নদীর কাছে রেখে এসেছিলাম

প্রিয়ব্রত চক্রবর্তী

ভোরের ঠিক আগে নদীর একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে।

শহরের মানুষ সে গন্ধ চেনে না। শহরে নদী মানে সেতুর নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া জল, দু-ধারে কংক্রিটের দেওয়াল, আর দূরে মিলিয়ে যাওয়া একটা ধূসর রেখা। নদী সেখানে দৃশ্য—জীবন নয়।

কিন্তু চরের মানুষ জানে, জোয়ারের জল নেমে যাওয়ার পর কাদার বুক থেকে যে গন্ধ উঠে আসে, তার মধ্যে শুধু কাদা থাকে না। থাকে নোনা ঘাস, শুকিয়ে যাওয়া মাছ, ভাঙা ঘরের কাঠ, কচুরিপানার পচা পাতা, আর থাকে এমন সব মানুষের স্মৃতি, যাদের ঠিকানা নদী একদিন নিয়ে গেছে।

শশাঙ্ক সেই গন্ধ চিনত।

পঁচিশ বছর পরে আবার চিনল।

নৌকাটা তখন কুয়াশা কাটিয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। ভোর হয়নি, কিন্তু রাতের অন্ধকারও আর আগের মতো ঘন নয়। পূর্ব আকাশে একটা ফিকে রেখা দেখা দিয়েছে। মাঝি বৈঠা টানছে। বৈঠা জলে ঢুকছে, উঠে আসছে। প্রতিবার জল ভাঙার শব্দটা যেন একই জায়গায় ফিরে আসছে।

ছপ।

ছপ।

ছপ।

শশাঙ্ক গলুইয়ের কাছে বসে ছিল। তার পাশে একটা ছোট টিনের বাক্স।

বাক্সটির গায়ে মরচে পড়েছে। ঢাকনার এক কোণে পুরনো আঁচড়। তালা নেই। তবু সে এত বছর সেটি খোলেনি।

আজ খুলবে।

মাঝি একসময় পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করল,

—ওই চরে নামবেন?

—হ্যাঁ।

—আপনার বাড়ি ছিল?

শশাঙ্ক একটু থেমে বলল,

—ছিল।

মাঝি আর প্রশ্ন করল না।

চরের মানুষজন জানে—কিছু প্রশ্নের উত্তর নদীর কাছে থাকে।

নৌকা এগিয়ে চলল।

শশাঙ্ক তাকিয়ে রইল কুয়াশার দিকে।

কিছু দূরে চরটা ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে।

তার মনে হল, পঁচিশ বছর আগে সে এই নদীর কাছ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

আজ সেই নদীই তাকে ফিরিয়ে আনছে।

শশাঙ্কের বাবা হরিপদ ছিলেন মাঝি।

নিজের নৌকা ছিল না। অন্যের নৌকা চালাতেন। কখনও যাত্রী পারাপার, কখনও মাছ, কখনও বাজারের মাল—যে কাজ পাওয়া যেত, করতেন।

তাঁর গায়ে সবসময় একটা আলাদা গন্ধ লেগে থাকত।

শশাঙ্ক ছোটবেলায় বাবার জামা নাকে নিয়ে বলত,

—তোমার গায়ে কাদার গন্ধ।

হরিপদ হেসে বলতেন,

—ওটা নদীর গন্ধ।

—নদীর আবার গন্ধ হয়?

—হ্যাঁ, হয়।

—কীসের?

—বড় হলে বুঝবি।

শশাঙ্ক বুঝত না।

তার কাছে নদী ছিল একটা বিশাল জলরাশি। বর্ষায় ফুলে ওঠে, শীতে সরে যায়। কখনও মাছ দেয়, কখনও কাঁকড়া। কখনও ঘাটের মাটি কেটে নিয়ে যায়।

তার বেশি কিছু নয়।

তারপর এক বর্ষার রাতে নদী তার বাবাকে নিয়ে গেল।

সেদিন বিকেল থেকেই আকাশের মুখ ভার ছিল। বাতাসে নোনা গন্ধ। নদীর জলও যেন অকারণে ফুলে উঠছিল।

হরিপদ নৌকা নিয়ে বেরোচ্ছেন।

সুনয়নী—শশাঙ্কের মা—দরজায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন,

—আজ যেও না।

—যেতে হবে।

—জল ভালো নয়।

হরিপদ হাসলেন।

—জল ভালো-মন্দ হয় না। আমরা বুঝতে পারি কি না, সেটাই কথা।

সুনয়নী আর কিছু বলেননি।

শশাঙ্ক তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে।

—কখন ফিরবে?

হরিপদ তার মাথায় হাত রেখেছিলেন।

—সকালে।

—নিশ্চয়?

