উত্তর দিকে। তখন আমি সবে মাস্টার ডিগ্রী কমপ্লিট করে একটি ছোটখাট সাংবাদিকতার চাকরি নিয়েছি। একজন বন্ধুর কাছ থেকে ওই ভাড়া বাড়িটার খোঁজ পাই। চিৎপুরে রবীন্দ্র সরণির উপরে তিনতলা বাড়ি। বাড়ির মালিক থাকেন না; পুরো বাড়িটাই ভাড়া দিয়েছেন। শুধু চিলেকোঠার ঘরটি বাদে সবকটি ঘরেই লোক ছিল। আমার তখন যা রেস্ত ওই চিলেকোঠার ঘরটাও জুটত না বন্ধু না থাকলে। খুবই সস্তায় ঘর পেয়ে বন্ধুকে একদিন পেট ভরে হোটেলে মাংস ভাত খাওয়াতে হয়েছিল। অবশ্য তার জন্য সাতদিন টিফিনে শুধু ছোলা ভাজা খেয়ে কাটাতে হয়েছিল আমাকে। তা যাইহোক, ঘরটি আমার বেশ পছন্দ হয়ে গিয়েছিল, তার কারণ ঘরটি নিরিবিলি; লেখালেখির উপযুক্ত পরিবেশ। তবে সমস্যা যে কিছুই ছিল না তা নয়। সমস্যা হলো উত্তর দিকের ওই জানালাটা। একেই ঘরটা গুমোট, তার উপরে ঘরে কোন ফ্যানও ছিল না। অফিস থেকে এসে ঘামে ভেজা জামাটা খুলে একটু হাওয়া নেওয়ার জন্য উত্তরের জানালাটা খুললেই এক বিপদ। ওধারে তিন তলা বাড়ির দক্ষিণের জানালায় মেয়েদের উঁকিঝুঁকি, হাসাহাসি। শেষ পর্যন্ত জানলাটা আর খুলবো নাই ঠিক করলাম। এই ভাবেই বেশ কেটে যাচ্ছিল দিন। এই বাড়ির দোতালায় দুটো ঘর নিয়ে থাকতেন লাবণ্যময়ী ঘোষাল ও তার স্বামী তারাপদ ঘোষাল। লাবণ্য বৌদির সাথে আমার প্রথম দেখা হল ওই বাড়িতে আসার সপ্তাহখানেকের মাথায়। সেই দিন অফিসফেরত বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরতে একটু দেরী হয়েছিল। আমি যখন সিঁড়ি দিয়ে উঠে আমার চিলেকোঠার ঘরে যাচ্ছি দেখি এক সুবেশ ভদ্রমহিলা সঙ্গে এক ভদ্রলোক সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছেন। মুখোমুখি হতেই ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, “আপনি বুঝি নতুন এসেছেন? ওই চিলেকোঠার ঘরে থাকেন?” আমি হ্যাঁ বলতেই তিনি আবার বললেন, “আমার নাম লাবণ্যময়ী ঘোষাল আর ওই যে নীচে ভদ্রলোক চলে গেলেন উনি আমার স্বামী মিস্টার তারাপদ ঘোষাল। আমরা এই বাড়িতেই থাকি,ওই দক্ষিণ খোলা ঘরটায়। বাবুলদা মানে এবারের মালিক আর কি, আমাকে বলেছিলেন একটি ছেলে আসবে চিলেকোঠার ঘরটাতে। আসলে আমি কিছুদিন ছিলাম না, শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিলাম, কালকেই ফিরেছি। নীচ থেকে ভদ্রলোক এবার ডাক দিলেন, “কি হলো? কোথায় আটকে গেলে? দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।”  

“হ্যাঁ এই যাই।  যাই ভাই দেরি হয়ে যাচ্ছে। আরেকদিন ভালো করে আলাপ করব” এই বলে পাটভাঙা নীলাম্বরী শাড়ির আঁচল সামলে তিনি তড়তড় করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলেন। আমি ভ্যাবলার মতো কিছুক্ষণ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থেকে উপরে আমার চিলেকোঠার ঘরে চলে গেলাম। এই হলো লাবণ্য বৌদির সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। মায়ের পরে এত সুন্দরী মহিলা আমার ওই সাতাশ বছরের জীবনে আমি ওই প্রথম দেখেছিলাম।  কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রং, চোখ দুটি কি অসম্ভব মায়ায় ভরা আর সবচাইতে আশ্চর্য ব্যাপার হল এরপর থেকে যখনই লাবণ্য বৌদির কাছাকাছি গিয়েছি অদ্ভুত এক গন্ধ পেতাম; শরতের প্রথম শিউলি ফুলের গন্ধ। হাসলে মনে হতো যেন মেঘমুক্ত আকাশ। লাবণ্য বৌদির শুধু চেহারাতেই লাবণ্য ছিল না। মনেও লাবণ্য ছিল ভরপুর। অবশ্য ওরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই যে কতটা ভালো মনের মানুষ তার পরিচয় আমি মাস ছয়েক যেতে না যেতেই পেলাম। সেই গল্পে পরে আসছি। এই পর্বে লাবণ্যবৌদির পরিচয়টা দি।  লাবণ্যময়ী ঘোষাল ও তারাপদ ঘোষাল থিয়েটার জগতের এক পরিচিত নাম ছিল সেসময়। থিয়েটার প্রিয় মানুষজন তাদের ভালই চিনতো। অফিসপাড়া, গ্রুপ থিয়েটারে প্রায়ই অভিনয়ের জন্য তাদের ডাক পড়তো। আমি বেরসিক মানুষ, নুন ভাতের জোগাড় করতেই জেরবার। থিয়েটার জগতের কোনো খোঁজই আমি রাখতাম না। তাই আমি ওদের চিনতে পারিনি। ওই প্রথম দেখার পর লাবণ্য বৌদির সাথে আর দেখা হয়নি অনেকদিন। আমি অফিস থেকে ফেরার আগেই ওনারা রিহার্সালে বেরিয়ে যেতেন। রাতে ফিরতেন কখন জানতে পারিনি। তবে মাঝে মাঝে ওনারা বাইরেও শো করতে যেতেন। তখন বেশ কিছুদিনের জন্য ঘরে তালা পড়ে যেত। প্রথমেই বলেছি লাবণ্য বৌদির মনেও লাবণ্য ভরা ছিল। খুব মিশুকে মানুষ ছিলেন বৌদি। সেটা সেই প্রথম পরিচয়ের দিনেই বুঝতে পেরেছি। ওনার স্বামী একটু কম কথা বলতেন। কিন্তু মানুষ হিসেবে উনিও খারাপ ছিলেন না।

