প্রজন্মভরা বিচ্ছিন্নতা

ফারুক ওয়াসিফ

এক অন্তহীন ধারার মতো মানুষ তার পরের মানুষের কাছে এসে দাঁড়ায়। উত্তর-মানুষ তাঁর পূর্ব-মানুষের হাত ধ’রে জগত-সংসারে প্রবেশ করে। তার এই প্রবেশকে চিনতে গিয়েই ‘প্রজন্ম’ নামক ধারণার নির্মাণ হ’য়েছে। এ-এক সমাপ্তিহীন রিলে-রেস। যেখানে দৌড়ের নির্দিষ্ট সীমা পেরিয়ে একদল অপেক্ষমান পরের দলের কাছে তার ব’য়ে আনা কাঠিটি ধরিয়ে দেয়, এভাবে সেও যায় তার পরের দলের কাছে। তার হাতে ধরা ওই কাঠি বা কাঠ-খন্ডটির গায়ে জমা থাকে পূর্বসূরীর যা কিছু অর্জন তার সব। থাকে তার অভিজ্ঞতা, তার মনীষা, তার অতিক্রমণের ক্লান্তি এবং প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশা। ছেদহীন এই দৌড়ে বয়স হারিয়ে মানুষ সভ্যতার ভান্ডারে, সংস্কৃতির মানসলোকে একটি সময়ের সারাৎসার বহন করে এনে সংরক্ষণের নিমিত্তে তুলে দেয়। অবশ্য অনেক কিছুকে খেয়ে নেয় সময়, নরম মাটির দাগের মতো অনেক কিছু মুছেও যায়। যা থাকে- তাতেই ইতিহাস বেঁচে থাকে। সময়ের সাথে সাথে যারা সেই সময়কে বোধ করে সেই মানুষও এগোয়। এরকম ঘটাই নিয়ম। তাই একেই স্বাভাবিকতা ব’লে মানি।

কিন্তু কখনও এমন হয়। ছেদ আসে। পূর্ববর্তীদের অর্জন পরবর্তীরা পায় না। উত্তরাধিকার হাতে এসে পৌঁছোয় না। যারা সেই দায়িত্বে ছিলো তারা চেতনার ভুলভুলাইয়ার ফাঁদে কিংবা ইতিহাসের অনিবার্য বিপত্তির কবলে পড়ে লোপাট হ’য়ে যায়। কখনো দূর্বল চিন্তাজাত দূর্বল উদ্যম যাত্রাপথের মাঝামাঝিই নিঃশেষ হ’য়ে গিয়ে গন্তব্যের অনেক পূর্বেই ব’সে পড়ে। অথচ অন্যপ্রান্তে একদল প্রতীক্ষারত মানুষ উন্মূখ হ’য়ে অপেক্ষা করছে। তাদের রসদ, তাদের পথের দিশা, তাদের দুর্দম নিশানবাহীরা তাদের প্রস্তুত ক’রে দেবে ব’লে তারা অপেক্ষা করে- ইতিহাসের প্রতিভূ হ’য়ে তারা প্রতীক্ষা করে। তারপর ব’সে পড়ে। এক সময়হীনতার মধ্যে তারা ডুবে যায়। কেননা কেউ এসে বলে না- ‘‘এনেছি আমার সময় বাকী সব সময়ের কাছে।’’ এরা দূর্ভাগা, ইতিহাসের অপকি্লষ্ট সন্তান। এদের কোন পূর্বাপর নেই- শুধু আছে বর্তমান। প্রবল- একা ভরসাহীন বর্তমান। অভিজ্ঞতার রসদহীন অসংখ্য প্ররোচনায় অলঙ্কৃত বিদ্যমান। পেছনে তাকিয়ে এরা কিছুই দেখে না। সামনের পথের জন্য এদের হাতে কোন আলোকবর্তিকা নেই।