—নিশ্চয়।

সেই সকাল আর আসেনি।

রাতে কয়েকজন মানুষ যখন তাদের উঠোনে এসে দাঁড়াল, তখন শশাঙ্ক প্রথমে বুঝতে পারেনি কী হয়েছে।

সবাই এত চুপ কেন?

তারপর সে মায়ের মুখ দেখল।

সুনয়নী কাঁদছিলেন না।

চোখ দুটি শুধু স্থির হয়ে ছিল।

শশাঙ্ক দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—বাবা কোথায়?

কেউ উত্তর দিল না।

—বাবা কোথায়?

মা ধীরে বললেন,

—নদীতে।

—নৌকায়?

মা মাথা নাড়লেন।

—ফিরবে?

সুনয়নী এবার ছেলের দিকে তাকালেন।

—না।

শশাঙ্ক নদীর দিকে ছুটতে চেয়েছিল।

হরু কাকা তাকে ধরে ফেলেছিলেন।

সে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,

—নদী বাবাকে মেরে ফেলেছে।

সুনয়নী তখনও চুপ।

অনেকক্ষণ পরে বলেছিলেন,

—নদী কাউকে মারে না।

—তাহলে কে মেরেছে?

মা উত্তর দেননি।

সেই রাতেই শশাঙ্ক নদীকে ঘৃণা করতে শিখেছিল।

বাবার মৃত্যুর পর সংসারটা যেন হঠাৎ বদলে গেল।

একটা মানুষ কমে যাওয়া মানে শুধু একটা মুখ কমে যাওয়া নয়। একটা হাত কমে যাওয়া। একটা আয় কমে যাওয়া। একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষ কমে যাওয়া।

সুনয়নী মাছ শুকিয়ে বিক্রি করতেন।

ভোরের অন্ধকারে উঠতেন। মাছ পরিষ্কার করতেন। নোনা জলে ধুতেন। বাঁশের চাটাইয়ে মেলে দিতেন।

শশাঙ্ক সেই গন্ধ সহ্য করতে পারত না।

তার মনে হত, এই গন্ধটাই তাদের দারিদ্রের গন্ধ।

একদিন সে বলেছিল,

—আমি পড়াশোনা ছেড়ে দেব।

মা মাছের আঁশ ছাড়াতে ছাড়াতে বলেছিলেন,

—কেন?

—তুমি একা কত করবে?

—যতদিন পারি করব।

—যদি না পারো?

সুনয়নী হাত থামিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়েছিলেন।

—তুই পড়বি।

—কিন্তু সংসার?

—সংসার আমি দেখব।

—কী করে?

মা একটু হেসেছিলেন।

—যেভাবে এতদিন দেখেছি।

তারপর বলেছিলেন,

—তুই এই চর ছাড়বি।

শশাঙ্ক চুপ করে ছিল।

—শহরে যাবি। পড়বি। কাজ করবি। নিজের পায়ে দাঁড়াবি।

—তুমি?

—আমি আছি।

সুনয়নীর সেই “আমি আছি” কথাটা শশাঙ্ক তখন খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিল।

মানুষ মায়ের থাকা নিয়ে প্রশ্ন করে না।

যতক্ষণ মা থাকেন, তাঁর থাকা যেন পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম।

একদিন সেই নিয়ম ভেঙে যায়।

মাধবী ছিল পাশের বাড়ির মেয়ে।

শশাঙ্কের চেয়ে কয়েক মাস ছোট।

তাদের বন্ধুত্বের শুরু হয়েছিল কাঁকড়া ধরতে গিয়ে।

শশাঙ্ক কাদায় হাত ঢুকিয়ে একটা কাঁকড়া ধরেছিল। কাঁকড়া উলটে তার আঙুলে চিমটি কাটতেই সে চিৎকার করেছিল।

মাধবী হেসে বলেছিল,

—বলেছিলাম না, ধরিস না!

—তুই আগে বলিসনি।

—বলেছি।

—কখন?

—তুই শুনিসনি।

শশাঙ্ক রেগে গিয়েছিল।

মাধবী আরও হেসেছিল।

তার হাসি ছিল পরিষ্কার। নদীর জলের মতো নয়—বরং কাশবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ার মতো।

তারা একসঙ্গে স্কুলে যেত।

একসঙ্গে নদীর ধারে বসত।

কখনও বই পড়ত।

মাধবী পড়তে ভালোবাসত।

একদিন শশাঙ্ক জিজ্ঞেস করেছিল,

—এত পড়ে কী হবে?

—জানি না।

—মাস্টারমশাই হবি?

—হতে পারি।

—তুই পারবি?

মাধবী নদীর দিকে তাকিয়ে বলেছিল,

—চেষ্টা করলে মানুষ অনেক কিছু পারে।

শশাঙ্ক বলেছিল,

—আমি শহরে গিয়ে বড় চাকরি করব।

মাধবী তার দিকে তাকিয়েছিল।

—জানি।

—কী করে জানিস?

