রঙিন পাথর
সান্ত্বনা চাটার্জি
আজকাল প্রতিমা নানা রঙের পাথর দিয়ে তার ঘর সাজানো শুরু করেছে। নানান রকম কাঁচের ফুলদানি, পেট মোটা, সরু গলা, ছড়ানো এগুলো আলমারি থেকে বার করে, ধুয়ে মুছে চকমকে করে, যেটাতে যা ভালো লাগে, যেমন পেট মোটাতে জল ভরে রঙিন পাথর ফেলে মনি প্ল্যান্ট, ছড়ানো পাত্রে শুধুই পাথর, কাঁচের মোমদানি, টবের গাছ, কিছু বাদ রাখেনি। এমন কি দেবেশের ছবির পাশেও কাঁচের ফুলদানীতে রঙিন পাথর আর জল রেখে, সূর্যমুখী ফুল কিনে সাজিয়েছে। একা আপনমনে সারাদিন এ ঘরে ও ঘর ঘুরে বেডায়, কাঁচের আলমারি গুলো মুছে রাখছে, ঘরে কোথাও ঝুল নেই তো, দেবেশের যে খুব পরিস্কার করা বাতিক ছিল।
এটা নয় যে প্রতিমা নিজে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসেনা। কিন্তু বাড়িতে এতো কাজ, তার উপর দেবেশের দীর্ঘ সময় অসুস্থ থাকায়, বাড়ি আর রোগীর সেবা দুটোতে সমান মনোযোগ দিতে পারেনি। ফলে বাড়ির কাজে ঢিলা পরে ছিল। এখন তার অখণ্ড অবসর, কেউ নেই কিছু নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
আজ দুপুরে পুরাতন সহকর্মী মীরা এসেছিল, দুপুরটা কাটিয়ে বিকেলে ফিরে গেল। এ রকম কিছু চেনা মানুষ আছে বলেই একাকিত্ব তার হৃদয়ে থাবা গেড়ে বসতে পারে না। মীরা বেশ কিছুদিন পরে এসেছে তাই প্রতিমার রঙিন পাথর-প্রেম জানতে পারেনি।
দেখে বলল বাহ্ ভারি সুন্দর লাগছে তো, কতো রঙের মেলা, মনটা খুশি হয়ে যায়। আগে তো কখনো এতো ঘর সাজানোর ইচ্ছা দেখিনি। যদিও জানি যে, দেবেশ তোকে তোর নিজের ইচ্ছা মতন চলতে দিত না কোনও দিন। এ শাড়িটা কেন পরেছ পাল্টে এসো। একি ফুলদানি টা টেবিলের উপর রেখেছ কেন? তোমার কোনও সৌন্দর্য বোধ নেই, ……এতদিনে নিজের মত আছিস, খুব ভালো, সব অপূর্ণ ইচ্ছা পূর্ণ করে নে। জীবনে আফসোস থাকবে না।
মীরা বোঝেনি তার সহানুভূতির কথা প্রতিমার হৃদয় ছিন্ন ভিন্ন করে দিচ্ছিল। কিছুক্ষন মাথা নিচু করে চোখের জল সামলে মাথা তুলল প্রতিমা। ধরা গলায় বলল, নারে সব ব্যাপারে দেবেশ বাধা দিত না আমায়। দেবেশ শাড়ির দোকানে এসে দুটো শাড়ি পছন্দ করল, আমি বললাম দেবেশ এতো টকটকে লাল সিল্ক চওড়া কালোতে জরি পার, এ বয়সে কি পরা উচিত! রেগে গিয়ে বলল কেন তুমি কি বিধবা!
খুব ভালো মানাবে তোমায়। দুটোই বেশ দামী আর রঙচঙে, আমার একটু হাল্কা, চাপা রঙ ভালো লাগে দেবেশের ঠিক উল্টো, সেদিনের কথা আমার আজও মনে পড়ে,কতো ভালোবাসত আমায়।
দেবেশের রাগটাই মারাত্মক ছিল তাই সকলে ওকে রাগী বলেই চিনত। দেবেশের অনুরাগ শুধু আমি জানি। তাছাড়া ও মানুষটা ছেলেমানুষের মতন সরল ছিল। যা মনে হতো সবার সামনেই বলে দিত। ঠাট্টা করলে সত্যি ভেবে বসত। মানুষতো দোষে গুনে ভরা।
আমার উপর দেবেশের অগাধ আস্থা আর বিশ্বাস আমাকে অনেক কাজে এগিয়ে যাবার সাহস যুগিয়েছে। সব সময় পাশে থেকেছে, সুখে দুঃখে যেকানও পরিস্থিতিতে, কখনও একলা ছাড়েনি আমায়। আমার সহায় আমায় ছেড়ে গেছে, সে যে কি বেদনাদায়ক…এবার প্রতিমার কথা বন্ধ হয়ে যায়।
অঝর ধারায় চোখের জলে বুক ভাসায়।
মীরা চুপ করে থাকে, জানে এখন কোনও কথা বলা ঠিক হবে না।
কিছু পরে প্রতিমা আঁচলে চোখ মুছে বলে, দেবেশের অভাবে আমার জীবনের সব রঙ চলে গেছে। শুধু ধূসর ফাঁকা মরুভূমি। তাইতো রঙিন পাথর কিনেছি এতো, আমার আর দেবেশের প্রাণে রঙ আনবার জন্য।
মীরা চোখ বড় করে বলে, কি বলছিস রে, দেবেশের প্রাণ তো শেষ হয়ে গেছে, তোর কিন্তু একা থাকা একেবারেই উচিত নয়।
প্রতিমা মৃদু হেসে বলে, নারে ভয় পাস না, যা বলছি ভেবেই বলছি। হ্যাঁ মানছি দেবেশের শরীর জীবনের সাথে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু সব প্রাণইতো অনন্ত অসীম প্রাণে মিলিয়ে যায়, সেখানে না জন্ম আছে, না মৃত্যু, না দুঃখ, না বিচ্ছেদ। রবি ঠাকুরের গানটা শুনিসনি, আমারতো খুব প্রিয় গান। ডাকার মতন ডাকতে পারলে ঈশ্বর ধরা দেন, অসীম অনন্ত প্রাণের স্রোতে কোথাওতো আছে সে, তাই আমার জীবন রঙিন করতে, আর সে রঙ অনন্ত প্রাণে ছডিয়ে দিতে, এতো রঙের বাহার এনেছি ঘরে।








০ টি মন্তব্য