ফেব্রুয়ারি ৬, ২০০৪ | জাভেদ হুসেন, প্রবন্ধ | ০ টি মন্তব্য

নৈতিক বিচারের ভিত্তিঃ একটি মার্কসীয় পর্যালোচনা

জাভেদ হুসেন


[প্রবন্ধটি রচিত হয়েছে ১৯৯৭ খৃষ্টিয় সনের মাঝামাঝি, বর্তমান পর্যন্ত এতে পরিমার্জন বা সংযোজনের কোন অবকাশ হয়নি। তার বহুল কারন বিষয়টির সঙ্গে লেখকের চিন্তার ভিন্নতা। এই ভিন্নতা বর্তমান প্রবন্ধের মূল তাকতের সঙ্গে ঝগড়া নয়, বরং বাতচিতের ব্যাপার। কিছু ব্যাপারকে এখানে মোটা দাগে সরলীকরণ করা হয়েছে। এখন এই বিষয়ে পুনরায় কলম ধরলে লেখক এত জনের সালিশ মানবেন না। যা বলা হয়েছে এই লেখায় তার কোন কথা লেখক অস্বীকার করেন না। শুধু তাকে উপস্থাপনে বা বুুদ্ধির দরবারে আরো ভিন্ন ভাবে শিখিয়ে পড়িয়ে হাজির করবার চেষ্টা জারি থাকতো। ও, আরেকটা ব্যাপার, এখানে শুধু সাহেব দর্শন নিয়েই কচলানো হয়েছে; রচনা কালে প্রবন্ধকার নিজেদের মরম বুঝ-পরামর্শ করে সেরে উঠতে পারেননি। নিজেদের মানে প্রাচ্য তথা বাঙ্গালাভাষী দর্শন চর্চার উত্তরাধিকার। পাঠক, কথাটা চিন্তায় রেখে পাঠ করলে ফায়দা হতে পারে।]


মানুষের চিন্তারাজ্যের পরিবর্তনশীলতা অত্যন্ত বৈচিত্রময় হওয়া সতে্বও একটি ব্যাপার স্থির থেকে গেছে- মানুষ নৈতিক জীব। যখন থেকে মানুষ নিজেকে চিন্তা সক্ষম জীব বলে চিনতে পারল, সেই মুহূর্ত থেকে তার চিন্তাশীলতা তাকে সমস্ত কর্মকান্ডের সঙ্গে ভাল মন্দ, শুভ অশুভ নামক বোধের সঙ্গেও পরিচিত করলো। মানুষ যা হয় তাতেই সন্তুষ্ট থাকলে আর আলোচনার অবকাশ থাকতো না। কিন্তু সে তার আগেই আরেকটি ছবি আঁকে- সে কী চাইতো। আর সেই হওয়া আর হতে চাওয়ার আনুসাঙ্গিক বিশ্লেষণ বলে যা ভাবা হয় তা হলো তার সাপেক্ষে সমস্ত কিছুকে বিচার করা। এই তীক্ষ্ণ বৈশিষ্ট এত প্রখর যে, বিভিন্ন কালে তা মানুষের মাঝে মানবোত্তর বৈশিষ্টের সম্ভাবনার কথা ভাবিয়েছে। তবে আজকের যুগে তা অতিরঞ্জন ভাবতে হবে কারন তা মানুষের আপন নীতি নিয়ম আর সামাজিক জীবনের মধ্যে দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। মানুষ- ভয়, আশা আর বাসনা যার চরিত্র, সে বাস করে এমন এক জগতে যা তার আশাকে হতাশায় বদলে দেয়, সে দেখে চারদিকে সন্দেহ আর অনিশ্চয়তা, যা তার পরিকল্পনাকে পূর্ণও করতে পারে চূর্নও করতে পারে।

ভাল মন্দের বিচার, জীবন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়েছে বিভিন্নকালে, বিভিন্ন সমাজে; আবার একই সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে এর সম্পর্কে রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। তার জন্য চিন্তারাজ্যের ইতিহাস ঘাটতে যাওয়া হচ্ছে না, তার চাইতে চারপাশ থেকে বোঝার চেষ্টা করা যাক কি করে মানুষ ভাল মন্দ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছয়। যদি প্রশ্ন করা যায় কেন চুুরি করা বা মিথ্যে বলা উচিত নয় তাহলে বিভিন্ন প্রকারের উত্তর পাওয়া যাবে। কেউ বলবে কাজটা ভুল, কেউ বলবে আমাদের অন্তরাত্মা এই কাজে সমর্থন দেয় না। এগুলো পাশ কাটানো, উত্তর নয়। কারন প্রশ্নটা হলো, কেন এই কাজগুলো ভুল, কেন আমাদের অন্তরাত্মা এতে সায় দেয় না? অন্য কেউ বলবে, কারন এটা ঝুুঁকিপূর্ণ। আবার কেউ বলবে এটা ঈশ্বরের বারণ, তার ইচ্ছাতেই সব হয়। এরকমও জবাব আসতে পারে যে শেষ পর্যন্ত এসব মনের শান্তি নষ্ট করে। আরেকটু বেড়ে গিয়ে কেউ বলবে, এসব কাজের ফলে সমাজের স্বাভাবিক গতি নষ্ট হয়। আর তাই এসব কাজ খারাপ, আরো অনেক উত্তর আসতে পারে তবে তা ঘুরে ফিরে এই রকম কিছুই বলবে।

মানুষ প্রতিনিয়তই এই ভালমন্দ তথা নৈতিকতার ব্যবহার করে; যদিও পুরনো ধ্যান-ধারনাতে একে নৈতিকতার মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখে নীতির মধ্যমে, অস্বীকার করে জীবনের বিরাট প্রেক্ষাপটকে। ফরাসী এনসাইক্লোপেডিষ্ট হেলভেটিয়াস যেমন বলেন- ‘নৈতিকতা নেহাতই অর্থহীন যদি না সে রাজনীতি আর প্রশাসনে সম্পৃক্ত হয়।’ যেমন দাম্পত্য বিশ্বাসবোধ- চিরায়ত নৈতিকতায় একে নিয়ে প্রচুর তুরুকবাজী হয়েছে মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক জীবনকে আড়াল করে। কিন্তু সামগ্রীক বিচারে এই সামগ্রীকতার বাইরে এইসব প্রশ্নের কোন উত্তর পাওয়া যাবে না। এর একটা কারন হলো, বিশেষ কোন আলোড়ন ছাড়া এই নৈতিকতা আধিপত্যকারী শ্রেণীর দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত যারা একে নেহাৎ ব্যক্তির সদ্‌গুন বলে চালাতে পারলেই তৃপ্ত হয়। এই সীমাবদ্ধতা বজায় থাকার ফলে সমাজকে আর বিশ্লেষণ করতে হতো না, যা করলে মানুষের নৈতিকতার অস্ত্রোপচার এর পথ ধরে তাদের অর্থাৎ জনগোষ্টির নিতান্ত বস্তুতান্ত্রিক প্রয়োজন তা পাওয়া না পাওয়ারও প্রশ্ন উঠে আসতো। যে কারনে ভীত হয় ব্রেখটের গ্যালিলিও নাটকের পুরুত। আজ যদি সব হাভাতেরা ভাবে সূর্য ঘোরে না, পৃথিবী ঘোরে- তবে কাল তারাই প্রশ্ন করবে কেন সবকিছু আমরা করার পরও আমাদের পেটে খাবার নেই?

নৈতিক বিচারের ভিত্তি কি, এই প্রশ্নে ফিরে আসা যাক। একেবারেই মৌলিক নৈতিক তত্ত্ব বিচার করবার আগে আরও কিছু সমস্যা পরীক্ষা করা যেতে পারে। আমরা কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করি গণতন্ত্র কেন ভাল বা খারাপ, তাহলে আগের প্রশ্নটির মতই বিভিন্ন উত্তর পাবো। গণতন্ত্র কেন ভালো এর পক্ষে জবাব আসতে পারে- কারণ জনগণের কণ্ঠস্বরই ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর অথবা এতে ব্যক্তির মতের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন হয়, এমনও উত্তর আসবে যে এতে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতে পারে। আবার অপর পক্ষে গণতন্ত্র কেন খারাপ তার জবাব আসতে পারে যে, কারণ আরব দেশে এমন কোন ব্যবস্থা ছিল না অথবা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ধীর, জটিল অথবা গণতন্ত্র বরাবরই অশিক্ষিত জন গোষ্ঠীর ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হতে পারে।

উপরের দুই দিকের উত্তর পাশাপাশি সাজানোতে বোঝা গেল প্রত্যেক জবাবের সঙ্গেই একটা নির্দিষ্ট ভালমন্দের বিচারবোধ সম্পৃক্ত। চিরায়ত নৈতিকতা বরাবরই একরকম মৌলিক প্রেক্ষাপটকে অস্বীকার করে। অপরদিকে এটা একেবারেই পরিষ্কার যে শুধমাত্র কিছু এই ধরনের মৌলিক প্রশ্নই নয়, রাজনীতি আর অর্থনীতির সমস্ত সমস্যা আদতে নৈতিক সমস্যা। এই সত্য আজকে আবিষ্কৃত হয়নি, এর কৃতিত্ব দিতে হবে প্লেটো আর এরিষ্টোটলকে। গ্রীক দাস ব্যবস্থায় সমাজের শ্রেণীবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের মনে হয়েছিল যে, প্রত্যেক সামাজিক আর রাজনৈতিক ব্যপারের আগেই তার শুভ অশুভের ধারনা জড়িত থাকে আর এই রাজনীতি পূর্ব পরিকল্পনা করে নেয় একটি নৈতিকতার।

মানুষ যখন কোন কিছু সম্পর্কে ভাল, মন্দ বা উচিত এই সব শব্দ ব্যবহার করে তার সঙ্গে ছোট, বড়, ঠাণ্ডা, গরম এই সব শব্দ ব্যবহার এক করে দেখা যায় না। প্রথম সারির শব্দ ব্যবহারে একটি সাপেক্ষ সম্পৃক্ততা জড়ানো, যার ফলে তার সাথে শুধুমাত্র প্রাথমিক স্তরের ইন্দি্রয় সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়ার চাইতে উচ্চতর কিছু বোঝায়। দ্বিতীয় সারিতে তা ইন্দ্রিয় সংশ্লিষ্টতার স্তরে রয়ে গেছে। নৈতিকতার সমস্ত প্রশ্নের মূল হল কোন ভিত্তিতে মানুষ নির্দিষ্ট বিষয়ের বিচার করে এবং করা উচিত?

এই কথাটি একটি শক্ত নৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে দ্বন্দ্বে নামতে পারে যাতে নৈতিক বাধ্যবাধকতায় মূল বা উৎস খোঁজাকে প্রধান সমস্যা বলে ধরা হয়েছে। এই ধারাতে কান্ট থেকে ক্রপ্টকিন পর্যন্ত নৈতিকতার সমস্যা ছিল- মানুষ নৈতিক আচরন করবে কেন অথবা দায়িত্ববোধ আসে কোথা থেকে? এই প্রশ্ন করার মাঝেই এক গলধ রয়ে গেছে যা বোঝা একবারেই স্বাভাবিক। সাধারণত বিশাল সামাজিক জনগোষ্ঠী কখনই জিজ্ঞাসা করে না, যা তারা ভাল মনে করে তা করবে কিনা অথবা যা তারা খারাপ মনে করে তা থেকে বিরত থাকবে কিনা। কোন কিছুকে ভাল কিংবা মন্দ বলতে বোঝায় তার কাজটি করবে কিংবা করবে না। অথবা তারা তাকেই ভাল বলে যা তারা চায়। তাই প্রশ্নটা এমন নয় যে, কেন আমি ভাল কাজ করব; প্রশ্নটা বরং কী করে ভাল যাঁচাই করব। আরো সংক্ষেপে বললে বলতে হবে- ভাল মানে কী, আর মানুষ কি করে ঠিক করবে, তা কী?

এটা সাধারণ ভাবেই বোঝা যায় মানুষ কী করে ভাল মন্দ বিচার করে বা নৈতিক বাধ্যবাধকতাই নৈতিকশাস্ত্র নয় বরং তা শুধুমাত্র ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব অথবা মনোবিজ্ঞান এর মত কিছু। যদিও প্রসংগগুলো নৈতিকতা বিচারে আবশ্যক তবুও এগুলোই নীতিবিদ্যা নয়। কারন তারা শুধুমাত্র বর্ণনা করে মানুষ কি করে ভাল মন্দ বিবৃত করে। অপর পক্ষে নীতিবিদ্যা বিচার করবে আসলেই শুভ কী আর মানুষ কী করে এই বিচার করবে। চিরায়ত নীতিবিদ উপলব্দি করেন মানুষের নৈতিক পদ্ধতি বর্ণনা করাই যথেষ্ট নয়। সেই সাথে এটাও দেখাতে হবে কী করে তা করা উচিত। মার্কসীয় বিচার পদ্ধতিতে এইসব নৈতিকতত্ত্ব নিজেরাই সামজিক আর ঐতিহাসিক শর্তাবদ্ধ, আর তা প্রতিফলন ঘটায় সেই সব শর্তের যার অধীনে এই তত্ত্বগুলো গড়ে উঠেছিল। কিন্তু মার্কসীয় বিচার পদ্ধতি কি তাহলে কোন নীতিশাস্ত্র তৈরী করতে পারে যা হবে ভালমন্দে বিচারের ভিত্তি আর যা একই সঙ্গে কার্য ও ঘটনাকে বিচার করবে সেই মাপ কাঠিতে?

