ইচ্ছেকুহক

পারভেজ শিশির

এক.

রাত তখন প্রায় আড়াইটা। ঘরের বাইরে প্রকৃতি তখন গভীর ঘুমে মগ্ন, কেবল জানালা বেয়ে অবিরাম একঘেয়ে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। আমার পড়ার টেবিলের ওপর রাখা ছোট ল্যাম্পটার বৃত্তাকার হলুদ আলো এসে পড়েছে খাতার সাদা পাতাগুলোর ওপর। মনের মধ্যে নানা রকম চরিত্রের আনাগোনা আর চরিত্রায়ন চলছে সাদা পাতায় কালো কালির আঁচড়ে। ঠিক সেই নিস্তব্ধ মুহূর্তে আমার মোবাইলটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। টেবিলে রাখা ফোনটার স্ক্রিন আলো করে ভেসে উঠল একটি নাম, ‘তারিক আব্দুল্লাহ’। নামটা দেখার সাথে সাথেই মনের মধ্যে এক অদ্ভুত ভালো লাগার উষ্ণতা খেলে গেল, ক্লান্তি নিমেষে উবে গেল যেন। তারিক ভাইয়ের সাথে এই গভীর রাতের দীর্ঘ আলাপচারিতা না হলে যেন আমার দিনটাই কোনোদিন পূর্ণ হতো না। একজন লেখকের জীবনে তার প্রকাশকেরও যে কত ভূমিকা থাকে, সেটার উদাহরণ এই তারিক ভাই। জানা অজানায় মেশা এই লোকটির সাথে এই কয়েকটি বছরে দারুণ একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

বিনা দ্বিধায় রিসিভ বাটনটা ছুঁয়ে ফোনটা কানের কাছে ধরতেই ওপার থেকে ভেসে এলো চিরচেনা ক্লান্ত অথচ অদ্ভুত দীপ্তিময় কণ্ঠস্বর। চিরাচরিত বিনয় নিয়ে এক অদ্ভুত মায়া জড়ানো গলায় তিনি বললেন, “আজাদ ভাই, জেগে আছেন? স্যরি, এই গভীর রাতে বিরক্ত করলাম কি না, বুঝতে পারছি না।”

আমি খাতার ওপর থেকে আলতো করে কলমটা সরিয়ে রেখে হাসিমুখে চেয়ারে একটু নড়েচড়ে বসলাম। কণ্ঠে স্বাভাবিক উষ্ণতা এনে বললাম, “না তারিক ভাই, এই তো কাজ করছি। রাতের এই নিরিবিলিতে আপনার গলা শুনলে এমনিতেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়, উল্টো কাজের একটা নতুন স্পৃহা ও শক্তি খুঁজে পাই।”

তারিক ভাইয়ের গলায় এমন এক ধরনের নিজস্ব মাদকতা বা সম্মোহনী শক্তি ছিল, যা মানুষকে সহজেই কাছে টানতে পারে ব’লে অন্তত আমার মনে হয়। তিনি তখনো ঘুমাননি। গভীর রাতের এই নিস্তব্ধতায় তিনি হয়তো ‘ইচ্ছেকুহক’-এর কোনো নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপি বা ফর্মা নিয়ে বসে আছেন। তাঁর কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিল না; রাত যত গভীর হতো, তাঁর ভেতরের প্রুফরিডার বা সম্পাদক তত বেশি সজাগ হয়ে উঠত। কথায় কথায় তিনি চলে গেলেন তাঁর আজন্মের সেই স্বপ্নের কথায়, যে স্বপ্ন তিনি লালন করতেন বাংলা সাহিত্য আর অনুবাদকে ঘিরে।

একটু থেমে, গলার স্বরটাকে সামান্য নামিয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন, “দেখুন আজাদ ভাই, আমরা নিজেদের মধ্যে কত কথাই তো বলি, কিন্তু একবার ভেবে দেখেছেন কি, ইউরোপের বড় বড় লাইব্রেরিতে আমাদের সাহিত্যের উপস্থিতি কতটুকু? আমাদের এই সমৃদ্ধ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে হবে। আমাদের অনুবাদগুলো যদি আন্তর্জাতিক মানের না হয়, তবে বিদেশের একজন পাঠক আমাদের চিনবে কী করে? আমাদের ক্লাসিক সৃষ্টিগুলো, আমাদের সমসাময়িক কবি-লেখকদের শক্তিশালী লেখাগুলো যদি ইংরেজি বা অন্য কোনো বিশ্বভাষায় বিশ্ব দরবারে না পৌঁছায়, তবে আমাদের এই লেখক ও প্রকাশনার জগত টিকিয়ে রাখার সার্থকতা কোথায়? এই দায় তো আমাদেরই নিতে হবে।”

তারিক আব্দুল্লাহ, এই মানুষটির জীবন চাইলে অন্য দশজন মানুষের মতো সম্পূর্ণ অন্যপথে চলতে পারত। তিনি ইচ্ছা করলেই লন্ডনের কোনো অভিজাত এলাকার বর্ণিল ও বিলাসবহুল জীবনে থিতু হতে পারতেন। তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই বহু বছর ধ’রে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। পারিবারিক সূত্রে বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রবাসী হওয়া তাঁর জন্য একরকম ডালভাত ব্যাপার ছিল। কিন্তু তিনি সেই সহজ রাস্তাটা মাড়াননি। প্রকাশনার জগত, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অবর্ণনীয় টান, আর এই বাংলার মাটি কামড়ে পড়ে থাকা লেখক, কবি ও শিল্প-সংস্কৃতির মানুষদের মায়া তিনি কোনোভাবেই ত্যাগ করতে পারেননি।

তিনি প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন, “সবাই যদি একে একে বিলেতে বা অন্য কোনো দেশে পাড়ি জমায়, তবে এই ঘিঞ্জি, ধুলোবালিভরা ঘামঝরা বাংলাবাজারে ব’সে লেখকের স্বপ্নের অক্ষরগুলো কে সাজাবে? এই বাংলার মাটির যে সোঁদা গন্ধ, মানুষের মুখের যে না বলা ভাষা শব্দ, তা তো ওই বিদেশের দামী পাউন্ড বা ডলার দিয়ে কোনোদিন কেনা যায় না, বলেন আজাদ ভাই!”

তাঁর এই দেশপ্রেম, নিজের শিকড়ের প্রতি নিখাদ টান আর শিল্পের প্রতি সুগভীর দায়বদ্ধতা আমাকে সবসময় মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। রাতের পর রাত আমাদের ফোনে কথা হতো। কখনো কথা হতো বিশ্বের অনুবাদ সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে, কখনো গল্প কবিতার নিখুঁত গঠনরীতি ও পঙক্তিমালা নিয়ে, আবার কখনো বা বাংলা প্রকাশনা শিল্পের ভবিষ্যৎ ও সংকট নিয়ে। তাঁর এই ক্লান্তিহীন পরিশ্রম এবং বইয়ের প্রতি পাগলামির পেছনে ছিল এক ধরনের সুপ্ত জেদ, বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বমানের উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার আন্তরিক ইচ্ছে, যা কেবল সত্যিকারের শিল্পবোদ্ধা ও স্বপ্নদ্রষ্টাদের মাঝেই দেখা যায়। সেইসব রাত্রির প্রতিটি কথা আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

দুই.