সেদিনটা ছিল এক রবিবার যেদিন লাবণ্যবৌদি প্রথম দুপুরে আমার ঘরে এলেন। দুপুরের খাওয়া সেরে আমি তখন লেখার খাতা নিয়ে হাই তুলতে তুলতে একটু লেখার চেষ্টা করছি। এমন সময় আমার চিলেকোঠার দরজায় টোকা। সঙ্গে সুরেলা নারী কন্ঠের আওয়াজ, “ ব্যস্ত আছো? আসবো?” দরজার কাছে গিয়ে দেখি এক ফালি নির্মল আকাশ আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

―আরে আরে আসুন না বৌদি, বাইরে কেন? বৌদিকে ঘরে আসতে বললেও তাকে যে কোথায় বসতে দেব এই ভেবেই আমার কাল ঘাম ছুটতে লাগলো। বৌদি আমাকে কোনরকম অপ্রস্তুত হবার সুযোগ না দিয়েই সোজা এসে আমার চৌকির উপর বসে পড়লেন আর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখো আমি কিন্তু প্রথম আলাপেই তোমাকে তুমি বলে ফেললাম, কারণ তুমি আমার থেকে অনেক ছোট। তুমি রাগ করলে না তো?”

―না না, রাগ করবো কেন? আপনার মত মানুষ আমাকে এতটা আপন করে নিয়েছেন, আমার ঘরে এসেছেন। আমার খুব ভালো লেগেছে বৌদি।  কোনরকমে কথাগুলো বলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

―আমার মত মানুষ বললে কেন? তুমি আমার সম্পর্কে কি জানো? লাবণ্যবৌদির ধারালো প্রশ্নে এবার আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। কি বলা উচিত না বুঝেই বলে ফেললাম, “না মানে আপনারা তো শিল্পী মানুষ, বিখ্যাত লোক। তাই বললাম ওই কথাটা।” এই কথাটা বলতে পারলাম কারণ ততদিনে ওদের পরিচয় আমার জানা হয়ে গেছে। মুহূর্তে বৌদির মুখখানিতে হাজার ওয়াটের বাল্ব জ্বলে উঠলো,

―হ্যাঁ আমরা থিয়েটার করি। অবশ্য আমার বর একটি বেসরকারি ব্যাংকেও কাজ করেন। ওটা আমাদের পেটের খিদে মেটায় আর মনের খিদে মেটায় ওই থিয়েটার। ওটা ছাড়া আমরা বাঁচব না। কিছুক্ষন থেমে একমুখ হাসি ছড়িয়ে আবার বললেন, “জানো আমাদের দু’জনের আলাপ ওই থিয়েটার করতে গিয়েই। তারপর বাড়ির অমতে বিয়ে। শুধু থিয়েটার নিয়ে থাকবো বলেই আমরা কোন সন্তান নিইনি।” আমি নীরব শ্রোতা হয়ে সব শুনে যাচ্ছি। কোন উত্তর দিচ্ছি না দেখে এবার লাবণ্যবৌদি একটু লজ্জিত হয়ে বলে উঠলেন, “আমি বোধহয় তোমাকে বিরক্ত করলাম” বলে আমার লেখালেখির খাতার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। – কি লিখছিলে? গল্প?

―না, প্রবন্ধ। উত্তর দিলাম আমি।

―বাহ্! খুব ভালো। ঠিক আছে তুমি লেখ। আর তোমায় বিরক্ত করবো না। তবে তোমার এই ঘরটা বড্ড গুমোট। ওই জানলাটাও তো খুলতে পারো। বলে নিজেই উঠলেন জানলাটা খুলতে। আমি হা হা করে উঠলাম, “না না খুলবেন না বৌদি। আমার অসুবিধা হয়।” বৌদি কি বুঝলেন জানিনা, মুখ টিপে হেসে চলে গেলেন।  

