বিদ্রোহ
ফারিশতা সালেহি
অনুবাদ: বিদ্যুত খোশনবীশ
[ফারিশতা সালেহি একজন আফগান লেখক ও উন্নয়ন কর্মী। আফগানিস্তানের বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিওর সাথে তিনি পেশাগতভাবে সম্পৃক্ত, বসবাস করেন কানাডার ওটোয়ায়। বিদ্রোহ গল্পটি আফগানিস্তানে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা। রাইটারস ওইদাওট বর্ডার ম্যাগাজিনের জন্য গল্পটি পশতু থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাসেত।]
এর চেয়ে আর কত জোরে দৌড়ানো যায়? আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, হৃদস্পন্দন কানে এসে ধাক্কা দিচ্ছিল। পেছনে এক ছায়ার উপস্থিতি টের পেয়ে আমি সাধ্যমতো জোরে দৌড় দিলাম। ঘামে ভিজে গেছি। শেষ পর্যন্ত বাসার গলিতে পৌঁছে তবেই একটু স্বস্তি পেলাম। কাছের একটি দেয়ালের আড়াল থেকে ভার্সিটির দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখি পাগলিটা তখনও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে ক্রোধের আগুন, সেই আগুন আমি দূর থেকেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
মা রান্নাঘরে ছিল। তাকে খুব ক্লান্ত দেখালেও আমাকে দেখে খুশি হল। বলল, ‘ভালো হয়েছে তুই এসেছিস। খাওয়া শেষ করে প্লেটগুলো ধুয়ে রাখিস।’ আমি আজকের অদ্ভুত ঘটনাটা তাকে বলতে চেয়েছিলাম। একটু জিরিয়ে নিয়ে, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে নিজের অনুভূতিগুলো ভাগ করে নিতে চেয়েছিলাম। অবশ্য আজকে প্লেট ধোয়ার পালা আমারই ছিল। ঠিক আছে— মনে মনে ভাবলাম, এগুলোই আগে ধুয়ে নিই, তা না হলে আরও প্লেট জমে যাবে।
মা তার ঘরে চলে গেল। আমার খেতে ইচ্ছে করছিল না, তাই প্লেট ধোয়া শুরু করলাম। আমার হাত দুটো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। নিজের ওপর রাগও হচ্ছিল। ক্লান্তই যদি হয়ে থাকি তা হলে মাকে কেন বললাম না যে, একটু বিশ্রাম নিয়ে পরে প্লেটগুলো ধোব? কাউকে ‘না’ বলতে আমার খুব কষ্ট হয়। যখন ‘না’ বলেই ফেলি, তখন নিজেকে অভদ্র মনে হয়। তা ছাড়া সাহায্য চাওয়ার পরও হাত গুটিয়ে বসে থাকলে মা-ও কষ্ট পেতে পারে।
পাগলিটার চেহারা এখনও আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। জীবনে এই প্রথম কোনো নারীকে দেখে আমি ভয় পেলাম। দ্বিতীয় সেমিস্টারের দ্বিতীয় দিনের শুরুটা কতই না রোমাঞ্চকর ছিল! কিন্তু পাগলিটা সব নষ্ট করে দিল। দ্বিতীয় সেমিস্টার শুরু হওয়ার পর আমরা নতুন একটি বাসায় উঠেছি, ভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির কাছেই। ফলে প্রথম সেমিস্টারের সময় যে গেট দিয়ে ভার্সিটিতে যাতায়াত করতাম, এখন আর সে দিকে যেতে হয় না। যাতায়াতের পথ বদল না হলে হয়তো কখনোই তার সঙ্গে আমার দেখা হতো না।
ভার্সিটির সিকিউরিটি গার্ডের ধমকাধমকির সময়টা মনে পড়ছে। গার্ড পাগলিকে চেঁচিয়ে বলছিল— ‘তাড়াতাড়ি উঠ, এই আলু-পরোটা নিয়ে জলদি ভাগ এখান থেকে।’ আমি ভাবছিলাম, হয়তো কোনো অসহায় ভ্যানওয়ালাকে সে তাড়িয়ে দিচ্ছে। গার্ডের পাশ দিয়ে আমি যখন গেটের দিকে যাচ্ছিলাম, তখনই পাগলিটার কণ্ঠস্বর কানে এলো। কী যেন কী ভেবে আমি হঠাৎ থেমে গেলাম এবং সেদিকে ঘুরে দাঁড়ালাম। আমার দৃষ্টি আটকালো এক নারীর ওপর– লাল রঙের ব্লাউজ পরা, তবে হাতা ছেঁড়া; জিন্সের প্যান্ট পরা কিন্তু তাতে মাত্র একটি পা। হাতে একটি পাথর নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে।