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অমর একুশে বইমেলা মানেই অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য, অন্যরকম উৎসবের আমেজ। এই একই উদ্যানে, অন্য সময় দেখা যাবে, হয়তো দল বেঁধে ছেলেরা ফুটবল খেলছে, অথবা ভেতরে যে মন্দিরটি রয়েছে সেখানে কোনো না কোনো পূজাপার্বণ চলছে এবং সেই উপলক্ষে খাবারের অস্থায়ী দোকান বসেছে। তবে ফেব্রুয়ারি এলেই এই উদ্যানের চেহারা পালটে যায়, স্টলগুলো আস্তে আস্তে নির্মাণশিল্পীদের কারুকার্যে সেজে উঠতে থাকে।

মেলার সেই পরিবেশের মধ্যে একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হলাম। সেদিন বিকেলে মেলায় উপচে পড়া ভিড়, চারদিকে মানুষের ঠেলাঠেলি আর হইচই। ঠিক সেই চরম ব্যস্ততার মুহূর্তে হঠাৎ খেয়াল করলাম, সুহাসিনী একটু চড়া ও রুক্ষ স্বরে তারিক ভাইকে কী যেন বলছেন। মেলার তীব্র কোলাহল আর মাইকের আওয়াজে তাঁদের কথাগুলোর প্রতিটি শব্দ আমার কান পর্যন্ত পরিষ্কার পৌঁছায়নি, কিন্তু সুহাসিনীর শরীরের ভঙ্গি এবং চেহারার কাঠিন্য পরিষ্কার বলে দিচ্ছিল যে কাজের প্রচণ্ড চাপ বা কোনো একটা ভুলত্রুটিতে তাঁর মেজাজ বেশ তিরিক্ষি হয়ে আছে। চারপাশের শত শত মানুষের ভিড়ে একজন স্ত্রীর এমন প্রকাশ্য তিরস্কার যে কোনো মানুষের জন্যই বিব্রতকর হওয়ার কথা।

ফাগুনের শেষবেলার মিষ্টি রোদ ছাপিয়ে চারপাশের বাতাসে তখন উড়ছে শুকনো ধুলোবালি, মাইকে ভেসে আসছে একের পর এক নতুন বইয়ের ঘোষণা, আর বইপ্রেমী মানুষের উপচে পড়া সমুদ্রসমান ভিড়। এই কোলাহলপূর্ণ ও কর্মব্যস্ত মেলার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ইচ্ছেকুহক’-এর স্টলটা বরাবরই একটু আলাদা রূপ নিয়ে মাথা উঁচু করে থাকত। কোনো চটকদার বা দৃষ্টিকটু সাজসজ্জা না থাকলেও, স্টলটার ভেতরে প্রবেশ করলেই একটা স্নিগ্ধ আভিজাত্য আর গভীর সাহিত্যিক আবেশ অনুভূত হতো।

স্টলের ঠিক মাঝখানের কাঠের চেয়ারটায় বসে থাকতেন তারিক ভাই। পরনে তাঁর চিরচেনা সাধারণ একটি সুতির পাঞ্জাবি, গায়ে কিংবা চেহারায় নেই কোনো বাড়তি অহংকার বা আড়ম্বর। চোখের গভীরে জমাট বাঁধা রাতের পর রাত জাগার ক্লান্তি স্পষ্ট ফুটে উঠত, অথচ কেউ তাঁর দিকে তাকালেই ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠত এক অনবদ্য, মায়াবী হাসি। বইমেলা চলাকালীন এই মানুষটি যেন ঘুম-খাওয়া ভুলে কেবল পাঠকের হাতে একটি ভালো বই তুলে দেওয়ার আনন্দে বিভোর থাকতেন।

ঠিক তাঁর পাশেই ব’সে থাকতেন তাঁর সহধর্মিণী সুহাসিনী চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সাথে মাস্টার্স সম্পন্ন করা এই মানুষটির রক্তে ও মননে মিশে ছিল খাঁটি সাহিত্যচর্চা। সুহাসিনীর সাহিত্যের প্রতি অগাধ অনুরাগ এবং ভাষার ওপর নিখুঁত দখল ছিল চোখে পড়ার মতো। ‘ইচ্ছেকুহক’-এর জন্মলগ্ন থেকেই তারিক ভাইয়ের প্রতিটি কাজে সুহাসিনী ছায়ার মতো জড়িয়ে থাকতেন। স্টলে সাজানো কোনো নতুন বইয়ের প্রচ্ছদটি কেমন হলো, রঙের বিন্যাসে কোনো ভুল আছে কি না, কিংবা ভেতরের ফর্মার কোনো পৃষ্ঠায় বানান বা প্রুফে সামান্যতম ত্রুটি রয়ে গেল কি না, সবকিছুর ওপর তাঁর তীক্ষ্ণ ও নিখুঁত নজর থাকত। তারিক ভাই যদি হন সেই প্রকাশনার স্বপ্নদ্রষ্টা আর কারিগর, তবে সুহাসিনী ছিলেন সেই স্বপ্নের নিপুণ ভাস্কর, যিনি প্রতিটি কাজকে ত্রুটিহীন করার পণ করেছিলেন।

মেলার সেই পরিবেশের মধ্যে একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হলাম। সেদিন বিকেলে মেলায় উপচে পড়া ভিড়, চারদিকে মানুষের ঠেলাঠেলি আর হইচই। ঠিক সেই চরম ব্যস্ততার মুহূর্তে হঠাৎ খেয়াল করলাম, সুহাসিনী একটু চড়া ও রুক্ষ স্বরে তারিক ভাইকে কী যেন বলছেন। মেলার তীব্র কোলাহল আর মাইকের আওয়াজে তাঁদের কথাগুলোর প্রতিটি শব্দ আমার কান পর্যন্ত পরিষ্কার পৌঁছায়নি, কিন্তু সুহাসিনীর শরীরের ভঙ্গি এবং চেহারার কাঠিন্য পরিষ্কার বলে দিচ্ছিল যে কাজের প্রচণ্ড চাপ বা কোনো একটা ভুলত্রুটিতে তাঁর মেজাজ বেশ তিরিক্ষি হয়ে আছে। চারপাশের শত শত মানুষের ভিড়ে একজন স্ত্রীর এমন প্রকাশ্য তিরস্কার যে কোনো মানুষের জন্যই বিব্রতকর হওয়ার কথা।

কিন্তু তারিক ভাইয়ের প্রতিক্রিয়াটি ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও অসাধারণ। তিনি সামান্যতম বিরক্ত হলেন না, মুখের ওপর সামান্যতম ভাঁজও দেখা গেল না। বরং তাঁর ঠোঁটের সেই স্নিগ্ধ হাসিটা আরও একটু গাঢ় হলো। তিনি স্ত্রীর মুখের ওপর কোনো পাল্টা কথা না বলে বরং সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে মাথা নিচু করে নিলেন, যেন মনে হলো তারিক ভাই তার স্ত্রীর এমন কথায় কিছুই ভাবলেন না। তিনি সুহাসিনীর কথার কোনো প্রত্যুত্তোর করলেন না, কিন্তু চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে সেই দৃশ্যটি আমার মনে একটা অদ্ভুত দাগ কেটেছিল।

সেদিন গভীর রাতে যথারীতি তারিক ভাইয়ের সাথে যখন ফোনে আমার দীর্ঘ আলাপ হলো, তখন মনের কৌতূহল আর চেপে রাখতে পারলাম না।

