সেপ্টেম্বর ১০, ২০০২ | লু স্যুনের চীনা গল্প | ০ টি মন্তব্য

ঔষধ

এক.

হেমন্তের কাকভোর। চাঁদ ডুবে গেছে কিন্ত্ত সূর্য উঠেনি। বিশাল আকাশ নীল চাদরের মতো বিছানো। নিশাচর ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। বুড়ো শুয়ান হঠাৎ বিছানায় উঠে বসে। খশ্‌ করে ম্যাচ জ্বালিয়ে হারিকেন ধরায়। চা দোকানের দু’কামরার উপর এক ভুতুড়ে আলো নেমে আসে।

বউ জানতে চায়, ‘‘ছোট শুয়ানের বাপ তুমি কি এখন যাচ্ছ?’’ ভেতরের ছোট্ট কামরা থেকে কাশির শব্দ আসছে।
‘‘হুঁ।’’

কাপড় পরতে পরতে বুড়ো শুয়ান জবাব দেয়। তারপর হাত বাড়িয়ে বলে,
‘‘ওটা দাও।’’

কিছুক্ষণ বালিশের নীচে হাতড়ে বউ টাকার পোটলা তার হাতে তুলে দেয়। বুড়ো শুয়ান ভয়ে ভয়ে সেটা পকটে ঢ়ুকায়, দু’বার পকেট চাপড়ে দেখে। তারপর কাগুজে লণ্ঠন জ্বালিয়ে ভেতরের কামরায় ঢোকে। প্রথমে মৃদু কাশির শব্দ আসে তারপর আরো জোরে। সবকিছু থেমে গেলে, বুড়ো আস্তে আস্তে বলে, ‘‘বা’জান … … উঠিস না! … … তোর মা দোকান দেখাশোনা করবে।’’

জবাব না পেয়ে বুড়োর মনে হলো ছেলে গভীর ঘুমে অচেতন। সে রাস্তায় নেমে আসে। অন্ধকার ধূসর রাস্তা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। লণ্ঠনের আলো পায়ের সঙ্গে দুলছে। এখানে সেখানে কুকুর চোখে পড়ে। কিন্ত্ত একটাও ঘেউ ঘেউ করছে না। ঘরের চেয়ে বাইরে বেশ ঠাণ্ডা। তবু বুড়ো শুয়ানের সাহস বেড়ে যায়, যেন হঠাৎ তার বয়স কমে গেছে, যাদুর জীবনী-শক্তি পেয়ে গেছে। সে পা চালিয়ে দেয়। রাস্তা পরিষ্কার হতে হতে আকাশও পরিষ্কার হয়ে আসে।

বুড়ো শুয়ান একমনে হেঁটে চলেছে। সামনে পথের শেষ দেখতে পেয়ে হঠাৎ তার সম্বিৎ ফিরে আসে। কয়েক পা পিছিয়ে এক দোকানের কার্নিসের নীচে সে বন্ধ দরোজার সামনে দাঁড়ায়। কিছুক্ষনের মধ্যে ঠাণ্ডায় তার কাঁপুনি ধরে যায়।
‘‘আহা, বুড়ো।’’
‘‘বেশ সতেজ মনে হয় … …।’’

বুড়ো শুয়ান আবার সজাগ হয়। চোখ খুলতেই দেখতে পায় কয়েকজন লোক যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। তাদের একজন আবার তার দিকে ফিরেও তাকায়। সে তাকে পরিষ্কার
দেখতে না পেলেও মনে হলো খাওয়া দেখে অভুক্ত মানুষের যা হয়, তার চোখ সেরকম জ্বল জ্বল করছে। বুড়ো শুয়ান তাকিয়ে দেখে লণ্ঠন নিভে গেছে। পকেট চাপড়ে দেখে- না, পোটলাটা আছে। তারপর আশে পাশে তাকাতেই তার অদ্ভুত সব লোক নজরে পড়ে। ভূতের মতো দু’জন, তিনজন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্ত্ত ভালো করে তাকাতেই, তাদের আর অদ্ভুত মনে হয় না।