সংক্ষেপে একেবারেই তাত্ত্বিক সংক্ষিপ্ত যাঁচাইয়ের পথেই এগোনো ঠিক হবে, যার মধ্যে মার্কস-এঙ্গেলস মৌলিক দার্শনিক আর নৈতিক সমস্যা উপস্থাপন করেছেন। দার্শনিক চিন্তা ধারায় ইতিহাস যারা গুলে খাননি, তাদের কাছে এই উপস্থাপন স্বাভাবিক আর যৌক্তিক মনে হবে। কিন্তু পেশাদারী বুদ্ধিজীবীদের কাছে এটা একেবারেই চিরকালীন পথ থেকে এক বেদনাদায়ক সরে যাওয়া। কারন মার্কসীয় পদ্ধতি শুরু করে সেখান থেকে যে, সমস্ত চিন্তার জন্য আসলেই একেবারেই প্রথমে কি? জার্মান ভাবাদর্শতে মার্কস এঙ্গেলস লিখেছেন-

“আমরা কোন স্বেচ্ছাচারী বা অন্ধমতবাদের ক্ষেত্র থেকে শুরু করিনি। শুরু করেছি এমন ক্ষেত্র হতে যা থেকে মূর্তন করা সম্ভব শুধুমাত্র কল্পনায়। তারা প্রকৃত স্বতন্ত্র, তাদের কার্যাবলী ও তারা যে বস্তু শর্তের অধীনে থাকে, উভয়কেই তারা পায় পূর্ব হতেই অস্তিত্বমানভাবে এবং সেগুলো তাদেরই ক্রিয়ায় উদ্ভুত। এভাবেই এই ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করা যায় শুদ্ধ অভিজ্ঞতাবাদী পথ।”

নীতিশাস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে দেখা যাচ্ছে; কোন অতিন্দ্রীয় আদেশ, অন্তরাত্মার নৈতিকতা, এসবের থেকে শুরু না করে শুরু করা হচ্ছে নীরেট সামাজিক জীবন থেকে। আমরা ব্যক্তি বা স্বতন্ত্র মানুষ থেকে শুরু না করে, যাত্রা করছি মানুষের পারস্পরিক বহুমুখী সম্পর্ক এবং তার জীবনে যে বস্তুশর্ত বিদ্যমান প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের সাপেক্ষে- সেখান হতে। এটা আরো বোঝাচ্ছে যে, নীতিশাস্ত্রের সব ভালমন্দের তত্ত্বই প্রকৃত পক্ষে মানুষ থেকেই আসে, তার জীবনের সামগ্রীক জটিলতায় তা যেমন সেভাবে, যা ঐতিহাসিকভাবে শর্তাবদ্ধ কোন নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে। শেষ পর্যন্ত কোন নৈতিক তত্ত্বের বিশ্লেষণ বা যাচাই হবে যে জটিল মানবিক সম্পর্ক ক্ষেত্রসমূহে ঐ তত্ত্ব ক্রিয়াশীল ছিল সেই ক্ষেত্রের সাপেক্ষে।

ঐ একই গ্রন্থে মার্কস এঙ্গেলস ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার মূল অবস্থান বিবৃত করেছেন, খুঁটিনাটি ধরে তা অনৈতিহাসিক এবং ভাববাদী উপস্থাপনের বিপরীতে দাঁড়ায়।

“জার্মান দর্শন- যা উপর থেকে ধরায় অবতীর্ন, তার সঙ্গে সরাসরি বিরোধ করলাম আমরা ধরা থেকে উধের্ব উঠে গিয়ে। বলতে গেলে আমরা তার রক্ত মাংসের শরীরে পৌঁছুতে তার কথা, কল্পনা, ভাবনা বা মানুষ যেভাবে বর্ণনা করে সেভাবে তার পথ ধরে এগোই নি। আমরা যাত্রা শুরু করেছি প্রকৃত ক্রিয়াশীল মানুষ থেকে এবং তাদের প্রকৃত জীবন পদ্ধতিকে ভিত্তি করে প্রদর্শন করেছি তাদের ভাবাদর্শিক প্রতিফলনের ক্রমোন্নতি ও তার জীবন পদ্ধতির প্রতিধ্বনি। মানব মস্তিস্কে যে প্রতিচ্ছায়া গঠিত হয় তা অবধারিতভাবেই তাদের বস্তু জীবন প্রণালীর উধর্বপাতন যা অভিজ্ঞতাগতভাবে বিশ্লেষণ যোগ্য ও বস্তু অঙ্গনে বদ্ধ। নৈতিকতা, ধর্ম, অধিবিদ্যা, বাকি সমস্ত ভাবাদর্শ এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সচেতনতার রূপ এভাবেই আর স্বাধীন হবার প্রতীক রূপে থাকতে পারে না। তাদের কোন ইতিহাস নেই, অগ্রগতি নেই; কিন্তু মানুষ, তাদের বস্তু উৎপাদনের উন্নতি এবং তাদের বস্তু সংশ্রাব্যতায় পরিবর্তিত হয়- তাদের প্রকৃত অস্তিতে্বর সাথে, তাদের চিন্তা এবং তাদের চিন্তার উপজাতত্ত্ব। জীবন চৈতন্যের দ্বারা নির্দিষ্টায়িত হয় না বরং জীবনই চৈতন্য নির্দিষ্ট করে। শুরুতে পৌঁছানোর প্রথম পদ্ধতি হল চৈতন্যকে প্রাণশীল ব্যক্তিসত্ত্বা রূপে বিবেচনা করা; পদ্ধতির দ্বিতীয় স্তর হলো এটি প্রকৃত প্রাণশীল স্বতন্ত্র সত্তা তাদের মাঝেই, যেমন প্রকৃত জীবনে এবং সচেতনতা বিচার্য স্বতন্ত্রভাবে তাদেরই সচেতনতা হিসাবে।”

উদ্ধৃত দুটো অনুচ্ছেদের বোধের ব্যপকতা বিশ্লেষণ উল্লেখ নিস্প্রয়োজন। এবার দু’একটা চলতি দৃষ্টিভঙ্গি পাশাপাশি দাঁড় করানো যাক যা উদ্ধৃতির সঙ্গে একমত পোষন করে না। একজন এমেরিকান ঐতিহাসিক প্রফেসর ফিলিপভ্যান নেস মেয়ারস এক পুস্তক রচনা করলেন। এই কথা প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে যে নৈতিক অগ্রগতি ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রাণতো বটেই, তদোপুরি নৈতিক উদ্দেশ্য মানবতার বিবর্তনে নিজেকে একটি শক্তিশালী নিয়ামক হিসাবে উপস্থাপিত করে। এই রকম একটা অশুভের বোধহীন পথ নির্দেশক পাওয়া খুব আনন্দের ব্যাপা, কিন্তু সমস্যাটা রয়েই গেল। সেই নৈতিক প্রণোদনা আসে কোথা থেকে। এই ধরনের ভাববাদী দার্শনিকায়িত বোধকেই মার্কস-এঙ্গেলস ধ্বংস করতে লড়াইয়ে নেমেছিলেন। যদিও তাঁরা ভালভাবেই জানতেন শ্রেণীবিভক্ত সমাজ যতদিন থাকবে এই প্রবনতা পুরোপুরি বিনাশ লাভ করবে না। এবার আরেকজন প্রোথিতযশা অধ্যাপকের একটা অনুচ্ছেদের প্রসংগ টানা যেতে পারে, প্রফেসর ম্যাকাইভার লিখেছেন:

“অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় পদ্ধতি, মানব সম্পর্কের সমস্ত পদ্ধতিই অস্তিত্বমান শুধুমাত্র সচেতন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। অভিজ্ঞতা সরিয়ে নিলে তার কোন ছাপই থাকবে না। যেমন যান্তি্রক পদ্ধতি, তৎসম্পর্কিত সচেতনতা ছাড়া কোন যন্ত্রও নয় পদ্ধতিও নয়। ইঞ্জিন এবং বন্দুক তখন কিছু কৌতুহল উদ্দীপক আকৃতির ধাতব খণ্ড মাত্র………”

এখানেও একটা ভাববাদী দর্শনকে সমাজ বিজ্ঞানরূপে প্রকাশ করার চেষ্টা দেখতে পাচ্ছি। যার মূল সুর সচেতনতাই অস্তিত্ব নির্দিষ্ট করে। প্রফেসর ম্যাকাইভার আরেকটু সামনে গিয়ে বলেন, সমাজের সামগ্রীকতা বিষয়ীগত, চিন্তার রূপে, পৌরানিকতায়, স্বপ্নের অবয়বে। সংক্ষেপে বলা যায় নীতিশাস্ত্র প্রাথমিক আর মানুষের বাস্তব বস্তুগত সামাজিক জীবন দ্বিতীয় পর্যায়ে। এইভাবে কোন সমাজ বিজ্ঞান তৈরী করা অসম্ভব, যে কোন ভাববাদী দর্শনের প্রকরন যেভাবে নাকোচ করা যায়, এই প্রসঙ্গে তার চাইতে বেশী কিছু বলা নিস্প্রয়োজন। শুধু এটুকু বলা যায় যে, এখানে নিতান্ত বস্তুগত সামাজিক উপাদান যা সমাজের প্রতিটি মানুষ তাদের অভিজ্ঞতাগত চেতনার মাধ্যমে নিতান্ত পরিচিত বলে জানে তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে নৈতিক ধারনাকে অবয়বহীন সচেতনতার ধারনাতীত উৎসারন বলেই প্রকাশ করছে।

এবার মার্কসীয় পদ্ধতিতে নীতিশাস্ত্র সম্পর্কিত একটি রূপরেখা টানা যাক। প্রথমত নীতিশাস্ত্র হল মানবসৃষ্ট, অভাব, বাসনা, আশা, নিরাশার একটি সচেতন প্রতিফলন। আর এই মানুষটি নিরেট বাস্তব সামাজিক মানুষ, দ্বিতীয়ত এই প্রতিফলন সর্বদাই উঠে আসে মানুষের নিরেট বস্তু প্রতিবেশের শর্তাবলীকে প্রথম শর্ত ধরে, মানুষ তার জীবনধারনের জন্য যে উৎপাদন প্রত্রি্কয়া ও পারস্পরিক সম্পর্ক সৃষ্টি করে তা গ্রাহ্য সমান্তরালভাবে। তৃতীয়ত, নৈতিক ধারনা জীবনের বস্তুশর্ত, উৎপাদনশক্তি ও সম্পর্ক পরিবর্তিত হবার সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় এবং কখনই এই নৈতিক ধারনা অর্থনৈতিক স্তরের চাইতে উচ্চতর অবস্থানে উপনীত হতে পারে না (যেমন দাস সমাজে মানব ভ্রাতৃত্ব আর সামন্ত সমাজে ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা ভাবা অর্বাচীনতা)। চতুর্থত, দ্বন্দে লিপ্ত অর্থনৈতিক শ্রেণী বিভক্ত সমাজে নৈতিক অবধারনা বিভিন্ন শ্রেণীর বিভক্তির প্রকাশ, আর তা হয় আধিপত্যের যথার্থতা অথবা এই শ্রেণীর সম্পর্কের পরিবর্তনের দাবীকে উপস্থাপিত করে। পঞ্চমত, অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তনের দাবী এক শ্রেণী হতে অপর শ্রেণীর কাছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবী এবং এই দাবীর নৈতিক যথার্থতা বিচার করতে হবে দাবী উপস্থাপনকারী দ্বিতীয় শ্রেণীর দ্বারা পূর্বকথিত ক্ষমতাদ্বয়ের পরিচালনা আরও সূচারুরূপে হতে পারে কিনা তা দ্বারা। ষষ্ঠত, ভাল, ন্যায়, উচিত, ন্যায় বিচার এই ধরনের ধারনাবলী পূর্বকথিত পরিভাষাগুলোর নিরিখেই হতে হবে। তা নির্ধারিত হবে কোন নির্দিষ্ট সময়, স্থানে মানুষের সমাজের প্রকৃত জীবন অবস্থান দ্বারা আর তার সমস্ত পরিবর্তন সূচীত হবে সমাজ অংশের বৃহৎ বা ক্ষুদ্র অংশের প্রয়োজন বা স্বার্থে। সবশেষে বলা যায় নীতিশাস্ত্র হলো সামাজিক অবভাস। রবিনসন ক্রশোর নির্জন দ্বীপে কোন নীতিশাস্ত্র অর্থহীন। কিছু নীতি ছাড়া সমাজ জীবন অসম্ভব। এই নীতিগুলোতে নির্ধারিত হয় কি করে এক ব্যক্তির সাথে আরেক ব্যক্তি আচরন করবে এবং সাধারণ পরিস্থিতির মোকাবেলা করবে তার সাপেক্ষ বিশেষ। মার্কসীয় বিচার পদ্ধতিতে নীতিশাস্ত্রের উদ্দেশ্য হলো স্বতন্ত্র ব্যক্তির এমন প্রকৃত পরিচয় বের করা, যেখানে তার প্রবণতা, ইচ্ছে এইসব সমাজিক প্রয়োজনের সাপেক্ষ্যে এমন হওয়া যেখানে মানুষ যা করতে চায় তা হবে তাই যা তাদের করা উচিত এবং এর উল্টোটাও।

এবার কিছু ঐতিহাসিক নৈতিকতত্ত্বের সংক্ষিপ্ত একটা পর্যলোচনা করা যাক। এতে মার্কসীয় নৈতিকতত্ত্বের একটি মূল্যায়ন সহজ হবে। আজকের বিশ্ব প্রেক্ষাপটে দেখা যাবে সমগ্র বিশ্ব ক্রমাগত সব আছে এবং কিছুই নেই এই শিবিরে বিভক্ত হয়ে গেছে। এদেরকে আবার কোন নির্দিষ্ট ভূ-ভাগেও বিভক্ত করা যায় না। বিভিন্ন ভূ-খন্ডে একই সমাজে তা বরাবরের মতই বিদ্যমান। লক্ষনীয় এই, এই দুই অংশের পার্থক্য যদি শুধুমাত্র প্রফেসর ম্যাকাইভার কথিত নৈতিকতা প্রধান্যযুক্ত হয় তবে আমাদের বিচার্যের ধারা অনেক সহজ হতো, যার মত অনুসন্ধান গেল হাজার বছর ধরে হয়ে আসছে। যার প্রধান একটি সমাধান হচ্ছে দুই অংশের মাঝে তাদের উত্তম দিক গুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন। এই পথের সবচাইতে ভাল দিক নির্দেশক হচ্ছেন ধর্ম প্রচারক ও তাত্ত্বিকরা। তারা ঈশ্বরের রাজ্যে দরিদ্রের প্রবেশ দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। আর জাগতিক ক্ষেত্রে যীশুর কণ্ঠে বলেন, ‘‘ঈশ্বরকে যা দেবার তা ঈশ্বরকে দাও, সীজারকে যা দেবার সীজারকে দাও।’’ নৈতিকতার সমস্যা সমাধানে আরও সহজ পথ ‘এক জোড়া’- যা ঈশ্বর ও শয়তানের সমন্বয়, শুভ ও অশুভের দ্বান্দিক প্রতিয়মানতার রূপক হিসাবে।