‘আবার যদি আমার কাছে আসিস, তোকে পাথর মারব। তোর আলু-পরোটা তুই খা! কী ভাবছিস তুই, আমাকে এখান থেকে তাড়িয়ে দিবি? এটা তোর বাপের জায়গা?’ এভাবেই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে গার্ডের সঙ্গে ঝগড়া করছিল। আমি অজান্তেই তাদের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। আমাকে দেখামাত্র পাথরটি আমার দিকে তাক করে সে বলল, ‘কাছে আসলে তোর মাথাও ফাটিয়ে দেব।’
‘ওই মহিলা পাগল, ওর কাছে যেও না, তোমাকে আঘাত করতে পারে,’ সিকিউরিটি গার্ড আমাকে সতর্ক করে দিল। ‘পাগল’ শব্দটি শোনামাত্রই ভয় আমার বুক চেপে ধরল। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম এবং তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।
ধোয়া প্লেটগুলো যখন সাজিয়ে রাখছিলাম, তখন সেই ভয়ের কথা মনে পড়তেই আমার গা শিউরে উঠল। আমি তাড়াতাড়ি চারপাশে তাকালাম; শুকরিয়া, আমি বাড়িতেই আছি।
একজন নারীকে দেখে আমি ভয় পেয়েছি— এ কথা ভেবে আমি বিস্মিত হচ্ছিলাম। আমি নিজেকে সাহসী মেয়ে বলেই মনে করি, সহজে ভয়ও পাই না। তবে যখন ভয় পাই, আমার চোখে-মুখে সে ভয় ফুটে ওঠে। আমি ভয় পাই তখন, যখন নির্জন রাস্তায় হাঁটার সময় পেছনে কোনো পুরুষ থাকে অথবা ছেলেরা যদি এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে যেন আমার শরীরে কোনো কাপড় নেই। কিন্তু আজ আমি একজন নারীকে ভয় পেয়েছি। এতটাই ভয় পেয়েছি যে ব্যাপারটা আমার কাছে খুব অদ্ভুত লাগছে। নতুন নতুন প্রশ্ন আমার মাথায় এসে জড়ো হয়েছে।
রান্নাঘরের কাজ শেষ করে বিছানায় ঢলে পড়লাম। ধীরে ধীরে ভয়টা যখন বুক থেকে সরে যেতে লাগল, তখন অদ্ভুতভাবে মনে হলো— সেই পাগলিটার সঙ্গে আমার যেন এক ধরনের সংযোগ তৈরি হচ্ছে। তার দেহভঙ্গি, তার কথা বা আচরণের মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা আমাকে তার দিকে টানছে। হঠাৎ একটি চিন্তা মাথায় এলো— আচ্ছা, আমিও যদি তার মতো হতাম? আমি হেসে উঠলাম। এটাও এক ধরনের পাগলামি। হা হা! পাগলামি— অদ্ভুত একটা শব্দ! আজকের আগে আমি নিজেকে কখনো পাগল হিসেবে কল্পনাও করিনি অথবা হয়তো কোনো পাগলের দিকে সেভাবে তাকানোও হয়নি।
আমি আমার অনুভূতিগুলো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এক ঘণ্টা আগেও যাকে দেখে ভয় পেয়েছিলাম তাকে নিয়ে এত ভাবছি কেন? পাগলামি মানে কি চেতনার অভাব? যদি তাই হয়, তবে তার চোখে আমি এত গভীরতা দেখলাম কেন? এসব ভাবনার মধ্যেই নিজেকে শাসন করে বললাম, তুমি কি দার্শনিক হয়ে গেলে নাকি! কিন্তু তারপরও পাগলিটার চিন্তা আমি মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না।
আমার প্রিয় দুটি রং একসঙ্গে মিলিয়ে পরদিন সকালের জন্য আমি পোশাক আর ওড়না গুছিয়ে রাখলাম। পোশাক ম্যাচ করার উত্তেজনায় কিছুটা হলেও পাগলিটার চিন্তা মন থেকে সরে গেল, অবশেষে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রস্তুত হচ্ছি, এমন সময় মা ঘরে ঢুকল।
‘ওড়নাটা ছোট লাগছে, একটা বড় ওড়না পরে নাও,’ মা বলল।
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, ‘এই জামার সঙ্গে ওই ওড়নাটাই ভালো লাগছে।’
‘জানি, মা। কিন্তু বড় ওড়না পরলে বাইরে পুরুষদের দৃষ্টি থেকে তুমি নিরাপদ থাকবে, কেউ তোমাকে বিরক্ত করবে না।’