আলতোভাবে প্রসঙ্গটি তুলতেই ফোনের ওপার থেকে তারিক ভাইয়ের এক চিলতে মৃদু হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত নমনীয় গলায় বললেন, “আরে আজাদ ভাই, সুহাসিনী একটু এমনই! আসলে ওর মাথার ভেতর সবসময় একেবারে নিখুঁত একটা সাহিত্যের জগত ঘুরপাক খায় তো, তাই কাজের সামান্য এদিক-সেদিক হলে, ও সেটা সহজে সহ্য করতে পারে না। একটু খুতখুতে স্বভাবের তো বটেই! তবে বিশ্বাস করুন আজাদ ভাই, ও রাগ করে ঠিকই, কিন্তু ও যদি মানসিকভাবে আমার পাশে না থাকত, তবে এই ‘ইচ্ছেকুহক’ কবেই ধ্বসে পড়ত, মাটির সাথে মিশে যেত। আমার সমস্ত খামখেয়ালি আর পাগলামির সবচেয়ে বড় ও একমাত্র সহযাত্রী তো ও-ই। ও আমাকে বাইরে থেকে কাজের চাপে যতটা বকে বা কড়া কথা বলে, ভেতর থেকে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি আমাকে ও আমার কাজকে ভালোবাসে। ওর ওই বকুনিগুলোর ভেতরেই আমার প্রতি ওর নিখাদ যত্ন লুকিয়ে থাকে।”

তাঁদের এই দাম্পত্যের টানাপোড়েন, মান-অভিমান আর গভীর নিবিড় বোঝাপড়ার কথাগুলো শোনার পর আমার ভাবনার জগতটা বদলে গিয়েছিল। সেদিন আমার উপলব্ধি হয়েছিল, একটি সফল ও মানসম্মত প্রকাশনীর পেছনে কেবল পাণ্ডুলিপি, কাগজ, প্রিন্টিং প্রেস আর টাকার লেনদেন থাকে না; এর পেছনে লুকিয়ে থাকে এমন কিছু অদৃশ্য আত্মত্যাগ, না বলা বোঝাপড়া এবং অন্তহীন বিশ্বাসের বুনন, যা বাইরে থেকে সহজে দেখা যায় না। তারিক ভাই আর সুহাসিনীর এই বোঝাপড়া থেকে আরও একবার জীবনের কিছু প্রয়োজনীয় পাঠ পাওয়া গেল।

তিন.

‘ইচ্ছেকুহক’-এর ছোট্ট ও স্নিগ্ধ গোছানো পরিবেশের ভেতরে কম্পিউটার কম্পোজের টেবিলটা ছিল যেন এক আলাদা জগত। কীবোর্ডের ওপর যার দুটি আঙুল চলত ঠিক পিয়ানো বাদকের জাদুকরি ছন্দে, সে ছিল মেহরাব। মাথায় একটা পরিপাটি টুপি পরা, ওকে দেখে প্রথমদিনই আমার মনে হয়েছিল, ছেলেটা খুব ভালো স্বভাবের হবে। কারণ আমি ঠিকানা চিনতে না পারার কারণে প্রথম যেদিন ইচ্ছেকুহকে আমি গিয়েছিলাম, সেদিন ও এসেছিল ওদের প্রকাশনীর মোড়ে আমাকে নিতে।

সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশ থেকে আসা মাদ্রাসায় পড়া সেই শান্ত ও লাজুক স্বভাবের তরুণের হাতের ছোঁয়ায় কম্পিউটার স্ক্রিনের সাদাকালো অক্ষরগুলো নিমেষে জীবন্ত হয়ে উঠত। দ্রুত লয়ের টাইপিং ছাড়াও প্রমিত বাংলা বানান নিয়ে মেহরাবের যে সহজাত ও সূক্ষ্ম জ্ঞান ছিল, তা এই বয়সের একটি ছেলের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না। বইয়ের প্রুফ দেখার ক্ষেত্রে তার চোখ ছিল অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত; পাতার পর পাতা অন্ধের মতো টাইপ করে যাওয়ার সময়ও কোনো না কোনো বানান বা ব্যাকরণগত ত্রুটি তার চোখ এড়াতে পারত না। প্রকাশক হিসেবে তারিক ভাই গুণী মানুষ চিনতে ভুল করেন না, আর তাই মেহরাবকে তিনি নিজের ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন এবং তার কাজের ওপর তাঁর অগাধ ভরসা ছিল। আমি যেদিন প্রথম মেহরাবকে আমার পাণ্ডুলিপি দিলাম, সেদিন সে আমাকে শুধু এতটুকুই বলল, “আপনার কোনো চিন্তা করা লাগবে না, পারভেজ ভাই, আমি আমার যথাসাধ্য সুন্দর করে আপনার বই উঠিয়ে দেবো”।

একদিন গভীর রাতে যথারীতি তারিক ভাইয়ের সাথে কাজের ফাঁকে ফোনে কথা হচ্ছিল। নানা প্রচ্ছদ, অনুবাদ ও লেখার আলোচনা করতে করতে এক ফাঁকে প্রসঙ্গক্রমে আমি মেহরাবের কথাটা তুলে বসলাম। একটু স্নেহের সুরেই তারিক ভাইকে বললাম, “তারিক ভাই, আপনার অফিসের ওই কম্পোজার ছেলেটা, মানে মেহরাব, সত্যি খুব চমৎকার কাজ করে। ওর মাথা যেমন পরিষ্কার, তেমনি কাজের প্রতি ওর নিষ্ঠাও দারুণ। ছেলেটাকে একটু দেখেশুনে রাখবেন, আজকাল এমন ডেডিকেটেড ছেলে পাওয়া মুশকিল।”

আমার এই সাধারণ প্রশংসা শোনার সাথে সাথেই টেলিফোনের অন্যপ্রান্তে তারিক ভাইয়ের গলার স্বরটা মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন পাল্টে গেল। ওপার থেকে ভেসে এল এক পলকের পিনপতন নীরবতা। রাতের সেই নিস্তব্ধতাকে ভারী করে তুলে, ওনার ক্ষণিকের নীরবতা যেন আমার বুকটাতেও একটা ছোট্ট ধাক্কা দিল। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে মেহরাবের প্রশংসা করার মতো একটা সহজ কথায় কেন হঠাৎ হঠাৎ এমন চুপ ক’রে গেলেন কেন।

বেশ কয়েক সেকেন্ডের অস্বস্তিকর নীরবতা ভেঙে তারিক ভাই খুব ধীরেসুস্থে, ভারী গলায় বললেন, “মেহরাব এখন আর ‘ইচ্ছেকুহক’-এ নেই, আজাদ ভাই”।

আমি সামান্য অবাক হয়ে কৌতূহলী কণ্ঠে বললাম, “নেই মানে? হুট করে চলে গেল কোথায়? অন্য কোনো বড় প্রকাশনীতে চাকরি পেয়েছে নাকি?”

