অধিকার
রিয়া চ্যাটার্জী
তামিশ্রার মুখের ওপর বালিশটা ভীষণ শক্ত করে বেশ খানিকক্ষণ চেপে ধরে থাকলো ঋতম, যতক্ষণ অবধি না তামিশ্রার হাত পা ছোড়া বন্ধ হলো। ঋতমের কপালে জমলো বিন্দু বিন্দু ঘাম। তারপর তামিশ্রার মুখ থেকে বালিশটা সরিয়ে নিলো ঋতম, নিষ্পলক বিস্ফারিত চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে ভাবলো কি শান্ত! এবার মাথাটাকে কোলে নিয়ে তার লম্বা চুলে হাত বোলাতে লাগলো, এই প্রথম সে লাগামহীন, স্বাধীন!
ঋতম বরাবর মায়ের খুব ভালো ছেলে, তার ছোটোবেলা শুধু মা কে নিয়েই তৈরি। বাবা, ঋতম অনেক ছোট থাকতেই বাড়ি ছেড়ে চলে যান তার বাবা। ঝাপসা কানাকানি শোনা যেত অন্য জায়গায় সংসার করেন তিনি।
ঋতমের মা সবসময় বলতেন, “বাবা তুইও কি তোর বাবার মত আমায় ছেড়ে চলে যাবি?” শিশুমন, তখন মা কে সর্বান্তকরণে সান্তনা দিতো “না মা!কখনও না”।
ঋতমের মা অন্য সব মা’দের থেকে একটু বেশি যত্নশীল ছিলেন, ছেলের যত্নে কোনো ত্রুটি তার সহ্য হতনা। ছেলে কোনদিন কোন সময়ে কি খাবে, কোন সময় কি জামা কাপড় পড়বে সব তার মা ঠিক করে দিত। এমনকি ছেলের বন্ধুসঙ্গও নির্বাচন করে দিত মা। “পাশের বাড়ির বখাটে ছেলেটার সাথে মিশবে না, দুদিন পরে বিড়ি খাবে ঠিক, ও তোমার যোগ্য না। “
তার পড়াশোনার দায়িত্বও ছিলো মায়ের ওপর, তার মা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। বানান থেকে, হাতের লেখা সব নিখুঁত ছিলো তার ছেলের। রোজ ভোর বেলা নিয়মমাফিক পড়তে বসতে হত তাকে, শীতের দিনগুলো তে একটু লেপ জড়িয়ে শোয়ার অনুমতি ছিল না।
জানলা দিয়ে পাশের গলির বস্তির বাচ্চাদের খেলা দেখতো সে,কিন্তু সে খেলায় অংশীদার হওয়ার অধিকার তার নেই, “ও মা ওরা কি তোমার সাথে খেলার যোগ্য?”, “তুমি না আমার সোনা ছেলে ” তাকে মায়ের ভালো ছেলে হতে হবে, মায়ের যে প্রচুর কষ্ট। নিজেকে তার দিদিনের বাড়ির খাঁচার পাখির মত মনে হতো। ” আকাশ টা কি বড়, কি নীল…”
তার স্কুলের সহপাঠীরা অনেক সময় তাকে দলে টানার চেষ্টা করেও হার মেনেছে , কখনও তারা কোনো নতুন সিনেমা দেখতে গেলে বা কোথাও বেড়াতে গেলে ঋতমকে বলে, সে মুখ নিচু করে বলত, “মা যেতে দেবেনা” । এই নিয়ে সময় সময় কটুক্তিও শুনতে হয়েছে তাকে “তুইতো মামাস বয়,মা যা বলে তাই শুনিস”, “শোনো বন্ধুরা ঋতম কে বোলো না, ও ভালো ছেলে…” বলে মুখ বাঁকা করে হেসেছে। মনে মনে সে এইসবের প্রচণ্ড বিরোধিতা করলেও, মুখে কিছু বলতে পারতো না। মায়ের কষ্টের বোঝা ভারি পাথরের মত মাথায় বসে থাকতো তার। যেন বাবার করা সমস্ত অন্যায় ঠিক করার দায়িত্ব তার। মাঝে মাঝে সে শুধু খোলা নীল আকাশের দিকে চেয়ে দেখতো, কিভাবে ডানা মেলে খোলা আকাশে উড়ছে পাখিরা। পাখি তার খুব পছন্দের, উন্মুক্ত, খোলা আকাশের বুকে উড়ে বেড়ানো পাখিরা তার খুব প্রিয়।