মা ঠিকই বলেছে: ওড়না ছোট হলে ছেলেরা উত্যক্ত করে কিংবা লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আমি আলমারি থেকে আরেকটি ওড়না নিয়ে নিলাম এবং ভার্সিটির পথে রওনা দিলাম। আমাদের বাসা থেকে মাত্র একটি রাস্তা পার হলেই ভার্সিটি, খুব বেশি সময় লাগে না। কিন্তু সেদিন মনে হচ্ছিল পথটা যেন শেষই হচ্ছে না।
ভার্সিটির গেটের কাছে এসে চারদিকে তাকালাম, কিন্তু সেই পাগলিটাকে দেখতে পেলাম না। আমার মন খারাপ হয়ে গেল। অদ্ভুত এক অনুভূতি— আমি যেন তাকে দেখার জন্যই অপেক্ষা করছি।
প্রথম ক্লাস শেষ করে আবার গেটের কাছে ফিরে এলাম, দেখলাম সে ওখানে আছে। পাগলিটা এমন একটি জামা পরেছিল, যার রং ঠিক সেই ওড়নাটির মতো, যেটা আমি প্রথমে পরতে চেয়েছিলাম। তার জামাটা হাঁটু পর্যন্ত লম্বা, পা ছিল খোলা। ভাবছিলাম, বড় ওড়না পরার পরও ছেলেরা যেভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, এমন পোশাকে পাগলিটাকে তারা না জানি কতটা হয়রানি করে! এত অপমান সহ্য করে সে কীভাবে চলাফেরা করে?
সে দেখে ফেলল আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। আমি তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে ফেললাম। কিন্তু আমার মন আমাকে তার দিকেই টানছিল। সম্ভবত একই অনুভূতি তার মধ্যেও কাজ করছিল। সাহস সঞ্চয় করে আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম। কাছে যেতেই সে যে পাতলা চাদর বিছিয়ে বসে ছিল, তার নিচ থেকে একটি পাথর বের করে হাতে নিল, তারপর হাত উঁচু করে পাথরটি আমার দিকে তাক করল।
আমি শান্ত স্বরে বললাম, ‘না, না, আমি আপনার কোনো ক্ষতি করতে চাই না। আমি শুধু একটা কথা বলতে চাই।’ আমার কণ্ঠের নমনীয়তায় সে পাথরটা নিচে নামাল। আমি বললাম, ‘আপনি আমার প্রিয় রঙের পোশাক পরেছেন।’ সে হেসে উঠল, সেই হাসি এতটাই উন্মত্ত ছিল যে ভয় পেয়ে গেলাম। খুব দ্রুতই তার হাসি থেমে গেল, তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে লাগল, সে কাঁদতে শুরু করল। আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম, কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
‘আমি দুঃখিত, আমার প্রিয় রঙের পোশাক পরেছেন দেখে আমি আপনাকে খুশি করতে চেয়েছিলাম।’
‘প্রিয় রং? তোমার কি আদৌ কোনো প্রিয় রং থাকতে পারে?’ সে এবার জবাব দিল।
আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না, তবু নিচু স্বরে বললাম, ‘হ্যাঁ, পোশাক আর রঙের ব্যাপারে আমার রুচি ভালো।’ সে চাদরটা তুলে কাঁধে জড়িয়ে চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল।
“প্রিয়! হা হা হা, ‘প্রিয় রঙ’, পাগলি মেয়ে,” বলতে বলতে সে চলে গেল।
আমাকে কেউ ‘পাগল’ বলছে এটা শোনার পর আমার হাঁটু অবশ হয়ে গেল, আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। সে বলে কি! আমি পাগল? আমি যাকে পাগল বলি, সেও আমাকে পাগল বলে? না, না— সেই পাগল, আমিই স্বাভাবিক। নিজেকে এ কথা বোঝাতে অনেক চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার ভেতরের একটি অংশ এতটাই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল যে, কোনো যুক্তিই আর কানে ঢুকছিল না।
মিডটার্ম পরীক্ষার দিন উপলব্ধি করলাম, পাগলিটাকে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মানসিক অশান্তির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। আমার মন বলছিল, তার আর আমার মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে; তাকে জানা আমার নিজের অনুভূতিগুলো উপলব্ধি করার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