—তোর চোখে চলে যাওয়ার তাড়া আছে।

শশাঙ্ক হেসেছিল।

—তোর?

মাধবী একটু চুপ করে বলেছিল,

—আমার থাকার।

তখন তারা কেউ জানত না, একদিন এই দুটি শব্দ তাদের জীবনের মধ্যে এত বড় দূরত্ব তৈরি করবে।

কলকাতায় চাকরি পাওয়ার খবর এল এক শীতের সকালে।

সুনয়নী খুব খুশি হয়েছিলেন।

কিন্তু মুখে প্রকাশ করেননি।

ছেলের কাপড় গুছিয়ে দিয়েছিলেন।

দুটি শার্ট।

একটি প্যান্ট।

একটা গামছা।

কাপড়ের ব্যাগ।

শেষে একটা ছোট টিনের বাক্স হাতে দিয়ে বলেছিলেন,

—এটা রাখ।

—কী আছে?

—তোর পুরনো জিনিস।

শশাঙ্ক খুলে দেখেনি।

বাস ছাড়ার সময় মা বলেছিলেন,

—নিজের যত্ন নিস।

—তুমিও।

—চিঠি লিখিস।

—লিখব।

মাধবী একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল।

শশাঙ্ক তাকে দেখে হাত নাড়ল।

—আমি ফিরব।

মাধবী কিছু বলল না।

শুধু তাকিয়ে রইল।

বাস ছেড়ে দিল।

চর পিছিয়ে গেল।

শশাঙ্ক জানালার পাশে বসে প্রথমবার বুঝল, সে সত্যিই চলে যাচ্ছে।

তার বুকের ভেতর তখন আনন্দও ছিল, কষ্টও।

কিন্তু আনন্দটাই বেশি ছিল।

শহর তাকে প্রথমে মুগ্ধ করেছিল।

আলো।

ভিড়।

উঁচু বাড়ি।

অসংখ্য মানুষ।

এখানে কেউ তাকে মাঝির ছেলে বলে চিনত না।

সে ছিল শশাঙ্ক।

একজন কর্মচারী।

নিজের বেতন আছে।

নিজের ঘর হবে।

নিজের জীবন হবে।

প্রথম দিকে সে মাকে নিয়মিত টাকা পাঠাত।

চিঠিও লিখত।

মা উত্তর দিতেন।

“নদীতে জল কম।”

“নিমগাছে পাখি বাসা করেছে।”

“তুই ঠিকমতো খাস তো?”

আর কখনও লিখতেন,

“মাধবী এসেছিল।”

মাধবী একবার নিজেও চিঠি লিখেছিল।

“কেমন আছিস? তুই বলেছিলি ফিরবি। কথা রাখিস।”

শশাঙ্ক চিঠিটা বহুবার পড়েছিল।

উত্তর দিতে বসেছিল।

পারেনি।

তার মনে হয়েছিল, এখন নয়।

চাকরিটা একটু গুছিয়ে।

টাকা একটু জমিয়ে।

তারপর যাবে।

মানুষের জীবনে “তারপর”। এই শব্দটাও বড় বিপজ্জনক।

চাকরি বদলাল।

বেতন বাড়ল।

শহরে নতুন ঘর হল।

তারপর বিয়ে।

সংসার।

দায়িত্ব।

মা ফোন করলে সে বলত,

—এখন অফিসে আছি।

মা বলতেন,

—ঠিক আছে। পরে কথা বলিস।

“পরে” আর আসত না।

একদিন মা বললেন,

—কবে আসবি?

—শিগগিরই।

—শিগগির মানে?

শশাঙ্ক হেসে বলেছিল,

—খুব তাড়াতাড়ি।

মা বলেছিলেন,

—তোর তাড়াতাড়ির সঙ্গে আমার তাড়াতাড়ি মেলে না রে।

কথাটা শুনে শশাঙ্ক হেসেছিল।

এখন সেই কথাটাই তার মনে পড়ে।

মায়ের শেষ চিঠিটা এসেছিল শীতের সকালে।

“শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। যদি পারিস, একবার আসিস।”

চিঠিটা পড়ে শশাঙ্ক অনেকক্ষণ বসে ছিল।

তার স্ত্রী বলেছিল,

—যাও।

—যাব।

—কবে?

—এই সপ্তাহে।

কিন্তু সেই সপ্তাহে অফিসে কাজ পড়ল।

তারপর আরও কাজ।

সে নিজেকে বোঝাল—

মা তো আছেনই।

কাজটা শেষ হলেই যাবে।

একদিন দুপুরে হরু কাকার ফোন এল।

—শশাঙ্ক?

—হ্যাঁ কাকা।

—তুই কোথায়?