তারিক ভাই সামান্য থেমে, অত্যন্ত শীতল ও নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিলেন, “কোথাও গিয়েছে কি না জানি না। ওকে আমি নিজেই অফিস থেকে বের করে দিয়েছি।”

কথাটা আমার কানে যাওয়ার সাথে সাথেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠল, একটা সূক্ষ্ম খটকাও লাগল। মাদ্রাসার সেই অত্যন্ত ভদ্র, শান্ত, নিভৃতচারী এবং মার্জিত স্বভাবের তরুণ ছেলেটিকে তারিক ভাই কেন নিজের হাতে বের করে দেবেন? আমি তো গত কয়েক বছর ধরে তারিক ভাইকে চিনি, মানুষ হিসেবে তিনি অসম্ভব কোমলহৃদয় এবং স্নেহসুলভ। ছোটোখাটো ভুলত্রুটি তো দূরের কথা, কারো ওপর চড়া গলায় কথা বলতেও তাঁকে কোনোদিন দেখিনি। অথচ সেই মানুষটির গলাতেই মেহরাবের বের ক’রে দেয়ার কথাটা শোনার সময় একটা অদ্ভুত ও অচেনা কঠোরতা টের পেলাম। আমার মুখের প্রশ্নটা আর গলার ভেতর থেকে বের হতে চাইল না। জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম, কী এমন হলো যে তাকে বের ক’রে দিতে হলো!

আমি আর একটু পরিষ্কার করে জানতে চাইলে তারিক ভাই খুব সংক্ষিপ্ত ও রহস্যজনক ভঙ্গিতে শুধু এটুকু বললেন, “সব কথা সব সময় প্রকাশ করতে নেই, বলাও যায় না, আজাদ ভাই। জীবনের কিছু সমীকরণ বড় জটিল। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে ঠিক নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত কাজ করার জন্য, তারপর নানা কারণে বিশ্বাস অবিশ্বাসে তাদের রাস্তা চিরতরে আলাদা হয়ে যায়। যতটুকু সময় ওর থাকার কথা, মেহরাবও সেটুকু সময়ই ছিল…”

এরপর আমি আর জোর ক’রে কিছু জানতে চাইনি, কারণ তারিক ভাইয়ের সেই কণ্ঠস্বরে এক ধরণের অস্বস্তি আর সামান্য বিরক্তিও ছিল, তাই মেহরাবের ব্যাপারে আর কোনো প্রশ্ন করার ইচ্ছে আমার হয়নি। মেহরাবের সেই আকস্মিক চ’লে যাওয়ার পেছনের আসল সত্যটি কী ছিল, তা আজও আমার কাছে এক পরম অমীমাংসিত রহস্য হয়ে রয়ে গেছে। মেহরাবের পার্সোনাল মোবাইল নাম্বারটাও রাখা হয়নি। ওর সেই শান্ত মুখখানা আর তারিক ভাইয়ের অচেনা কঠোরতার সুরটি মিলিয়ে গিয়ে আমার মনে একটা গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল, যার কোনো উত্তর কোনোদিনই আর পাওয়া হবে না।

চার.

অমর একুশে বইমেলার কোলাহল প্রতিদিনই শুরু হয়ে যায় বিকেল থেকেই। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কাঁচা মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়া বিকেলে মেলার একটা বিশেষ আকর্ষণ আমার কাছে ‘ইচ্ছেকুহক’-এর স্টলটি। নিজের বই ইচ্ছেকুহকে প্রদর্শিত হচ্ছে, সেটা তো একটা বিষয় আছেই, তবে অন্যান্য লেখক কবিসাহিত্যিকদের সাথে দেখা ও আলাপ করার সুযোগটাও একটা বিরাট আনন্দের ব্যাপার। মেলার বাকি স্টল ও প্যাভিলিয়নগুলোতে বই বিক্রির ধুম চলছে, বেশ কয়েকটা প্যাভিলিয়ন আর স্টলে সেলিব্রিটি লেখক ও কবিদের অটোগ্রাফ নিচ্ছে ক্রেতাপাঠকেরা, তখন ‘ইচ্ছেকুহক’-এর চারপাশটা কেমন যেন এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ ও শান্ত দ্বীপে পরিণত হতো। সেদিন বিকেলেই মেলার মাঠে এসে আমার সাথে যোগ দিয়েছিলেন আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ট এবং সাহিত্যপাগল তিন কবিবন্ধু, শিরিন তৌফিক, আহমেদ মোর্তুজা এবং সাব্বির আশরাফ। আমরা চারজন মিলে যখন দীর্ঘ সময় ধ’রে বইয়ের স্টলগুলো ঘুরে ক্লান্ত, ঠিক তখন আমাদের পা আপনাআপনি গিয়ে থামল ‘ইচ্ছেকুহক’-এর সামনে।

আমরা স্টলের কাছাকাছি পৌঁছানোর সাথে সাথেই তারিক ভাই আমাদের দিকে তাকিয়ে যে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন, তা আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। বয়স ও খ্যাতির কোনো অহংকার তাঁকে কখনো ছুঁতে পারেনি; বরং তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের বসার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখের সেই চিরচেনা ক্লান্ত অথচ মায়াবী হাসিটা ছড়িয়ে পড়ল সারা মুখে এবং একে একে আমাদের চারজনকে খুব উষ্ণভাবে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এই আন্তরিকতায় কোনো কৃত্রিম বাণিজ্যিক ভদ্রতা ছিল না, এর মধ্যে ছিল খাঁটি মানুষের বিনয় ও ভালোবাসা।

সেদিনের সেই বিকেলটা আমাদের কবি বন্ধুদের সেই অন্তরঙ্গ আড্ডা, সাহিত্য নিয়ে অন্তহীন তর্ক-বিতর্ক আর তারিক ভাইয়ের সেই অমায়িক, নির্ভেজাল হাসিতে একাকার হয়ে একটা চমৎকার মায়াবী সময়ে রূপ নিয়েছিল। ঠিক সেই সময়টাতে আমাদের সেই আড্ডার সুরক্ষাবলয় ভেঙে হঠাৎ করেই এসে হাজির হলেন বাংলাবাজারেরই পরিচিত অন্য একটি প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনীর দুই প্রকাশক। তাঁদের গায়ে বিত্তবৈভবের একটা চটকদার ছাপ স্পষ্ট ছিল।

আমাদের বসার জন্য স্টলের ছোট জায়গাটায় তক্ষণাৎ ব্যবস্থা করা হলো। আহমেদ মোর্তুজা স্টলের তাকগুলোয় সাজানো বইগুলোর ওপরে একটা আলতো বুলবুলি বুলিয়ে তারিক ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধতার সুরে বলে উঠলেন, “তারিক ভাই, সত্যি বলছি, মেলার এই বিশাল বাজারে আপনাদের এই ছোট্ট স্টলটার পরিবেশটাই আলাদা। চারপাশে শুধু বই বিক্রির তোড়জোড় আর বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা, অথচ আপনাদের এখানে পা রাখলেই মনে হয় কোনো এক শুনশান লাইব্রেরির কোণায় বসে আছি। বইগুলো সাজিয়েছেনও খুব সুন্দর ক’রে”

আহমেদ মোর্তুজার কথা শেষ হতে না হতেই শিরিন তৌফিক স্টলের টেবিলে বইগুলোর উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। সেখান থেকে তারিক ভাইয়ের সদ্য প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক অনুবাদের কবিতার বই নিজের হাতে তুলে নিলেন। বইটির প্রচ্ছদ ও পাতার ফিনিশিং দেখে শিরিন পাতার পৃষ্ঠা উল্টে উল্টে মুগ্ধ গলায় বললেন, “বইটির কাগজ, ফন্টের সাইজ এবং বাঁধাইয়ের মান তো সত্যিই অসাধারণ! আজকালকার দিনে এত মার্জিত রুচি নিয়ে বই প্রকাশ করে এমন প্রকাশক বাংলাবাজারে আর কয়জনই বা পাওয়া যায় বলুন তো?”