বাড়ি ফিরে দেখি, অন্যদিনের মতোই মা আমার জন্য রাতের খাবার রান্না করে রেখেছে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে— সে ক্লান্ত। তার চোখের গভীরে তাকিয়ে দেখলাম, সেই পাগলিটার চোখের মতোই সেখানে লুকিয়ে আছে অসংখ্য না বলা গল্প।
‘এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আজ কি আমাকে খুব মনে পড়ছিল?’ মা জিজ্ঞেস করল।
আমি তার প্রশ্নটা ভালোমতো শুনতে পাইনি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার নাম মালাইকা কেন রেখেছিলে?’ তার চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল। থালা-বাসন রেখে মা আমার পাশে এসে বসল। তাকে এতটা আবেগতাড়িত হতে আমি আগে কখনো দেখিনি।
মা হাসিমুখে বলতে শুরু করল, “আমার বয়স তখন একুশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। তখনই প্রথম বুঝতে পারলাম তুই আমার গর্ভে এসেছিস। তোর বাবা খুব খুশি হয়েছিল, কিন্তু আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। আমার আনন্দও হচ্ছিল, আবার ভয়ও ছিল। আমি জানতাম না কেন ভয় পাচ্ছিলাম, কিন্তু সেই ভয়টা ছিল আমার আনন্দের চেয়েও বেশি। ভূমিষ্ট হওয়ার পর তোর ছোট্ট হাত দুটো ছুঁয়ে তোকে যখন কোলে নিলাম, তখন শান্তি পেলাম। আমি তোর নাম রাখলাম মালাইকা— মানে ফেরেশতা। তুই আমার রক্ষাকারী ফেরেশতা, আমার আপনজন, আর আমার মতোই একজন নারী। কিন্তু সেই ভয়টা এখনও আমার মনে গেথে আছে।” মা’র হাসিটা ম্লান হয়ে গেল।
‘কীসের ভয়?’ আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম। মা আমার মুখে হাত বুলিয়ে দিল।
‘তুই মেয়ে, আর মেয়েদের জীবন অনেক কষ্টের। মেয়েদের খুব সাহসী হতে হয়, অনেক ধৈর্য রাখতে হয়। ছেলেরা অনেক সময় অসাবধান হতে পারে, কিন্তু মেয়েদের প্রতিটা ব্যাপারে সাবধান থাকতে হয়।’ আমি আরও কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তোর প্রশ্নের ঝুড়ি আবার খুলে গেল। আগে খেয়ে নি, তারপর ঘর ঝাড়ু দে। ঘর-দোর এই অবস্থায় দেখতে ভালো লাগে না।’
মায়ের কথা আমাকে আরও অস্থির করে তুলল। তার চোখ আর সেই পাগলিটার চোখের মধ্যে একটা পার্থক্য ছিল। মা’র চোখে ভয় ছিল, কিন্তু ওই পাগল মহিলার চোখে ভয় বলে কিছু ছিল না।
মা’র সাথে কথা বলার পর আমার খিদে চলে গেল। আমার সব অশান্তির শুরু যেন এই এক প্রশ্ন থেকেই— আমার মনে এত ভয় কেন? এই ভয় আমার সব শান্তি কেড়ে নিয়েছে। আমি ভাবতে লাগলাম, কারও সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক তৈরি হলে কি ভয় পাওয়া স্বাভাবিক? প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয় মানেই তো কষ্ট পাওয়ার ভয়, সমাজের ভয়। ওই পাগল মহিলার হয়তো কারও সঙ্গে কোনো আবেগের সম্পর্ক নেই, কিংবা সে হয়তো সম্পর্ক গড়তেও পারবে না— এজন্যই হয়তো সে এতটা নির্ভীক।
ওই পাগলিটার যদি একটা মেয়ে থাকত? সে আমার বয়সিও হতে পারত, মালাইকার বদলে হয়তো তার নাম হতো লেমার বা সূর্য। সে হতো নক্ষত্রপুঞ্জের অন্যসব নক্ষত্রের মতই সমান মর্যাদার। হয়তো লেমার কোনো কিছুতেই ভয় পেত না, সে যা পেতে চায় তাই চেয়ে বসত। লেমার, আমার খুব পছন্দের একটি নাম…
হঠাৎ নিজের ওপরই রাগ হলো। আমি কি এতটাই অকৃতজ্ঞ হয়ে গেছি যে মায়ের ভালোবাসা আর নিরাপত্তাকে দুর্বলতা মনে করছি? কিন্তু এই ভাবনাগুলোর ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, এগুলো কোথা থেকে আসছিল তাও আমি জানতাম না।
দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। প্রতিদিনই আমি পাগলিটার সঙ্গে একটু একটু করে কথা বলার চেষ্টা করতাম, কিন্তু তার সাথে কথা বলে আমার জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পাওয়ার চেয়ে প্রশ্নই তৈরি হতো বেশি।
অবশেষে একদিন ঠিক করলাম, তার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলব। সে যা-ই বলুক ধৈর্য ধরে শুনব আর আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করব। আমার মন বলছিল, আমার সব প্রশ্নের উত্তর তার কাছে আছে।
আমি ভার্সিটির গেটের কাছে গেলাম। দেখলাম, একটা পাতলা চাদর পেতে সে বসে আছে। চাদরটা আমিই তাকে দিয়েছিলাম। আমার দেওয়া জিনিসটা সে ব্যবহার করছে দেখে বেশ ভালো লাগল। আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। সে আমার দিকে তাকাল, খেয়াল করলাম আজ তার চোখে খুশির ঝলক দেখা যাচ্ছে। মনে হলো, আজকের দিনটা ভাল যাবে।
সে বলল, ‘পাগলি মেয়ে, আজ কি আমাকে একটা আলুপরাটা কিনে দেবে?’
আমি বললাম, ‘কেন নয়! কিন্তু আগে বলো, তুমি আমাকে পাগলি বলে ডাকো কেন?’
সে বলল, ‘তুমিও তো আমাকে পাগলি বলেই ডাকো, তাই না?’
আমি বললাম, ‘আমি? আমি তো তোমাকে সামনা সামনি কখনও পাগলি বলি না।’
সে বলল, ‘হুম, তোমাদের মতো মানুষরা তো অন্যের পেছনে কথা বলেই অভ্যস্ত।’
আমি বললাম, ‘কিন্তু আমি তো পাগলাটে নই।’
সে হেসে উঠল, আমার দিকে তাকাল, আবার হাসল, তারপর বলল, ‘আমাকে তোমার পাগল মনে হয় কেন?’
আমি বললাম, ‘জানি না, কিন্তু সমাজের চোখে তুমি স্বাভাবিক নও।’
সে বলল, ‘সমাজ? সেটা আবার কী?’
আমি বললাম, ‘সমাজ মানে নিয়ম-কানুন, আচার-আচরণ, রীতি-নীতি।’
সে বলল, ‘ওহ, মানে তুমি দাসত্বের কথা বলছ?’
আমি বললাম, ‘না, দাসত্ব হবে কেন?’ তবে এবার আমি কিছুটা ধাধায় পড়ে গেলাম।
দাসত্ব নয় তো কী? মানুষের পছন্দমতো পোশাক পরা, অন্যের জন্য নিজের হাসি, কান্না, সুখ, দুঃখ নিয়ন্ত্রণ করা— এসব তা হলে কী? অন্যের চাহিদা মাফিক বেঁচে থাকাকে দাসত্ব ছাড়া আর কী বলা যায়?’
আমি তাকে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু উপযুক্ত কোনো শব্দই খুঁজে পেলাম না। সে বারবার বলছিল, ‘পাগল, পাগলামি; পাগল, পাগলামি।’
‘তোমার নাম কী? তুমি কি চাও না মানুষ তোমাকে নাম ধরে ডাকুক?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। তার চোখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, আর সে এমন এক সুরে উত্তর দিল, যা আমি আগে শুনিনি।
‘নাজানিন, নাজানিনা— কারও প্রিয়, কারও আদরের।’
‘কি সুন্দর নাম! এখন থেকে আমি তোমাকে নাজানিন বলেই ডাকব। নাজানিন, তোমার যদি একটা কন্যা সন্তান থাকত, তুমি কি আমার মায়ের মতোই তার নাম রাখতে মালাইকা?’
“কন্যা? ‘কন্যা’ নামটাই তো যথেষ্ট। যদি আমার মেয়ে থাকত, আমি তাকে শুধু ‘কন্যা’ বলেই ডাকতাম। কোনো তুচ্ছ নামে তাকে বেঁধে রাখতাম না। সে আমার ‘কন্যা’ হয়েই থাকত, এটাই যথেষ্ট।”
তার কথাগুলো আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেল। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। নাজানিন আর আমার মা প্রায় সমবয়সি, কিন্তু মা আমাকে নিয়ে সবসময় ভয়ে থাকেন, অথচ নাজানিনের মধ্যে কোনো ভয় নেই। এমন কেন? মনে হচ্ছিল আমার বুক ফেটে যাবে। আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সে গভীর চিন্তায় ডুবে আছে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘নাজানিন, তুমি কি জানো সবাই তোমাকে পাগলি বলে?’