এরপর লাবণ্যবৌদির সঙ্গে আরও বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে সিঁড়িতে বা ঘরের বাইরে। কিন্তু আমার ঘরে আর উনি আসেননি। যদিও সেটা আমার মত ব্যাচেলর ছেলের কাছে বেশ একটা স্বস্তির কারণ। তবুও মনের ভেতর কোথাও একটা খচখচ্ করতে থাকত আমার। আমার কোন ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে কি বৌদি আমার ঘরে আর আসছেন না? ওই যে সেদিন জানলাটা খুলতে চেয়েছিলেন, আমি বাধা দিয়েছিলাম। ছি ছি আমার ওরকম করা বোধহয় উচিত হয়নি। মনে মনে বড্ড অস্থির বোধ করতে লাগলাম। ভাবলাম বৌদিকে একবার জিজ্ঞেস করেই ফেলি। কিন্তু লজ্জায় সেটাও করতে পারলাম না। এইভাবেই দিন কাটতে লাগলো।

রোজ একই রুটিন। সকাল সাতটায় ঘুম থেকে ওঠা, পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে গিয়ে খালি পেটে এক কাপ চা। তারপর ঘরে ফিরে এসে বাথরুমে ঢুকে চান। যদিও বাথরুম যে জায়গাটাকে বলছি সেটা বাড়ির মালিকের বদান্যতায় দরমা ও প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরা একটা এক ফালি জায়গা, যেখানে একটি কলও ফিট করা ছিল এবং পাশেই ইন্ডিয়ান স্টাইলে একটা প্যানও বসানো ছিল যাতে প্রাতঃকৃত্যের জন্য ভাড়াটেকে অন্য কোথাও যেতে না হয়। এমন চমৎকার বন্দোবস্তে আমার যে বেশ আরামেই দিন কাটছিল তা বলাই বাহুল্য। রোজ প্রায় একই সময়ে বাড়ি থেকে বের হতাম এবং একই সময় বাড়ি ফিরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে কোন একজনের খুব আন্তরিক একটা মুখ দর্শন করার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নিজের চিলেকোঠার ঘরে এসে ঢুকতাম। যেদিন সেই মুখদর্শন হত মনটা কি জানি কেন একটা প্রশান্তিতে ভরে যেত। আর যেদিন সেটা হতো না কিরকম একটা অনুভূতি যে হতো, মনে হতো সারাদিনটাই বুঝি ব্যর্থ হয়ে গেল। এরকম কেন হতো বা হওয়া উচিত কিনা এ প্রশ্ন নিজেকে হাজারবার করেও কোন সদুত্তর পাইনি। অথচ যত দিন যাচ্ছিল সেই অনুভূতিটা বেড়েই চলছিল আর সেটাকে আড়াল করার জন্য আমার মরিয়া প্রয়াস আমাকে লাবণ্যবৌদির কাছে দিন দিন ছেলে মানুষ করে তুলছিল। এইরকম ছেলেমানুষীর একটি দিনে দ্বিতীয়বারের জন্য আমার ঘরে পা দিল লাবণ্যবৌদি। আগের দিন অফিস থেকে ফেরার পর থেকেই বেশ জ্বর জ্বর লাগছিল। সঙ্গে গা হাত পা প্রচন্ড ব্যথা। বাড়িতে ফিরে কিচ্ছু না খেয়ে সেই যে বিছানা নিয়েছিলাম পরের দিন যখন লাবণ্যবৌদি এলো তখনো একইভাবে বিছানায় শুয়ে ছিলাম। বৌদি বোধহয় কিছু একটা আন্দাজ করেই আমার ঘরে এসেছিলেন। বাইরে থেকে দরজার গায়ে টোকা দিয়ে ডাকলেন, “সুবিমল, আছো ঘরে, আসবো?” জ্বরের দাপটে এত কাহিল ছিলাম যে উঠে দরজা খুলে দেবো তার অবস্থা ছিল না। অবশ্য আমি দরজায় কখনোই ছিটকিনি লাগাতাম না। তাই কোনো রকমে উত্তর দিলাম, “দরজা খোলা আছে বৌদি। আসুন।” দু-হাতে দরজার কপাট দুটো ঠেলে ঘরে এসে ঢুকলেন লাবণ্যবৌদি আর ঢুকেই আমাকে দেখে চমকে উঠলেন, – একি কি হয়েছে তোমার? অফিস গেলে না, ঘরে শুয়ে আছো, জ্বর টর এসেছে নাকি? বলেই এগিয়ে এসে আমার তপ্ত কপালে তার ঠান্ডা হাতের স্পর্শ দিয়েই প্রায় ছিটকে গিয়ে বলে উঠলেন, “এ বাবা! এতো সাংঘাতিক জ্বর! ঘরে থার্মোমিটার আছে?”

―না বৌদি। কোনরকমে উত্তর দিলাম।

 ―দাঁড়াও আমি ঘর থেকে থার্মোমিটার  নিয়ে আসছি। তবে একশো দুইয়ের এর বেশি বই কম হবে না। তারপর আরো একটু ঝুঁকে আমার মুখের কাছে মুখ এনে গভীরভাবে কি নিরীক্ষণ করে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কপালে, গলায়, হাতে গোটা গোটা ওগুলো কি? আগে ছিল?” বৌদির কথা কিছু বুঝতে না পেরে হাবার মতন তাকিয়ে থাকলাম।

―দাঁড়াও আমি ঘর থেকে থার্মোমিটার আর আয়নাটা নিয়ে আসছি। বলেই ধুপ ধাপ করে নিচে চলে গেলেন আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ফিরে এলেন। “দেখি দেখি থার্মোমিটারটা জিভের তলায় দাওতো, দেখি কত জ্বর। আর এই আয়নাটা দিয়ে দেখতো তোমার মুখে, কপালে ওই গোটা গুলি আগে দেখেছো কিনা।

