গোলামালীর রস কিচ্ছা
আশরাফ উদ্দীন আহ্মদ
আশ্বিনের অপেক্ষা শেষ হয়ে কার্তিক পড়তেই মন চনমনিয়ে ওঠে। মনের মধ্যে দোলা লাগে, মন দোলায়িত হয়। সে দোলায় বাকবাকুম বাকবাকুম ডাকটা বেশ টের পায় গোলামালী। কার্তিক-অঘ্রাণে হালকা শীত-শীত একটা আমেজ শরীর মনকে ঠান্ডা রাখে। পৌষ মাঘ ফাল্গুন তো শীতের জেরবার কাহিল দশা। ঋতুর এই চড়কা নাচন বড় বিচিত্র। লোকমানপুরের আকাশে ভাতের মাঢ়ের মতো মেঘ লেপ্টে থাকে। গোলামালী হলদিগাছী-চারঘাট-আড়ানী-পিরিজপুর-নন্দনগাছীর দিকের প্রায় সমস্ত খেঁজুরগাছের গাছী। ওর সাগরেদ আছে দশ থেকে বারোজন, দিনেদিন তারাও পাকা শিউলী বা গাছী হয়ে উঠেছে। ওস্তাদকে মান্য করেও বটে। কর্মঠ্য ক্লান্তিহীন মানুষ, ওরাও গোলামালীর মতো পরিশ্রম করতে পারদর্শী।
এবার কার্তিক পড়তেই শীতও বেশ জাপটে বসেছে, শীতের কামড় বাঘের দাঁতের চেয়েও মারাত্মক মনে হয়। দুপুরের পরপর শরীরটাকে আর বিছানায় গড়ান না দিয়ে বাপকেলে মার্ডগারহীন ভাঙা সাইকেলটা নিয়ে বের হতে হয় গোলামালীর। অনেক-অনেক দূরে যেতে তার এতোটুকু ক্লান্তি লাগে না। সাইকেলের দু’ হ্যান্ডেলে এবং পেছনের ক্যারিয়ারে পেল্লাই সাইজের অ্যালুমিনিয়ামের কেতলি। সঙ্গে দু’চার রকমের হেঁসো, সান দেওয়ার পাতলা পাথর, কোমরে হেঁসো রাখার চোঙা। একগাছা পাকানো দড়াগাছা, লোহার সরু চোঙ, আরো নানান খুঁটিনাটি সরঞ্জাম, একজন পাকা শিউলীর যা লাগে। সাগরেদরাও এদিক-ওদিক ছড়িয়ে যায়, রসের যতো যোগান গুড়ের ততো বাড়-বাড়ন্ত। গুড় বেশি-বেশি মানে হলো ব্যবসার উন্নতি। বাতাসে যখন গুড়ের সুঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার হয়ে মাতামাতি করে ছোটাছুটি করতে থাকে। তখন গোলামালীর মনটাও কেমন আঁইঢাঁই করে ওঠে। রসের জ্বাল যতো সুনিপূঁণ হয়, মনটা তখন হারিয়ে যায় কোথায়। ফাল্গুন মাসের একটা হালকা ছোঁয়া এভাবে তাকে উচাটন করে কেনো বোঝে না কিছুই সে।
পড়ন্ত রেশমী বিকেলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গোলামালী ভাবে এবার আরেকটা বিয়ে করবে। ভাবনাটা দীর্ঘদিনের, কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। বিয়ে মানে আরেকটা বিয়ে, আরেকটা বউ। নতুন বউ ঘরে আসলে তার ভাগ্যের সঙ্গে বউয়ের ভাগ্য এক হলে ব্যবসার উন্নতি হবে। নতুন পুরানো দুজনে একসাথে কাজ করলে মন্দ কি। আগেরটাও পরিশ্রমী নতুনটাও দেখাদেখি পরিশ্রমী হয়ে উঠতে কদিন আর লাগবে। অতএব বিয়ে তাকে করতেই হবে।