—অফিসে।

ওপাশে একটু নীরবতা।

তারপর—

—তোর মা চলে গেল।

শশাঙ্ক প্রথমে কথাটা বুঝতে পারেনি।

—কখন?

—গতরাতে।

—আমাকে ডাকেনি?

হরু কাকা বললেন,

—ডেকেছিল।

শশাঙ্কের গলা শুকিয়ে গেল।

—কী বলেছিল?

—বলেছিল, “ওকে ডাকিস না। ওর কাজ আছে।”

ফোন কেটে যাওয়ার পর শশাঙ্ক অনেকক্ষণ নিজের ডেস্কে বসে ছিল।

চারপাশে লোকজন কাজ করছে।

কম্পিউটারের পর্দায় সংখ্যা।

ফোন বাজছে।

কেউ হাসছে।

কেউ কথা বলছে।

তার মনে হল, পৃথিবী থামেনি।

শুধু তার একটা অংশ থেমে গেছে।

সেই প্রথম সে বুঝেছিল—

কাউকে হারানোর সবচেয়ে বড় কষ্ট মৃত্যু নয়।

কখনও কখনও কষ্টটা হল, আর কোনোদিন বলা যাবে না—

“আমি আসছি।”

মায়ের শেষকৃত্য সে করেছিল।

চর থেকে ফিরে আসার পর কয়েকদিন ঘরে থাকতে পারেনি।

মায়ের চৌকির ওপর একটা ভাঁজ করা শাড়ি।

দেওয়ালে বাবার পুরনো ছবি।

কোণে মাছ রাখার বাঁশের ঝুড়ি।

সবকিছু যেন মাকে ছাড়া আরও বেশি করে মায়ের হয়ে উঠেছিল।

সেই রাতে সে প্রথমবার টিনের বাক্সটা খুলেছিল।

ভেতরে ছিল—

একটা শুকনো কাশফুল।

একটা নীল ফিতে।

একটা পুরনো কলম।

আর মাধবীর চিঠি।

“তুই বলেছিলি ফিরবি।

আমি অপেক্ষা করব বলিনি।

তবু করব।

যদি কোনোদিন ফিরিস, নদীর কাছে দাঁড়াস।

নদী সব কথা মনে রাখে।

—মাধবী।”

চিঠিটা পড়ে শশাঙ্ক জানালার পাশে বসে ছিল।

সেই রাতে সে অনেক কেঁদেছিল।

কিন্তু কার জন্য, সে নিজেও জানত না।

মায়ের জন্য?

মাধবীর জন্য?

নিজের জন্য?

নাকি সেই ছেলেটার জন্য, যে একদিন বাসের জানালা দিয়ে হাত নেড়ে বলেছিল—

“আমি ফিরব।”

কয়েক মাস পর খবর এল—

নদী বাড়ি নিয়ে গেছে।

তারপর উঠোন।

তারপর নিমগাছ।

শশাঙ্ক আর যায়নি।

সে নিজেকে বোঝাল—

যা ছিল, সব তো শেষ।

কিন্তু মানুষ কখনও কখনও জায়গা হারায় না।

জায়গার ভেতর নিজের একটা অংশ রেখে আসে।

সেই অংশটিই তাকে আবার ফিরিয়ে আনে।

পঁচিশ বছর পর।

মাধবীকে খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগল না।

চরের মানুষ তাকে চিনত।

সে এখন একটা ছোট পাঠশালা চালায়।

টিনের ঘর।

সামনে কাঁচা উঠোন।

দেয়ালে শিশুদের আঁকা ছবি।

কেউ নদী এঁকেছে।

কেউ নৌকা।

কেউ মাছ।

কেউ একটা বড় বাড়ি।

শশাঙ্ক দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছিল।

মাধবী বোর্ডে লিখছিল—

নদী আমাদের কী দেয়?”

একটা ছেলে বলল,

—মাছ।

একটি মেয়ে বলল,

—জল।

আরেকজন বলল,

—ভয়।

সবাই হেসে উঠল।

মাধবীও।

ঠিক তখন সে দরজার দিকে তাকাল।

হাত থেমে গেল।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

পঁচিশ বছর যেন এক মুহূর্তে সরে গেল।

মাধবী প্রথমে বলল,

—এসেছিস?

শশাঙ্ক বলল,

—হ্যাঁ।

—অনেক দেরি করলি।

—জানি।

—বস।

শশাঙ্ক বসল।

শিশুরা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে।

মাধবী বলল,

—ও কলকাতায় থাকে।

একটা ছেলে জিজ্ঞেস করল,

—কলকাতা কেমন?

শশাঙ্ক বলল,

—বড়।

—আমাদের চরের চেয়ে?

—অ-নে-ক বড়।

ছেলেটা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—সেখানে নদী আছে?