‘আমি যখন মানুষকে তোয়াক্কা করা বাদ দিলাম তখন থেকেই তারা আমাকে পাগলি বলা শুরু করেছে। সেটা অনেক দিন আগের ঘটনা। এখন আমি জীবনের সত্যটা বুঝতে পারি।’ নাজানিন ভার্সিটির গেটের দিকে তাকিয়ে রইল, তার মুখের আনন্দের ঝিলিক ধীরে ধীরে উবে গেল।
‘কোন ঘটনা?’
‘তুমি কি জানো, কেন তুমি ওদের এত ভয় পাও, কিন্তু আমি পাই না? তুমি কি জানো, কেন তুমি তোমার পছন্দের রঙের কাপড় পরতে পারো না, আর আমি পারি? তুমি কি জানো, কেন তুমি তাদের মতো করে চলার পরও তারা তোমাকে শান্তিতে থাকতে দেয় না?’
আমার বুক ধড়ফড় করছিল। আমি জোরে চিৎকার করে বলতে চেয়েছিলাম, ‘না, না, আমি জানি না! এটাই তো আমি জানতে চাই!’ কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই নাজানিন আবার বলতে শুরু করল।
‘সেদিনের ওই বিদ্রোহই আমাকে সত্যটা দেখিয়েছিল। তখন আমি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিলাম, আর আয়াজ ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর একজন মেধাবী ছাত্র। আমাদের বাগদান হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এই অত্যাচারী সমাজ আমাদের সেই ভাগ্য কেড়ে নিয়েছে। আমরা এই গেট দিয়ে বের হচ্ছিলাম, হঠাৎ মোটরসাইকেলে চড়ে কিছু ছেলেপুলে এসে কয়েকজন মেয়ের মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারল। আয়াজ আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিল, সে প্রতিবাদ করেছিল। প্রতিবাদ করায় ওরা আয়াজকেও মেরে ফেলে। আয়াজ প্রতিবাদ করে মারা যায়, আর আমার প্রতিবাদ ছিল পাগল হয়ে যাওয়া।’
নাজানিনের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। সে উঠে দাঁড়াল, আমার দেওয়া পাতলা চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিল, আর বারবার বলতে লাগল, ‘পাগলামি, বিদ্রোহ, স্বাধীনতা।’
একটা ঠান্ডা স্রোত আমার শরীর জুড়ে বয়ে গেল। আমার হাত-পা কাঁপতে লাগল, চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল। আমি উঠতে চাইলাম, কিন্তু ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছিলাম না। আমি কোনোমতে শরীরটা টেনে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম, আর উদ্বিগ্ন গলায় বলতে লাগলাম, ‘পাগলরা কি সত্যিই পাগল, নাকি আমরা? আমি কি পাগল, নাকি পাগল ওই মহিলা? সে তো ঠিকই বলেছে, আমরা এত ভান করি কেন? আমি কি স্বাধীন? আমরা পাগল, নাকি পাগলরাই পাগল?’ আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, আমি দৌড়াতে শুরু করলাম, আর বারবার বলতে লাগলাম, ‘আমি পাগল, নাকি ওই পাগল মহিলাই পাগল?’ এই ভাবনায় ডুবে আমি বাড়ি পৌঁছালাম।
বরাবরের মতো মা ঘরের কাজে ব্যস্ত ছিল। আমরা একে অপরকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ‘খাওয়া শেষ করে জায়গাটা ঝাড়ু দিস, কালকে অতিথি আসবে।’
আমি তাকে জোরে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলাম, বলতে চেয়েছিলাম, ‘মা আমার, আর ভয় পেও না। অন্যদের ভয় পাওয়াটা আমাদের খাসলত হয়ে গেছে, কিন্তু যত গর্জে তত বর্ষে না।’ আমি তার বুক থেকে সেই ভয়টা ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলাম, তার ভয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ততক্ষণে আমার নিজের লড়াই শুরু করার সময় হয়ে গেছে। আমি মাথা তুলে শান্ত গলায় বললাম, ‘মা, আমি একটু বিশ্রাম নেব, তারপর ঘরের কাজে তোমাকে সাহায্য করব।’








০ টি মন্তব্য