সেদিন কথাটা জরিনাকে বলতেই গোখরা সাপের মতো ফণা তুলে ওঠে। চোখের মধ্যে বিষ থাকলে হবে কি কাজ তো হয় না। গোলামালী আলগোছে নিজেকে সংবরণ করে। মনে-মনে বলে, যে সাপের বিষ নেই, তার আবার কুলোপনা… ওমন সাপের ছোবল কতো সে খেয়েছে জন্ম থেকে। কি হয়েছে, মরেনি আজো। কেনো মরবে, ইচ্ছে করলেই কি মানুষ মরতে পারে, মরা তো কারো হাতের মোয়া নয়। যে মরতে ইচ্ছে হলো আর মরে গেলাম। ওপরওয়ালার মর্জি না হলে কেউ মরতে পারে না। সবই তার কারসাজি, দাবা খেলার আসল রহস্য তো তার নিজের হাতে। সে যা করে তাই হয়।
ফাল্গুন মাস আসলেই মনটা কেমন উড়ু-উড়ু করতে থাকে। কি যেন চাই, কি চাই তা সে নিজেই জানে না। জরিনার মধ্যে আর সে রকম স্বাদ নেই, দিনেদিন কেমন পানসে-পানসে একঘেঁয়ে লাগে সব সময়। তারপরও মুখ ফুটে তো কিছুই বলা যায় না। বিষ খেয়ে বিষ হজম আরকি! টাকা-পয়সা যতোই আসুক না কেনো মনে তৃপ্তি বা শান্তি না হলে তো জীবন বিষন্ন-বিপন্ন হবেই। জীবনে সখ-সাধ বলে তো একটি বিষয় আছে, জীবন মানে তো শুধু টাকা রোজগার করা নয়, একটু সুখ একটু আনন্দ বাকিটা হয়তো গল্পের। সে সুখ তো জরিনা দিতে পারে না। আগের মতো আর নেই সেই মজা আনন্দ।
পড়ন্ত রেশমী বিকেলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গোলামালী ভাবে এবার আরেকটা বিয়ে করবে। ভাবনাটা দীর্ঘদিনের, কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। বিয়ে মানে আরেকটা বিয়ে, আরেকটা বউ। নতুন বউ ঘরে আসলে তার ভাগ্যের সঙ্গে বউয়ের ভাগ্য এক হলে ব্যবসার উন্নতি হবে। নতুন পুরানো দুজনে একসাথে কাজ করলে মন্দ কি। আগেরটাও পরিশ্রমী নতুনটাও দেখাদেখি পরিশ্রমী হয়ে উঠতে কদিন আর লাগবে। অতএব বিয়ে তাকে করতেই হবে।
লোকমানপুরের স্টেশনের কাছাকাছি এসে পশ্চিমের ঘন সবুজের দিকে একবার তাকিয়ে মন হারিয়ে যায়। একদিন এখানে কতো-কতো ট্রেন থামতো, আজ সবই পুরানো গল্প কেচ্ছা মানে ইতিহাস। নামে মাত্র স্টেশন, কাঠামো ভেঙে-ভেঙে একশেষ অবস্থা। প্লার্টফর্ম-চাতাল সবই ইট বের হওয়া ঘেঁয়ো নেড়ি কুত্তার দশা। বাদুর-কাকের বাসা, আরো কতো কি রয়েছে তার ফিরিস্তি দিতে গেলে, বিশাল ফর্দ করতে হবে। রাজ্যের বেঁজি-শেয়াল আর সব সাপ খোপের আস্তানা। কোনো ট্র্রেন আর থামে না, সময়ের কি মূল্য এখন মানুষের। মানুষ যতোই এগিয়ে যাচ্ছে সময়ও কেমনে-কেমনে যেন ছোটো হয়ে আসছে। এপাশে আড়ানী আর ওপাশে আবদুলপুর মাঝে লোকমানপুর, কেনো থামবে আর আন্তঃনগর, মেইল কমিউটার ট্রেন, ঢালারচর ট্রেন। অথবা লোকাল ছোটো খাটো মাঝারি ট্রেন কি থামে দু’একটা! গোলামালী অনেক চেষ্টা করে দেখার, নিশ্চয় কোনো সাক্ষী কিছু থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু না, অন্বেষণ করেও কোনো লাভ হয় না। বুকের মধ্যে কেমন একটা হ্যাঁচড়প্যাঁচড় শুরু হয় একসময়। বাপজানের মুখে শুনেছে এককালে দূর-দূর রাজ্যের শহরের ক্রেতা-বিক্রেতা