ব্যাস যেই মুহূর্তে বৌদি বুঝতে পারলেন আমার গুটিবসন্ত হয়েছে ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই আমার সেবার সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। আমার কোন ওজর আপত্তি কোন কাজেই আসলো না। উল্টে ফরমান জারি করলেন, “শোনো সুবিমল, তোমার এই ঘরটা বড় অস্বাস্থ্যকর। তাছাড়া আমার পক্ষে রোজ দোতলা আর এই চিলেকোঠায় যাতায়াত করা অসুবিধা হয়ে যাবে। তাই তোমাকে আমার ঘরে নিয়ে যাব। আমার দক্ষিণ খোলা ঘর, বারান্দা। প্রচুর আলো বাতাস খেলে। তুমি শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠবে।” আমি একে অসুস্থ তার উপর বৌদির এই কথা শুনে বিড়ম্বনায় পড়লাম। কাতর অনুরোধ জানালাম বৌদিকে – না না বৌদি, আমি এই ঘরেই ঠিক আছি। আপনি শুধু শুধু আমাকে নিয়ে ভাববেন না। যদি পারেন আমার বাড়ির ঠিকানায় একটা খবর দিয়ে দিন। তাহলেই হবে। আমার এই প্রস্তাব বউদির সামনে পড়ে ঝড়ের মুখে খড়কুটোর মতই উড়ে গেল এবং আমি এসে উঠলাম বৌদির দক্ষিণ খোলা ঘরে। বেশ বড় ঘরটা, সুন্দর করে সাজানো, ভীষণ রুচিসম্মত। ঘর সংলগ্ন একটি বারান্দাও ছিল দক্ষিণমুখী। ঘরের ভিতর সেই বারান্দার দিকের দেয়ালের গায়ে একটি ছোট খাটে আমার রোগসজ্জা পাতা হলো। মাথার কাছে পূর্ব দিকে একটা বড় জানালা ছিল। সূর্য ওঠার সাথে সাথে ঘরের ভেতর পর্যন্ত আলো চলে আসতো আর সূর্য ডোবার সাথে সাথে দক্ষিণের মৃদুমন্দ বাতাস ঘরের ভেতরে চীনেমাটির ফুলদানির ফুল গুলোকে যখন আলতো করে ছুঁয়ে দিত তখন এক অদ্ভুত সুখানুভূতিতে আমার মনটা ভরে উঠতো। বৌদি অবশ্য সন্ধে হবার সাথে সাথেই জানালাগুলো বন্ধ করে দিতেন যাতে ঠান্ডা লেগে আমার জ্বর না বাড়ে। রিহার্সালে যাওয়াও প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিলেন বৌদি আমার সেবা করার জন্য। তারাপদদারও এতে প্রশ্রয় ছিল। এই প্রশ্রয় দেবার  একটা কারণ হয়ত এই ছিল যে তার মনে হয়েছিল তার স্ত্রী একটি খেলার পুতুল পেয়েছেন। বুকের মধ্যে জমাট বাঁধা  স্নেহের ধারা উদ্গত করার একটা জায়গা যদি তিনি আমার মধ্যে পেয়ে থাকেন ক্ষতি কি? যাইহোক, কারণ যাই থাক, বাড়ি থেকে দূরে অসুখে পড়ে আমার মতো অপোগন্ডের প্রাণটা যাতে বেঘোরে না বেরিয়ে যায় তার জন্য এই স্বামী-স্ত্রী জুটির চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। আর আমি আস্তে আস্তে ভুলে যেতে থাকলাম যে আমি ওদের দয়ার পাত্র। মনে হতে থাকলো এই সেবা এই ভালোবাসা এই সবকিছুর উপরে যেন আমার আজন্ম অধিকার। এই প্রচন্ড অধিকারবোধ থেকেই আমি একদিন এক সাংঘাতিক কান্ড করে বসলাম যার পর বৌদির উচিত ছিল আমার ঘাড় ধরে ঘর থেকে বের করে দেওয়া। কিন্তু বৌদি তা করেননি বরং আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

সেদিন লাবণ্যবৌদির দু-চোখের সেই মেঘ বৃষ্টির খেলা আমাকে অস্থির করে তুলেছিল। আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার অধিকারবোধের সীমা। নিজের দুই হাত বাড়িয়ে তাকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে তার সমস্ত শূণ্যতাটুকু ভরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। স্বামীর মুখটা মনে করে  প্রথমটায় বৌদি আমাকে বাধা দিতে চেয়েছিলেন। আমার দু’বাহুতে আত্মসমর্পণ করার আগে ব্যাকুল হয়ে বলেছিলেন, “সুবিমল আমি আমার স্বামীর বিশ্বাসঘাতিনী হতে চাই না, আমি তাকে ভালোবাসি।