সে দেখতে পায় জনা কয়েক সৈন্য ঘোরাঘুরি করছে। দূর থেকে তাদের ইউনিফর্মের বড়ো সাদা চিহ্ক পরিষ্কার দেখা যায়, কাছে আসতে লাল বর্ডারও চোখে পড়ে।পরমুহূর্তে ধূপধাপ শব্দে একদল লোক পার হয়ে গেল। তারপর একটু আগে যে ছোট্ট দলটি এসেছিল তারা জড়ো হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ঠিক পথের শেষ প্রান্তের
আগে হঠাৎ থেমে গিযে তারা অর্ধবৃত্তাকারে আবার জড়ো হয়।

বুড়ো শুয়ান সেদিকে তাকিয়ে দেখে, কিন্ত্ত শুধু লোকজনের পেছনের দিকটা দেখতে পায়। তাদেরকে অদৃশ্য হাতে গলা ধরে ঝোলানো হাঁসের মতো দেখা যাচ্ছে। এক মুহূর্ত সব চুপচাপ, তারপর একটি শব্দ শোনা গেল। দর্শকদের মধ্যে হইচই পড়ে যায়। তারা সবাইকে পেছনে ঠেলতে শুরু করে। ধাক্কায় বুড়ো শুয়ানের প্রায় পড়ে যাবার দশা হয়।

পুরো শরীর কালো কাপড়ে ঢাকা একজন বুড়ো শুয়ানকে বলে, ‘‘তোমার টাকা আমাকে দাও, আমি তোমাকে জিনিস দেব।’’ তার চোখজোড়া চাকুর মতো। ভয়ে বুড়ো শুয়ান চুপসে যায়। সে তার লম্বা একটি হাত বাড়িয়ে দেয় বুড়োর দিকে। আর একহাতে ধরা আছে একটি সেদ্ধ রুটি, যা থেকে ফোটায় ফোটায় ঝরছে লাল তরল পদার্থ।

টাকার জন্য বুড়ো শুয়ান জলদি হাতড়াতে থাকে। কাঁপতে কাঁপতে প্রায় সে দিয়েই দিচ্ছিল, কিন্ত্ত ভয়ে অন্য বস্তুটি নিতে সাহস হলো না। অস্থির হয়ে লোকটি চিৎকার ক’রে উঠে, ‘‘তোমার কিসের ভয়? কেন নিচ্ছনা ?’’ বুড়ো তখনো থতমত অবস্থা। কালো কাপড়ে ঢাকা লোকটি রুটি জড়ানোর জন্য লণ্ঠনের কাগজের ঢাকনাটি ছিঁড়ে ফেলে। জড়ানো রুটি সে বুড়োর হাতে সঁপে দেয় এবং শয়তানী চোখে তাকিয়ে রুপোলী জিনিসগুলো নিয়ে নেয়।
‘‘বুড়ো হদ্দ … …’’ বিড়বিড় করতে করতে সে ফিরে চলে।

‘‘এসব কার অসুখের জন্য?’’ বুড়ো শুয়ানের মনে হলো কেউ জিজ্ঞেস করছে, কিন্ত্ত সে কোন জবাব দিলনা। তার পুরো মনোযোগ পোটলার দিকে। এমন সাবধানে সে সেটা বহন করছে যেন তা কোন পুরনো বাড়ীর একমাত্র বংশধর। এখন আর কোন কিছু এত দামী নয়। সে তার বাড়ীতে নতুন জীবন আনবে, সুখের সন্ধান পাবে। সূর্য
উঠেছে। যে রাস্তা সোজা বাড়ীর দিকে গেছে, তা এখন আলোকিত। পথের শেষে পুরনো ফলকে বিবর্ণ সোনালী রঙে্‌র লেখা জ্বলছে, ‘‘পুরনো প্যাভিলিয়ন।’’

দুই.