ফরিয়ারা-পাইকারেরা শুধু মাত্র খেঁজুরগুড়ের বায়না করতে ভাদ্র-আশ্বিন থেকে কার্তিক-অঘ্রাণ মাস অবধি আসতেই থাকতো লোকমানপুরে। সে সময় শত-শত গেরস্থবাড়ির গুড়ের জ্বালে মোহিত হতো আকাশ-বাতাস। সেই সুঘ্রাণে দূর-দূর অঞ্চলের মানুষ কি এক শিহরণে উত্তেজনায় ছুটে আসতো এই হদ্দ গাঁয়ে। অথচ আজ সেই স্টেশনটাই হারিয়ে যেতে বসেছে, কোনোদিন বা মাটির সাথে মিশে যাবে ওর সর্বশেষ স্মৃতিচিহৃটুকু। তখন কেউ জানবে না একদিন এখানে একটা লোকমানপুর স্টেশন ছিলো। বিট্রিশ রাজ এলাকার মানুষের কথা ভেবে স্টেশান করেছিলো এখানে। একটা সময় ব্যাপারী-সওদাগরের হাঁকডাক সরগরম থাকতো সর্বদা। শোনা যায় আশেপাশে দু’ চারটে বেপাড়াও ছিলো তখন। কাস্টমার যেহেতু ভিন দেশের, এবং অল্প সময়ের, তাই পাড়া নয় বলা যায়। তবে বেপাড়া মানে পাড়া নয় এমন নয়। সেটাও পাড়া তবে ভিন দেশি নিশি লোকেরা সেখানে কদাচিৎ হাজির হতো। কতো কিসিমের মানুষজন এখানে আসতো, তাদের জন্য তো দরকার ছিলো এমন বেপাড়ার। ক্ষণিকের সুখ-সুখ ভালোবাসা কিনতে, মানুষ তো সারাজীবন কতো কিছুই না বেসাতি করে। জীবন থেকে সেগুলো কিনতে হয় আবার জীবনেরই হাটে বিকিয়ে দিতে হয়। গোলামালীও প্রথম যৌবনে ক’বার গেছিলো হয়তো পথ ভুলে। তবে সে আনন্দ আজো শিরায়-শিরায় বয়ে বেড়ায়। যার কারণে এদিকে আসলেই সে অনুভূতি জেগে ওঠে,মনটাকে নাড়িয়ে দেয় কিসের এক অচেনা বাতাস। সে বাতাস যেন বাতাস নয়, ভালোবাসার পরম মমতা। জরিনাকে পাওয়ার পর ভুলেই গেছিলো সে সমস্ত স্মৃতি। কিন্তু তারপরও মন থেকে তো সরানো যায় না সবকিছু। গোপন ভালোবাসা হয়তো একেই বলে। আজো পৌষ-মাঘের কনকনে শীতে জাকিয়া-রাবিয়া সীমা-আনারকলির কথা মনে পড়ে। বেপাড়ার এ’সমস্ত মেয়েরা তার মনকে একটা সময় রাঙিয়েছে ক্ষণিকের জন্য হলেও।
ফাল্গুন মাসের বৈরী বাতাসে মনকে শান্ত করেছিলো বেপাড়ার তন্বীগুলো। আজ তারা কোথায় কে জানে। কে কার খোঁজ রাখে। সময় মানুষকে সব কিছুই ভুলিয়ে দেয়। তখন বৈশাখ- জৈষ্ঠ্যের আগুন ঝরা গরম শরীর মনে উত্তাপ তোলে।
লোকমানপুর স্টেশান থেকে মাইল তিনেক দূরে খেঁজুরগাছের বাগানে গোলামালী নিজেকে হারিয়ে ফেলে। গাছগুলো পোয়াতির মুখের মতো আনন্দ হাসির আহলাদে ভরপুর। মাতৃত্বের গৌবরে সুখ-সুখ স্বপ্ন চোখে-মুখে বিমোহিত। শরীর মন কেমন বেদ্বীন হয়ে ওঠে। বাসুদেবপুর-মালঞ্চি-মধুঘাটি-এনায়েতপুরের ওদিক থেকেও সম্বন্ধ আসছে। গোলামালীর সৎমায়ের ভাই অর্থাৎ আতাবুর মামা পেছনে লেগেছে বেশ কয়েক মাস ধরে।
—আমার এক দূর-সম্পর্কের ভাগ্নি আছে, অল্প বয়সে স্বামী ছাড়া, তুমি ইচ্ছে হলে বিয়ে করে ঘরে আনতে পারো…
—কিন্তু মামা জরিনা কি মানবে, যদি কোট-কাচারি!