শশাঙ্ক থেমে গেল।

—আছে।

—তাহলে আপনি ফিরে এলেন কেন?

প্রশ্নটা শুনে মাধবী মাথা নিচু করে ফেলল।

শশাঙ্ক শিশুটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—কারণ কিছু নদীকে দূর থেকে দেখা যায় না।

সন্ধ্যায় তারা নদীর ধারে বসেছিল।

পঁচিশ বছরের নীরবতা দুজনের মাঝখানে বসে ছিল।

শশাঙ্ক বলল,

—তুই এখনও এখানে?

—হ্যাঁ।

—কেন?

—কোথায় যাব?

—শহরে যেতে পারতিস।

—পারতাম।

—যাসনি কেন?

মাধবী নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

—সবাই তো শহরে গেলে বড় হয় না।

শশাঙ্ক মৃদু হাসল।

—তুই এখনও আগের মতো কথা বলিস।

—তুই বদলে গেছিস।

—খারাপভাবে?

—না।

—তাহলে?

—আগে তুই সবকিছু পেতে চাইতিস।

—এখন?

—এখন বুঝতে শিখেছিস, সবকিছু পাওয়া যায় না।

শশাঙ্ক দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—তুই বিয়ে করিসনি?

মাধবী নদীর দিকে তাকিয়েই বলল,

—না।

—কেন?

—সব প্রশ্নের উত্তর বিয়ে দিয়ে হয় না।

শশাঙ্ক আর কিছু বলল না।

পরদিন সকালে সে পাঠশালায় গেল।

দেখল, ঘরের টিনে ফুটো।

বৃষ্টির জল পড়ে।

বই রাখার আলমারি নেই।

শিশুদের বসার বেঞ্চ কম।

সে বলল,

—আমি একটা পাকা ঘর করে দেব।

মাধবী বলল,

—কর।

—বই দেব।

—দিস।

—বিদ্যুৎ?

—এখানে লাইন নেই।

—লাইনও হবে।

মাধবী এবার তার দিকে তাকাল।

—তুই সত্যিই বদলেছিস।

শশাঙ্ক বলল,

—হয়তো বদলাতে অনেক দেরি করেছি।

মাধবী বলল,

—দেরি আর ফিরে আসা এক জিনিস নয়।

—জানি।

—তাহলে?

—যা বাকি আছে, সেটা করতে চাই।

কয়েক মাসের মধ্যে পাঠশালার নতুন ঘর তৈরি হল।

দরজার ওপর লেখা হল—

সুনয়নী পাঠশালা।

নীচে—

নদী ঘর ভাঙে, স্বপ্ন নয়।

উদ্বোধনের দিন শশাঙ্ক একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

মাধবী এসে বলল,

—ভিতরে যাবি না?

—না।

—কেন?

—এটা আমার নয়।

মাধবী বলল,

—তোর মায়ের।

শশাঙ্ক তাকাল।

—তাই তো।

সে ভিতরে গেল।

একটা ছোট মেয়ে নতুন বই হাতে বসে আছে।

শশাঙ্ক তার পাশে বসে বলল,

—কী পড়ছ?

মেয়েটি বলল,

—নদী।

—নদী কী?

মেয়েটি বইয়ের ছবি দেখিয়ে বলল,

—এটা।

শশাঙ্ক জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে সত্যিকারের নদী।

সে বলল,

—শুধু এটা নয়।

মেয়েটি তাকাল।

—আর কী?

শশাঙ্ক বলল,

—যেটা চলে যায়, আর তবু থেকে যায়।

মেয়েটি বুঝল না।

মাধবী দূর থেকে শুনছিল।

সে কিছু বলল না।

সন্ধ্যায় শশাঙ্ক আবার পুরনো জায়গায় গেল।

বাড়ি নেই।

নিমগাছ নেই।

শুধু নদী।

কাদা।

কাশফুল।

আর একটা ভাঙা ইট।

সে হাঁটু গেড়ে বসে মাটি ছুঁল।

আঙুলে কাদা লাগল।

এই কাদার গন্ধ তার চেনা।

এখানে তার মায়ের পা পড়েছিল।

বাবার নৌকার দড়ি বাঁধা হয়েছিল।

সে প্রথম হাঁটতে শিখেছিল।

মাধবীর সঙ্গে ঝগড়া করেছিল।

প্রথম স্বপ্ন দেখেছিল।

আর একদিন সব ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

তার চোখে জল এল।

মাধবী পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

সে বলল,

—তোর মা শেষদিকে আমার সঙ্গে কথা বলত।

শশাঙ্ক মুখ তুলল।

—কী বলত?

—তুই যেন নিজের মতো করে বাঁচিস।

শশাঙ্ক চুপ।

—আর?