ধর্মীয় বা আধ্যাত্মবাদী নীতিশাস্ত্র যেহেতু ইতিহাসে আধিপত্য বিস্তার করেছে বেশী, তাই কিছু চিরায়ত ধারনার মাঝে দিয়েই পরীক্ষা শুরু করা যাক, পাশ্চাত্য নীতিশাস্ত্রীয় চিন্তা এই ধারার আধিপত্য ছিল, যদিও প্লেটো থেকেই নৈতিকতার ধারনাকে অতিন্দ্রীয়বাদিতার হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা শুরু হয়েছিল।

প্লেটোর একটা তুলনামূলক বেশী বস্তুবাদী সংলাপে, সক্রেতিস সংলাপে রত য়ুথিফ্রো নামক এক যুবকের সাথে। যার বাবা বিচারের সম্মুখীন একজন ভৃত্যকে হত্যার অপরাধে। যুবক এখানে বাবার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহন করেছে। সক্রেতিস প্রথমে যুবকের এই মহৎ গুনের প্রশংসা করলেন। এই প্রশংসার ফাঁদে পড়ে যুবক স্বীকার করলো সে অন্যান্যদের তুলনায় দয়া ও নির্দয়তার মাঝে তফাত করতে জানে। সক্রেতিস এই সম্পর্কিত জ্ঞানের অভাবের কথা স্বীকার করে জানতে চাইলেন দয়া কী? যুবক আবার ফাঁদে পা দিল। উত্তর আসলো দেবতারা যাতে খুশী হন তাই ধার্মিকতা বা ভাল আর তারা যাতে অখুশী হন তাই মন্দ। এবার এই প্রসঙ্গেই সক্রেতিস তার ব্রক্ষাস্ত্র ছুড়লেন, প্রশ্ন করলেন যে কোন কাজ কি এজন্য ভাল যে তা দেবতাদেরকে খুশী করে নাকি তা দেবতাদের খুশী করে কারন তা ভাল? এই প্রশ্ন অতিন্দ্রীয়বাদী নীতিশাস্তে্রর মূলে কুটারাঘাত করে যৌক্তীক বিদ্রোহের সুচনা নির্দেশ করেছে। যদি এমন হয় যে দেবতাদের প্রীত করে বলেই কোন কার্য ভাল হয় তবে ঐ কার্য শুভের পর্যায়ে পড়ে যাওয়া নিতান্তই ঘটনাক্রম আর এতে শুভের বা ভালোর কোন সংজ্ঞাই পাওয়া যায় না। সোজা কথায় শুভকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে আর অতিন্দ্রীয় ধর্ম আবরনের বাইরের বাস্তবগ্রাহ্য যৌক্তিকতা ধারন করতে হবে।

ধর্মতত্ত্ব গেল হাজার কয়েক বছর ধরে ঈশ্বরকে সমস্ত ভালোর আদীকারণ ও উৎস বলে চিহি্কত করার চেষ্টা করে আসছে। কখনো বলা হয়েছে সমস্ত ভালো ঈশ্বরের স্বেচ্ছাচারী অধিকারে সংরক্ষিত, তিনি চাইলেই হত্যাও নির্দোষ হবে অথবা কখনো টমাস একুইনাসের মতো বলা হলো যে ঈশ্বরই সমগ্র শুভ, যার ফলে তিনি অন্যায়কে ন্যায় বলে ইচ্ছা করতে পারেন না, কারন তাহলে তার মধ্যে পরস্পর বিরোধীতা সৃষ্টি করবে। প্রথম ক্ষেত্রে ভাল-মন্দের কোন স্থিরতা ধার্য করা যায় না, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ঈশ্বর স্বয়ং শুভত্বের শৃংখলে আবদ্ধ।

অতিন্দ্রীয় নৈতিকতাবাদীদের আরো দুইটি মত আছে যা আজো নির্দিষ্টায়ীত নয়। প্রথমটি হলো ঈশ্বর ছাড়া কোন ভাল-মন্দ বা ন্যায়-অন্যায়ের অস্তিত্ব থাকবে না। অপরটি হলো ঈশ্বর বিশ্বাস ছাড়া আমরা কোন নৈতিক যাচাইয়েই যেতে পারব না। দুটো ধারানাই একে অপর থেকে অনেক দূরে দাঁড়ানো, প্রথম ধারনাটি পরিষ্কার বলছে যে, ভাল ও মন্দের মাঝে স্পষ্ট ব্যাপক ব্যবধান আছে, এখানে অন্তঃত ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসের ফাঁকটুকু পাওয়া যায়। অপরদিকে একটা পুরনো ধারনা আছে যে, মানুষ স্বভাবগত ভাবেই অশুভ, শুধুমাত্র কোন ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপই তার মাঝে শুভত্বের বীজ প্রবিষ্ট হতে পারে। কিন্তু এখানে ঈশ্বরকে যাত্রা বিন্দু বলে গণ্য করা হল আর ভালমন্দের বিচারে মানুষের নিতান্ত বৈষয়িক, ইহজাগতিক প্রয়োজন বা আশা-আকাঙ্ক্ষার কোন সংশ্লিষ্টতাই খুঁজে পাওয়া গেল না। ঈশ্বরে বিশ্বাস ছাড়া কোন ভালমন্দের যাঁচাই সম্ভব কিনা সেই প্রশ্ন অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসী দেশে আলোচিত হয়েছে। এমন কি প্রশ্ন ছিল এমন, ‘নাস্তিকদের সমাজ কী সম্ভব?’ ফরাসী দার্শনিকরা এক্ষেত্রে উচ্চমেধা সম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বতন্ত্র অবস্থান নির্দিষ্ট করেছেন। তবে এক্ষেত্রে স্পিনোজার কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। কথাটি এরকম যে, মানুষ কোন কিছু এজন্য চায় না যে ঐ জিনিসটা ভাল বরং তারা ঐ জিনিসটা চায় বলেই একে ভালো নামে ডাকে। স্পিনোজার কথার সঙ্গে পূর্ব কথিত সক্রেতিসের কথা মিলিয়ে বলা যেতেই পারে যে ভাল মন্দ চিনতে কোন ঐশ্বরিক সনদনামা প্রয়োজন নেই।

ঈশ্বর বিশ্বাস ছেড়ে দিলেই মানুষ জামাকপড় পরা ছেড়ে, খুন রাহাজানি করে জঙ্গলে ফিরে যাবে এরকম মনে করার কোন যৌক্তিক কারন আবিষ্কার করা যায় নি। বাস্তবিক ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশ্বাস সমাজের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন উন্নতির স্তরে, মানব আচরনের সবচাইতে প্রশংসনীয় ও নিন্দনীয় উভয় স্তরেই সহাবস্থান করতে দেখা যায়। আর মতেঁইনের এই কথাটিও অবহেলা করা যায় না, ধর্মযুদ্ধে শুধুমাত্র ঈশ্বরের দোহাইয়ে একশজন সৈনিকও তলোয়ার হাতে নিত কিনা সন্দেহ। ক্রসেডের বৈষয়িক লাভ না থাকলে জেরুজালেম যাত্রা হতো না বা ভারতীয় ধনসম্পত্তির রূপকথা প্রচলিত না থাকলে বখতিয়ার খলজীদের হাত ধরে ইসলাম ভারতবর্ষে আসতে আরও বেশী সময় লাগতো। ধার্মিকদের কাছ থেকে আবার অভিযোগ আসতে পারে যে ধর্মকে সঠিকবাবে প্রয়োগ করা হয়নি তাই এত হানাহানি, নৈরাজ্য। যদি প্রশ্ন আসে কেন সঠিক প্রয়োগ হয় নি? উত্তর আসতে পারে দুরকম, আধ্যত্মবাদী বলবেন সেই কথা- মনুষ স্বভাবতই মন্দ প্রবৃত্তির, আত্মার খোরাকের চাইতে দুনিয়াদারীর প্রতি তার নজর বেশী অথবা আসতে পারে বাস্তববাদী উত্তর- আমাদের সামাজিক অর্থনৈতিক প্রতিবেশ ও প্রনোদনা অন্যসব প্রয়োজনীয়তাকেই বেশী উৎসাহিত করে ধর্মীয় বুলি বা নৈতিক আচরনের চাইতে।

এবার আরেকবার সক্রেতিস আর য়ুথিফ্রোর আলোচনায় ফিরে আসি। এক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে ন্যায়বিচার এবং শুভত্ব মানুষের প্রয়োজনীয়তার মাঝে থেকেই উদ্ভুত একথা প্রতিষ্ঠা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নৈতিকতাকে গ্রীক দেব-দেবীদের হাত থেকে রক্ষা করে তাঁর নিজস্ব ঢংয়ের অতিন্দ্রীয় সার্বিক সত্তার হাতে তুলে দেয়া। কেবল মাত্র এই আলোকেই প্লেটোর সমগ্র নৈতিকতার ঝোঁককে বোঝা যেতে পারে। তিনি চেয়েছিলেন নৈতিকতাকে চিরন্তন বৈচিত্ররূপে প্রতিষ্ঠা করতে। চেয়েছিলেন নৈতিকতাকে তৎকালীন দ্বন্দ্বে অবতীর্ন দেব দেবীদের হাত থেকে রক্ষা করতে, সে দেব-দেবীরা ছিল তৎকালীন সমাজের আন্তঃশ্রেণী দ্বন্দ্বের প্রকাশ। ড. গ্রেগোরী ভ্লাসটস তার “SLAVARY IN PLATOS THOUGHT” রচনায় বেশ ভাল ভাবেই বুঝতে পেরেছেন যে, প্লেটোর নৈতিকতা, মানুষ ও মহাবিশে্বর সম্পর্কিত তার সমগ্র ধারনাই মূলত দাড়িয়ে আছে তৎকালীন গ্রীক সমাজের প্রভূ ও দাস ও তৎসম্পর্কিত জটিল সম্পর্ক সূত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চেতনার অনুসঙ্গ ধরে। প্রফেসর এলবান উইনসপার বলেন যে, ন্যায় বিচার আর শুভত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে প্লেটো যে অতিন্দ্রীয়, ইন্দ্রিয়াতীত ধারনার ধোঁয়াশামায় ভাবজগত নির্মান করেছেন তা মূলত তার কালের একজন এথেনসীয় ভূমি অধিকারী পুরাতন শ্রেণীর ভদ্রলোকের আক্ষেপ, বানিজ্য আর হস্তকর্ম দক্ষ অংশের মৈত্রীর বিরুদ্ধে।

যারাই নৈতিকতাকে কোন উচ্চ অধিবিদ্যক সূত্রে প্রতিস্থাপিত দেখতে চেয়েছে তাদের প্রত্যেকের সম্পর্কেই উপরোক্ত কথাগুলো বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রযোজ্য। আর এই কথাটাও মনে রাখতে হবে যে, ভাববাদী দর্শনের আত্মা প্রথম তারপর বস্তু এই কথার চাইতে নৈতিকতার ক্ষেত্রে ঈশ্বর বলেন বা ঈশ্বর আদেশ করেন ধরনের কথা বলা অনেক কেতা দুরস্ত আর সাধারণের মাঝে তার কার্যকারীতা ও বেশী।

সমস্ত ভাববাদী নৈতিক পদ্ধতির মাঝে ইমনুয়েল কান্টের পদ্ধতিই সবচাইতে সফল আর পরবর্তীতে ছাপ ফেলেছে তাঁর পদ্ধতিই বেশী রকম। কান্ট বেঁচেছিলেন তখনও সামন্তবাদী পূর্ব প্রুসিয়ায় অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে। দেখেছিলেন ইংলেন্ডের তথাকথিত শিল্প বিপ্লব আর ফ্রান্সের ফরাসী বিপ্লবে বুর্জোয়াদের ক্ষমতারোহন। তিনিও দৃঢ়ভাবে পবিত্র ব্যক্তি অধিকার আর অন্যান্য বুর্জোয়া নৈতিক নীতি প্রয়োগ করতে পারতেন। কিন্তু এই ব্যপার গুলো তাকে তত্ত্বের মাঝেই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে কারন প্রুসিয়ায় তখন কোন বিপ্লবী মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরী হয় নি। তিনি যার ফলে থেকে গেছেন কেবলমাত্র চিরন্তন নৈতিক আইনের অবয়বেই। কান্ট ভাবতেন তাঁর নৈতিক সূত্রগুলো এতই মৌলিক যে, সেগুলো শুধুমাত্র মানব সমাজ নয় যেকোন যুক্তি বোধ সম্পন্ন প্রাণীর ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যেতে পারে। তাঁর এই বিশ্বাসের কারন ছিল, তিনি মনে করতেন তাঁর সূত্রগুলো ছিল স্বয়ং যুক্তিবুদ্ধির সূত্র, তাই যে কোন যৌক্তিক ক্ষেত্রের নিয়ম। এভাবেই সময়, ক্ষেত্র এইগুলো নৈতিকতার নিয়ামক হিসাবে কান্টের পদ্ধতিতেও স্থান পেল না। তাঁর পদ্ধতি সমস্ত শর্তের উধের্ব, এমনকি মানুষও তার নীচে অবস্থান করে। আর কান্ট পবিত্র বিস্ময়ে বলেন, ‘তারকাময় আকাশ আমাদের উপরে আর আমাদের মাঝে নৈতিক আইন।’