বুড়ো শুয়ান বাড়ীতে পৌঁছে দেখে দোকান পরিষ্কার করা হয়েছে। চায়ের টেবিলগুলো; “ঝকঝক করছে, কিন্ত্ত কোন খদ্দের তখনো আসেনি। শুধু তার ছেলে দেয়ালের কাছে বসে খাচ্ছে। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। জ্যাকেট শিরদাঁড়ার উপর ঝুলে আছে, ট- এর মতো কাঁধের হাডগুলো চোখে পড়ে। ছেলেকে দেখেই আবার বুড়োর কপাল কুঁচকে যায়। রান্নাঘর থেকে তার বৌ দৌড়ে আসে। তার চোখে আশার আলো, ঠোঁট জোড়া কাঁপছে-
‘‘পেয়েছ?’’
‘‘হ্যাঁ।’’

তারা দু’জনেই রান্নাঘরে গিয়ে যুক্তি করে। তারপর তার স্ত্রী বাইরে থেকে একটি শুকনো পদ্মপাতা এনে টেবিলের উপর বিছিয়ে দেয়। বুড়ো শুয়ান লন্ঠনের কাগজ
জড়ানো লাল রংয়ের রুটিটি খুলে পদ্মপাতার উপর রাখে। ছোট শুয়ানের খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। কিন্ত্ত তার মা জলদি বলে উঠে-
‘‘বা’জান, বসে থাক! এখানে আসবি না।’’

চুলোর আগুন ঠিক করতে করতে বুড়ো শুয়ান সবুজ পোটলা এবং লণ্ঠনের সাদা- লাল কাগজ চুলোর ভেতর দিয়ে দেয়। আগুনের লাল-কালো শিখা উঠে আসে। একটা
অদ্ভুত গন্ধে ভরে যায় সমস্ত দোকান।

‘‘বেশ ভালো গন্ধ মনে হচ্ছে! কি খাচ্ছ তোমরা?’’ কঁুজো এসছে, সে তাদের একজন যারা পুরো সময়টা চা দোকানে কাটায়। সকালে সবার আগে আসে এবং সন্ধ্যায়
সবার পরে যায়। হোঁচট খেতে খেতে রাস্তার মুখোমুখি কোণার এক টেবিলে গিয়ে সে বসে। কিন্ত্ত কেউ প্রশে্নর জবাব দেয় না।
‘‘চালের খিচুড়ি?’’

তবু কোন জবাব নেই। তার জন্য চা বানাতে বুড়ো দৌড়ে আসে।

‘‘বা’জান, এদিকে আয়।’’ ছোট শুয়ানের মা তাকে ডেকে ভেতরের ঘরে নিয়ে যায়। ঘরের মাঝখানে একটি টুল দিয়ে ছেলেকে সেখানে বসায়। তারপর প্লেটে করে কালো
একটা কি যেন নিয়ে এসে সোহাগ ক’রে বলে-
‘‘খেয়ে ফেল … … … তা’হলে ভালো হ’য়ে যাবি।’’

কালো জিনিসটি হাত দিয়ে ধরে ছোট শুয়ান সে দিকে তাকায়। তার ভেতরে একটা অদ্ভুত ভাব খেলা করতে থাকে। যেন সে নিজের জীবন হাতে ধরে আছে। তারপর সাবধানে সেটা খুলে ফেলে। কালো আবরনের নীচ থেকে সাদা ধোঁয়া বেরিয়ে এসে ছড়িয়ে পড়ে। পড়ে থাকে দু টুকরো সেদ্ধ রুটি। খাওয়া হয়ে গেলে গন্ধ চলে যায়, পড়ে থাকে খালি থালা। তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবা-মা। তাদের চোখ কিছু একটা দেখছে। যেন ছেলের শরীরে কিছু একটা দিয়ে অন্য কিছু বের ক’রে আনতে চায়। তার ছোট্ট বুক দ্রুত উঠানামা করতে থাকে। বুকের উপর হাত চেপে সে আবার কাশতে থাকে।

মা বলে, ‘‘ঘুমা, তা’হলে ভালো হ’য়ে যাবি।’’

ভালো ছেলের মতো ছোট শুয়ান কাশতে কাশতে ঘুমিয়ে পড়ে। তার দম ফেলা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত মা অপেক্ষা করে। তারপর শততালি দেয়া কাঁথা দিয়ে ঢেকে দেয়
তার শরীর।

তিন.

