উইলিয়াম ফকনারের নোবেল বক্তৃতা
অনুবাদ: খাদিজা ভূঁইয়া
[নোবেল জিতেছিলেন ১৯৪৯ সালে, তার উপন্যাসগুলোর জন্যে,সংখ্যায় মোট ১৮ টি। জন্মেছিলেন অক্সফোর্ডের কাছে মিসিসিপির অন্তর্গত অ্যালবানীতে। তিনি স্কুল জীবনেই গড়েছিলেন তার মনের ভূবন; ব্যবহৃত হয়েছেন ইউএস আর্মির দ্বারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। যুদ্ধের পর তিনি মিসিসিপি ইউনিভারসিটিতে একটি সময়ের জন্য ভর্তি হন এবং তারপর বিভিন্ন সময়ের মধ্যে নানাপ্রকার চাকুরীতে জড়িত হন। নিউ অরলিন্সে কাজ করবার সময় তিনি পরিচিত হন শেরউড এন্ডারসনের সঙ্গে, ঔপন্যাসিক; তিনি প্রলুব্ধ করেছিলেন তাকে এবং সাহস দেখিয়েছিলেন। যার ফলে তিনি তার প্রথম উপন্যাস Soldier’s Pay (1926) আবারো লিখা শুরু করেন। ১৯২৯ এ তার বিয়ের বছরে একটি স্থানীয় পাওয়ার স্টেশনে কয়লা শ্রমিকের রাতের কাজ নেন এবং As I Lay Dying (1932) উপন্যাসটি লিখেন। অনেক পরে তিনি হলিউডে স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে চাকরী নেন শুধুমাত্র পয়সার জন্যে। কানাডিয়ান ফ্লাইং কর্পোরেশনে কাজ করা ফকনার নিউইয়র্কের এক বইয়ের দোকানেও কেরানীর কাজ করেছেন। তার মৃত্যুর বেশিদিন আগের কথা নয় ফকনার ১৯৬২ সালের তার স্থান পরিবর্তন করেন এবং ভার্জিনিয়ায় শার্লটস্ভিলেতে চলে আসেন। তিনি নোবেল পান সাহিত্যের জন্যে। তার বইগুলোর মধ্যে হ’লো Light in August (1932), The Wild Palms (1939), Go Dawn, Moses (1942), Requiem for nun (1951), Absalom, absalim! (1936) ইত্যাদি।]
স্পষ্টই বুঝতে পারছি পুরস্কারের লক্ষবস্তুটি আমি নই- আমার কাজ; এক জীবনের কাজ, চেতনার যন্ত্রণা আর ঘামে সার্থক যেটি। কোন গৌরব আর লাভ-অলাভের ব্যাপার নয়, কিন্তু মানব চেতনার জড়তার বাইরে এমন কিছু সৃষ্টি করা যা পূর্বে ছিলো না। অতএব, এই পুরস্কার, আমার বিশ্বাস, আমার জন্যই। পুরস্কারের অর্থের যে অংশটি, তা উৎসর্গ করার জন্য কাউকে খুঁজে বার করা কষ্টকর নয়, যা কিনা এর উৎপত্তির উদ্দেশ্য ও তাৎপর্যের সঙ্গে যথার্থ। কিন্ত্ত আমি যেটা করতে চাই তা হ’লো এই স্মরণীয় মূহুর্তে সবাইকে প্রাণভরে অভিবাদন জানাতে চাই, যারা শুনছেন, ইতোমধ্যেই যারা উল্লেখিত যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতায় শামিল হয়েছেন সেই তরুণ-তরুণীদের। এদের মধ্য হ’তে কেউ হয়তো এখানটায় দাঁড়াবে একদিন, যেখানে আমি এখন দাঁড়িয়ে।
আমাদের ট্র্যাজেডি আাজ, বিশ্বজুড়ে একটা বস্তুগত ভীতি বিরাজ করছে- এত সময় ধ’রে যে, এতে আমরা অভ্যস্ত হ’য়ে পড়েছি। চেতনার কোন বড় সমস্যা নেই এখানে। প্রশ্ন একটাই: কখন আমি ধ্বংস হ’য়ে যাব? এর জন্যই তরুণ লেখকরা আজ বিস্মৃত হ’চ্ছে অন্তর্দ্বন্দ্ব-পূর্ণ মানব হৃদয়ের সমস্যাগুলো, যা হ’য়ে উঠতে পারে উৎকৃষ্ট কোন রচনা, কেননা তা মূল্যবান ঘামে আর যন্ত্রণায় লেখা।
লেখকদের অবশ্যই জানতে হবে। সে অবশ্যই জানবে যে সবকিছুর ভিত্তি হ’চ্ছে ভীতিবোধ? সে নিজেকে শিক্ষা দেবে এই যে, বিস্মৃত হও; কোন স্থান নেই এসবের- পুরনো মূল্যবোধ আর হৃদয়ের সত্য ছাড়া, সেই প্রাচীন বিশ্বজনীন সত্য যা ব্যতিত সব গল্পই ক্ষণজীবী, ব্যর্থ। তা হোক প্রেম অথবা সম্মান, দয়া অথবা অহংকার, সমবেদনা কিংবা উৎসর্গের। তেমন না হ’লে তার সকল শ্রমই ব্যর্থ। তখন প্রেম নয়- লালসার উপাখ্যান রচিত হয়, জয় আর পরাজয়ের উপাখ্যান- যে পরাজয় কেড়ে নেয় নি মূল্যবান কিছু, যে জয়ে নেই কোন আশা। সবচাইতে নিকৃষ্ট যা তা হ’লো দয়া বা সহানুভূতির অনুপস্থিতি। তার দুঃখ, তার বেদনা পৃথিবীর বুকে কোন চিহ্ক রেখে যায় না। সে হৃদয় নয় – হৃদযন্ত্রের কথা বলে।
এই বিষয়গুলো জেনে যখন কোন লেখক লিখতে শুরু করেন, তিনি যেন মানুষের মাঝে থেকে মানুষের পরিণতি দেখতে পান। আমি মানুষের শেষ পরিণতি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাই। এটা ব’লে ফেলা সহজ যে, মানুষ অমর শুধুমাত্র এজন্যে যে সে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জানে। যখন ধ্বংসের শেষ ঘন্টা বাজবে, ম্রিয়মান শেষ বিকেলের শেষ সীমানা হ’তে, এমনকি তখনো কেউ ব’লে যাবে- ক্ষীণ, অবিনাশী কন্ঠস্বরে। আমি কিন্তু বিশ্বাস করি- মানুষ টিকেই থাকবে না শুধু, সংগ্রাম ক’রে বেঁচে থাকবে। মানুষ অমর শুধু এজন্য নয় যে সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র সেই অবিনাশী কন্ঠস্বরের অধিকারী, বরং এজন্যে যে সে এমন এক চেতনাকে ধারণ করে যে সহানুভূতিশীল, ত্যাগী, অস্তিত্বগর্বী লেখক আর কবিদের কাজ এসব বিষয় প্রকাশ করা। এটাই তার বড় পাওয়া যে মানুষকে টিকে থাকার সংগ্রামে সাহায্য করে হৃদয়বৃত্তির উন্নয়নে, স্মরণ করিয়ে দেয় তার অতীতের গৌরবগাঁথা- সাহস আর সম্মানের, আশা এবং গর্বের, সহানুভূতি ও দয়া আর ত্যাগের। কবির কন্ঠস্বর শুধু বর্ণনাই ক’রে যাবে না, তা হবে মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামের একেকটি স্তম্ভ।








০ টি মন্তব্য