কান্ট বিশ্বাস করতেন, প্রত্যেক যুক্তিবোধ সম্পন্ন প্রাণীই এই নৈতিক নীতি নিয়ে চলে। এভাবে একই সময়ে এই পদ্ধতি মানুষকে দিল মহাবিশ্ব, আরোহী বিশ্ব ও সময় এবং শুভত্ব সম্পর্কে প্লেটোনিক পরমভাবের গৌরব আবার তার চাইতে গৌরবময় প্রোটেষ্টান্ট বুর্জোয়া নৈতিকতার পরম সম্পদ। তা সেই মানুষ যত হীন জীবন যাপন করুক না কেন! কান্টের মতে এটা হচ্ছে তাই যা ছাড়া কোন নীতিশাস্ত্র হবে না, হতে পারে না কেননা এটা শর্তহীন দায় (তাঁর ভাষায়, ‘আকারগত অনুজ্ঞা’), সেই অনুজ্ঞা দাবী করে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব, তাতে কতটা মূল্য দিতে হলো তা অর্থহীন। কান্টের এই নৈতিক আইন বলে না ‘কী করতে হবে’, শুধু বলে ‘করতে হবে’। এই অবশ্য পালনের শর্ত আপত্তি করার বিন্দুমাত্র সুযোগও বাকী রাখলো না, যদিও একথা সাধারণ ভাবেই স্বীকার্য আমার কোন দায়িতে্বর প্রতি দায়বদ্ধতার মাঝেই দায়িত্ব শব্দটির অর্থ নিহিত। কান্ট ভাবলেন তিনি সমস্যাটির সমাধান করে ফেলেছেন, একে আমাদেরর মাঝেরই কোন রহস্যময় নৈতিক আইনের আদেশে রূপান্তরিত করে। কিন্ত্ত একটা সন্দেহ রয়েই গেল। তিনি বলেছেন যে আমাদের স্বভাবকে এক আদেশ বলে, আমাদের তাই করা উচিত যা আমাদের করা উচিত। বুর্জোয়াদের জন্য এটা দূর্ভাগ্য বটে তাদের তাত্ত্বিকদের মধ্যে একজন সুখ বা আত্মস্বার্থের মতো পরিভাষা প্রয়োগ না করে, আশ্রয় নিলেন এমন এক কুয়াশাময় অবধারনার যা শুধুমাত্র মানুষ নয় যেকোন বুদ্ধিসম্পন্ন জীব সম্পর্কে প্রযোজ্য। অন্যকথায় কান্টের অভিলাসের বুর্জোয়া সমাজে যদি সুখ এবং স্বতন্তে্রর স্বার্থ মানব আচরনের পথ প্রদর্শক হিসাবে প্রতিস্থাপিত করা না যায় তবে অন্য কোন নীতিই সম্ভবত তার পরিবর্তে দাঁড় করানো যাবে না।

কান্ট মনে করলেন সমস্ত নৈতিক তত্ত্বকেই যে সূত্রে প্রকাশ করা যায় তা হচ্ছে, ‘এমন আচরন করো যাতে তোমার ক্রিয়াদীর প্রকাশ মহাবৈশি্বক তত্ত্বাবধায়নের প্রকাশ হয়।’ আরো সরল করলে মানে দাঁড়ায়, প্রত্যেক ক্ষেত্রে প্রত্যেকের এমন আচরন করা উচিত যাতে সে সেই কার্যকে একই রূপ ক্ষেত্রে সকল মানুষের করনীয় বলে মনে করে। মনে পড়ে সেই আপ্তবাক্য, ‘অন্যের সঙ্গে এমন আচরন করো যা তুমি অন্যের কাছে আশা করো।’ কান্টের এই নীতির এমন প্রভাব পড়েছিল যে, ১৯৫০ সনে একজন জার্মান দার্শনিক হারম্যান কোহেন বললেন, কান্টের নৈতিক নীতিই সমাজতন্ত্রের উদ্‌গাতা।

অবশ্য এই দাবী বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে কারন কান্ট যে সমাজতন্তে্রর স্বপ্নও দেখেননি শুধু তাই নয়, এমনকি এই নীতি মৌলিকভাবে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় শ্রমিক শ্রেণীর যে মনোভাব প্রয়োজন তার সাথে বিরুদ্ধভাবাপন্ন। কান্ট তাকিয়েছিলেন তৎকালীন প্রুশিয়ায় বুর্জোয়াদের ব্যাক্তি সম্পত্তি অধিকার স্থাপন এর দিকে। কান্টের নৈতিক নীতি মনে হয় যেন সমাজ এমনকি প্রকৃতিরও উপরে অবস্থান করে। যা দাবী করে স্বতন্ত্র সত্তার আচরন হবে এমন যেন সমাজ সম্পূর্ণ রূপেই যৌক্তিক, তা সে বাস্তবে যে অবস্থানে যেমনই থাকনা কেন। লেনিনের ‘দল ত্যাগী’ কার্ল কাউটিস্কি তাঁর “ETHICS AND MATERIALIST CONCEPTTION OF HISTORY” গ্রন্থে বলেন যে, সকল সামাজিক ক্ষতই মূলত স্বতন্ত্র ব্যক্তির সৃষ্ট এবং তা নিরাময় করা যেতে পারে কেবলমাত্র ব্যক্তি মানবের স্বতন্ত্র মানোন্নয়নে। ঐতিহাসিকভাবে কান্টের এই মনোভাব অগ্রসরতার চাইতে পশ্চাদপদসরন বলাই শ্রেয়। কারণ ফরাসী বস্তুবাদীরা বিশেষ করে হেলভেটিয়াস, আগোছালো হলেও এমন একটি নৈতিক ধারনার প্রকাশ করেছিলেন যা সমাজের বিষয়ীগত প্রতিষ্ঠানের প্রতি দিক নির্দেশ করে আর যার দাবী, তা এজন্য যৌক্তিক হবে যাতে সমাজের স্বতন্ত্র সত্তা তাদের আপন স্বার্থের পথ ধরে, আপন স্বার্থেই আবশ্যকীয়ভাবে কাজ করবে সামগ্রীক স্বার্থে।

কান্টের আরেকটি নীতি বেশ নজর কেড়েছিলো। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে প্রত্যেক ত্রি্কয়াতেই মানুষকে দেখতে হবে একটি সমাপ্তি হিসাবে আর তা কোনভাবেই শুধুমাত্র সরল মানুষ হিসাবে নয়। কান্ট এক্ষেত্রে যা বললেন তা আদী খ্রীষ্টিয় মতবাদ, ‘যেহেতু প্রত্যেক মানুষই ঈশ্বরের সন্তান তাই সবাই সমান’ এই কথাটিরই পুনরাবৃত্তি। ইতিবাচক দৃষ্টিতে তা তৎকালীন প্রুশীয় সামন্ত ব্যবস্থার প্রতি বিদ্রোহ আর নেতিবাচকভাবে একে বলা যায় বুর্জোয়া দর্শনের যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা মাত্র। অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষেরই কিছু শর্তাবদ্ধ অধিকার এবং দায় আছে। মার্কসীয়রাও এতে পুরোপুরি বিশ্বাস করে এমন সমাজ গড়ে তুলতে চায় যাতে এই মতটিকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিপরীতে দাঁড় করানো যাবে, যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বৃহৎ মানব অংশ উৎপাদনের অন্যান্য উপকরনের মতই একটি উপকরন মাত্র। এবং তা অবশ্যই সম্ভব হবে ব্যক্তি সম্পত্তি মালিকনা উচ্ছেদের  মাধ্যমে এই কার্য উদার নৈতিকদের পক্ষে সম্ভব নয় কারন তারা সর্বোপরি বিশ্বাস রাখে পবিত্র স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বে। যা সেই পুরাতন অংশ ও সমগ্রের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে। এই কথনে প্রত্যেক ভাববাদী দর্শনে যে সমস্যা তা অবশ্যকভাবে  এখানেও বিদ্যমান। এই দর্শনগুলো বরাবরই সমস্যাগুলোকে নিজের মত করে তাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ সমাধান করে, বিদ্যমান ব্যবস্থার অবস্থাকে যৌক্তিক প্রতিপন্ন করে। কিন্ত্তু যেহেতু তারা আধিবদ্যক বিমূর্ততায় শেকড় গেড়ে আছে তাই তাদের পক্ষে কোন ইতিবাচক ব্যাপার সমাজ পরিবর্তনের পথ প্রদর্শক হওয়া সম্ভব নয়। কান্ট যখন বাস্তবক্ষেত্রে তার নীতি প্রয়োগ করেন, আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার বের হয়ে আসে। তিনি একটি উদাহরন দেন: একজন যে কোন একটা প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছে পরিস্থিতির চাপে। ‘অন্য মানুষেরা একই পরিস্থিতিতে যেমন আচরন করবে আমাদেরও সেই আচরন করা উচিত।’ কান্ট এই নীতিটি প্রয়োগ করে বলেন যে, প্রতিজ্ঞাটি ভঙ্গ করা উচিত হবে না। কারন যদি তুলনীয় পরিস্থিতিতে সবাই এই আচরন করা শুরু করে তাহলে, প্রতিজ্ঞাটি অর্থহীন হয়ে যাবে এবং সমাজ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এখানে এটা স্বচ্ছ হয়ে যায় যে, কান্টের নৈতিক নীতির ভিত্তি পাওয়া যাবে তাঁর সমাজ কী হওয়া উচিত -এই ধারনায়, এমন ধারনায় যা নিজস্ব পরিবেশে নির্দিষ্টায়িত; আমাদের ভেতরকার চিরন্তন নীতির দ্বারা নয়। অন্যভাবে বলতে হয়, কান্ট সংক্ষেপে তাই করেছেন যা আমরা সকলে করি। তিনি সুত্রায়িত করেছেন বিদ্যমান পরিস্থিতির ভিত্তিতে একটি সামাজিক ধারনা যা ভালভাবে তার প্রয়োজন ও বাসনা পূরন করেছে। তারপর এটাকেই আমাদের নৈতিক সূত্রের নির্দিষ্টকারী বলে মানা নিয়ে তাঁর যুক্তির ভিত্তি ছিল এই বিশ্বাস যে যদি মানুষ তার সুখের বাসনার দ্বারা চালিত হয় তাহলে তারা প্রত্যেকেই তাদের স্বতন্ত্র পথে এমনভাবে এগোবে যে কোন যৌক্তিক সমাজ হয়ে পড়বে অযৌক্তিক। এটাকে বুর্জোয়া ভাবধারার কোন বৈশিষ্ট বলে প্রশংসা করা যেত কিন্ত্ত বাস্তবতা হচ্ছে কান্টের এই অবধারনার পেছনে হয়তো তার ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের ছাপই বেশী, যা তাকে এই ধারনা যুগিয়েছিল যে মানুষ স্বভাবগতভাবে অন্যায় ঘেষা।

অন্য ভাববাদী নীতিশাস্ত্র আলোচনায় আনা যায় কিন্ত্ত কান্টের ধারাই এই ধরনকে উপস্থাপিত করতে আপাতত যথেষ্ট। এই ধারা মানুষের সমস্ত নৈতিকতার উৎস খোঁজে স্থান কালাতীত কোন প্রচ্ছন্ন ধোঁয়াময় অবস্থানে যেখান থেকে সমস্ত কিছু বিমূর্ত অবয়বে এক হয়ে সমান হয়ে যায়। সেই তাত্ত্বিকতার সব সমস্যাকে ঘোলাটে দৃষ্টিতে সমাধান করে দিতে দেরী হয় না। কিন্তু সব সমস্যা তখনই শুরু হয় যখন তা এই ইট পাথরের জাগতিক মানে এসে দাঁড়ায় সর্ব রোগ হরণের দাবী নিয়ে। সেই আধিবিদ্যক নীতিশাস্ত্র মানব সমস্যায় নিজেকে দেখতে পায় খাপছাড়া আর তারপর ঐশ্বরিকতার দাবীতে নিজের আদলে পাল্টাতে চায় সমাজ। তারপরও প্রশ্ন আসতে পারে বিভিন্ন কালে এই নীতিশাস্ত্রবিদ্‌দের মাঝ থেকে কী করে চিরন্তন কিছু মৌলিক মানবিক সমস্যা বিবেচনায় আসলো! এর উত্তর আসলে এইখানে যে তারা নিজেরাও জানতো না যে তাদের আধিবিদ্যকতারও ছিল একটি সরল নিরেট বস্তুতান্ত্রিক ভিত্তি ও ব্যাখ্যা।

এতক্ষণের আলোচনায় একটি ধারনা পাওয়া যেতে পারে কেন ভাববাদীরা নৈতিকত্ত্বের ক্ষেত্রে এত খুঁটিনাটি ব্যাপার সন্নিবেশিত করা সত্ত্বেও মৌলিকভাবে ব্যার্থ হলো। ‘কী হওয়া উচিত’ জানতে হলে কী নিশ্চিত করা উচিত তা জানাতে তাদের তত্ত্বের মূল্য অপরিসীম। তারপরও তাদের ব্যার্থতার অনুক্রমিক সার সাজানো যাক: ১. তারা মানুষ ও মানুষের জটিল প্রনোদনা, চাহিদা বাসনার (মনো বৈজ্ঞানিক ও সমাজ বৈজ্ঞানিক) বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অবহেলা করেছিলেন। ২. তারা মানব সামাজিক প্রগতির ও নিরেট প্রকৃতির এবং তার বহুমূখী ধারায় নেতৃত্ব, সমাজতত্ত্ব, রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তাকে অবজ্ঞা করেছেন। ৩. প্রকৃত বাস্তব মানুষের প্রকৃত অভাবকে তারা প্রতিস্থাপিত করেছেন কাল্পনিক চাহিদা এবং বিমূর্ত বা আরো সহজভাবে বলা যায় কাল্পনিক মানুষ দিয়ে। ৪. তারা সমাজের উন্নতিকে করেছেন স্বতন্ত্রের উন্নতি বা সংশোধনের উপর, যা হওয়া উচিত ছিল বিষয়গত প্রতিষ্ঠানের সংস্থাপন বা নতুন ছাঁচে সাজানোতে। ৫. চিরন্তন নৈতিক সত্য খোঁজা এবং পাওয়ার দাবীতে তারা একটি নির্দিষ্ট শে্রণীর ধারনাকেই মহিমায়িত করেছেন আর তাকে অক্ষয় করতে চেয়েছেন সমগ্র মানবতার মাঝে। ৬. আর সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, তাঁরা বিকল্পের জন্য ভিত্তি প্রদান করতেন, যেমন মানুষের বাস্তব চাহিদার পূর্ণতায় আতি্মক ভাবালুতায় অনূপান যার অধিকাংশই হচ্ছে ধর্মগ্রন্থীয় মোড়কে। রানী আঁতোয়ানেত এর মত মানুষ চাইছে রুটি ক্ষুধায় কাতর হয়ে আর ভাববাদীরা তাদের সাধেন ঐশ্বরিক কেক সঙ্গে চিরন্তন অক্ষয় ধর্মের জ্যাম।