—মানুষ হওয়া যেন ভুলিস না।

শশাঙ্ক মাটির দিকে তাকাল।

—আমি কি ভুলে গিয়েছিলাম?

মাধবী বলল,

—পুরোপুরি নয়।

—তাহলে?

—শুধু মনে করতে দেরি হয়েছে।

সেই রাতে শশাঙ্ক টিনের বাক্স খুলে মাধবীর চিঠিটা বের করল।

—এটা এতদিন রেখেছিলি?

মাধবী বলল,

—তুই রেখে গিয়েছিলি।

—তুই ফেরত নিসনি?

—কেন নেব?

—কারণ আমি তো আসিনি।

—তুই আসিসনি। চিঠিটা তো এসেছিল।

শশাঙ্ক মৃদু হেসে ফেলল।

—সব চিঠি কি পৌঁছয়?

মাধবী বলল,

—না।

—তাহলে?

—কিছু চিঠি মানুষকে নয়, সময়কে লেখা হয়।

শশাঙ্ক চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—তুই কি আমার জন্য অপেক্ষা করেছিলি?

মাধবী অনেকক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।

—একটা সময়।

—কতদিন?

—যতদিন অপেক্ষা করাটা অভ্যাস হয়ে যায়।

—তারপর?

—তারপর বুঝলাম, অপেক্ষা করলে মানুষ ফিরে আসে না। মানুষ নিজের সময়ে ফিরে আসে।

শশাঙ্কের গলা ভারী হয়ে উঠল।

—ক্ষমা করেছিস?

মাধবী তাকাল।

—কিসের জন্য?

—ফিরিনি বলে।

—তুই কথা রাখিসনি।

—জানি।

—কিন্তু সারাজীবন রাগ করে থাকা যায় না।

—কেন?

—রাগেরও একটা বয়স আছে।

পরদিন ফেরার সময় নৌকা ঘাট ছাড়ল ভোরে।

মাধবী দাঁড়িয়ে ছিল।

শিশুরা পাশে।

শশাঙ্ক হাত নাড়ল।

মাধবীও।

নৌকা একটু দূরে যেতেই শশাঙ্ক পিছনে তাকাল।

চর কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে।

মাধবী ছোট হয়ে আসছে।

পাঠশালার টিনের চাল দেখা যাচ্ছে।

তার মনে হল, এবার সে কাউকে রেখে যাচ্ছে না।

কিছু মানুষকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া যায় না।

তাদের সঙ্গে নিয়ে চলতে হয়।

নৌকা মাঝনদীতে পৌঁছল।

শশাঙ্ক টিনের বাক্সটা খুলল।

ভেতরে চিঠি।

নীল ফিতে।

শুকনো কাশফুল।

সবকিছু আছে।

শুধু সে নেই—সেই আগের মানুষটি।

বৈঠার শব্দ উঠছে।

ছপ।

ছপ।

ছপ।

তার মনে পড়ল বাবার কথা—

“বড় হলে বুঝবি।”

আজ সে বুঝতে পারছে।

নদীর গন্ধ আসলে কাদার গন্ধ নয়।

এটা ফিরে আসার গন্ধ।

তারপর থেকে শশাঙ্ক প্রতি বছর চরে যায়।

পাঠশালায় নতুন বই আসে।

নতুন শিশু আসে।

কেউ বড় হয়ে শহরে যায়।

কেউ নদীতে মাছ ধরে।

কেউ থেকে যায়।

মাধবী এখনও পড়ায়।

চুলে পাক ধরেছে।

চোখের পাশে রেখা।

কিন্তু বোর্ডে যখন সে লেখে—

“নদী আমাদের কী দেয়?”

তখন তার হাত কাঁপে না।

একদিন এক শিশু উত্তর দিয়েছিল,

—নদী সব নিয়ে যায়।

মাধবী বলেছিল,

—সব?

ছেলেটা বলেছিল,

—হ্যাঁ।

মাধবী জানালার বাইরে তাকিয়ে বলেছিল,

—তাহলে মানুষ নদীর কাছে ফিরে আসে কেন?

শিশুরা চুপ।

মাধবী বলেছিল,

—কারণ নদী শুধু নিয়ে যায় না।

একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,

—কী দেয়?