আমার শরীরটা অনেকটা সেরে উঠেছে দেখে বৌদি দুদিন ধরে রিহার্সাল জয়েন করেছিলেন যদিও তাড়াতাড়ি ফিরে আসতেন আমার জন্য। বৌদি ঘরে ফিরে বাইরের জামা কাপড় বদলে আমার জন্য খাবার তৈরি করে আমাকে নিজে হাতে খাওয়াতেন আর কত যে গল্প করতেন! সেইসব গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে হতো ওই সদা হাসিখুশি উজ্জ্বল মুখটার পেছনে কোথাও একটা ফাঁকা, একটা শূন্যতা যেন লুকিয়ে আছে। স্বামী হিসেবে তারাপদদার কোন খামতি ছিল না। তিনি স্ত্রীকে অত্যন্ত ভালবাসতেন, সম্মান করতেন। কিন্তু স্ত্রীকে সবটুকু দিয়ে সন্তুষ্ট করার ক্ষমতা ঈশ্বর তাকে দেননি। এই অভাবটুকু তিনি আর সবকিছু দিয়ে ভরিয়ে দেবার চেষ্টা করতেন। স্ত্রীর কোন ইচ্ছা বা স্বাধীনতায় তিনি কখনো বাধা দেননি। তার শুধু একটাই ভয় ছিল যদি কখনো লাবণ্যবৌদি তাকে ছেড়ে চলে যান। এই ভয়ে তিনি কাঁটা হয়ে থাকতেন। বৌদিও তার স্বামীকে খুবই ভালোবাসতেন। কিন্তু সেই ভালোবাসার মধ্যে যতটা না ছিল প্রেম, তার থেকে অনেক বেশি ছিল দয়া, করুণা,আর স্নেহ। তিনি তার করুণা আর স্নেহের আঁচল দিয়ে স্বামীকে ঘিরে রাখতেন। স্বামীর প্রতি ভালবাসায় একনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করতেন সবসময়।  অথচ বুকের ভেতর একটা শূন্যতা  দিন দিন বেড়েই চলছিল। সেই শূন্যতার বিস্ফোরণ সেদিন সন্ধ্যেবেলা হয়ে গেল যেদিন বৌদি রিহার্সাল থেকে ফিরে আমাকে নিয়ে ধরে ধরে দক্ষিণের বারান্দাটাতে নিয়ে বসালেন। সেদিন বসন্ত শেষের মন পাগল করা বাতাস ছিল বাইরে। আমার হাতে হরলিক্সের গ্লাসটা ধরিয়ে দিয়ে নিজে আরেকটি চেয়ারে গিয়ে বসলেন।

―জানো সুবিমল আমরা যখন ভাড়াবাড়ি খুঁজছিলাম অনেক বাড়ি দেখেছিলাম। আমার কোনটাই পছন্দ হচ্ছিল না। তারপর তোমার তারাপদদা এই বাড়িটার যখন সন্ধান এনে দিলেন আমায়, এক দেখাতেই এই বাড়িটা আমার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। কেন জানো? আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন লাবণ্যবৌদি।

―কেন?

এই দক্ষিণ খোলা বারান্দাটার জন্য। অন্য যে বাড়িগুলো দেখেছিলাম তার থেকে এই বাড়ির ভাড়া অনেক বেশি, তবুও। এই বারান্দাটাই আমার মুক্তির একমাত্র জায়গা, আমার নিজের ভুবন বলতে পারো। দেখো না আমি কত গাছ লাগিয়েছি টবে। সন্ধ্যেবেলা সব কাজ সেরে যখনই এই বারান্দাটাতে বসি ওই টবের গাছগুলোর সাথে কথা বলি, ওদের গান শুনাই। মন খারাপ থাকলেও ওদেরকেই বলি। ওরা বোঝে আমার কথা। পরের দিনই দেখি আমার মন ভালো করার জন্য কোন না কোন টবে একটা বড় ফুল ফুটেছে। কথা শেষ করে হাসতে থাকে বৌদি। দেখলাম সত্যি সত্যি অনেকগুলো ফুল পাতাবাহারের টব বারান্দার রেলিং এর উপর পর পর সাজিয়ে রাখা।

―কিন্তু একমাত্র জায়গা কেন বলছ বৌদি? নাটক থিয়েটার এগুলো কি তোমায় মুক্তির আনন্দ দেয় না?

―দেয়, নিশ্চয়ই দেয়, অভিনেত্রী লাবণ্য ঘোষাল কে দেয়। নারী লাবণ্য ঘোষালকে যে দেয়না সুবিমল। বৌদির গলার স্বরে চমকে উঠে বৌদির দিকে তাকাতেই দেখি শরতের সেই নির্মল আকাশ উধাও, তার জায়গা জুড়ে রয়েছে আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘ যে বৃষ্টি ঝরাবার জন্য আকুল হয়ে আছে।

সেদিন লাবণ্যবৌদির দু-চোখের সেই মেঘ বৃষ্টির খেলা আমাকে অস্থির করে তুলেছিল। আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার অধিকারবোধের সীমা। নিজের দুই হাত বাড়িয়ে তাকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে তার সমস্ত শূণ্যতাটুকু ভরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। স্বামীর মুখটা মনে করে  প্রথমটায় বৌদি আমাকে বাধা দিতে চেয়েছিলেন। আমার দু’বাহুতে আত্মসমর্পণ করার আগে ব্যাকুল হয়ে বলেছিলেন, “সুবিমল আমি আমার স্বামীর বিশ্বাসঘাতিনী হতে চাই না, আমি তাকে ভালোবাসি।

নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে তাকে আশ্বস্ত করেছিলাম, “ তুমি বিশ্বাসঘাতিনী হবে না বৌদি, শুধু আমি তোমার শূণ্যতাটুকু ভরিয়ে দিতে চাই। এইটুকু অধিকার তুমি আমাকে দাও।”