ঠিক তখনই সাব্বির আশরাফ তারিক ভাইয়ের কাঁধে পরম বন্ধুসুলভ একটা মৃদু চাপড় দিয়ে হাসিমুখে বলে উঠলেন, “তাছাড়া আমাদের আজাদ ভাই তো আপনার এই ‘ইচ্ছেকুহক’ আর তার প্রকাশিত ‘কাব্যনন্দিনী’ নিয়ে সারাক্ষণ মেতে থাকেন। আমাদের আড্ডার টেবিলে আপনার নামটা এখন রোজকার আলোচনার বিষয়। আপনার মতো একজন স্বপ্নবাজ মানুষের সাথে আমাদের এই পরিচয়টা সত্যি আমাদের জীবনের একটা বড় সৌভাগ্য, তারিক ভাই।”

বন্ধুদের মুখে এমন নিখাদ প্রশংসা শুনে তারিক ভাইয়ের গাল দুটো সামান্য লাল হয়ে এল। তিনি কোনো বড় বড় বুলি আওড়ালেন না; বরং অত্যন্ত সাবলীল ও বিনম্র ভাষায় আমাদের সবার উদ্দেশ্যে তাঁর প্রকাশনা ভাবনার মূল দর্শনটা তুলে ধরলেন। তাঁর শান্ত কণ্ঠস্বর তখন মেটালো বাতাসে মিশে এক অদ্ভুত দ্যোতনা তৈরি করছিল।

তারিক ভাই খুব মৃদু হেসে বলেছিলেন, “আপনাদের এই ভালোবাসাই তো আমাদের প্রকাশনীর মূল চালিকাশক্তি। দেখুন ভাই, সাহিত্য তো কখনো কোনো সাধারণ ব্যবসার পণ্য হতে পারে না, এটি হলো সোজা অর্থে মানুষের আত্মার খোরাক। আপনারা যখন দিনের পর দিন রাত জেগে এক একটা অসাধারণ সৃষ্টি বা অনুবাদ দাঁড় করান, যেমন পারভেজ ভাই তার ‘কাব্যনন্দিনী’ বইটি করেছেন, আর আমি যখন প্রকাশক হিসেবে সেই পাণ্ডুলিপিটাকে মলাটবদ্ধ করে পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ পাই, তখন বিশ্বাস করুন, মনে হয় আমার এই জন্মটাই সার্থক হয়েছে। টাকা তো জীবনে অনেকভাবেই কামানো যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকার মতো কাজ কি আর রোজ করা যায়?”

সেদিনের সেই বিকেলটা আমাদের কবি বন্ধুদের সেই অন্তরঙ্গ আড্ডা, সাহিত্য নিয়ে অন্তহীন তর্ক-বিতর্ক আর তারিক ভাইয়ের সেই অমায়িক, নির্ভেজাল হাসিতে একাকার হয়ে একটা চমৎকার মায়াবী সময়ে রূপ নিয়েছিল। ঠিক সেই সময়টাতে আমাদের সেই আড্ডার সুরক্ষাবলয় ভেঙে হঠাৎ করেই এসে হাজির হলেন বাংলাবাজারেরই পরিচিত অন্য একটি প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনীর দুই প্রকাশক। তাঁদের গায়ে বিত্তবৈভবের একটা চটকদার ছাপ স্পষ্ট ছিল।

তাঁদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত প্রবীণ ও ব্যবসায়ী মনের প্রকাশকটি এসেই তারিক ভাইয়ের সদ্য প্রকাশিত কিছু ভারী অনুবাদ ও ক্লাসিক সাহিত্যের বইয়ের বাঁধাই ও প্রচ্ছদ নিয়ে একটু টিটকারি ও নেতিবাচক সুরেই সমালোচনা শুরু করলেন। তিনি হালকা ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলেন, “কী ব্যাপার তারিক ভাই? আপনি তো দেখছি দিন দিন আরও বেশি জেদি হয়ে উঠছেন! এত জটিল সব বিদেশি অনুবাদ আর সাধারণ মানুষের মাথার ওপর দিয়ে যাওয়া কঠিন কঠিন সাহিত্য নিয়ে কাজ করার পাগলামি আপনার কবে কমবে বলুন তো? এই যুগে এসব চটকদার ছাড়া বইয়ে তো লাভ কম, লস দিনের পর দিন পাহাড়সমান হয়। একটু কমার্শিয়াল বা বেস্টসেলার মার্কা বইপত্র না করলে এই বাজারে টিকে থাকবেন কীভাবে ভাই?”

তাঁর মুখের কথার রেশ কাটতে না কাটতেই পাশে থাকা অন্য প্রকাশকটি অবশ্য কিছুটা সহানুভূতির সুরেই তারিক ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে প্রতিউত্তর করে বসলেন। তিনি একটু হেসে বললেন, “আরে ভাই, সব প্রকাশক তো আর আপনার বা আমার মতো সারাক্ষণ শুধু লাভ-লসের হিসাব কষার জন্য বইমেলায় বসে নেই! তারিক সাহেব তো বাংলা সাহিত্যে একটা নিজস্ব রুচি ও মান তৈরি করার এক কঠিন ব্রত নিয়েছেন। এই বাণিজ্যিক যুগে দাঁড়িয়েও মানসম্মত বই করার এই জেদটা কম বড় কথা নয়।”

দুই প্রকাশকের এই বিপরীতমুখী যুক্তিতর্ক শুনে তারিক ভাই একটুও বিচলিত হলেন না। তাঁর মুখে বিন্দুমাত্র রাগ, ক্ষোভ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো তাড়া দেখা গেল না। তিনি শুধু আলতো করে একটু মুচকি হাসলেন। তারপর খুব শান্ত, মন্থর ও দৃঢ় গলায় তাঁদের উদ্দেশ্যে এক এমন কথা বললেন, যা আমাদের চারজনের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য গেঁথে গেল।

তিনি শান্ত গলায় বলেছিলেন, “দেখুন ভাই, জীবনটা তো মোটেও কোনো লাভ-ক্ষতির হিসেবের খাতা নয়, যে প্রতি মুহূর্তে পজেটিভ-নেগেটিভ মেলাতে হবে। এই হিসেব করতে করতে তো মানুষ তার ভেতরের মনুষ্যত্বটাই হারিয়ে ফেলে। জীবনের কিছু কিছু কাজ করতে হয় সম্পূর্ণ প্রাণের টানে, নিছক টাকার টানে নয়। টাকার মালিক হয়তো অনেকেই হতে পারে, কিন্তু একটি ভালো বইয়ের অভিভাবক হওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার।”

তারিক ভাইয়ের সেই কথাগুলোর মধ্যে থাকা নিখাদ সততা ও শিল্পবোধ সেদিন উপস্থিত সেই বাণিজ্যিক প্রকাশকদেরও মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আর আমরা কবি বন্ধুরা আরও একবার অনুভব করেছিলাম, এই মানুষটি সাধারণ কোনো প্রকাশক নন, তিনি আসলে বাংলা সাহিত্যের প্রণোদনায় নিবেদিত একজন শিল্পী, একজন মহৎ কারিগর।

পাঁচ.