দোকানে লোকজন গিজগিজ করছে। বুড়ো শুয়ান ব্যস্ত। বুড়ো তামার কেটলীতে করে সে খদ্দেরদের জন্য চা বানিয়ে চলছে। তার চোখের নীচে কালো রেখা।

সাদা দাড়িওয়ালা একজন জিজ্ঞেস করে, ‘‘বুড়ো শুয়ান, তোমার কি শরীর ভালো নেই?
কি হয়েছে তোমার?’’
‘‘কিছু না।’’
‘‘কিছু না? … … তোমার হাসি দেখে মনে হচ্ছে … …’’ বুড়ো নিজেকে শুধরে নেয়।

কঁুজো বলে, ‘‘ওটা বুড়ো শুয়ানের ব্যস্ততা। যদি তার ছেলে … …’’ কথা শেষ করবার আগেই দোকানে ঢুকলো ভারী চোয়ালের এক লোক। তার কাঁধের উপর ঝুলছে বোতাম খোলা খয়েরী রঙে্‌র শার্ট, এলোমেলোভাবে ফিতে দিয়ে কোমর বাঁধা। দোকানে ঢুকতে না ঢুকতেই সে বুড়ো শুয়ানের দিকে হাঁক মারে-
‘‘সে কি ওটা খেয়েছে? কিছুটা ভালো হয়েছে? বুড়ো, তোমার কপাল ভালো! কি কপাল যদি তাড়াতাড়ি না জানতাম … …’’

এক হতে কেটলী ধরে, আর এক হাত ভক্তির সঙ্গে সোজা ঝুলিয়ে রেখে হাসিমুখে বুড়ো শুয়ান সব শোনে। আসলে সবাই মনোযোগের সঙ্গে শুনছিল। বুড়ী, তার চোখের নীচেও কালো রেখা, চা-পাতা ও জলপাই দেয়া বাটি নিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে। বুড়ো শুয়ান নতুন মানুষটির জন্য তাতে ফুটন্ত পানি ঢেলে দেয়।

বুড়ো চোয়ালের মানুষটি বলে, ‘‘এটা একেবারে ধম্বন্তরী! অন্য জিনিসের মতো নয়! একেবার ভেবে দেখ, গরম গরম কেনা, গরম গরম খাওয়া।’’

বুড়ী গদ গদ হয়ে বলে, ‘‘খাং চাচার সাহায্য না পেলে আমারা এটা জোগাড় করতে পারতাম না।’’

‘‘ধম্বন্তরী! গরম গরম খেয়েছে। মানুষের রত্তে্ক ভেজা এরকম রুটি যেকোন যক্ষারোগ সারিয়ে তুলতে পারে।’’

‘যক্ষারোগ’ কথাটা শুনে বুড়ীকে একটু বিচলিত ও ফ্যাকাশে মনে হয়। তবু জোর করে হেসে সে এক ছুতায় ভেতরে চলে গেল। এদিকে খয়েরী পোশাক পরা লোকটি অসভ্যের মতো চীৎকার করে চলছে যতক্ষণ না ছেলেটি ভেতরের কামরায় জেগে উঠে আবার কাশতে শুরু করে।

‘‘তোমার ছোট শুয়ানের কপাল ভালো! তার অসুখ পুরো সেরে যাবে। বুড়ো শুয়ানের হাসিতে অবাক হবার কিছু নেই।’’ কথা বলার সময় সাদা দড়িওয়ালা খয়েরী জামার কাছে এগিয়ে আসে। গলার স্বর নামিয়ে জিজ্ঞেস করে-
‘‘খাং চাচা আমি শুনেছি আজকে যাকে বলি দেয়া হয়েছে সে সিয়া পরিবারের। সে কে? কেন তার বলি হয়েছে?’’
‘‘কে? বিধবা সিয়ার ছেলে নিশ্চয়ই! একটা রাসকেল!’’