মাধবী উত্তর দিয়েছিল,

—মনে রাখার ক্ষমতা।

শশাঙ্ক এখন শহরে থাকলেও মাঝে মাঝে ভোরের আগে ঘুম ভেঙে যায়।

জানালা খুলে দাঁড়ায়।

সামনে বহুতল।

নীচে গাড়ি।

দূরে আলো।

কোথাও নদী নেই।

তবু সে নদীর গন্ধ পায়।

হয়তো সত্যিই আসে না।

স্মৃতি নিয়ে আসে।

সে টিনের বাক্সটা খোলে।

মাধবীর চিঠি বের করে।

অক্ষরগুলো এখন আরও ফ্যাকাশে।

কাগজ হলুদ।

তবু পড়া যায়।

“যদি কোনোদিন ফিরিস, নদীর কাছে দাঁড়াস।

নদী সব কথা মনে রাখে।”

শশাঙ্ক চিঠিটা ভাঁজ করে না।

অনেকক্ষণ খোলা রাখে।

তারপর জানালার পাশে রেখে দেয়।

সে জানে, কিছু স্মৃতিকে তালাবন্ধ করে রাখলে তারা আরও ভারী হয়।

আলোয় রাখলে হালকা হয়।

একদিন তার ছেলে জিজ্ঞেস করেছিল,

—বাবা, তুমি নদীকে এত ভালোবাসো কেন?

শশাঙ্ক বলেছিল,

—আমি একসময় নদীকে খুব ঘৃণা করতাম।

—কেন?

—নদী আমার কাছ থেকে একজনকে নিয়ে গিয়েছিল।

—কে?

—আমার বাবা।

ছেলে চুপ করে ছিল।

তারপর বলেছিল,

—তাহলে এখন ভালোবাসো কেন?

শশাঙ্ক একটু ভেবে বলেছিল,

—কারণ পরে বুঝেছি, নদী শুধু মানুষকে নিয়ে যায়নি। আমার নিজের একটা অংশও রেখে দিয়েছিল।

—কোথায়?

শশাঙ্ক জানালার বাইরে তাকিয়ে বলেছিল,

—চরে।

বছর পেরিয়ে যায়।

নদী তার গতিপথ বদলায়।

চর ভাঙে।

নতুন চর জাগে।

কেউ বাড়ি বানায়।

কেউ আবার ভেঙে অন্যত্র যায়।

মানুষ নদীর সঙ্গে লড়াই করে।

তারপর নদীর কাছেই ফিরে আসে।

শশাঙ্কও বদলেছে।

তার শহরের জীবন আগের মতোই চলছে।

কাজ আছে।

সংসার আছে।

দায়িত্ব আছে।

কিন্তু তার জীবনের মধ্যে এখন একটি চর আছে।

একটি পাঠশালা আছে।

একজন মাধবী আছে।

একজন মা আছেন, যাঁকে সে শেষবার সময় দিতে পারেনি।

একজন বাবা আছেন, যাঁর শেষ কথাটা সে এখনও শুনতে পায়।

আর আছে একটা নদী।

যাকে একদিন সে শত্রু ভেবেছিল।

আজ সে জানে—

নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক জয়-পরাজয়ের নয়।

নদীকে জয় করা যায় না।

তাকে বুঝতেও পুরোপুরি শেখা যায় না।

শুধু তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যায়।

শেষবার শশাঙ্ক যখন চরে গিয়েছিল, তখন শরৎ।

কাশফুল ফুটেছে।

আকাশ পরিষ্কার।

নদীর জল সরে গিয়ে চওড়া কাদার জমি দেখা দিয়েছে।

সুনয়নী পাঠশালার সামনে নতুন একটা নিমগাছ লাগানো হয়েছে।

শশাঙ্ক গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

—এটা কে লাগিয়েছে?

মাধবী বলল,

—একটা ছেলে।

—কোন ছেলে?

—তুই চিনবি না।

শশাঙ্ক গাছটার দিকে তাকাল।

পাতাগুলো ছোট।

কোমল।

সে হাত বাড়িয়ে একটা পাতা ছুঁল।

তার মনে হল, বহু বছর আগে তার মা বলেছিলেন—

“তুই থাকবি না, গাছটা থাকবে।”

কথাটা সত্যি হচ্ছে।

শুধু গাছটা আগেরটি নয়।

জায়গাটাও আগের নয়।

মানুষগুলোও নয়।

তবু কোনো অদৃশ্য ধারাবাহিকতায় সবকিছু যেন একই।

মাধবী পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

—কী ভাবছিস?

—মা ঠিকই বলেছিল।

—কী?

—কিছু কিছু গাছ মানুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে।

মাধবী হেসে বলল,

—সব গাছ নয়।

—তাহলে?