পড়াশোনাতে ঋতম ছিলো বরাবরের খুব ভালো ছেলে। ঋতমের মায়ের সজাগ দৃষ্টি ছিলো এই ব্যাপারে। তাই খুব নামি কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে সে একসময় খুব বড় কোম্পানি তে চাকরি নেয়।
ঋতম তামিশ্রার মধ্যে কোনোদিনও ভালোবাসার কমনীয়তা অনুভব করতো না। সবসময় তার ছিল শাসনের কঠীনতা। তামিশ্রার প্রেমিকা সত্তাটাকে কোনোদিনও সে অনুভব করেনি, তার জায়গায় পেয়েছে এক কঠোর মাতৃমূর্তিকে, যার সাথে বসে সারাদিনের সুখদুঃখের গল্প করা যায়না, যাকে ঠিক নিজের মত করে ভালোবাসা যায়না। আলগোছে চুল টা সরিয়ে দিয়ে গল্প করা যায়না। কোনোদিন ঋতমের মাথা ধরলে সে ওষুধ দিয়ে যেতো ঠিকই কিন্তু মাথায় হাত রেখে আদর করে যন্ত্রণা লাঘব করার চেষ্টা করত না।
দেখতে সুন্দর হলেও কোনোদিনও সেইভাবে কোনো মেয়ের সাথে খুব বেশি একাত্ম হয়নি সে, ওসব তাকে শোভা পায়না। অনেক মেয়েরা তার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করলেও সে এড়িয়েই গেছে। দৃষ্টি বলে এক সহপাঠীকে মনে মনে ভালো লাগলেও সেই অনুভূতিকে সে অঙ্কুরেই বিনাস করেছে। ” মা কষ্ট পাবে। “
এক সময় তার মা তার পছন্দ মত মেয়ের সাথে বিয়ে দিলেন। বিয়ের পর তাদের প্রথম রাতটাও ছিলো কেমন যেন যান্ত্রিক, সিনেমাতে যেরকম দেখেছে, বা যেরকম শুনেছে , সেরকম সুন্দর, আবেগঘন ছিলো না কোনোভাবেই। শারীরীক ঘনিষ্ঠতাও যেন একটা প্রসেস কেবল ভালোবাসার বিন্দুমাত্র ছিলো না সেখানে।
একদিন ঋতমের মা হঠাৎ হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে, সংসারের মায়া, ছেলের মায়া ত্যাগ করে চিরকালের জন্য সমস্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে, পাড়ি দিলেন ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে। ঋতম দুঃখ পেলো, কিন্তু সেটা ঠিক ভালোবাসার না, যেন একটা পরিচিত অভ্যাসে একটু বদল হলো, সেই কড়া শাসন গুলো একটু ঢিলে হলো। উল্টো তার মনে হলো একটা দায়িত্ব যেন নামলো তার কাঁধ থেকে, ভালো হওয়ার, তার বাবার অন্যায়ের সমতা রাখার। পায়ের একটা বেড়ি কেউ যেন খুলে দিলো।
ঋতমের মা আশ্চর্য পরখে, যে মেয়েকে তিনি ছেলের জন্য নির্বাচন করেছিলেন, সেই তামিশ্রাও ছিল ঠিক তার মতো কর্তৃত্বপরায়ণ।
সংসারে প্রতিটা জিনিসেই ছিলো তামিশ্রার তীক্ষ্ণ নজর, তার সংসারে কোথাও অগোছালোভাবে কোনো জিনিস থাকতো না, কোথাও পরিপাটির অভাব ছিলো না। স্বামীর সমস্ত বিষয়ও ছিলো তার কঠোর নজরাধীন। ঋতম কি খাবে, কি পরবে, সব সে নির্বাচন করত। কোনোদিন জিজ্ঞেসও করত না ” কি খাবে বলো? “
বা স্বামী কে জড়িয়ে ধরে সোহাগী ও হতো না।
ঋতমের টাকাপয়সা থেকে শুরু করে সামাজিক জীবন সবটাই ছিলো তামিশ্রার কন্ট্রোলে। “শোনো তোমার অফিসের ওই ঋদ্ধিমান এর সাথে বেশি কথা বলো কেনো?”