তাদের শোনার ভঙ্গী দেখে মিঃ খাং- এর সাহস আরো বেড়ে যায়। তার চোয়াল কেপেঁ উঠে এবং যত জোরে সম্ভব সে তত গলা চড়িয়ে দেয়।

‘‘বদমাশটা বাঁচতে চায়নি। এবার আমি কিছুই করিনি। এমনকি তার কাপড়গুলো পর্যন্ত জেলার নিয়ে গেছে। আমাদের বুড়ো শুয়ানের কপাল খুব ভালো আর তিন নম্বর চাচা সিয়ার কপালও ভালো। পুরষ্কারের পঁচিশ টেল রুপা পুরোটাই সে মেরে দিয়েছে, এক পয়সাও খরচ করতে হয়নি।’’

বুক চেপে ধরে কাশতে কাশতে ছোট শুয়ান ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। রান্নাঘরে গিয়ে সে একবাটি ঠাণ্ডা ভাত নিল। তারপর গরম পানি মিশিয়ে সেখানে বসে খেতে শুরু করে। মা ঝুকে পড়ে সোহাগের সঙ্গে জিজ্ঞেস করে,
‘‘বা’জান তোর কি ভালো লাগছে? ভুখ কি লেগেই আছে?’’

‘মহা ধম্বন্তরী।’ খাং চাচা ছেলেটির দিকে তাকায়। তারপর মুখ ঘুরায়ে লোকজনদের কিছু বলার জন্য, ‘‘তিন নম্বর চাচা সতি্যই স্মার্ট। সে খবর না দিলে তার পরিবারের ফাঁসি এবং সম্পত্তি ক্রোক হয়ে যেত। কিন্ত্ত তার বদলে? রুপা! সেই বদমাশটা সতি্যই একটা রাসকেল! সে জেলারকেও বিদ্রোহের সুড়সুড়ি দেয়।’’

পেছনের সারিতে বসা বিশ বছরের বেশী একজন ক্ষেপে উঠে, ‘‘না! এমন কথা বলবেন না।’’

‘‘তুমি জান, রক্ত-চক্ষু তাকে বাজিয়ে দেখতে যায়, কিন্ত্ত সে তার সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়। সে বলে আমরা সবাই মহান ছিং সাম্রাজ্যের মালিক। একবার ভাব, এটা কি বুদ্ধিমানের কথা? রক্ত-চক্ষু জানত বাড়ীতে তার বুড়ী মা আছে, কিন্ত্ত ভাবতে পারেনি সে এত গরীব। সে তার কাছ থেকে কিছুই আদায় করতে পারেনি। সে ভীষণভাবে ক্ষেপে গেল। তারপর সেই বুদ্ধু সাপের লেজ দিয়ে কান চুলকাতে চেয়েছে এবং সে তাকে দুটি চড় মেরেছে।’’

দেয়ালের কোনা থেকে কঁুজো খুশীতে বলে ওঠে, ‘‘রক্ত-চক্ষু ভালো মুষ্ঠিযোদ্ধা। ঐ চড়গুলোতে নিশ্চয়ই চোট লেগেছে।’’

‘‘পাজিটার মারের ভয় ছিল না। সে এমনকি তার দুঃখের কথাও বলেছে।’’

সাদা দাড়িওয়ালা বলে, ‘‘এমন মন্দ লোককে মারলে তাতে দুঃখের কিছু নেই।’’

খাং ভ্রূ কঁুচকে তার দিকে তাকায়। তারপর ঘৃণা ভরে বলে, ‘‘তুমি ভুল বুঝেছ। যেভাবে বলেছে সে লাল চক্ষুর জন্য দুঃখিত।’’

তার শে্রাতাদের চোখ চকচক করে উঠে। কিন্ত্ত কেউ কিছু বলে না। ছোট শুয়ানের ভাত খাওয়া শেষ। তার গা দিয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে, মাথা দিয়ে ভাপ বেরুচ্ছে।

যেন হঠাৎ আলো দেখতে পেয়েছে এমনভাবে সাদা দাড়ি বলে ওঠে, ‘‘লাল চক্ষুর জন্য খারাপ লাগে- পাগল! সে একটা আস্ত পাগল!’’