‘কাব্যনন্দিনী’ বইটি প্রকাশের পর তারিক ভাইয়ের সাথে মৌখিক ও লিখিত যে চুক্তি হয়েছিল, তার একটা অন্যতম শর্ত ছিল যে প্রকাশনী থেকে লেখকের প্রাপ্য নির্দিষ্ট কিছু কপি তারা নিজ দায়িত্বে আমার নির্দিষ্ট ঠিকানায় কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেবে। বইয়ের প্রচ্ছদ, কাগজ এবং ভেতরের সম্পাদনা সব মিলিয়ে বইটি নিয়ে আমার প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। তাই যশোরে বসে আমি অধীর আগ্রহে দিন গুণছিলাম কবে সেই পার্সেলটি আমার হাতে এসে পৌঁছাবে। কিন্তু বই প্রকাশের পর থেকেই এক অদ্ভুত রহস্যময় ও অদ্ভুত কান্ড ঘটতে শুরু করল, যা আমার মতো একজন লেখকের জন্য ছিল বেশ অস্বস্তিকর এবং কিছুটা বিরক্তিরও।

তারিক ভাই আমাকে একে একে কয়েকবার ফোন করলেন। তাঁর সেই ক্লান্ত অথচ আন্তরিক গলায় তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথেই বলতেন, “আজাদ ভাই, আপনার বইয়ের কপিগুলো আমি একেবারে যত্ন করে প্যাক করে কুরিয়ারে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আশা করছি দুয়েকদিনের মধ্যেই আপনার হাতে পৌঁছে যাবে।”

আমি যশোরে বসে দিন গুনি, ফোনের নোটিফিকেশন চেক করি, পোস্টম্যান বা কুরিয়ার সার্ভিসের লোক এলো কি না খোঁজ নিই — কিন্তু কোথায় কী! কুরিয়ারের কোনো নামগন্ধও নেই। দুশ্চিন্তা ও কৌতূহল যখন চরমে উঠল, তখন আমি নিজেই তারিক ভাইকে ফোন করে বিষয়টি জানতে চাইলাম। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি একটু আমতা আমতা করে বেশ একটা অদ্ভুত যুক্তি দাঁড় করালেন। তিনি বলতেন, “আরে আজাদ ভাই, এই কুরিয়ার অফিসগুলোর গাফিলতি ও অমার্জিত আচরণের কথা তো আপনার অজানা নয়! ওরা সাধারণ পার্সেলের মতো বইগুলোর ওপরও কেমন যেন এক ধরনের যত্নহীন, অমানবিক আচরণ করে। এর আগে গত বইমেলায় কুরিয়ারে করে কিছু বই পাঠাতে গিয়ে বইয়ের মলাট কুঁচকে নষ্ট গিয়েছিল, বাইন্ডিং কিছুটা নষ্ট হয়েছিল। সেই থেকে আমার মনের ভেতরে একটা অজানা আশংকা কাজ করে। বইয়ের কোণা একটু মুড়ে গেলে বা মলাটে সামান্য আঁচড় পড়লে, বিশ্বাস করুন আজাদ ভাই, আমার নিজের বুকটা যেন ফেটে যায়। একটি বই তো কেবল আমার প্রকাশনী থেকে ছাপা হওয়া কোনো মালপত্র না, ওগুলো আপনাদের সন্তানের মতো, এটাই আমি মনে করি।”

তখনো আমি জানতাম না যে তারিক ভাই শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। অসুস্থতার তীব্রতার কারণে তিনি তখন বাংলাবাজারের সেই কোলাহলপূর্ণ গুদাম বা শোরুমে নিয়মিত যেতে পারতেন না; বাধ্য হয়েই তাঁকে বাড়িতে কিংবা নিজ ঘরে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হতো। কিন্তু তার পরেও তাঁর সেই এক জেদ, “বইগুলো তো আমি একেবারে ঠিকঠাক রেডি করে আপনার জন্য টেবিলেই গুছিয়ে রেখেছি, কিন্তু আমার কেমন যেন একটা বুক কাঁপা ভয় হয়, কুরিয়ারে দিলেই যদি বইগুলোর কাগজের বাঁধাই নষ্ট হয়ে যায়!” তার এই কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

আমার ভেতরে তখন তারিক ভাইয়ের প্রতি বেশ খানিকটা অভিমান পুঞ্জীভূত হতে শুরু করেছিল। মনে মনে ভাবছিলাম, একজন পেশাদার প্রকাশক যদি এভাবে বারবার কথা দিয়েও তা রক্ষা না করেন, কেবল অজুহাত দেখাতে থাকেন, তবে তা মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন। তিনি নিজে আমাকে বারবার কথা দিয়েও শেষ পর্যন্ত বইগুলো কুরিয়ারে পাঠাননি, এমনকি আমার যশোরে বসে দীর্ঘ প্রতীক্ষার কথা জেনেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। এই উদাসীনতা বা অতিরিক্ত খুঁতখুঁতে ভাবের আড়ালে আমার মনে তাঁর প্রতি এক ধরনের মিষ্টি অভিমানের মেঘ জমেছিল। আমার বারবার মনে হচ্ছিল, প্রকাশক হিসেবে তারিক ভাই হয়তো বাংলা সাহিত্যকে ভালোবাসেন, আমার কাজকেও শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু লেখক হিসেবে আমার যে একটা তাড়া আছে, আমার অধিকার আছে আমার নিজের বই হাতে পাওয়ার, সেটা তিনি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কেন তিনি নিজে কথা দিয়ে কথা রাখলেন না? কেন একটা সহজ কুরিয়ারের কাজকে তিনি এত জটিল করে তুললেন? এই না-পাঠানোর রহস্য এবং তারিক ভাইয়ের এই অদ্ভুত আচরণ আমার মনের কোণে এক গভীর অভিমানের জন্ম দিয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত আমি আর তারিক ভাইয়ের আশ্বাসের ওপর ভরসা করে বসে থাকতে পারলাম না। ভেতরের সেই জমে থাকা অভিমান, ক্ষোভ আর বই হাতে পাওয়ার তীব্র তাগিদ নিয়ে আমি একপ্রকার ঝোঁকের বশেই সিদ্ধান্ত নিলাম। যশোর থেকে বাসে চেপে বসে সোজা চলে এলাম ঢাকায়। উদ্দেশ্য একটাই, বাংলাবাজার গিয়ে নিজ দায়িত্বে আমার ‘কাব্যনন্দিনী’র কপিগুলো বুঝে নেব।

আমি সোজা গিয়ে দাঁড়ালাম ‘ইচ্ছেকুহক’-এর পরিচিত শাটার তোলা দোকানের সামনে। কিন্তু কপাল খারাপ থাকলে যা হয়, সেদিন বাংলাবাজারের সেই স্টল বা গুদামে তারিক ভাইকে কোনোভাবেই পাওয়া গেল না। কর্মীরা জানাল, তিনি শরীর খুব খারাপ থাকার কারণে সেদিনও বাড়ি থেকেই বের হতে পারেননি, বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন।

তারিক ভাইয়ের সাথে দেখা না হওয়ার কারণে আমার মনের ভেতরের সেই অভিমানটা আরও দ্বিগুণ হয়ে গেল। আমি তো মূলত তাঁর কাছেই এসেছিলাম, শুধু যে বইগুলো নেওয়ার জন্য তা নয়, বরং তাঁর সাথে মুখোমুখি ব’সে এই যে তিনি কথা দিয়েও বই পাঠাননি, সে বিষয়ে নিজের ক্ষোভ ও অভিমানটুকু ব্যক্ত করার জন্য। কিন্তু সেই সুযোগ আর হলো না। শোরুমের নিচতলায় দাঁড়িয়ে কর্মচারীদের অবহেলা আর দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যখন আমার বইয়ের পার্সেলটি বুঝে নিচ্ছিলাম, তখন আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা হাহাকার ক’রে উঠল।