“শুনলাম আগের সপ্তাহে কোন এক মেয়ের সাথে দিঘা গিয়েছিল।”
“অবিনাশ তোমার বস হলেও সারাক্ষণ গায়ে গায়ে থাকতে হবে? “
“কোনোদিন দেখবো তোমায় সিগারেট ধরিয়েছে …”
ঋতম তামিশ্রার মধ্যে কোনোদিনও ভালোবাসার কমনীয়তা অনুভব করতো না। সবসময় তার ছিল শাসনের কঠিনতা। তামিশ্রার প্রেমিকা সত্তাটাকে কোনোদিনও সে অনুভব করেনি, তার জায়গায় পেয়েছে এক কঠোর মাতৃমূর্তিকে, যার সাথে বসে সারাদিনের সুখদুঃখের গল্প করা যায়না, যাকে ঠিক নিজের মত করে ভালোবাসা যায়না। আলগোছে চুল টা সরিয়ে দিয়ে গল্প করা যায়না। কোনোদিন ঋতমের মাথা ধরলে সে ওষুধ দিয়ে যেতো ঠিকই কিন্তু মাথায় হাত রেখে আদর করে যন্ত্রণা লাঘব করার চেষ্টা করত না।
অফিস থেকে ফিরতেই তামিশ্রা ঋতমকে জিজ্ঞাসা করে, “আজ এত দেরি কেনো?” “কাজের চাপ ছিল একটু।”
সত্যি বলতে ঋতম আজকাল প্রায় দেরি করে ফেরে, অফিস থেকে বেরিয়ে সে একটা নিষিদ্ধপল্লিতে যাতায়াত শুরু করেছে, প্রথম দিন যখন সে এক অফিস কলিগ এর সাথে গিয়েছিল, তার গা গুলিয়ে উঠেছিল, কিভাবে বিকট সব সাজ সেজে অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমবার অদ্ভুত একটা আড়ষ্টতা কাজ করেছিলো, গা ঘিনঘিনে একটা অনুভূতি। বাড়ি এসে খুব ভালো করে স্নান করেছিলো।
তারপর আজকাল সে প্রায় যায়, করবী বলে একটা মেয়েকে তার এখন বেশ ভালোই লাগে, তার কথা বলায় একটা মাধুর্য্য আছে, তার অধিকাংশ কথা মিথ্যা ছলনা হলেও , সেই মায়াজাল তাকে আকৃষ্ট করে। তার কাছে ছেলে মানুষ সাজা যায়, তার কাছে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা যায়। তার কাছে ঋতমের ভালো ছেলে সাজার তাগিদ নেই।
তামিশ্রা কিছু জিনিস দেখে একটা গোলমাল আন্দাজ করতো, কিন্তু পরিষ্কার কথা জিজ্ঞাসা করা বা স্বামীর ওপর ভালোবাসার অধিকার জমানোর মত মেয়ে সে নয়। সে জানত শুধু কঠোর শাসনের ভাষা। বিরোধটা খুব স্পষ্ট হচ্ছিল দুজনের মধ্যে। আজকাল আর তামিশ্রার পছন্দ করা জামা পড়ত না ঋতম। বাড়ির খাবার পছন্দ না হলে খাবার বাইরে খেয়ে আসতো। এসব বিরোধ তামিশ্রার একেবারে অসহ্য। “কি ভেবেছো টা কি তুমি?” তীক্ষ্ণ কণ্ঠে প্রশ্ন করে তামিশ্রা।
সেদিন ঘরের ভিতরটা খুব গুমোট ছিলো, বাইরে ঘন কালো মেঘ, তামিশ্রা খুব কঠিন গলায় ঋতমকে বেশ কিছু প্রশ্ন করতে থাকে, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ঋতমের আর ভালো ছেলে হওয়ার তাগিদ নেই, সে সব কিছু বলে তামিশ্রাকে।
“শোন আমি রোজ শুই একটা বেশ্যার সাথে, ভালো লাগে…”
জানালার পাশে একটা গাঢ় সবুজ রঙের টিয়া এসে বসলো, ঋতম এক পলক চেয়ে দেখলো, তারপরেই সেটা উড়ে চলে গেলো। “তোমায় দেখতে আমার ঘেন্না হচ্ছে … ছিঃ ছিঃ ” তারপর তামিশ্রার অনবরত কঠোর, কঠিন কণ্ঠস্বর শুনতে শুনতে জিভটা কেমন তেতো লাগে তার। ভালো মানুষ হওয়ার তাগিদটা একটা আত্মার মত ছেড়ে চলে গেলো তাকে চিরতরে মুক্তি দিয়ে। নিজেকে হালকা লাগলো।
এই বোঝা সে ছোট থেকে বইছে…
আস্তে আস্তে উঠে তামিশ্রাকে নিজের কোলে মাথা রেখে শুইয়ে দেয়, তারপর চিৎকার করে বলতে থাকে, “জানো তোমরা কেউ আমায় বাঁচতে দাও নি। “
“খোলা আকাশ উড়তে দাও নি।” মুখ লাল হয়ে আসে তার, চিৎকারের সময় মুখ থেকে থুতু বেরিয়ে আসতে থাকে তার। তারপর ভীষণ জোরে অথচ শান্ত ভাবে বালিশ দিয়ে মুখটা চেপে ধরে তামিশ্রার। তামিশ্রা প্রথম প্রথম হা পা ছোড়ে, বাধা দিতে চায়। চাপা গোঙানির মত আওয়াজ করতে থাকে। শান্ত অথচ দৃঢ় ভাবে নরম বালিশ টা চেপে ধরে থাকে ঋতম।
এবারে শান্তি এলো যেন…
চিরতরের মত নিস্তব্ধ করে দেয় সেই শাসন। তারপর নিষ্পলক চোখে খুব ভালো করে চেয়ে দেখে তার গতিহীন শরীরটাকে। সত্যি বলতে তামিশ্রা খুব সুন্দরী, কালো ভ্রু দুটো, নিষ্পলক চোখ দুটো এই প্রথম যেন খুব ভালো করে দেখলো।
আজ থেকে সে আর কোনো বাঁধনে বাঁধতে পারবে না তাকে। । আজ সে তামিশ্রা কে সত্যি করে আপন করলো বুকে জড়িয়ে ধরে। আজ সে সম্পূর্ণ স্বাধীন!








০ টি মন্তব্য