বিশ বছরের যুবকটিও বলে ওঠে, ‘‘সে নিশ্চয়ই পাগল!’’

খদ্দেরদের মধ্যে আবার প্রাণ ফিরে আসে। কথাবার্তা শুরু হয়। হইচই’র ভেতর ছেলেটি আবার বেদম কাশতে থাকে। খাং উঠে গিয়ে তার পিঠ চাপড়ে বলে,
‘‘মহা ধম্বন্তরী! ছোট শুয়ান এভাবে কাশবে না! মহা ধম্বন্তরী!’’
মাথা নেড়ে কঁজো বলে, ‘‘পাগল!’’

চার.

শহরের পশ্চিম ফটকের বাইরে দেয়াল ঘেষে যে জমিটুকু আছে তা এক সময় খাস জমি ছিল। পথচারীরা শর্ট-কার্ট হিসাবে কোণাকুণি যে আঁকাবাঁকা পথ বানিয়েছে তা’ই এখন সীমানা। পথের বাম পাশে ফাঁসির আসামী বা জেলে অবহেলায় মারা বন্ধীদের কবরস্থান, ডান পশে ফকিরদের কবরস্থান। পথের দু’পাশে কবরের মাটির ঢিবিগুলো দেখে মনে হয় কোন বড়লোকের জন্মদিনের সাজানো রুটি।

সে বছর ছিং মিং উৎসবের সময়টা ছিল অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। শস্যকণার মতো উইলো গাছে ছোট নতুন কুড়ি এসেছে। ভোরের আলো ফুটবার পরই ডানে একটি নতুন কবরের পাশে চার থালা খাবার ও এক বাটি ভাত নিয়ে আসে বুড়ো শুয়ানের বউ। তারপর সেখানে বিরাপ করতে থাকে। কাগুজে টাকা পোড়ানোর পর সে সেখানে চুপচাপ বসে থাকে, যেন কারো জন্যে অপেক্ষা করছে, কিন্ত্ত জানে না কার জন্য। বাতাসে তার ছোট চুল উড়ছে। গতবারের চেয়ে চুল এবার আরো সাদা হয়েছে। 

আর এক মহিলা এল। পাকা চুল, টুটা-ফাটা কাপড় পরণে। পুরনো, গোলাকার ঝুড়িতে ঝোলানো কাগুজে টাকা নিয়ে সে খুঁড়িয়ে খঁুড়িয়ে হাঁটছে। মাটিতে বসে বুড়ো শুয়ানের বউ তাকে দেখছে, দেখতে পেয়ে তার ফ্যাকাশে মুখ লজ্জায় ঢেকে গেল। তবু সে সাহস করে বাম দিকের একটি কবরে গিয়ে মাটিতে ঝুড়ি রাখল। 

সে কবরটি ছোট্ট শুয়ানের কবরের ঠিক উল্টো দিকে। মাঝখানে শুধু পথের ফারাক। সে মহিলাও চার থালা খাবার ও এক বাটি ভাত বিছিয়ে এবং কাগুজে টাকা জ্বালিয়ে বিলাপ করছে দেখতে পেয়ে বুড়ো শুয়ানের বউ ভাবল, ‘‘সে কবরে নিশ্চয়ই তার ছেলে আছে।’’ বুড়ো মহিলা উদ্দেশ্যহীনভাবে কয়েক পা এগিয়ে চারদিকে এলোমেলো তাকাল। তারপর হঠাৎ টলতে টলতে পিছিয়ে আসতে লাগল, যেন মাথা ঘুরছে।

পথ পেরিয়ে বেদনায়  ভরাক্রান্ত সে মহিলার কাছে গিয়ে বুড়ো শুয়ানের বউ নীরবে বলে, ‘‘দুঃখ করো না, চলো বাড়ী যাই!’’ 

সে সায় দিল। কিন্ত্ত তখনো একদিকে তাকিয়ে আছে। বিড় বিড়িয়ে বলে, ‘‘দেখ! ওটা কি?’’ 

