একদিন তাঁর শহরে

শাহ্ কামাল

একদিন তাঁর শহরে তাঁকে খুঁজতে গিয়েছিলাম
                                     বিবর্ণ শালপাতার ধ্বনি
                                           নিঃশব্দ জলের শব্দ
শাপলার মতো জড়িয়ে যায় মনের গোপন ড্রয়ারে।

ড্রয়ার খুলতেই বের হয়ে আসে ঈজিপ্টের নীল ফণা।

বয়ে গেছে বহুজল আমাজন মিসিসিপি আর ভলগার
                                            গোপন নিতম্বের নীচ দিয়ে
ইরাবতি হয়েছে কুমারী-জননী
হোয়াংহো হেঁটে হেঁটে শুধু বুনে চলে নকশীকাঁথার মাঠ

শহরজুড়ে কৃষ্ণচূড়ার কানাকানি
কফিশপের দোকানে ধোঁয়া ওঠে পুরোনো চুমুকের
এ কথা কে বলে দিয়েছে
আমার শহরে তোমার পা পড়েছে
তোমার চোখে পড়েছে রবীন্দ্র সরোবরের নিস্তব্ধতা।

বিদ্যুৎতের তারে দাঁড়কাক ডানাঝাড়া দিয়েছে দিবসের শেষ গানে…

আগুনের নাম-ই তো অগ্নি

মল্লিক বাড়ির বেত বনের ওপর দিয়ে—
রাত নামতেই,
মনে পড়ে জোনাকির কথা:
জোনাকি আসে—
ঝিঁঝি বাদ্য বাজায়,
পেঁচা দূর থেকে দেখে—
ইঁদুরের গতিবিধি।

সেদিন ভাঁটফুলের পাতায় বাসর বুনতেই,
হেমন্তের পূর্নিমা—
লিথি নদীর জলে থই থই করতে করতে
চাঁদের দেশের দিকে তাকাতেই
চন্দ্রবিন্দু-ই মানচিত্র থেকে উদাও হয়ে গেলো।

গোয়ালবাড়ির গুদারাঘাটে,
জল তখনো খেলা করে—
পানকৌড়ির শব্দে,
শামুকের শব্দে,
সারি সারি বেরন পাতার ধ্বনি—
তিনকড়ির অবশিষ্ট মেঘ;
দূরে ইশারায় ডাকে বুনোফুলের ঝোপে বুনোহাঁস।

বিসর্গ বাদ দিয়ে দুখ্‌খো লিখতে
হোয়াংহো দাঁড়িয়ে—
গোমতির কূলে,
ডাকাতিয়ার বাঁশি বেজে ওঠে বৃন্দাবন;
ময়ূরের পালক খসে পড়ে জোনাকির আলোর ভেতর।

শীতের কুয়াশা গ্রীষ্মের দুপুরে উপস্থিত হতেই,
আমের মুকুলের ঘ্রাণ—
কাশফুলের মতো
সরিষা খেতের গভীরে ডুবসাঁতার কাটে;
রাজহাঁসে ভেসে বেড়ায় ফোরাত নদীর তীরে।

মানচিত্র গোল না হয়ে ব্যবচ্ছেদ হলে—
কী এমন যায় আসে বাতাসের কাছে!
আগুনের নাম-ই তো অগ্নি…

বায়স

আকাশের যে নক্ষত্রের গর্ভে আমি জন্মেছিলাম—
সে নক্ষত্র মহাসমুদ্রে নিমজ্জিত হতেই
নক্ষত্রবীথিই আমার জন্য
নির্মাণ করেছে এক আশ্রায়ন প্রকল্প।

অথচ আমি, উল্কাপিণ্ডিকে বলেছি আমার—মা।
সমুদ্রের ফেনায়িত জলরাশির বিন্দুকে,
ঘোষণা করেছি আমার— পিতা।
মরুঝড়ের কবলে পড়া উষ্ট্রকে ডেকেছি— সহদর ভাই।
কাকজোস্‌নার রাতকে— প্রিয় ভগিনী।

ঘোষণা করেছি
জাগ্রত অগ্নিগিরির অগ্নুৎপাত—
আমার জায়া দম্পতি।
শেষ বিকেলের গোধূলির রঙ—
আমার কন্যা সন্তান।
তপ্ত রোদের গ্রীষ্ম— আমার পুত্র সন্তান।
সমগ্র নীল গালিচা—
আমার একমাত্র বন্ধু।

তোমরা হয়তো ভুলেই গিয়েছো—
আমার চোখগুলোই কাকচক্ষু
আমার বাসাই কাকের বাসা।
আমারই আরেক নাম— কাকতাড়ুয়া
আবার আমিই ইতিহাসের সেই আদি স্মারক: আমি— বায়স…

হালখাতা

এবার বুঝি সব দেনা-পাওনা মিটিয়ে দেবার সময় এলো
তোমার একগুচ্ছ কস্তুরিফুল
এক খোঁপা শাপলা
আর এক আকাশ কাশফুল
আনোতো দেখি— তোমার ব্যালেন্স সিটের কি অবস্থা?

এক পেয়ালা জল
এক থালা শিউলিফুল
আর সমগ্র পথজোড়া ভাঁটফুল
রাইট-অফের অপেক্ষায় তোমার একাউন্টস রিসিভএবলে…

ডিমান্ড নোটিশ ইস্যু হয়েছে এবার সাটডাউন
যেমন এপথে এগুলেই বরফকল
ওপথে এগুলেই পানামসিটি

ভেবেছি কী?
ধানক্ষেতগুলোই জলের সাথে বাড়তে বাড়তে সুউচ্চ ভবন
আমাদের হিসাবের ব্যালেন্স নিল হয়েছে সত্য
তারপরও আমাদের আকাশ নেই…

সব লেনদেনের হালখাতা খুলতে নেই
মনে রেখো একাউন্ট সাহেব…

নীল উচ্চারণ

একমুঠো রোদ—
পকেটে জমে থাকা পুরোনো ক্লান্তির পাশে।

জলরঙে আঁকা এক তটিনী
হঠাৎ ভেঙে পড়ে আয়নার ভেতর।

উদ্যত শরীরের ছায়া
দীর্ঘ হতে হতে
গিলে খায় নদীর নীল উচ্চারণ।

তারপর—

বালুচরে পড়ে থাকে
কিছু ভাঙা ঢেউ,
কিছু অসমাপ্ত আলো।

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।