এই শেষোক্ত চিন্তাতেই ভাববাদের সঙ্গে মার্কসীয় পদ্ধতির সবচাইতে প্রবল দ্বন্দ। মনে হয় এই ধরনের আধ্যাত্মবাদ বা ভাববাদকে নজরে রেখেই মার্ক্স বিস্ময়োক্তি করেছিলেন যে, মানবতার জন্য এর চাইতে বড় শত্রু আর নেই (THE HOLY FAMILY) যখনই কোন ব্যাপক সর্বাত্মক পরিবর্তন আসে তখন আপন স্বার্থ রক্ষায় ভাববাদীদের কিছু বাঁধা শ্লোগান এরকম- ‘ব্যক্তিত্ত্বের পবিত্রতা, জীবনের উচ্চতম মূল্য, ব্যক্তি স্বাধীনতা, চরিত্রের শৃঙ্খলা ও বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি।’ এর প্রত্যেকটা নির্দিষ্ট শর্তে ইতিবাচক শুভত্ব ধারন করতো। এই ধরনের কথাগুলোর জন্য আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা পালন করতে পারে এক সময় আর ঠিক এর পরেই চরম প্রতিক্রিয়াশীল হয়েই যায়। এই ধারনাগুলোর কোন নির্দিষ্ট কোন মূর্ত অবয়ব নেই যা দিয়ে তাদের কোন নির্দিষ্ট সময়ের সমাজ মানব স্বার্থের নিরিখে মূল্যায়িত করা যেতে পারে। যা একটা ভাল জীবন কাটানোর জন্য মানুষের প্রয়োজন সর্বোপরি বস্তু উপাদান, ভাববাদ এর ঝোঁক ‘আত্মত্যাগ’, ‘নিয়মানুবর্তিতা’ এইসব শব্দাবলীর দিকে যার সব চাইতে সফল প্রয়োগ করেছেন হিটলার আর মুসোলিনি।

এব্লেনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল এর কণ্ঠে সাম্রাজ্যবাদীরা ক্রমাগত মর্সিয়া গাইছে। সেই আধুনিক পদ্যকে যদি নিরেট গদ্য করি তাহলে কথাগুলো হবে এমন: স্বাধীনতা মানে মতের ভিন্নতা, এর মানে রাজনৈতিক ভাবে সমানাধিকার। রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষা প্রয়োজন, আমরা কখনই কোন পূর্ণাঙ্গ ও পূর্ণনির্মিত সমাজ পেতে পারি না, তা ভাবাও যাবে না কারন এর মানেই হচ্ছে স্থবিরতা যার অপর নাম মৃত্যু।

কথাগুলোর মাঝখানের কথাগুলো বাদ দিলে, অভিমতটা এমেরিকান দার্শনিক জন ডিউই এর উদ্ধৃতি বলে চালিয়ে দেয়া যেত। আমরা একটা পূর্ণাঙ্গ সমাজ চাই কিন্তু তা পেতে পারি না। আমরা ন্যায় বিচারও চাই তাও হয়তো পাবো না, কারন পূর্ণাঙ্গ সমাজ ও ন্যায় বিচার মূলত একই ভাব প্রকাশ করে। কেন? তাদের মতামতটা সুন্দর ভষার কারিকুরিতে সাজানো মোদ্দা কথাটা আসলে সমাজ এখানেই থেমে থাকবে, পুঁজিবাদই মানব প্রগতির শেষ কথা, এখন মানুষকে এর বিভিন্ন অন্ধিসন্ধিতে ঘুরে মরতে হবে।

আদিকাল থেকে ভাববাদী নীতিশাস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া এগোতে পারেনি। তাঁর বিপরীতে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে আরেকটা নৈতিক মতবাদ। সেই মতবাদ কোন অতিন্দ্রীয় সত্ত্বার কাছে সমাজ জীবনের ভালো-

মন্দের সার্টিফিকেট না চেয়ে, বোঝার চেষ্টা করেছে। স্মরণীয় আগে বলা মার্কসীয় নৈতিক ধারায় তৃতীয় ধাপটি, কোন নৈতিক ধারনাই সেই কালের অর্থনৈতিক স্তরের চাইতে উঁচুতে উঠতে পারে না। যার ফলে আমরা এই ধারনাটিকে চিনতে শিখেছি ভোগবাদী দর্শন বা নৈতিকতা নামে। যার ধারনায় সমস্ত মানবীয় আচরনই উৎসারিত হয় আনন্দ, সুখ এর মাঝ থেকে। মানুষ যা চায় তাই ভালো, এই ধারনাটিকে কাজে লাগিয়ে তারা আচরনের মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে পরিবর্তিত করলো নীতিশাস্ত্রে। সাধারণভাবে একে বস্তুবাদের কাছাকাছি ভাবা যায়, আর দীর্ঘদিন যাবত ভাবা হতো এটাই একমাত্র সম্ভাব্য বস্তুবাদী নৈতিকতা।

এই চিন্তাধারার জনক বলে চিহি্কত করা যায় এরিষ্টপ্পাসকে, যিনি খ্রীষ্টিয় ৫ম থেকে ৪র্থ শতকে বেঁচেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ আনন্দ চায়, তা কোন উপায়ে আসছে তা বিবেচ্য নয় আর তাই আনন্দই হচ্ছে একমাত্র শুভত্ব। সেই সময়ের মাঝেই এই তত্ত্বের কিছু অসংলগ্নতা বের হয়েছিলো। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে চার্বাকদের এই ধারনার কারন অত্যন্ত সুস্পষ্ট। সামগ্রীক শ্রমের বিনিময়ে যখন পাওয়ার খাতা শূন্য তখন ঋণ করে ঘি খাওয়াই হতো একমাত্র যৌক্তিকতা। তবে ভোগবাদে ক্ষেত্রে দেখা গেল যে, আনন্দের স্থায়ীত্ব বড়ই ক্ষুদ্র আর শুধুই আনন্দকে পাওয়ার চেষ্টা পরিনামে বেদনাই বয়ে আনে। তাহলে এই আনন্দ আর বেদনাকে কী করে মেলানো যায়। সাময়িক প্রবল সুখ যার পরেই বেদনা ভাল নাকি মৃদু দীর্ঘস্থায়ী আনন্দ? এই ধরনের প্রশ্নগুলো ভোগবাদের মতাদর্শিক সংকীর্নতা প্রকাশ করলো। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এইসব প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামায় না। স্বাভাবিক ভাবেই এই সব প্রশ্ন ছিলো একটা অলস শে্রণীর যাদের আমোদ আহলাদের পর্যায়ে দর্শন বা নীতিশাস্ত্রও অর্ন্তভূক্ত ছিলো।

এপিকিউরাস তার শুদ্ধ আনন্দ তত্তে্ব এই ভোগবাদী ধারনার সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন আনন্দের চাইতে স্বাধীনতার জন্য যে বেদনা তাই মানুষের কাঙ্খিত শুভত্ব এবং সেটাই মানুষের আচরনের চালক। কোন কষ্টার্জিত আনন্দের চাইতে নিরুদ্বিগ্ন সুখে বাস করা বেশী পছন্দনীয়। এই প্রশান্তির জন্য অনেক আনন্দকেও প্রয়োজনে ত্যাগ করা যেতে পারে। এপিকিউরাস নিজেও তার তত্ত্বের অনুসরনে শান্ত, উদ্বেগহীন ও অপেক্ষাকৃত কৃচ্ছ জীবন যাপন করেছেন, সারাজীবন চষেছেন আপন পতিত জমি।

এরিষ্টপ্পাস এর তত্তে্বর এই সম্প্রসারনে দুটো চোখে পড়ার মত খুঁত ছিলো, যাদেরকে বলা হয়: সমাজিক আনবিকতা ও পলায়নপরতা। সত্যিকারের নৈতিক তত্ত্ব হিসাবে এর প্রধান দিক হতে হতো সাধারণ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পক্ষে প্রয়োগের সম্ভাব্যতা। এটা কি সব মানুষই নিজের মত করে গ্রহন করতে পারত না কি কিছু মানুষ অন্যের অবদানে প্রয়োগ করতে পারত। আমি প্রশান্তি কি করে অর্জন করব যখন আমার পাশের জনই এর অভাবে উদ্বিগ্নতায় ভুগছে? অথবা এটা যদি সর্ব সাধারণের আদর্শ হয় তবে সর্বজনের প্রশান্তি আনতে এক্ষেত্রে ব্যক্তি মানুষের করনীয় কি? যদি ব্যক্তি মানুষের এক্ষেত্রে সর্বজনের স্বার্থে কিছু, উৎসর্গ করতে হয় তাহলে কোন স্বতন্ত্র তার আপন প্রশান্তি বিনষ্ট করবে স্বেচ্ছায় যা কিনা এপিকিউরাসের প্রনোদনা তত্তে্বর সম্পূর্ণ উল্টো। তা নাহলে সামাজিক বাধ্যবাধকতাকে ন্যায় নিরুপিত করতে আরেকটি নৈতিক তত্তে্বর প্রয়োজন হবে। সংক্ষেপে এই তত্ত্ব সমাজকে মনে করে অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন এবং সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র স্বাধীন এককের সমষ্টিমাত্র। আর তাই প্রকৃত বাস্তবতা ও সমাজ জীবনের প্রয়োজনীয়তায় তা অর্থহীন।

এপিকিউরাসের জীবন চিত্রে পলায়নপরতা প্রতীয়মান এবং তা তাঁর তত্ত্ব ও চিন্তা ধারাতেও উঠে এসেছে। মানুষ যে বিশেষ বিশেষ অবস্থানে ঝুঁকি গ্রহন করতে, বৈচিত্রময় তৃপ্তিবোধের জন্য কষ্টকেও স্বীকার করে তা গন্যতায় না আনায় তা মানুষের বৈচিত্রময় প্রেরনাকে ধারন করতে পারে নি। আর তাই মানুষের উদ্দেশ্য নির্ধারনেও হয়েছে ব্যার্থ। যেমন এপিকিউরাস ন্যয় বিচারকে গ্রহনযোগ্যতার প্রকাশ ছাড়া আর কিছু মনে করেন নি- ‘কাউকে ক্ষতি করতে অথবা ক্ষতিগ্রস্থ হতে বাঁধা দেয়া।’ গ্রীসের সেই স্বর্ণযুগের গোধুলীতে অন্যান্য দার্শনিকদের মাঝেও এই ধারনা ছিল বহুল প্রচলিত। যে সমাজের মাঝে শোষন প্রচলিত ও গ্রহনযোগ্য সেই সমাজের জন্য তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক আর আজকের দৃষ্টিতে তা বাকি দুনিয়া গোল্লায় গেলেও নিজের বাগান সাজিয়ে যাওয়ার মত মানসিকতার প্রকাশ। বৃহত্তর গে্রকো রোমান জগতকে এই তত্ত্ব বিশেষ প্রভাবিত বা অনুপ্রানিত করতে পারে নি। তারা খ্রীষ্টিয় মতবাদে পেয়েছিল তাদের জাগতিক আশার প্রকাশ আর পরলোকে ত্রান।

এই আনন্দ দর্শন বহু শতক ঠেলে সরিয়ে রাখা হয়েছিল, আবার তা স্থান পায় রেঁনেসা কালে, পরবর্তী ইংল্যাণ্ডে এবং চূড়ান্ত হয় অষ্টাদশ শতাব্দীর ফ্রান্সে। এই দর্শন আলোচিত হলো ব্যাপকভাবে, কিন্তু বিস্ফোরন্মুখ সামাজিক সমস্যা এবং তার প্রেক্ষিতে মধ্যবিত্ত শে্রণী ও তার বুদ্ধিজীবী অংশের মাঝে ব্যাপক পরিবর্তনের দাবী গোটা ভোগবাদী দৃষ্টি ভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনলো। হেলভেটিয়াস নেতৃত্ব দিলেন। তাঁকে মূল্য দিতে হয়েছিল, তাঁর বই Deli sprit প্যারিসের রাস্তায় কর্তৃপক্ষ পোঁড়ালো প্রকাশের সাথে সাথেই, আর ১৭৫৮ সনে লেখককে বাধ্য করা হলো দেশ ছাড়তে। খুব সম্ভব হেলভেটিয়াস বিশ্বাস করতেন, নিউটন গতিবিজ্ঞানে যা করেছিলেন তিনি মানব আচরনের রহস্য উদ্‌ঘাটনে একই কাজ করেছেন অর্থাৎ সমস্ত মানবিক কার্যের মৌলিক নীতি উদ্ঘাটন। তিনি যেন ভাবতেন মধ্যাকর্ষন শক্তির কারনে সৌরজগৎ যেমন নিয়মে বিন্যাস্ত ঠিক তেমনি মৌলিক মানবিক আচরনের ভিত্তিতে একটি ছন্দময় সমাজ গঠন করা যাবে। এই মৌলিকতত্ত্ব হচ্ছে মানুষ প্রত্যেক ক্ষেত্রে সেই আচরনই করে যাকে সে তার স্বার্থের অনূকুল মনে করে- আত্ম স্বার্থেই হলো সমস্ত আচরনের প্রকৃতির ভিত্তি। কিন্ত্ত মানুষ তার পরিবেশের সৃষ্টি আর যা সে ভাল মনে করে তা প্রকাশিত হয় তার আচরন, ঐতিহ্য আর শিক্ষায়, এখানেই হেলভেটিয়াস তার বৈশিষ্ট প্রকাশ করলেন। তিনি আরো প্রকাশ করলেন যে মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সমান।