আবেগের ঢেউয়ে ভেসে এরপর সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছিলাম সেদিন আমরা দুজনেই।

তারপর সময় এগিয়ে গেছে তার নিজস্ব নিয়মই । আমি সাংবাদিকতার চাকরি ছেড়ে চলে এসেছি আমার রাঙামাটির দেশ পুরুলিয়ায় এখানকার সরকারি কলেজের অধ্যাপনার কাজে নিয়োজিত হয়ে। বাবার পছন্দের পাত্রীকে বিয়ে করে থিতু হয়েছি সংসারে। এক ছেলে, এক মেয়ে। তারাও আজ বিবাহিত এবং স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। ফুটফুটে দুই নাতি নাতনি। কোথাও কোন অভাব নেই, দুঃখ নেই। জীবনে বেঁচে থাকতে গেলে এর বেশি আর কি চাই? কিচ্ছু না। কিন্তু কোথায় যেন একটা শূন্যতার বোধ যেটা শুরু হয়েছিল কলকাতা ছেড়ে আসার পর থেকেই, জীবনের এত দীর্ঘ রাস্তা অতিক্রম করার পরও সেই বোধটা যেন আজও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে আমায়। কিছুতেই তার থেকে মুক্তি পাই না।

তবে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা একটা তৈরি হয়েছিল গত বছর বৈশাখ মাসে, আমার শহরের একটি এনজিওর সাথে আমি গিয়েছিলাম বারাসাতের একটি বৃদ্ধাশ্রমে। চাকরি জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর সাহিত্যচর্চা ছাড়া আর বিশেষ কিছু করতাম না। বছর দুয়েক হলো এই এনজিওটার সাথে যুক্ত হয়েছি আমারই পাড়ার ছেলে রজতের অনুরোধে। ওরা বেশ কিছু বছর হল এই এনজিওটি খুলেছে। ষাট বা সত্তরোর্দ্ধ অসহায় বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের জন্য ওরা কিছু করার চেষ্টা করছে। ওদের সংগঠনের কলকাতা কেন্দ্রিক শাখা বারাসতে একটি বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করেছে । রজত অনেকদিন আগেই আমায় একটা প্রস্তাব দিয়েছিল।

―কাকু আপনাকে একদিন আমাদের বৃদ্ধাশ্রমটা দেখিয়ে নিয়ে আসবো বারাসাতে। দেখবেন আমরা খুব সততা ও যত্নের সাথে কাজটা করছি।

আমি জীবনে একজন সফল ব্যক্তি, গুছানো সংসার আমার, মাথার উপর ছাদ আছে। ছেলেমেয়েরা সেটল্ড এবং বাবা-মাকে তারা যথেষ্ট ভক্তি শ্রদ্ধা করে। লেখালেখির জগতেও একটা স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হয়েছে আমার। এ হেন মানুষের বৃদ্ধাশ্রম এর প্রতি একটু নাকউচুঁ মনোভাব থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। তাই রজতের অনুরোধে প্রথমে সাড়া দিইনি। পরে মনে হল দেখে আসতে ক্ষতি কি? একটা নতুন জায়গা ঘোরাও তো হবে। পৃথিবী যে সত্যিই গোল এই কথাটা আবার প্রমাণিত হলো ওই বৃদ্ধাশ্রমে পা দেবার পর। সেই দিনটা ছিল পয়লা বৈশাখ। সেই উপলক্ষে ‘সংকল্পতে’ (বৃদ্ধাশ্রম এর নাম) একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল এবং তাতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে আমি এবং আরো কিছু সাহিত্য সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন।  ওই ঘর ছাড়া অসহায় মানুষগুলোর সাথে সারাটা দিন কাটানো, গানে গল্পে ওদের কিছুক্ষণের জন্য আনন্দ দেওয়াটাই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু ওখানে যে আমার জন্য এত বড় বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে সেটা কল্পনারও অতীত ছিল।

বৃদ্ধ বৃদ্ধারা একটা হলে জড়ো হয়েছিলেন। তাদের সাথে আমাদের পরিচয় পর্ব মিটলে তাদের জন্য বয়ে আনা খাবারদাবার ও উপহার সামগ্রী যখন তুলে দেওয়া হচ্ছিল তখন পাশ থেকে ওখানকার কেয়ারটেকার সুব্রত কোন একটি মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলল, “রানু লাবণ্যদির জিনিস গুলো ওনার ঘরে পৌঁছে দিও, উনি তো এখানে আসবেন না।” নামটা কানে যেতেই কি অদ্ভুত একটা অনুভূতি খেলে গেল সারা শরীরে বলে বোঝাতে পারবো না। কেয়ারটেকার ছেলেটিকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি ব্যাপার কেউ কি খুব অসুস্থ? এখানে আসতে পারেননি?”

―হ্যাঁ, অসুস্থ ঠিকই, তবে যতটা না শরীরে তার থেকে অনেক বেশি মনে। উনি ঘর ছেড়ে কিছুতেই বের হতে চান না। সুব্রত উত্তর দিল।

―কেন কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে জীবনে? আচ্ছা ওনার সঙ্গে কি একবার দেখা করা যায়?