আমাদের দেশে আমাদের কালে আজকে যাদের বয়স বিশ থেকে তিরিশের মধ্যে, তাদের অবস্থা কী? আমাদের নিকট ইতিহাসে কোন আশাপ্রদ ঘটনা নেই। কেমন ছিলো পিছনের ঢেউগুলো? মুক্তিযুদ্ধ ছিল। তার উদ্ভাসনে একসময় অনেক কোটি মুখ রক্তাক্ত আভা নিয়েও জ্বলে উঠেছিলো। জনগণের ইচ্ছাশক্তি একটি উন্নত জীবনের জন্য একীভূত হ’য়ে শত্রুকে আঘাত হেনেছিল। কিন্তু তারপর? আমরা জিতেছি। কীসের উপর সেই বিজয় স্থাপিত হ’য়েছে? পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামো এখনো অটুট। জনগণের প্রতিটি শত্রু আজও অক্ষয়। কারণ দূরত্ব ছিল। যুদ্ধের আগের যে প্রস্তুতি, মতাদর্শিক প্রস্তুতি ছিল কী? বুদ্ধিজীবী-নেতাদের স্বার্থপ্রসূত আকাঙ্ক্ষার সাথে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বাঁচার চেষ্টার মধ্যে দূরত্ব ছিল। সে কারণে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্কের এখনো অবসান হয়নি। বিতর্ক আছে, অথচ অনুসন্ধান নেই- আত্মজিজ্ঞাসা নেই। কেননা পেছনের লোকেরা আমাদের জানায়নি, কোথায় আমাদের ঠিকানা। তিরিশ লক্ষ মানুষ মারা গেল, নয় মাসে। তার পরের চার বছরে আরো তিরিশ হাজার তরুণ বিপ্লবীকে নিখোঁজ ক’রে দেয়া হ’লো। তারা তাদের সময়কে নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দিতে পারলো না। রেসের কাঠি নিয়ে মাঝপথেই মুখ-থুবরে পড়ে গেলো। আজকের তরুণ তাই একাত্তরকে শক্ত ক’রে ধ’রতে পারে না। একটি সময়- একটি যুগ আজকের তরুণের কাছে তাই নিরেট অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখায় না। শুধু চিন্তাগত মৃত্যু নয়; যারা ম’রে গেল তাদের শারীরিক অনুপস্থিতি অনেক পরিবারে, অনেক শিশুদের জন্যই অবলম্বনহীন ভবিষ্যত নিয়ে এলো। তারা পূর্ব-মানুষের হাত ধ’রে হাঁটতে শিখলো না। নিজের মতো ক’রে চলতে গিয়ে এলোমেলো পায়ে কেবলই বিশৃঙ্খলা বাড়ালো।

অন্যদিকে নতুন মধ্যবিত্ত নগরবাসী হ’তে গিয়ে গ্রামের আলপথ-খাল-বিল হ’য়ে যেভাবে উঁচু সড়ক ধ’রে শহরে এসে ঢুকলো তাতে ভবিতব্য পরিষ্কার হলো বটে, কিন্তু পেছনের পথের কোন চিহ্ন সে রাখলো না। গ্রামজীবনের অভিজ্ঞতাকে অবজ্ঞা ক’রেই সে আধুনিক হ’লো, মানে হীনদৃষ্টি-তৃপ্তিযোগবাদী জীবনেই জীবনের পরমার্থ সন্ধান করলো। এভাবে শারীরিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে আমাদের ইতিহাস অসংখ্য ছেদ আর খাদে ভ’রে গেল। একটি যুগ পরবর্তী যুগের কাছে আসবার আগেই শেষ হ’য়ে গেল। অনেক স্রোতস্বী যেমন মোহনায় পৌঁছবার আগেই মরুর বালিতে মুখ গুঁজে মরে। তাহলে কী ক’রবো আমরা? যে ডাক আমাদের কাছে এসে পৌঁছোয় নি, যে হাত আমাদের ছুঁতে পারছে না, তার কাছে যাব? নাকি ভূত-ভবিষ্যতহীন বিকট হতাশাজনক বর্তমানকেই পুঁজি করে দিনের রসদ দিনেই শেষ করবো? কাজ তাই পেছনের পথ নির্মাণ ক’রে ক’রে বর্তমানের সাথে মেলানো। যে অভিজ্ঞতা তার মানুষদের সাথে সাথেই লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, সেই অভিজ্ঞতার সারসংকলন করে নিজেদের জীবনের কোথায় তার রেখাপাত আর কোথায় সংক্রমণ তা সনাক্ত করা। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একেই বোধহয় ‘‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’’ ব’লে দেখিয়েছেন। কাজ সেই সেতু জোড়া লাগানো। পথের মাঝখানে যারা প’ড়ে আছে, তাদের হাত থেকে তাদের সংকেত তুলে নিয়ে আসা। তারা যখন আসেনি তখন তাদের কাছে যেতে তো হবেই।