কিসে মানুষ আত্মস্বার্থ খুঁজে পায় হেলভেটিয়াস তা বলেননি, বলেছেন কিভাবে তাদের আচরন, অন্যরা যাকে আত্মস্বার্থ বলে ভাবে, তাতে প্রভাব ফেলে। উল্লেখিত গ্রন্থের একটি অনুচ্ছেদে তিনি বলেছেন চমক লাগানো একটি কথা,- যে মানুষ গণস্বার্থে আপন আনন্দ ও আবেগ ত্যাগ করে সেই নৈতিক গুন সম্পন্ন নয়, যেহেতু তা অসম্ভব। বরং যার সবচাইতে দৃঢ় আবেগ এমনভাবে সাধারণ স্বার্থের সাথে নির্দিষ্টায়িত যে প্রায় সর্বদাই প্রয়োজনের স্বার্থেই সেই নৈতিক গুনাবলী সম্পন্ন। সদ্য তরুন ফরাসী বুর্জোয়াদের এই আশাবাদী কণ্ঠস্বর বলেন যে, সমস্তটাই হচ্ছে শিক্ষার সমস্যা। মানুষকে তাদের স্বার্থ নিরুপিত করতে পর্যাপ্ত শিক্ষা দেয়া যায় নি নতুবা, সমাজ সুসংহিত হতো। কথাটা প্রথমদিককার মতো বৈপ্লবিক নয়। হেলভেটিয়াসের মতে শিক্ষা হল সমস্ত প্রভাবক প্রতিবেশ, স্কুল কলেজের সীমার চাইতে যা ব্যাপক। এর মানে সমাজ তার প্রতিষ্ঠানগত অবয়বের মধ্য দিয়েই শেখাবে মানুষের কাংখিত মূল্যবোধ, আগ্রহ, আবেদন। যদি প্রকৃতিগত এই আত্ম স্বার্থ নীতি দ্বারা চালিত হয়ে মানুষেরা এই সামাজিক সংগঠনের সাথে দ্বন্দ্বে অবতীর্ন হয়, তবে তা সেই সংগঠনেরই ত্রুটি। হেলভেটিয়াস ভাবলেন এই দ্বন্দ্বই ঘটেছে অতীতে এখনও বিরাজ করছে বর্তমানে ব্যাপকভাবে। সামাজ প্রশংসা করে সদগুনের আর পুরস্কৃত করে তৎসম্পর্কিত অসৎগুনকে। বর্তমানের প্রতিষ্ঠান আমাদেরকে আমাদের প্বাশর্ববর্তীদের থেকে আমাদের স্বার্থকে পৃথক করতে শেখায় যেখানে আমাদের যৌক্তিক আত্মস্বার্থ শেখায় যে প্রত্যেক স্বতন্ত্রতা সুখে থাকতে পারে শুধুমাত্র আমাদের স্বতন্ত্র স্বার্থের সংহতিতে।

কার্ল মার্কস অষ্টাদশ শতাব্দীর এই ধাপ সম্পর্কে বলেন:

“প্রকৃত শুভত্ব এবং মানুষের সমান বৌদ্ধিক ঋদ্ধি, অভি’তার, আচার এবং শিক্ষার সর্বশক্তিমানতার, বাহি্যক অবস্থার মানুষের উপর প্রভাবের, পরিশ্রমের চুড়ান্ত গুরুত্বে, উপভোগের যথার্থতার সাথে সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয় সম্বন্ধ অবগত হতে বিশেষ নিখুতত্বের প্রয়োজন নেই। যদি মানুষ তার সমস্ত ভাব ও আকার সমস্ত ধারনা পায়, ইন্দ্রিয়ের জগৎ থেকে, এবং তার অভিজ্ঞতা আনে ইন্দ্রিয়ের জগৎ থেকে, এটা বোঝায় যে, অভিজ্ঞতাগত জগত এমন সুসংহত হতে হবে যাতে সে উপস্থাপন করতে পারে সত্যিকারের মানবিক অভিজ্ঞতার সম্পদ।

যদি আলোকিত আত্মস্বার্থ সমস্ত নৈতিকতার নীতি হয়, তার মানে মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থ হতে হবে মানবিক স্বার্থের সমবর্তী। মানুষ যদি বস্তুদৃষ্টিতে মুক্ত না হয়। তাহলে বলতে হবে, এটা সেটা অগ্রাহ্য করার নেতিবাচক শক্তির যৌক্তিকতায় সে মুক্ত নয়। তাকে বরং তার প্রকৃত স্বাতন্ত্রতা বিবৃত করার ইতিবাচক শক্তিতে মুক্ত হতে হবে। তাহলে মানুষের ব্যক্তি অপরাধের শাস্তি দেয়া উচিত নয়। সমাজ বিরোধিতার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা উচিত এং প্রত্যেকেই যেন পায় পর্যাপ্ত সমাজিক সুযোগ তার স্বাতন্ত্রতাকে প্রকাশ করতে সে দিকে নজর দেয়া উচিত। মানুষ যদি তার পরিপাশ্বের দ্বারা গঠিত হয়, তাহলে কেবলমাত্র সমাজেই সে তার স্বভাবের উন্নতি লাভ করতে পারে এবং তার স্বভাবের শক্তি অবশ্যই পরিমাপিত হবে, সমাজের শক্তিতে, বিচ্ছিন্ন স্বাতন্ত্রের শক্তিতে নয়।”

হেলভেটিয়াস ও তার সমবর্তীরা সমাজতন্ত্রী বা সাম্যবাদী ছিলেন অথবা তারা সাম্যবাদের জন্য সন্তোষজনক নীতিশাস্ত্র উদ্ভাবন করেছেন মার্কস তা বোঝাননি। বরং তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে র্যাডিক্যাল বুর্জোয়ারা তাদের বিপ্লবী পর্যায়ে বিপ্লবী নীতিশাস্ত্র উদ্ভাবন করে যা তাদের নিজস্ব স্বার্থ ও দাবীকে প্রকাশ করে। মার্কস অন্যত্র বলেন যে, সমাজের সাধারণের অধিকারের নামে করা হচ্ছে এটা প্রকাশ করে বা না বলে কোন বিশেষ শ্রেণীই শাষনের দাবী করতে পারে না। এবং বুর্জোয়াদের এই অংশ তাদের দাবীর সাথে সাথে নৈতিক তত্ত্বেও কিছু সংযোজন করে। হেলভেটিয়াস বা তার শিষ্য হলবাথ যে সমাজ চাইতেন তার ব্যাপারে আর বিশেষ অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই। আত্ম-স্বার্থের নীতি তাদের দ্বারা উন্নিত হয়েছিল একটি যৌক্তিক সমাজের দাবীতে তা বোঝাই পর্যাপ্ত হবে। হলবাখ পরিষ্কার বলেন যে, সেটাই যৌক্তিক সমাজ যা মানুষকে সুখী করতে পারে এবং তার জন্য প্রয়োজন প্রথমেই, ঐ সমাজ পর্যাপ্ত বস্তু প্রয়োজন মেটাবে, দ্বিতীয়ত এই কাজ হবে এমন এক পথে যা বের করে আনবে প্রত্যেক স্বতন্ত্রের এবং বাকী সবার মধ্যবর্তী স্বার্থের পরিচয়। এইভাবে তারা কোনমতেই স্বতন্ত্রের খুঁটিতে দাঁড়ানো কোন সমাজের কথা বলেননি, বলেছেন স্বতন্তে্রর আন্ত:সম্পর্কের সমারোহের কথা যা সমাজ গঠন করে।

এই মতাদর্শের পরবর্তী ইতিহাস মূলত পাওয়া যাবে ইংল্যান্ডে, প্রয়োগবাদের মাঝে, যা গঠন করেছেন মূলত জেরেমি বেনথাম ও জন স্টুয়ার্ট মিল। কিন্তু হেলভেটিয়াসের এই পরিবর্ধনের ফলে এই মতের কয়েকটি সঙ্কীর্নতা প্রকাশ পেল যার মূল্য দিতে হল বৈশিষ্টপূর্ণ দিকটি খুইয়ে। বঙ্কিম চন্দ্রের রম্য রচনায় UTILITY এর বাংলা হয়েছিল ‘উদর দর্শন’ আর পরবর্তীকালে ঊনবিংশ শতাব্দির ব্রিটিশ সমাজতন্ত্রী বেলফোর্ট বেক্স এর কাছে এই আলোকিত আত্মস্বার্থ হয়ে গেল ‘ভরা পেট আর ভরা পকেটের’ নীতিশাস্ত্র। তাত্তি্বকভাবে এই মতাদর্শ মানব আচরনের চালিকাশক্তি ও সেই সাথে তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারন করতে ভূল করেছিল। এরিস্টোটল তাঁর ‘নিকেমেকিয়ান এথিকসে’ চমৎকার ভাবে লক্ষ্য করেন যে মানুষ তার প্রকৃত স্বেচ্ছাকার্যেই পরিতৃপ্তি পায়। কিন্তু এই তৃপ্তির চরিত্র মানব সত্তার চরিত্রের মতই ব্যাপক ও বহুপল্লবী। কেউ উদর পূর্তিতে তৃপ্তি পায় আবার কেউ তার আপন শ্রেণীর বা সমাজগোষ্ঠী, যার দ্বারা সে আপন অবস্থান নির্দিষ্ট করে, তার স্বার্থে নিজের সত্তাকে উৎসর্গ করে তৃপ্তি পায়।

এইভাবে আত্মস্বার্থ কথাটি শব্দগত অর্থের চাইতে বেশী কিছু বোঝায়, বোঝায় মানব আচরনের প্রেষনা। বুর্জোয়া তাত্তি্বকেরা যেমন বলেন তা সম্পূর্ণ গননাতীত, সেই ব্যক্তি উৎসর্গ পুঁজিবাদের বা কোন শ্রমিকের তার শ্রেণী, দেশ বা কাংখিত সমাজের যাই হোক। এই পরিভাষাটির চমকপূর্ণ পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে আদি খ্রীষ্টান শহীদ বা অন্য যারা তাদের বিশ্বাসের জন্য প্রাণোৎসর্গ করলেন তাদের বীরতে্বর ব্যাখ্যা দেয়া যায়, কার্যটিকে ‘আত্মস্বার্থ’ পে্রষিত বলে। এই রকম সমস্ত ক্ষেত্রেই মানুষ তাদের আপন স্বার্থ এমনকি প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করে এমন কোন আদর্শের জন্য যা ‘তাদের’ আদর্শ, তাদের শুভত্বের প্রতীক, তাদের জনগোষ্ঠীর, শ্রেণীর বা দেশের। তাহলে দেখা যাচ্ছে ‘আত্মস্বার্থ’ কথাটি প্রকৃত আচরনের সম্পূর্ণ অপর্যাপ্ত বিবরণ। তদপুরি তা যদি স্বতন্ত্রকে তার বহুমুখী, গতিময় সামাজিক সংস্থানের সম্পর্ক থেকে পৃথক করে আনবিক স্তরে প্রতিস্থাপিত করার প্রচেষ্টা নেয়া হয় তাহলে কি বলার থাকে!

কেউ হেলভেটিয়াসের নীতিশাস্ত্রকে সমাজ সংস্থানের পরিবর্তনের জঙ্গি দাবী থেকে লক্ষ্যচু্যত বলতে পারেন। যে পরিবর্তন হবে মানুষের বাস্তব প্রকৃতি ও চাহিদা মেটাতে, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানকে মানুষের স্বার্থের দাঁড়ানো থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনে এবং মানুষের স্বার্থকে বিদ্যমান সমাজিক ও অর্থনৈতিক ছাঁচে ধাবমান করাতে। এই লক্ষ্যচু্যতির কারন লুকানো আছে এই ভুল অর্থনৈতিক অনুমানে যে পুঁজিবাদী উপাদান সম্পর্ক সবার স্বার্থে চালিত। তাদেরকে এই রকম করানোর  জন্যই নীতিবাদীরা বলেন তারা যেন চিরকাল শ্রেণী আধিপত্য বজায় রাখতে তাদের লোভকে নতুনভাবে সাজান। তারা শ্রমিকের কাছে উপমা টানেন প্রকৃতির নিয়মের আর বলেন পুঁজিবাদে প্রত্যেকের ভাল মানে সবার ভাল। আজকে এই মতাদর্শ মৃত তাত্ত্বিক ভাবে, প্রায়োগিক ভাবেও। কারন তার মাঝে আর কোন বিপ্লবী আবেদন নেই। বুর্জোয়া বিপ্লবী ‘আত্মস্বার্থ’ ক্ষুদ্র হয়ে মানিব্যাগে ঠাই নিয়েছে। আজকে মানুষ গণতান্ত্রিক অবস্থান রক্ষার্থে লড়াই করবে, কোন পুঁজিবাদী ফ্রি এন্টারপ্রাইজ গঠনের জন্য নয়।

আধ্যাত্মবাদী নীতিশাস্ত্র যেমন স্বতন্তে্রর আত্মার পরিত্রানের কথা বলতো, তেমন করে আত্মস্বার্থের নীতিশাস্ত্র দাবী করতো তার অভিজ্ঞতাময়তা ও বাস্তবতা সমৃদ্ধ হবার। তবে আদী পুঁজিবাদী স্বাতন্ত্রতা, (লেইসে ফেয়ার), অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্ধিতা যেমন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদে পর্যবাসিত হয়েছে, তেমনি সেই নীতিশাস্ত্রও হয়ে গেছে মাৎসন্যায় নীতিশাস্ত্র। এখন বৃহৎ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আত্মস্বার্থ তার উৎপাদক শ্রেণী হিসাবে আত্মরক্ষার খাতিরে শ্রেণী স্বার্থের সাথেই সম্পৃক্ত। পুঁজিবাদী তত্ত্ব যেখানে নিঃশেষ মার্ক্সীয় নীতিশাস্ত্রের শুরু সেখানে এবং তা পুঁজিবাদী ধারারই ধারাবাহিকতা।

আরেকটি সাধারণভাবে বহুল উক্ত নীতিশাস্ত্রীয় ঐতিহ্য আছে। একে বলা যায় নীতিশাস্ত্রে নীতিকরণ। কিন্তু তা বাস্তব। এতে বলা হচ্ছে মূল্যবোধের একক নির্দিষ্টকারক হচ্ছে শক্তি বা বল। ‘জোর যার মুলুক তার’ ঠিক এমনভাবে কথাটা বলে হচ্ছে না। এটাকে আরো ভালভাবে বললে বলতে হবে যে, যা বাস্তবে অস্তিত্বমান তার চাইতে ন্যায়ের অন্য কোন মানে নেই এবং তা কেবলমাত্র সবচাইতে শক্তিশালী শক্তির বিজয়েরই ফল। ‘সত্য সর্বদা জয়ী’ কথাটাকে অন্যভাবে বলা যাবে ‘যে জয়ী হয় সে সর্বদায়ই সত্য’, যাকে মনে হবে প্রথমটি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একইভাবে প্রয়োগবাদী উইলিয়াম জেমস্‌ যখন বলেন, ‘ন্যায় হচ্ছে আমাদের আচরনের পথের যথার্থতা মাত্র’, তিনি আসলে বলেন, আমরা যা করব তা ততক্ষণই ন্যায় যতক্ষণ আমরা তা করে পার পেয়ে যাব বা অন্য ভাবে বলা যায় যা সফল হয় তাই সঠিক।