―কেন যাবে না? চলুন আমি নিয়ে যাচ্ছি।

সুব্রতর সাথে সিঁড়ি দিয়ে তিন তলায় উঠে বাঁদিকের একেবারে কোণের ঘুপচি ঘরটাতে পা দিতেই চমকে উঠলাম। এ কে শুয়ে আছে, প্রায়ান্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের জীর্ণ, মলিন শয্যায়? এ যে এককালের মঞ্চ  কাঁপানো সুন্দরী অভিনেত্রী লাবণ্যময়ী ঘোষাল, আমার লাবণ্য বৌদি!  মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ বাক্যহারা হয়ে গেলাম। বুকের ভিতর যেন অসম্ভব জোরে কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে তার শয্যার কাছে গিয়ে নাম ধরে তাকে ডাকলাম, “লাবণ্য বৌদি, আমায় চিনতে পারছেন? আমি সুবিমল চক্রবর্তী। কলকাতায় একই  বাসাবাড়িতে আমরা ভাড়া ছিলাম, মনে পড়ে?”

আস্তে আস্তে মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। সেই স্নিগ্ধ চাহনি, সেই হাসি। কিন্তু সবকিছুর উপরে এক যন্ত্রণার কালো মেঘ যেন তার মৌরসিপাতটা জাঁকিয়ে বসেছে।

 ―সুবিমল, খবরের কাগজের সুবিমল? ক্ষীণ কন্ঠে একটা কষ্টার্জিত হাসি টেনে এনে জিজ্ঞেস করলেন লাবণ্য বৌদি।

 ―হ্যাঁ আমি সেই সুবিমল। আপনি চিনতে পেরেছেন? আপনি এখানে এই অবস্থায় কেন? তারাপদদা, আপনার দক্ষিণ খোলা বাড়ি কি হলো সেসব?

আমার আকুলতা দেখে লাবণ্য বৌদি মৃদু হেসে বললেন, “এই এখন আমার সব সুবিমল,তুমি বসো।”

লাবণ্য বৌদিকে নিজের হাতে সেদিন আমি খাইয়ে দিয়েছিলাম। আমার প্রতি তার যা ঋণ সেটা এই জীবনে শোধ করতে পারবো না আমি জানি। কিন্তু ওই অবস্থায় তাকে দেখতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। দুপুরবেলা আহারাদির পর সুব্রতকে নিয়ে বসলাম। জানালাম লাবণ্যময়ী ঘোষালের অতীত ইতিহাস যতটুকু আমি জানি। কিন্তু কি করে তিনি এখানে এলেন সেটা আমায় জানতে হবে।

 সুব্রত একনাগাড়ে বলে গেল সেসব কথা।

―এই সংকল্পে লাবণ্যবৌদিকে রেখে গেছিল তার কিছু গুণমুগ্ধ ভক্ত। তার স্বামী তারাপদ ঘোষাল আত্মহত্যা করেছিলেন, কি কারনে কেউ জানে না। তারপর থেকেই দুঃখের দিন শুরু হয় লাবণ্য ঘোষালের। প্রথম প্রথম দয়াপরবশত কেউ কেউ তাকে কিছু কাজ দিত। কিন্তু তার পিছনে যতটা না দয়া কাজ করতো অন্য কারণ কাজ করত অনেক বেশি। লাবণ্য বৌদির সন্তানাদি ছিল না, মাথার উপরে ছাদও ছিল না। তিনি কম্প্রোমাইজও করতে পারেননি। টাকাপয়সা, গয়নাগাঁটি যা ছিল তাই বিক্রি করে কিছু বছর চালিয়েছিলেন। তারপর শুরু হয়েছিল অনাহারের জীবন। দীর্ঘদিন অনাহারে অসুস্থ হয়ে পড়লে যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন তার মালিকই সরকারি হাসপাতালে তাকে ফেলে আসে। উদ্দেশ্য বাড়ি পরিষ্কার করা। শুনেছি দীর্ঘদিনের ভাড়া বাকি ছিল।

―সেই হাসপাতাল থেকেই কি এখানে এসে উঠেছিলেন? সুব্রত কে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

―হ্যাঁ ওখানকার একজন পুরনো স্টাফ ওনাকে চিনতে পেরেছিলেন। একসময় নিয়মিত ওনাদের অভিনয় দেখতেন। ওই ভদ্রলোক ও আরো কিছু শুভানুধ্যায়ী মিলে লাবণ্য ঘোষাল কে এখানে রেখে যান। কথা হয়েছিল ওরা মাস মাস ওনার খরচা পাঠিয়ে দেবেন। দেন না তা নয়, তবে সেটা নিয়মিত নয়। বছরের ছয়-সাত মাসের বেশি টাকা আসে না। তবুও মানবতার খাতিরে আমরা ওনাকে ফেলে দিতে পারিনি।