—যাদের কেউ মনে রাখে, তারা বেঁচে থাকে।

শশাঙ্ক কিছু বলল না।

ফেরার আগে সে একবার নদীর ধারে গেল।

সন্ধ্যা নামছে।

পশ্চিম আকাশে আলো নিভে আসছে।

নদীর জল ধীরে ধীরে কালো হচ্ছে।

সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

—আমি তোকে দোষ দিয়েছিলাম।

নদী কোনো উত্তর দিল না।

—বাবার জন্য।

নদী চুপ।

—মায়ের জন্যও হয়তো।

চুপ।

—কিন্তু এখন বুঝি, তুই কাউকে রাখিস না। শুধু বয়ে নিয়ে যাস।

বাতাস উঠল।

কাশফুল দুলল।

নদীর ওপর ছোট ছোট ঢেউ।

শশাঙ্কের মনে হল, উত্তর পেয়ে গেছে।

উত্তর শব্দে হয় না সবসময়।

কখনও কখনও জলেই হয়।

নৌকা ছাড়ার সময় মাধবী ঘাটে ছিল।

শশাঙ্ক বলল,

—আবার আসব।

মাধবী বলল,

—জানি।

—এবার তাড়াতাড়ি।

মাধবী হেসে বলল,

—তোর তাড়াতাড়ি যেন আমার তাড়াতাড়ির সঙ্গে মেলে।

শশাঙ্কও হাসল।

নৌকা ছেড়ে দিল।

মাধবী ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।

চরও।

পাঠশালা।

নিমগাছ।

সব।

কিন্তু এবার শশাঙ্কের মনে হল না, সে চলে যাচ্ছে।

কারণ সে জানে—

যেখানে ফিরে আসার পথ থাকে, সেখান থেকে মানুষ কখনও পুরোপুরি চলে যায় না।

ভোরের আগে নদীর যে গন্ধ, সেটা শশাঙ্ক এখন শহরেও চিনতে পারে।

কেউ তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলতে পারে না, গন্ধটা কোথা থেকে আসে।

হয়তো কাদা থেকে।

হয়তো নোনা ঘাস থেকে।

হয়তো বহুদিনের শুকনো মাছের গন্ধে।

হয়তো মানুষের স্মৃতি থেকে।

সে শুধু জানে—

সেই গন্ধ এলেই তার মনে হয়, কোথাও একটা চর জেগে উঠছে।

কোনো পুরনো ঘাটে একটা নৌকা বাঁধা।

একজন মা দরজায় দাঁড়িয়ে।

একজন বাবা বৈঠা হাতে।

একজন মেয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে।

একজন কিশোর বাসের জানালা দিয়ে হাত নাড়ছে।

সে বলছে—

“আমি ফিরব।”

কেউ তাকে থামায় না।

কেউ তাকে ধরে রাখে না।

জীবন তাকে নিয়ে যায়।

বছর যায়।

মানুষ বদলে যায়।

বাড়ি ভাঙে।

গাছ মরে।

নদী পথ বদলায়।

তবু কোনো এক অদৃশ্য জায়গায় সেই কথাটা থেকে যায়।

ফিরব।

হয়তো মানুষ সব প্রতিশ্রুতি সময়মতো রাখতে পারে না।

কিছু প্রতিশ্রুতির জন্য তাকে অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হয়।

কিছু মানুষ অপেক্ষা করতে করতে অপেক্ষার অর্থ বদলে দেয়।

কিছু মৃত্যু মানুষকে শেষ করে না—বরং তাকে অন্যরকম করে বাঁচতে শেখায়।

আর কিছু নদী—

তারা ঘর ভাঙে।

মানুষের জমি কেড়ে নেয়।

শৈশব মুছে দেয়।

তবু তাদের বুকের ভেতর কোথাও একটা অদৃশ্য ঘাট রেখে দেয়।

সেখানে ফিরে এসে মানুষ একদিন নিজের কাছে দাঁড়াতে পারে।

শশাঙ্ক দাঁড়িয়েছিল।

পঁচিশ বছর পরে।

খালি হাতে নয়।

সঙ্গে ছিল মায়ের স্মৃতি, বাবার অসমাপ্ত কথা, মাধবীর একটি পুরনো চিঠি, আর নিজের জীবনের দীর্ঘ অপরাধবোধ।

নদী তার কোনোটা ফেরত নেয়নি।

বরং সবকিছুকে একসঙ্গে রেখে দিয়েছে।

যেন বলেছে—

তুই যা হারিয়েছিস, তার সব আমি ফিরিয়ে দিতে পারব না।

কিন্তু যা থেকে তুই মানুষ হতে পারিস, তা রেখে দিয়েছি।

সেদিন শশাঙ্ক বুঝেছিল—

নদীর কাছে সে তার শৈশব রেখে এসেছিল।

মা রেখে এসেছিল।

বাবা রেখে এসেছিল।

একটি অসমাপ্ত ভালোবাসা রেখে এসেছিল।

কিন্তু নদী তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে অন্য কিছু।

নিজের কাছে ফিরে আসার পথ।

আর সেই পথের শুরু ভোরের আগে—

যখন নদীর বুক থেকে কাদামাটির গন্ধ ওঠে,

আকাশে আলো ফোটার আগেই,

আর দূরে কোথাও বৈঠার শব্দ শোনা যায়—

ছপ।

ছপ।

ছপ।

তারপর আলো।

শুধু আলো।

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।