কর্মচারীদের কাছ থেকে বইগুলো গুছিয়ে নিয়ে যখন সেই পুরোনো, স্যাঁতসেঁতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছিলাম, তখন পারিপার্শ্বিকতার সেই রূপটা আমার ভেতর এক গভীর বিষাদ তৈরি করেছিল। অদ্ভুত এক বৈপরীত্য কাজ করছিল মনে, যে মানুষটির সাথে দেখা করে একটু অভিমান ভাঙাবো ভেবেছিলাম, যাঁর এই গাফিলতির জন্য বুকভরা অভিযোগ জমিয়ে রেখেছিলাম, আজ শোরুমে এসে তাঁকে না পেয়ে উল্টো একটা অচেনা শূন্যতা আমাকে গ্রাস করল। যখন বাসে এসে উঠলাম, তখন জানালার বাইরে গোধূলির ম্লান আলোয় অজান্তেই আমার মনটা কেমন যেন বড্ড ভারী হয়ে উঠেছিল। সত্যিই লেখকের মনেও প্রকাশকের প্রতি কত কত অভিমান জমা হয়ে থাকে…!

ছয়.

বাংলা বাজার থেকে ‘কাব্যনন্দিনী’র কপিগুলো সাথে নিয়ে যখন যশোরে ফিরে এলাম, তখন এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি আমার আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। একদিকে নিজের বই হাতে পাওয়ার দারুণ আনন্দ, অন্যদিকে তারিক ভাইয়ের সাথে দেখা না হওয়ার কারণে মনে জ’মে থাকা একরাশ অভিমান ও চাপা ক্ষোভ। যশোরে ফিরে আসার পরপরই আমার সাহিত্যিক ভাবনা ও সৃজনশীলতার চাকা অন্য এক গতিতে ঘুরতে শুরু করল। সামনেই তো আসন্ন অমর একুশে বইমেলা, যে মেলাকে কেন্দ্র করে একজন লেখকের মন সবসময় একটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা থাকে।

সেই সময় আমার মাথার ভেতর একসঙ্গে বেশ কয়েকটি ভিন্নধর্মী কাজের পরিকল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছিল। আগামী বইমেলাকে সামনে রেখে আমি মূলত তিনটি ভিন্ন ধারার বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করার ব্রত নিয়েছিলাম। প্রথমত, আমার সুদীর্ঘ লেখালেখির অভিজ্ঞতা ও সমসাময়িক সাহিত্যবীক্ষণ থেকে একটি সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধের বই; দ্বিতীয়ত, আমাদের চারপাশের চেনাজানা জীবনের নানা বৈচিত্র্য ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা নিয়ে একটি মৌলিক গল্পগ্রন্থ; এবং তৃতীয়ত, একান্ত নিজের অনুভবের জমিন থেকে উঠে আসা একগুচ্ছ নতুন কবিতা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ। এই তিনটি পাণ্ডুলিপি একই সাথে তৈরি করা খুব সহজ ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন ছিল রক্তজল করা একনিষ্ঠ পরিশ্রম, রাত জাগা সাধনা এবং নিখুঁত বিন্যাস।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আমার দিনরাত কীভাবে কেটেছে, তার ইয়ত্তা নেই। সারাদিন লেখার টেবিলে হাজারটা কাগজ, কলম আর বইপত্রের ভিড়ে ডুবে থাকায় আমার ব্যক্তিগত ও সামাজিক যোগাযোগও বেশ সীমিত হয়ে পড়েছিল। এই ব্যস্ততার দিনগুলোতে আমার সাহিত্যিক ও ব্যক্তিগত জীবনের অত্যন্ত ঘনিষ্ট আপনজন, আমার কবিবন্ধু শিরিন তৌফিক, আহমেদ মোর্তুজা এবং সাব্বির আশরাফ, সারাক্ষণ ফোনালাপে আমার এই নতুন প্রজেক্ট নিয়ে খোঁজখবর রাখতেন এবং আমাকে মানসিকভাবে ভীষণ উৎসাহ জোগাচ্ছিলেন।

প্রায় প্রতি রাতেই আমাদের দীর্ঘ টেলিফোন আলাপ হতো। একদিন রাতে আহমেদ মোর্তুজা ফোন করে বেশ উদ্বেগের সুরেই জানতে চাইলেন, “কী আজাদ ভাই, তোমার ওই প্রবন্ধ আর গল্পগ্রন্থের কাজ কতদূর এগুলো? আগামী বইমেলায় তো তিনটে বই একসাথে নিয়ে আসার বিশাল একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছ তুমি। শরীরের দিকে খেয়াল রাখছ তো?”

আমি হাসিমুখে উত্তর দিয়েছিলাম, “চলছে ভাই, খসড়া সম্পাদনা প্রায় শেষের পথে। তবে প্রবন্ধের অংশটা আরও একটু শান দিতে হবে। আর কবিতার বইটার জন্য তারিক ভাইয়ের সাথে কথা বলার পরিকল্পনা আছে।”

ঠিক তখনই সাব্বির আশরাফ আরেক ফোনালাপে যুক্ত হয়ে আমাকে আরও একটু উসকে দিয়ে বলতেন, “দেখো আজাদ ভাই, তোমার এই তিনটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি যখন একবার পুরোপুরি রেডি হয়ে যাবে, তখন কিন্তু সোজা ‘ইচ্ছেকুহক’-এর তারিক ভাইয়ের হাতেই দিতে হবে। কারণ তোমার লেখার মননশীলতা যেভাবে উনি বোঝেন, অন্য কোনো বাণিজ্যিক প্রকাশক তা বুঝবেন না।”

শিরিন তৌফিকও সেদিন ফোনালাপে বেশ জোর দিয়ে বলেছিলেন, “আসছে বইমেলায় তোমার এই তিনটি বই প্রকাশের আয়োজনটা দারুণ জমবে। তুমি তাড়াতাড়ি পাণ্ডুলিপিগুলোর ফাইনাল ড্রাফট শেষ করো, তারপর আমরা আমাদের সবার বই নিয়ে সবাই মিলে ঢাকায় তারিক ভাইয়ের সাথে ব’সে একটা চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে ফেলব।”

আমার অবচেতন মনে তখন একটাই বিশ্বাস শিকড় গেড়ে বসেছিল যে, আমার তিনটি পাণ্ডুলিপি যখন সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে যাবে, তখন আমি ঠিকই আগের মতো রাতে তারিক ভাইকে ফোন দেব। গভীর রাতে যখন তারিক ভাই তাঁর চিরচেনা ক্লান্ত অথচ মায়াবী গলায় “কী ব্যাপার আজাদ ভাই, এত রাতে জেগে?” বলে ফোন রিসিভ করবেন, তখন আমি এক নিশ্বাসে আমার প্রবন্ধ, গল্প ও কাব্যগ্রন্থের এই নতুন পরিকল্পনার কথা তাঁকে জানাব। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, বাংলাবাজারে দেখা না হওয়ার যে অভিমানটুকু জ’মে আছে, আগামী বইমেলা উপলক্ষে তারিক ভাইয়ের সাথে নতুন কোনো কাজের টেবিলে বসে কফি কাপে চুমুক দিতে দিতে সেই অভিমান নিমিষেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে।