বুড়ো শুয়ানের বউ দেখতে পায় সামনের কবরে তখনো ঘাস গজায়নি। ময়লা মাটি দেখা যাচ্ছে। কিন্ত্ত একটু ভালো করে তাকাতেই তার অবাক হবার পালা। দেখতে পায় মাটির ঢিবির ওপর সাদা-লাল ফুলের তোড়া।

তাদের দু’জনেরই চোখের নজর কম। তবু তারা সাদা-লাল ফুল স্পষ্ট দেখতে পায়। খুব বেশী নয়, কিন্ত্ত গোল করে সাজানো, খুব তাজা নয় কিন্ত্ত সুন্দর। ছোট্ট শুয়ানের মা তাকিয়ে নিজের ছেলের কবর দেখতে পায়। প্রায় অন্য সবগুলো কবরের মতো তার ছেলের কবরেও গুটি কয়েক শুকনো ফুল। হঠাৎ তার মনে হল সবকিছুই অর্থহীন এবং ফুলের তোড়া সম্পর্কে তার উৎসাহ দমে যায়। 

ইতোমধ্যে আরো খঁুটিয়ে দেখার জন্য বুড়ী কবরের কাছে গেছে। সে আপন মনে বলতে থাকে, ‘‘এগুলোর কোন শেকড় নেই। এগুলো এখানে জন্মাতে পারে না। কে এসেছিল? ছেলেমেয়েরা এখানে খেলতে আসে না, আত্মীয়-স্বজনরাও কখনো আসে না। ব্যাপারটা কি হতে পারে?’’ তার কাছে ব্যাপারটা ধাঁধাঁর মতো মনে হয়। ভাবতে ভাবতে তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে এবং সে বিলাপ করতে থাকে, ‘‘বা’জান সবাই তোর প্রতি জুলুম করেছে। তুই তা ভুলতে পারিস নি। সে দুঃখ জানানোর জন্যই কি তুই আজ এই কেরামতি দেখিয়েছিস?’’

সে চারদিকে তাকিয়ে দেখে, কিন্ত্ত দেখতে পায় শূন্য ডালে বসে আছে একটি কাক। সে বলতে থাকে, ‘‘আমি জানি, তারা তোকে খুন করেছে। কিন্ত্ত বিচারের দিন মালিক তার বিচার করবেন। বা’জান, শান্তিতে ঘুমা … … … তুই যদি সতি্যই এখানে আমার কথা শুনে থাকিস, তাহলে ঐ কাকটি তোর কবরের উপর দিয়ে উড়ে যাক।’’

বাতাস পড়ে গেছে অনেকক্ষণ। তামার তারের মতো শুকনো ঘাসগুলো শক্ত ও খাড়া হয়ে আছে। একটি ক্ষীণ, ভিরু শব্দ বাতাসে ভাসতে ভাসতে মিলিয়ে যায়। চারদিকে মৃত্যুর নীরবতা। তারা শুকনো ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তাদের কাকের দিকে। গাছের ডালে কাকটি লোহার মতো চুপচাপ বসে আছে।  

সময় কেটে যায়, ছেলে-বুড়ো সহ অনেকে আসে কবর জেয়ারতে।

বুড়ো শুয়ানের বউ’র মনে হয় তার বুক থেকে একটি ভারী বোঝা নেমে গেছে। চলে যাবার জন্য সে বুড়ীকে বলে, 

‘‘চল যাই।’’

বুড়ী দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। তারপর উদাসভাবে তুলে নেয় খাবার ও ভাত। এক মুহূর্ত ইতস্ততঃ করে সে ধীরে ধীরে চলতে থাকে। তখনো সে বিড় বিড় করছে,

‘‘এর মানে কি?’’

তারা ত্রিশ কদমও যায়নি। পেছনে শুনতে পায় কাকের ডাক। থতমত খেয়ে পেছনে তাকায়, দেখতে পায় পাখা মেলে কাকটি তীরের মতো দূর দিগন্তের দিকে উড়ে যাচ্ছে।

৩ বর্ষ. ৬ সংখ্যা. ভাদ্র ১৪০৯. সেপ্টেম্বর ২০০২

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।