এই মতাদর্শটি ব্যাপকভাবে বিভিন্ন বেশে ছড়ানো ছিল, যতটা না প্রায়োগিকভাবে তার চাইতে বেশী তাত্তি্বকভাবে, বলা যায় গোপনভাবে। তার পরও সাহসী কয়েকজন বলেই ফেলেছিলেন যে এই নীতি হলো অধিকার ও ন্যায় বিচারের ভিত্তি। তারা সুখ্যাত হন বা কুখ্যাতই হন, অন্তঃত সৎ ছিলেন। বিভিন্ন অধিবিদ্যক নীতিশাস্ত্র যে পর্দার আড়ালে শে্রণী স্বার্থ সংরক্ষণ করতো, এই মতাদর্শীরা তাদেরকে পর্দার আড়াল থেকে বের করে আনেন। থে্রসিমেকাস, মেকিয়াভেলী, হবস, হেগেল, নিঁটশে, সেই অনেকের মাঝে কয়েকজন যারা বিভিন্নভাবে বুঝিয়েছেন যাদের শক্তি আছে তারাই সঠিক আর তাই তাদের সামনে দূর্বলতা মানেই হচ্ছে পাপ। কোন শোষক শ্রেণীই দীর্ঘদিন ধরে এই মতাদর্শ গ্রহন করার সাহস পাচ্ছিল না, কারন এই শাখের করাত এই কথাও বোঝায় যে যদি কোন শোষকশ্রেণী ক্ষমতা হারায় তাহলে তারা দূর্বলতার অভিযোগে সমস্ত অধিকারই হারায়।

‘শক্তিই অধিকার বা ন্যায় জন্ম দেয়’ এই দার্শনটির কয়েকটি ঐতিহাসিক ধাপ বিচার করা সমিচীন হবে।

প্লেটো তাঁর রিপাবলিকের প্রথম অধ্যায়ে দেখাচ্ছেন কয়েকজন তরুন এথেনসবাসী ন্যায়বিচারের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করছে। এদের মাঝে তার্কিক সম্প্রদায়ের থে্রসিমেকাস দাবী করলেন ‘ন্যায় বিচার হচ্ছে শক্তিশালীর স্বার্থমাত্র’। প্লেটোর অনুসারীরা দীর্ঘকাল ধরে তাঁর এই অবধারনাটিকে নিয়ে লজ্জিত ছিলেন। প্রফেসর উইনসপিয়ার তার WHO WAS SOCRATES গ্রন্থে থে্রসিমেকাসকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে থে্রসিমেকাস আসলে যা বলতে চেয়েছেন তা অনেকটা এরকমঃ সমাজের শাসকেরা চিরকালই ন্যায়বিচারকে ব্যাখ্যা করেন তাদের শাসনের দাবীর ও প্রয়োজনের স্বার্থেই। যদি অন্য কোন শ্রেণী শাসন করে তবে তা পরিবর্তিত হবে সেই শ্রেণীর অধিকার ও শ্রেণী স্বার্থেই।

বহু শতাব্দী পরে একজন ফে্লারেন্সবাসী রাজসভাসদ ইটালীর নগর রাষ্ট্রগুলোর মাঝে দ্বন্দ্বগুলোকে তীক্ষ্নভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন এবং প্রশ্ন করলেন কী করে এই ছোট্ট রাষ্ট্রগুলোর মাঝের রক্তক্ষয়ী, হন্তারক দ্বন্দ্বগুলো থামানো যায়? তিনি স্বপ্ন দেখলেন সমগ্র ইটালী জুড়ে একটা একক বিরাট রাষ্টে্রর, বুঝতে পারলেন তার জন্য চাই প্রবল শক্তিধর নির্মম কোন শক্তি। তার স্বপে্নর দেশ কোন শক্তিশালী বজ্র কঠিন হাতে বাকীদেরকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, এই বিশ্বাস করার সততা তার মাঝে ছিল। সাধারণভাবে মেকিয়াভেলীকে শক্তি উপাসক বলে দোষী করা হয়, তবে মেকিয়াভেলী বাস করতেন এমন এক সময়ে যখন বিভিন্ন দ্বন্দ্বে লিপ্ত শক্তিগুলোর মাঝে সবচাইতে বৃহৎ শক্তিটিই জনগণকে একটি একক বাঁধনে বাঁধতে পারত এবং সেই শক্তিটির বিজয় কামনা করাই তার পক্ষে ছিল স্বাভাবিক। কিছু একটা যথাসম্ভব শীঘ্র করে ফেলার উদগ্র বাসনায় মেকিয়াভেলী খুঁজেছিলেন একজন শক্ত পোক্ত মানুষ।

টমাস হবসে আমরা আবার দেখতে পাই শক্তির এক অদ্ভূত বৈচিত্র, যা স্থিত কিছু আদর্শের এমন এক নৈতিক শূন্যবাদের স্বার্থে যা সমস্ত মূল্যবোধকেই অস্বীকার করে। হবস একটা জিনিস চাইতেন প্রবল ভাবে। তা হল শান্তি, রাষ্ট্রের ভেতরে এবং রাষ্ট্রগুলোর মাঝেও। নিজে যথেষ্ট স্বচ্ছল থাকায় তার পক্ষে চাওয়া সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র নিরাপত্তা- শান্তিভঙ্গকারীদের কাছ থেকে, তা সে অপরাধী হোক, সামাজিক বিপ্লবী হোক বা ভিন্ন কোন রাষ্ট্রই হোক। মেকিয়াভেলীর মতই, হবস উত্তম রাষ্ট্রকে পরিচালনা করার জন্য শক্তিকেই করলেন পরশপাথর, তা সকল নাগরিকের কল্যাণ বিধানও হতে পারতো। হব্‌স্‌ তাঁর জীবদ্দশায় এই তত্ত্বটিকে ভয়ানকভাবে লঙ্ঘন করেছিলেন। যদি বিদ্যমান শাসকেরা ব্যার্থ হয় ও তারা কোন বিপ্লবীদের দ্বারা উৎখাত হয় আর বিপ্লবীরা যদি কোন সুসংহত শাসন কায়েম করে তবে কী হবে? ক্রমওয়েলিয়ান বিপ্লবীরা যখন ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়লো, রাজতন্ত্রের বন্ধু হবস তখন ফ্রান্সে পালালেন। যখন গোঁড়া রক্ষণশীলরা আবার ক্ষমতা নিয়ে সংহত হল, নির্বাসনের বিভীষিকা কাটিয়ে হবস ফিরে এলেন স্বদেশে।

একীভূত ইটালীর স্বপ্নসহ মেকিয়াভেলী এবং আর হবসের শান্তি আকাংখাসহ তাদের নৈতিক ভাবাদর্শ পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে অনেকটা পরিবর্তিত হয়ে গেল রাষ্ট্রপূজাতে, কারন রাষ্ট্র ও বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক আছে- কারন তারা আছেই, তাদের উৎপত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তাদের পবিত্রতাকে মেনে নিয়েই। এই মতাদর্শ সেই জিতে যাওয়া ঘোড়ার উপরই বাজি ধরতে চায়। এভাবে এই তত্ত্ব নৈতিক শূন্যতার বিপরীতে কিছু মূল্যবোধ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সবই বিসর্জন দেয় প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বেদীমূলে। প্রবল প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান নেয় সমস্ত বিকল্প প্রগতিশীলতার বিপক্ষে। এভাবেই এই মতাদর্শ হয়ে গেল নৈতিকতার জায়গা থেকে সম্পূর্ণভাবে গা বাঁচানোর এক অর্থনৈতিক হাতিয়ার, হয়ে গেল সমস্ত নৈতিক মূল্যবোধের নৈতিকরন।

এই শক্তি তত্তে্ব একটি বিশেষ রূপ আছে যা অস্বীকার করা যায় না। এটি হচ্ছে পুঁজিবাদী সর্বোচ্চ রূপ, শ্রমশোষনের নৈতিকতার পরখ। বাজার দখলের কুকুর লড়াই তার সবচাইতে দগ্‌দগে ইতিহাস প্রাক সাম্রাজ্যবাদী সময়কাল আর আজকের সাম্রাজ্যবাদী দেশ দখল। এক্ষেত্রে পুঁজিবাদীরা আশ্রয় নিলেন সম্পূর্ণ অন্য ক্ষেত্র হতে, একজন সহূদয় ইংরেজ জীববিজ্ঞানীর মহান তত্ত্বের। সেই দূর্ভাগা ব্যাক্তিটি হচ্ছে চার্লস ডারুইন। তাঁর প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্বটিকে একটি নোংরা রূপ দেবার মহান দায়িত্বটি নিলেন হার্বার্ট স্পেনসার। এটাকে বলা যায় একটি যুক্তিবাদী নষ্টামী; কারন তা ডারুইনের জৈব বিবর্তন (যা পরিলক্ষিত ও সূচিত বৃক্ষ ও প্রাণী চরিত্রে যার যোগসূত্র নেই কোন একক উত্তরনের সাথে) কে, মানব সমাজের মাঝে প্রযুক্ত করলো মানবজাতির ইতিহাসের প্রতি নজর না করে। স্পেনসারের ‘যোগ্যতমের উত্তরন’ স্লোগানটিতে ‘যোগ্যতম’ কথাটি পরিবর্তিত হয়েছে। তাদের মাঝ থেকে তা উত্তরিত হয়েছে এই নৈতিক বিচারে যে- তারাই শ্রেষ্ঠ। একে বলা যায় সামাজিক অধঃপাত, কারন সম্পূর্ণ অমানবিক জগতের সমস্ত নিয়ম প্রযুক্ত হলো মানবিক সমাজে, সমাজ শব্দটির ঐতিহাসিক বিবর্তনকে তোয়াক্কা না করে।

স্পেন্সারের সামাজিক দর্শনকে সাজানো যাক সোজাভাবে। প্রকৃতির একটি মৌলিক নিয়ম হলো সমস্ত কিছুই সরল থেকে জটিল পর্যায়ে যাচ্ছে। মানব সমাজ ও ইতিহাস সাধারণ নিয়মের অন্তর্গত। জীবজগতের নিয়ম হল সর্বোত্তমই টিকে থাকবে। অতএব এটি সামাজিক বিবর্তনের নিয়ম হতে বাধ্য এবং ভয়ংকর কথাটি হচ্ছে মানুষ এই অপূর্ব প্রাকৃতিক নিয়মটিতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে যদি সে দূর্বলকে সহায়তা করে টিকে থকার জন্য। এই জন্য স্পেন্সার তার যুগে জনশিক্ষা, জনস্বাস্থ, সেবা, শ্রম ও মজুরী আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন, কারন ব্যাপারটা দূর্বলকে রক্ষা করে। এইভাবে তিনি ব্রিটিশ শিল্প ও বিশ্বে তার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার পৈশাচিক প্রয়াসকে নৈতিক ও প্রাকৃতিক বিচারে গ্রাহ্য করতে চাইলেন।

সংক্ষেপে ডারুইনের মতবাদের এই অধঃপাতের কাছে একটিমাত্র নৈতিক রূপ থাকতে পারে, তা হল টিকে থাকা। বেনজামিন ফ্রাংকালিনের পরে এমেরিকান পুঁজিবাদ অনেক পথ চলেছে। কোন অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধারা কতটা অবক্ষয়ী তা সবচাইতে ভাল প্রকাশিত হয় তার তাত্ত্বিক সমর্থনে। এই তত্ত্ব সকল মূল্যবোধের অতীত- কারন এর মতে আজকের বিশ্বেও একমাত্র নৈতিক তত্ত্ব হল ভাঙ্গনের নীতি। এই কামড়া-কামড়ির তত্ত্ব এতই অপ্রাসঙ্গিক যে আলোচনায় তা আর বিস্তার দাবী করতে পারে না।

এখন পর্যন্ত প্রধান তিনটি ঐতিহাসিক তত্তে্বর ধারা আলোচনা করা হলো। এদের মধ্যে কেউই মানুষের সাধারণ জীবনমাত্রিক অতিসাধারন বস্তুগত সমস্যার সমাধান দিতে পারলো না। বিভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মবাদী নৈতিকশাস্ত্র স্বচ্ছ ধারনা দিতে পারলো না। ভোগবাদী আর উপযোগবাদীতা এতই ব্যক্তি ভিত্তিক যে তা বর্তমান জগতের প্রতিষ্ঠানগত সমস্যা সমাধানে কোন প্রকৃত দিকনির্দেশ দিতে অপারগ। শক্তি প্রাধান্যতা শেষ পর্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীলতাকেই সমর্থন করে। পুঁজিবাদের দ্বারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কোন তত্ত্ব আর পর্যাপ্ত রইলো না।

মানব ইতিহাসে এই প্রথমবারের মত মানুষের হাতে সবার ভালভাবে বেঁচে থাকবার মত উৎপাদন সম্ভব। তাহলে বর্তমানে বিশ্বব্যাপি দারিদ্র আর দূর্ভোগের কারন নিশ্চয়ই অর্থনৈতিক বা উৎপাদন সম্পর্ক। কিন্ত্ত এই অর্থনৈতিক সম্পর্ক যেহেতু উৎপাদনী হাতিয়ারের ব্যক্তি মালিকানায় স্থিত, সেহেতু তা সামাজিক অংশগুলোকে দ্বান্দ্বিক অর্থনৈতিক শ্রেণীতে ঠেলে দেবে। এই অংশগুলোর মাঝে পুঁজিধারী ও শ্রমধারীদের মাঝে রয়েছে নিরন্তন ক্ষমতার লড়াই। এই লড়াই শুরু শ্রমশর্ত, মজুরি এই সব থেকে আর ধাবিত হয় রাজনৈতিক শক্তির পরিচালনাতে, যা এক দিকে অর্থনৈতিক শক্তির প্রকাশ অপর দিকে তার পূর্বশর্তগুলোর।

