তীব্র সামাজিক
চন্দন মিত্র
কী আমার হত শুধু জলনামা ছাড়া
হয়তো বাজত খুচরো ঝমর ঝমর
হয়তো ভদ্রাসনে বসত পাহারা;
হয়তো উড়ত পাতা ডালে ফরফর।
হয়তো হতাম এক মোড়লশালিক
লেজ নেড়ে ওড়াউড়ি করতাম গাঁয়ে,
আমাকে পুষত কোনো সেয়ানা মালিক;
ঘুরতাম সারাদিন তার পায়ে পায়ে।
এই বা কী কম হল শ্রমণ-সন্ধান
শালবীথি দুকিনারে মাঝে লালধুলো;
অকুলীন কৃশকায়া তিরতিরে প্রাণ,
দেহাতি উঠানমাখা ছেলেমেয়েগুলো…
এসবে না-থেকে কেন নির্জলা হব ?
বরং মেলার শেষে মরমিয়া ঘুম,
ভেঙে গেলে হাতে আমি ব্রহ্মাণ্ডকে পাব
তীব্র সামাজিক আমি নাই বা হলুম।
ক্ষয়াটে সাইকেল
কী কুক্ষণে যে বর্ণের পরিচয়
হয়েছিল তোর আজও ঠিক বুঝিনি
বই ছুড়ে যদি মস্তিতে মৃদু হেসে
বন্ধ চোখটি দেখিয়ে উন্মাদিনী
নিগুম বারামে ডাক দেয় অনাবিল
তবু তোর নেই পতনের হাতছানি।
অসীম উচ্চে তোলা আছে ক্রোধী শিকে
বেড়াল কীভাবে পোহাবে সে হয়রানি।
শূন্যে স্বগৃহ ঝোলে গেঁয়োযোগী ডালে
ন্যূনতম খেদে বার্ষিক আমদানি
গ্রহণের হেতু দেয়ালে হেলান দিয়ে
রোদে-জলে ভিজে ঠেলে যাস বুড়ো ঘানি।
ঘোর
ওঁত পেতে আছে ডিমে তা-দেওয়া দিন।
মায়ের সঙ্গে ভায়ের সঙ্গে আড়ি,
সরে আসি খেদে। এড়িয়ে এড়িয়ে চলি;
বন্ধুরা নেই বহুদিন ছাড়াছাড়ি।
বেতন পেলেও সুখ পাচ্ছি না মোটে।
থিতু হয়ে বসে ভাবতে পারি না কিছু;
দেশকাল ডানা ঝাপটায় অবেলায়
কীভাবে যে থাকি চুপচাপ মাথানীচু!
এখনও ড্রাগনে চেপে বসবার সাধ,
বুনো মহিষের শিং ধরে ঘোরানোর
ইচ্ছে, গেল না অগস্ত্য যাত্রায়;
এখনও স্বপ্নে নাচে ঝকঝকে ভোর।
স্যাঁতলা জমেনি পলেস্তারার গায়ে,
কস্তা-কোলাজ পুরাতন ঘরেদোরে;
ওঁত পেতে আছে ডিমে তা-দেওয়া দিন
এড়িয়ে এড়িয়ে চলি অদম্য ঘোরে।
ইকেবানা
তোমাদের হাতে হাত রাখব না আমি
প্রয়োজনে নেব বনবাসকেই বেছে,
হুজুগের ভিড় দেখলে ঘৃণায় থামি;
হোক না আকাল; স্বাতন্ত্র্যে আছি বেঁচে।
যাব পাতাঝরা অরণ্যে পথে পথে
মানুষের পাড়া আবাসযোগ্য নয়,
নির্বাক হয়ে থাকা যায় কোনো মতে
হায়েনার মতো ঘরে উঁকি মারে ভয়।
তোমাদের ওই ক্লিন্ন আঙুলগুলি
আমাকে ছুঁয়েছে, ভেবে বিবমিষা জাগে,
কাঁধে ঝুলিয়েছি কৈশোরমাখা ঝুলি
পেশিতে আগুন জ্বলেছে দীপক রাগে।
ফিরে যাব ফের প্রাণি-পাদপের কাছে
তোমাদের হাতে হাত রাখব না, না, না…
এখনও অমোঘ স্বপ্ন অটুট আছে
এখনও আঁকতে পারি প্রিয় ইকেবানা।
প্রার্থনা
চেনা তল্লাটে ছি ছি পড়ে যাবে জেনে
এই আমি তবু বায়বীয় ধারণাকে
অমান্য করে তোমার সমীপে নত
আশ্বাস— পাব প্রাণাধিক করুণাকে।
নুব্জ ভুবনে ক্রোমোজোম যাত্রায়
ক্রীড়া-কৌতুকে আমাদের আনাগোনা
আর যত আছে অলীক উপাখ্যান
জেনে গেছি তারা মিথসাগরের ফেনা।
জাগো দেবি, ভাঙো মিথ্যা-দম্ভ-ভয়
আমি কুল-শীল ত্যক্ত করেছি পথে
অনিকেতব্রতে দীক্ষিত হয়ে হাঁটি
ধু-ধু চরাচরে নিঘর-চারণ-মতে।
তোমার সমীপে নতজানু হয়ে আজ
বাজিতে ধরেছি তুচ্ছ জীবনখানা
তাকে রেখে যাবে কুকাফ অন্ধকারে
সে একা সইবে কন্দর্পের হানা?


০ টি মন্তব্য