তারিক ভাইয়ের সেই রাতের টেলিফোনের চেনা রিংটোনটা আমার গত কয়েক বছরের অভ্যস্ত লেখকজীবনের একটা অনিবার্য ও মধুর অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মনে হতো, রাত বাড়লেই ওই স্ক্রিনটাতে তাঁর নাম ভেসে উঠবে। কিন্তু অদ্ভুত বাস্তবতায় বিগত বেশ কিছুদিন ধরে আমার নিজের অতিরিক্ত কারণে এবং তাঁর দিক থেকেও কোনো যোগাযোগ না থাকায় সেই কাঙ্ক্ষিত ফোনটা আর বাজছিল না। আমি নিজেও কাজের প্রচণ্ড চাপে আলাদা করে আর ফোন করার ফুরসত পাইনি, ভেবেছিলাম, থাক না কিছুদিন, কাজটা গুছিয়ে নিয়েই তো একসঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা দেব।

কে জানত, আমার এই ব্যস্ততার অন্তরালে এবং আমাদের মধ্যকার এই নীরবতার দেওয়ালের ওপারে সময়ের ঘড়িতে অন্য এক মহাকালের স্থায়ী নীরবতা নিঃশব্দে ফণা তুলে অপেক্ষা করছে! আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি যে, যে মানুষটার সাথে আগামী বইমেলার নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে দীর্ঘ পরিকল্পনা করার স্বপ্ন আমি রঙিন সুতোয় বুনছি, সেই মানুষটির জীবনের পাতাটাই প্রকৃতির নিষ্ঠুর নিয়মে চিরকালের মতো উল্টে গেছে।

সাত.

গতকাল শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে কি নামছে না। বরাবরের মতো অভ্যাসবশতই ফেসবুকের ফিডপেইক স্ক্রোল করছিলাম। ঠিক তখনই একটা সাহিত্যিক গ্রুপের পেজে চোখ আটকে গেল, আর মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটা যেন আমার পায়ের তলা থেকে সরে গেল। একটা শোকবার্তা—“ইচ্ছেকুহকের প্রকাশক তারিক আব্দুল্লাহ আর নেই।”

খবরটা পড়ার সাথে সাথে আমার মাথার ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা, মহাশূন্যের মতো নিঃশব্দ হয়ে গেল। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কিছুতেই মন সায় দিচ্ছিল না। আমি বারবার স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, ভাবলাম হয়তো কোনো ভুল নিউজ, কিংবা অন্য কোনো সমনামের মানুষ। কিন্তু না, ছবির সেই পরিচিত মুখটার দিকে তাকিয়ে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। গতকাল পর্যন্ত যিনি গভীর রাতে জেগে বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ নিয়ে কথা বলতেন, প্রবাসের সব মোহ আর আরাম-আয়েশ লাথি মেরে ছুড়ে ফেলে দেশের এই ধুলোবালিভরা মাটিতে বসে বইয়ের প্রুফ দেখতেন, নিজে সম্পাদনার কাজ করতেন, তিনি আজ আর এই পৃথিবীতে নেই! চিরকালের মতো ওপারে চলে গেছেন।

এই আকস্মিক বজ্রাঘাতের মতো সংবাদে আমি আক্ষরিক অর্থেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। গলার ভেতর দলা পাকিয়ে এল কান্নার একটা ভারী স্রোত, অথচ মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হলো না। মাথার ভেতর তখন হাজারটা অব্যক্ত চিন্তা কিলবিল করে ঘুরপাক খাচ্ছে। কোথায় তিনি কথা দিয়েও নানা অযুহাতে আমার কাব্যনন্দিনীর বইগুলো কুরিয়ারে পাঠাতে পারেননি, আমি যখন বাংলাবাজারে গেলাম তখন ব্যস্ততা বা অসুস্থতার অযুহাতে তাঁর সাথে দেখা পর্যন্ত হলো না! এমনকি কিছুদিন আগে আমার দু’য়েকজন লেখকবন্ধুকে তাঁর প্রকাশনীতে বই প্রকাশের জন্য উৎসাহিত করে বলার পরও যখন তাঁর কাছ থেকে কোনো প্রাণখোলা ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উষ্ণ বার্তা এলো না, তখন মনের কোণে তাঁর ওপর একটা হালকা অভিমান জমা হয়েছিল। আমি তো ভেবেছিলাম, আগামী বইমেলায় যখন আমার প্রবন্ধ, গল্প ও কাব্যগ্রন্থের এই তিনটি নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াব, তখন এই সব ছোটখাটো অভিমান আর না-পাঠানোর অনুযোগগুলো এক নিমিষে মিটিয়ে দেব। আমি তাঁকে আদুরে গলায় একটু তিরস্কার করব, অভিমানও দেখাব একটু। কিন্তু এ কী হলো! সেই অভিমানটুকু দেখানোর সহজ সুযোগটাও যে আজ চিরকালের মতো হারিয়ে গেল! এ কেমন নির্মম প্রাপ্তি? মানুষটা এমন একটা চটজলদি চিরবিদায় নিলেন যে, তাঁর সাথে না-বলা অভিযোগগুলো আর কোনোদিন শেয়ার করার সুযোগ রইল না।

আমি একা ঘরে বসে কেবল নিঃশব্দে নিজের সাথে কথা বলছিলাম, এক অদ্ভুত স্বগতোক্তিতে মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, এই শোক প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই।

ঠিক সেই নিস্তব্ধ মুহূর্তে মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠল গত বইমেলার সমস্ত জীবন্ত স্মৃতি। তারিক ভাইয়ের প্রাণবন্ত মুখাবয়ব, সুহাসিনীর সাথে তাঁর সেই মৃদু খুনসুটি, আমার কবিবন্ধু শিরিন, মোর্তুজা আর সাব্বিরের সাথে তাঁর হাসিমুখের আড্ডা, আর বাংলা বাজারের সেই স্যাঁতসেঁতে গলিতে আমার নিজে গিয়ে বই নিয়ে আসার সেই বিকেলগুলো একের পর এক সিনেমার রিলের মতো মনের পর্দায় ভেসে উঠতে লাগল। আমার দুই চোখ ভিজে উঠল। ঠিক তখনই মনে হলো, এক আকাশপাখির উচ্চতা থেকে আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আসন্ন আগামী বছরের অমর একুশে বইমেলা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঠিক সেই চেনা কোলাহলপূর্ণ জায়গায় ‘ইচ্ছেকুহক’-এর স্টলটি বসেছে। কিন্তু কী অদ্ভুত এক শূন্যতা! স্টলের ঠিক মাঝখানে তারিক ভাই নেই, অথচ তাঁর বসার চিরচেনা কাঠের চেয়ারটি একেবারে শূন্য পড়ে আছে। আর সেই শূন্য চেয়ারের সামনে অপলক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছি আমি, হাতে আমার সেই সাধের তিনটি নতুন বই। স্টলের সামনে ভিড় ক’রে থাকা লেখক ও কবি বন্ধুদের তিনি আজ আর নিজের মুখে ডেকে ডেকে নতুন প্রকাশিত বইগুলো দেখাতে পারছেন না, অথচ তাঁর অবয়বহীন উপস্থিতির একটা উজ্জ্বল আলো যেন পুরো স্টল জুড়ে মেখে রয়েছে।

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।