বর্তমানে মার্ক্সীয় নৈতিক বিচারের সাধারণ পে্রক্ষাপট এবং চিরায়ত নীতিশাস্ত্রীয় তত্ত্ব হতে তার শ্রেষ্ঠত্বের দাবীটি পরীক্ষা করা যাক।

প্রথমত, মার্কস এঙ্গেলস একথা অস্বীকার করে গেছেন যে নৈতিক বিচারই মানব জীবন ও সমাজ বিবর্তনের কেন্দ্র। নৈতিক তত্ত্বগুলো উত্থিত ব্যক্তি প্রয়োজন ও সমাজিক প্রক্রিয়ায়। যখন তারা তাদের উপর ক্রিয়া করে তখন তারা ঐ প্রয়োজন ও প্রক্রিয়ার অনুসারী হিসাবে থেকে যায়, যে প্রয়োজন ও প্রক্রিয়ায় আপন নির্দিষ্ট চলন পদ্ধতি আছে। এইভাবে, কোন প্রয়োজন বা সামাজিক পরিবর্তন শুধুমাত্র এই জন্য সাধিত হয় না যে তা সঠিক। বরং তার কারন প্রয়োজনটি পূর্ণতা দাবী করে আর সামাজিক পরিবর্তনটি সামাজিক পরিবর্তনের নীতি মেনে চলে। নৈতিক দৃষ্টিতে সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদ হতে উত্তম এই জন্যই মার্ক্স-এঙ্গেলস সমাজতন্তে্রর অবশ্যম্ভাবীতায় বিশ্বাস করতেন তা নয়। কারন ছিলো পুঁজিবাদী অর্থনীতির আপন দ্বন্দ্ব ও স্ববিরোধীতা বিজীত হবে আর যে মানুষেরা তা জয় করবে তারা চালিত হবে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবী ও স্বার্থে।

দ্বিতীয়ত, যেহেতু মানব চাহিদা বা আকাংখার উপরে কোন নৈতিকতা নেই এবং এই দাবী বা চাহিদা যেহেতু দমিত সমাজের শ্রেণী বিভাজনের প্রকৃত অবস্থায় তাই শুধুমাত্র দুটি স্থানে দাঁড়িয়েই নৈতিক বিচার সম্ভব। হয় সে দাবী, চাহিদা, আকাংখা, দৃষ্টিভঙ্গি বুর্জোয়াদের অথবা সর্বহারাদের। অন্যভাবে মানুষের চাহিদা যদি শ্রেণী সীমায় বিভক্ত হয় যা অবশ্যম্ভাবী রূপে দ্বন্দ্বে লিপ্ত তাহলে যে কাউকে আপন স্বার্থ অনুযায়ী যে কোন একটি শ্রেণীকে বেছে নিতে হবে। হয়ত সমাজের বিশাল একটা অংশেরই এই পছন্দ অপছন্দের সুযোগটা নেই কারন তাদের অবস্থানই তাদেরকে একদিকে ঠেলে দেয়। তাত্ত্বিক বিচার্যের চাইতে বস্তু প্রতিবেশই তাদের কাছে বাস্তব। তবে বিভিন্ন পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদেরকে অবশ্যই সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে শ্রেণী সংগ্রামে নৈতিক বিচার্য বলে কোন পরিভাষার কোন অবকাশ থেকে যায় কিনা? প্রশ্নটাকে আরো পরিষ্কার করলে বলতে হবে যে, শ্রেণী সংগ্রামে আমরা এমন কোন নৈতিক মূল্যবোধ পাই কি- যা দিয়ে আমরা পক্ষ নির্বাচন করতে পারি? ঐতিহাসিক বিচারের প্রেক্ষাপটে বললে আমাদেরকে এক্ষেত্রে সাধারণ শ্রমিক শ্রেণীকেই প্রাধান্য দিতে হবে। এর কারন এই নয় যে তারা বেশী পরিমান নীতিবোধ সম্পন্ন শ্রেণী। বরং উৎপাদনে মূল হাতিয়ারের সঙ্গে তাদের জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকায় তারা সামগ্রীক স্বার্থ রক্ষায় তৎপর হতে বাধ্য আপন স্বার্থেই। এই প্রতিবাদী দিকটি পুঁজিবাদীরা হারিয়েছে ঐতিহাসিকভাবে।

তৃতীয়ত, মার্কসীয় উপসংহার হলো পুঁজিবাদী উৎপাদনের প্রকৃত এই সত্য প্রকাশ করে যে তা সব মানুষের বস্তুগত প্রয়োজন মেটাতে পারে না, যা সে উৎপাদনের ধারায় যুক্ত করতে পেরেছিল তার প্রগতিশীল পর্যায়ে উৎপাদনের সমস্ত অর্গল ভেঙ্গে। অর্থাৎ পুঁজিবাদী উৎপাদনের প্রকৃতি, পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ককেই ছাড়িয়ে গেছে যার স্বচ্ছ প্রকাশ এই উৎপাদনী শক্তির ব্যক্তি মালিকানা। এই দ্বন্দ্বের একটি হল এত হরেক রকমের পণ্য থাকতেও বিশ্বময় দারিদ্র অথবা আরো ভালভাবে বলতে গেলে মুনাফার হার কমে যাওয়ায় সেই উৎপাদনের ক্ষেত্র হতে পুঁজি অপসারন, তা সে যে পণ্যই হোক না কেন। আরেকটি প্রকাশ বিশ্বময় নতুন বাজার, সস্তা কাঁচামালের খোঁজে সাম্রাজ্যবাদীদের পারস্পরিক জের- দুটি বিশ্বযুদ্ধ।

মার্ক্সীয় ধারায় বিশ্লেষণ আরো দেখায় যে শুধুমাত্র উৎপাদন উপকরনের সামাজিকীকরনের মধ্য দিয়েই বর্তমানে পঁুজিবাদের অর্গল ভেঙ্গে তাকে আরো সামনে নেয়া যায়। যা হবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থে। এর মধ্যে দিয়ে পঁুজিবাদী উৎপাদনের ধারা বিলুপ্ত হবে ও শ্রমিক শ্রেণীর দ্বান্দ্বিক অবস্থানের পরিবর্তন হবে।

এভাবে শ্রমিক শ্রেণী নিজেকে মুক্ত করতে পারে সমগ্র সমাজকে পুঁজিবাদী জোয়াল থেকে মুক্তি দিয়ে। তাই শ্রমিক শ্রেণী তার অবস্থানের কারনেই সমগ্র মানবজাতীর পক্ষ হয়ে লড়াই করতে বাধ্য। তাই সে তার প্রয়োজনেই এমন এক নীতিশাস্ত্র উদ্ভাবন করবে যা একই সঙ্গে শ্রেণী নৈতিকতা ও সকল মানুষের মৌল প্রয়োজনকে ধারন করে বলে একই সঙ্গে তা মানবিক নৈতিকতাও হবে।

তবে এখানে মনে রাখতে হবে যান্ত্রিক প্রথাগতভাবে ভাবতে শেখা বুদ্ধিজীবীদের কাছে ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে না, তবে দ্বান্দ্বিকভাবে দেখতে চাইলে তা অতীব সরল। তথাকথিত মহাবৈশ্বিক নৈতিক সত্য, সর্বগ্রাহ্য মানবতা ইত্যাদির দোহাই দিয়ে নিতান্ত বস্তু সমস্যার সমাধান হয় না বরং তাতে থেকে যায় সমস্যাকে আরো ঘোলাটে করে ফেলার আশংকা। অপরদিকে সাধারণ শ্রমজীবী জনতার সাথে দাঁড়িয়ে লড়াইয়ের সাথে সামিল হওয়াকে একটি পক্ষ্য অবলম্বন মনে হলেও সেটাই প্রকৃত মানবিকতা। এটাকে মনে হবে মার্ক্সীয় নীতি শাস্তে্রর ধাঁধাঁ। কিন্ত্ত তা মাক্সের্রর নয়, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটেরই সৃষ্টি। এই কারনেই সেই দুই বন্ধুদের পরবর্তী হতে আজো অনেকেই নীতিশাস্ত্রীয় নৈতিক মূল্যবোধ, মানবতা এইসব বুলি না কপচিয়েও চালিত হয়েছে একটি যৌক্তিক, শ্রেণীহীন সমাজের আদর্শ যেখানে প্রত্যেকের ভাল, সবার ভাল। মার্ক্স-এঙ্গেলস কেউই সেই ভবিষ্যৎ সমাজের নৈতিকতা নিয়ে বেশী কিছু বলতে চাননি কারন তারা তাদের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের পদ্ধতিকে কোন ইউরোপীয় ধারনা দিয়ে দ্বিধানি্বত করতে চাননি। আর আরেকটি ন্যায্যভয়তো ছিলই। বুর্জোয়ারা ন্যায় বিচার, মূল্যবোধ, চিরন্তন অধিকার, এই পরিভাষার বাজারও এমনভাবে দখল করে রেখেছে যে তা ব্যবহার করা যথেষ্ট অপব্যাখ্যার আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ।

পরিশেষে মার্কসীয় নীতিশাস্ত্র সম্পর্কে বলা যায় যে, তা মানব বস্তু প্রয়োজনের উৎসারন; যার দ্রুতি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব ও পরস্পর বিরোধীতার মাঝে এবং শ্রমিক শে্রণী ও মানব জাতীর স্বার্থ বর্তমানে একক। তাই মার্কসবাদীরা বিশ্বাস করে এই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শ্রমিক শ্রেণী চূড়ান্ত মাত্রায় সঠিক। তার মুক্তির জন্য অনূকূল পরিবেশ সৃষ্টির এই লড়াইকে তাই পুঁজিবাদী শে্রণী সৃষ্ট নৈতিকতা দ্বারা যাচাই করা যৌক্তিক হবে না। এই মার্কসীয় নৈতিকতা মানবজাতীর ইতিহাসে কোন আধিপত্যকারী শ্রেণীকেই চূড়ান্ত বলে মানে না। এই নৈতিকতা কোন আদর্শ সামজিক নৈতিকতা বলেও নিজেকে দাবী করে না, কারন তা এমন এক শ্রেণীর নৈতিকতা যারা মুক্তি অর্জনের তিক্ত লড়াইরত।

লেনিন ১৯২০ সনে সোভিয়েত য়ুনিয়ন এর যুব কমিউনিষ্ট লীগের তৃতীয় কংগে্রসের ভাষনে কমিউনিষ্ট নৈতিকতা সম্পর্কে বলেন

“আজকের তরুনদের প্রশিক্ষন, শিক্ষার সমস্ত হওয়া উচিত কমিউনিষ্ট নৈতিকতায় অনূপ্রানিত।

কিন্তু কমিউনিষ্ট নৈতিকতা বলে কি কিছু আছে? কমিউনিষ্ট নীতিশাস্ত্র বলে কি কিছু আছে? অবশ্যই আছে। প্রায়শই এমনই দেখানো হয় যে আমাদের কোন নিজস্ব নীতিশাস্ত্র নেই; আর বুর্জোয়ারা প্রায়শই আমাদের, কমিউনিষ্টদেরকে সমস্ত নৈতিকতা ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার দোষে দোষী করতে চায়। এটা হলো শ্রমিক কৃষকদের চোখে ধূলো দেয়ার চেষ্টা।

কোন অর্থে আমরা নৈতিকতা, নীতিশাস্ত্র ছুঁড়ে ফেলি?
এই অর্থে যে এটা বুর্জোয়াদের বলা, যা তারা এনেছে ঈশ্বরের আদেশ থেকে… … অথবা নৈতিক অনুজ্ঞা বা ঈশ্বর আদেশ এর বদলে তা তারা উৎসারিত করে ভাববাদী বা আধাভাববাদী চেহারা হতে যার সঙ্গে ঈশ্বরাদেশ এর কিছু মিল আছে।

যা অমানবিক ও অ-শ্রেণী ধারনা হতে উদ্ভূত এমন সব নৈতিকতা আমরা বর্জন করি। আমরা বলি তা হলো ধোকাবাজী, প্রবঞ্জনা, তঞ্চকতা, শ্রমিক কৃষকদের ধাঁধাঁয় ফেলা, জমিদার আর পুঁজিবাদীদের স্বার্থে।

আমরা বলি আমাদের নৈতিকতা, সর্বহারা শে্রণী সংগ্রামের স্বার্থের সম্পূর্ণ অধীন। আমাদের নৈতিকতা সর্বহারার শ্রেণী সংগ্রামের স্বার্থ হতে উত্থিত।”

লেনিন আবার কিছু পরে এক কথাতে মার্কসীয় নীতিশাস্ত্রের সার সংক্ষেপ তুলে ধরেন:

“নৈতিকতা মানুষকে সহায়তা করে মানব সমাজকে উচ্চস্তরে উত্থিত হতে এবং শ্রম শোষন থেকে মুক্তি পেতে।”

নৈতিকতা হলো সে নীতি গুলোর সমন্বয় যা মানুষের বস্তু ও সাংস্কৃতিক চাহিদা ও বাসনার সবচাইতে প্রশস্ত সম্ভাব্য পূর্ণতার পথে যাত্রাতে সৃষ্ট হয়, এই উদ্দেশ্যের ইতিবাচক পূর্ণতার মাঝে। যার সাথে স্থিরতার সম্পর্ক সম্পূর্ণ নেতিবাচক। এই পথে ধাবিত এমন যা কিছু পাওয়া যায়, যা সাধারণের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক- তাকেই মার্ক্সীয়রা মনে করে ভাল। আর যেহেতু উৎপাদন উপকরনের সামজিকীকরনই পারে সেই ইতিবাচকতাকে সব চাইতে সম্ভাব্য ব্যাপকমাত্রায় প্রসারিত করতে ও প্রায় সীমাহীন মানব সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে। এটাই হলো ‘সর্বোচ্চ শুভ’। আর যত দিন না এই লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে এটাই হবে মানব সমস্ত আচরন বিচারের মাপকাঠি। সেই লক্ষ্য এমন এক সমাজ যেখানে ‘প্রত্যেকে দেবে সাধ্য অনুযায়ী, নেবে যতটুকু প্রয়োজন।’

৫ বর্ষ. ৭ সংখ্যা. ফাল্গুন ১৪১০. ফেব্রুয়ারি ২০০৪

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।