এই কথাগুলো শুনতে শুনতে আমি আমার কর্তব্য ঠিক করে নিচ্ছিলাম। সুব্রত কে জানালা, “এখন থেকে ওনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার। ওনার জন্য যারা যা পাঠায় তাদেরকে বলো আর কিছু পাঠাতে হবে না। আমি সেই দিনই কিছু টাকা সুব্রতর হাতে ধরিয়ে দিলাম লাবণ্য বৌদির দেখভালের জন্য। ঠিক করলাম বাড়ি ফিরেই সংকল্পের নামে একটা রেকারিং একাউন্ট খুলব যাতে প্রত্যেক মাসে একটা নির্দিষ্ট টাকা আশ্রমে চলে যায় বৌদির খরচস্বরূপ। তবে এসবের পরেও একটা বড় কাজ বাকি থেকে গেছিল। একটা দক্ষিণ খোলা ঘর যার একটা দক্ষিণমুখী বারান্দা আছে। সুব্রত কে জিজ্ঞেস করলাম এরকম কোন ঘর আশ্রমে আছে নাকি। সুব্রত জানালো আছে কিন্তু খালি নেই। এক ডাক্তারের মা সেখানে থাকেন। তবে সে আমাকে কথা দিয়েছিল ওই ডাক্তার যদি তার মাকে নিয়ে যায়, সেরকম সম্ভাবনাও আছে,তাহলে ওই ঘরটা লাবণ্যবৌদিকেই দেওয়া হবে। ফিরে আসার সময়  বৌদির ঘরে গিয়ে জোর করে কিছু টাকা তার হাতে গুঁজে দিলাম আর আমার ঠিকানা,ফোন নম্বর লেখা একটা ছোট ডাইরি তাকে দিয়ে বললাম, “বৌদি আমায় এখন ফিরে যেতে হচ্ছে। কিন্তু তুমি একদম ভেবোনা। আমি আবার আসবো, খুব শিগগিরই আর তোমার জন্য দক্ষিণ খোলা ঘর, বারান্দার ব্যবস্থা করে আসবো। এইরকম ঘরে তোমায় মানায় না। মুখে একটা মিষ্টি করুন হাসি নিয়ে আমাকে সেদিন বিদায় দিয়েছিলেন লাবণ্যবৌদি। আসবার সময় সুব্রত কে আমার ফোন নাম্বার দিয়ে বলে এসেছিলাম লাবণ্যবৌদির যে কোন প্রয়োজনে আমাকে জানাতে যেন দ্বিধা না করে। এরপর আরও বার দুয়েক গেছি। যদিও দক্ষিণ খোলা বারান্দার ব্যবস্থা করতে পারিনি। ডাক্তার বিদেশ থেকে ফিরে ছিলেন ঠিকই কিন্তু তার মাকে নিজের কাছে নিয়ে যাননি। তাই ওই ঘরটাও আর খালি হয়নি। তবে সুব্রত কে বলে দক্ষিণমুখী আরেকটা ঘরে শিফট করেছিলাম লাবণ্যবৌদিকে যদিও ঘরটার বারান্দা নেই। তবু নেই মামার থেকে কানা মামাও ভাল। ঘরটিতে আসার পর থেকে বৌদির শরীরও যেন বেশ সেরে উঠেছিল। চোখ মুখ আর অত ফ্যাকাশে লাগত না। আমার চিন্তার মাত্রাও কমছিল। নিজের দায়িত্ব কিছুটা হলেও পালন করতে পেরেছি বলে খানিকটা আত্মশ্লাঘাও বোধ করছিলাম।

আজকের সকালের খবরের কাগজে ভিতরের পাতার বাঁ দিকের কোণের খবরটা সেই অহংকারকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। হয়তো শেষ সময় বৌদি আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন। আশ্রম থেকে বহুবার ফোন এসেছিল। কিন্তু নিজের কর্ম, নিজের সুখ, নিজের শান্তি এত ‘নিজের’ মধ্যে ডুবে থেকে সেই মৃত্যুপথযাত্রীর ডাক আমি শুনতে পাইনি। হয়তো বাকি জীবন এর জন্য নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব না। এরপরেও অপরাধ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে আমি রজতকে সঙ্গে করে ‘সংকল্পের’ দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। লাবণ্যবৌদির ঘরে গিয়ে বৌদির বিছানায় বসলাম। সারা ঘরটায় তখনও যেন তার অস্তিত্বের গন্ধ লেগে ছিল। বিছানার কাছে ছোট্ট টেবিলটায় আমার ঠিকানা আর ফোন নম্বর লেখা ডাইরিটা তখন ও পড়েছিল তার দু চারটি পাতা উল্টা কি দেখলাম কাঁপা কাঁপা হাতে আমাকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখেছেন বৌদি-

“সুবিমল তুমি আমার জন্য যা করেছ, আমাকে যা দিয়েছো তার ঋণ শুধু এ জন্মে নয় পরজন্মেও আমি শোধ করতে পারব না। আমি আমার স্বামীকে ভালোবেসেও ঠকিয়েছিলাম। সে বৃত্তান্ত এই পৃথিবীতে শুধু তুমি আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। কিন্তু যেটা তুমিও জানো না সেটা আজ তোমায় বলে যাই। ওই দিনের পর অপরাধবোধে তুমি বাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলে। তোমার হয়তো মনে হয়েছিল তুমি আমায় জোর করে ও পথে নিয়ে গিয়েছিলে। কিন্তু তোমার সে ধারনা ভুল। ওই দিনের অনেক আগেই আমি তোমায় ভালোবেসে ফেলেছিলাম। আজ এত বছর পর আমি প্রথম এই স্বীকারোক্তি দিলাম। শুধু তোমার উদ্দেশ্যে নয়, আমার মৃত স্বামীর উদ্দেশ্যেও। আমি আজ নির্ভার হলাম। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, তুমি ভালো থেকো”

                                                                          – বৌদি

ডায়েরির পাতাটা ছিঁড়ে নিয়ে শার্টের পকেটে ভরে সংকল্প থেকে শেষ বারের মতো বেরিয়ে আসলাম।

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।