শুধু চিন্তাগত মৃত্যু নয়; যারা ম’রে গেল তাদের শারীরিক অনুপস্থিতি অনেক পরিবারে, অনেক শিশুদের জন্যই অবলম্বনহীন ভবিষ্যত নিয়ে এলো। তারা পূর্ব-মানুষের হাত ধ’রে হাঁটতে শিখলো না। নিজের মতো ক’রে চলতে গিয়ে এলোমেলো পায়ে কেবলই বিশৃঙ্খলা বাড়ালো।

এই সংকট বৈশ্বিক। ইতিহাসে এরকম অবসাদ বারবারই এসেছে। দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধে য়ুরোপে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। লক্ষ লক্ষ অনাথ, বিধবা আর আহত মানুষেরা নিজেদেরকে হঠাৎ এক শূন্যতার মধ্যে আবিষ্কার করেছিল। দেখা দিয়েছিল আত্মপরিচয়ের সংকট। এই সংকট থেকেই লেখা হয়েছিল আলবেয়ার কাম্যুর শেষ উপন্যাস, দ্য ফার্স্ট ম্যান- প্রথম পুরুষ। বিশ্বযুদ্ধোত্তর সেই পরিবেশে একটি শিশুর প্রথম আত্মোপলব্ধিই হ’লো-তার কোন পূর্বসূরী নেই। তার সময়ে সেই- প্রথম পুরুষ, প্রথম নারী। স্বর্গ থেকে বিচু্যত হ’য়ে আদম এবং হাওয়াও বোধ হয় এমনই বোধ করেছিলেন। কাম্যু’র সেই অসমাপ্ত উপন্যাস তার নিজেরও অসমাপ্ত জীবনী। যেখানে যুদ্ধের অনেক বছর পর যখন তার বয়স চল্লিশ তখন সে তার পিতার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে বিহ্বল হয়ে পড়ে।

তার হঠাৎ করুণা হয় এই ভেবে যে, কবরে যে লোকটি শুয়ে আছে সে তার পিতা হলেও তার বয়স তার চেয়ে কম। এ-এক নির্মম পরিস্থিতি। যখন পিতার জীবৎকাল সন্তানের তারুন্যের চেয়ে কম। আমাদের ইতিহাসও আমাদের এমনই উপলব্ধির দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। আমাদের অতীত যেন আমাদের চেয়ে খাটো। কেননা আমরা অতীত সম্পর্কে বিস্মরিত হয়েছি। আমাদের ভবিষ্যত আমাদের চেয়েও হ্রস্ব। কেননা সামনের পথে আমাদের চোখ চলে না। তখন কী কারো এমন মনে হ’তে পারে না যে, তার অস্তিত্ব ইতিহাসের দিগন্তে মৃদুমন্দ দীপশিখার মতো শংকিত? পুরো জগতের দিকে, আকাশের কালপুরুষের দিকে তাকিয়ে সে হয়তো তখন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতেই পারে-

”এতো যদি ব্যুহ চক্র তীর তীরন্দাজ, তবে কেন

শরীর দিয়েছ শুধু, বর্মখানি গেছ ভুলে দিতে।”

২ বর্ষ. ৪ সংখ্যা. আষাঢ় ১৪০৮. জুন ২০০১

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।