—না ভাগ্নে তুমি তো পুরুষ নয় দেখছি…
—বিয়ে করা যায়, কিন্তু…
—আবার কিন্তু কি ব্যাটা, রোজগার করছো ভালোই, তোমার মা-বাপ তো নেই, সৎমা অর্থাৎ আমার বোনটাও তো চলে গেলো, এখন কি আর…
—কথা ঠিকই জরিনার দু’দুবার বাচ্চা নষ্ট হলো, আর সম্ভাবনাও নেই। মরা শুকনো খেঁজুর গাছের মতো অবস্থা, রস আসবে না আর…
—তাহলে বোঝো, আমি তোমার তিনকুলের এক মামা তো বটেই, আপন মানুষ বলতে যা বোঝায়। তাই বলি ভাগ্নিটাকে ঘরে তুলে নাও।
—জরিনাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম তো! ওকে দুঃখ দিতেও মন সায় দেয় না…
—আহা দুঃখ-কষ্ট দেবেই বা কেনো! শুধু ঘরে একটা নতুন মানুষ। ধরে নাও নতুন আরেকটা কাজের লোক। আয় উন্নতিও তো বাড়বে ওর কপালেই ও খাবে…
হঠাৎ আতাবুর মামার কথা স্মরণ হতেই গোলামালী নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বিয়ের কথা চাওড় হতেই ইয়াসিনপুরের নইমুদ্দী কবিরাজের ছেলে মরিচ শেখ রাতারাতি একদিন বাড়ি এসে জানায়, ভালো মন্দ মিলিয়েই কিন্তু মানুষের জীবন, তো কথা হলো, আমি দু’ চার-দশ অঞ্চলের মানুষের বাড়ির হাঁড়ির খবর জানি, কারণ আমার পেশা কি না…
—কিন্তু আমি তো মানুষ চিনি না, অতো-শত বুঝিও না, সোজা-সাপটা দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ…
—ওখানেই তো সব ফিনিস, মানুষ চিনতে হবে, তুমি মিয়া আমাকে না চিনে কিনা আতাবুর মামাকে চিনে ফেললে, জানো ও একটা আস্তো বদের ধাড়ী, ওর বাপ একটা পিশাচ, দয়াগঞ্জের ঘাটের পারানি ছিলো…
—জানি আমার আব্বা শেষকালে বিয়ে করে আতাবুরের বিধবা বড় বোনকে, ছাবেরালী পারানির মেয়ে…
—তো ওই হারামজাদা সাত গাঁয়ের মেয়েদের নষ্ট করে দুর-সম্পর্কের আত্মীয় বলে বিয়ে দিয়ে টাকা কামায়…
—আতাবুর মামা তো ঘটক নয়, নির্ভেজাল মানুষ শুনি।
—কি যে বলো, আতাবুর মামা বাসুদেবপুর-মালঞ্চির মানুষ নয়, সে কি জিনিস জানো না, একটা বউ বাসুদেবপুরে আরেকটা মালঞ্চির দিকে আছে, আবার শুনি হিলি নাকি বালুরঘাটের দিকে আরেকটা আছে…
—তা তো জানি না, অনেকদিন পর দেখা হলো সেদিন।
—হ্যাঁ এই তো, আমি মরিচ শেখ, আমার আব্বা নইমুদ্দী শেখ কবিরেজ, আমরা সাত তল্লাটের মানুষকে হাড়ে-গতরে চিনি, তো আমার হাতে হাজার খানিক মেয়ে আছে, হা কম-বেশি তা হবে। তুমি একেবারে সধবা আনকোড়া মেয়ে বিয়ে করবে…
তার কিছুদিন পর বাপ চোখ বুঁজলে, সৎমা পালিয়ে গেলে বাড়িটা হালকা হয়, ভূতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয় বলা যায়। এর মধ্যে নাকি অজানা অচেনা ভূতের উপদ্রপ বেড়ে যায়। জরিনাকে বেশ কয়েকবার জাপটে ধরে, পেটে বাচ্চা এলে নাকি খেয়ে ফেলে। কবিরাজ বলে, তোমার বউকে সহজে ছাড়বে না, খেতে যখন শুরু করেছে, ওর পেটে যতো বাচ্চা আসবে, অশরীরি ভূত-আত্মা তা খেয়ে উদরের তৃপ্তি মেটাবে। কথাটা সত্য তা গোলামালী অনুধাবণ করেছে ঘটনা পরম্পরা। একদিন নাকি স্বচক্ষে দেখেছেও মস্ত হাত-পা ওয়ালা ভূতটাকে। মুখটা সেভাবে দেখতে না পেলেও পিলে চমকে যায় তাতেই। সেদিন থেকে বিশ্বাস করলেও, ওসব নিয়ে বেশি আর বাড়াবাড়ি করেনি। ভূত নিয়ে কে আর অতো নাড়াচাড়া করতে চায়।
গোলামালী কোনো কথা বলতে পারেনি। মরিচ শেখের মুখে আতাবুর মামার ভেতরের কথা শুনে মনটা ভেঙে যায়। ওর বাপ ঘাটের পারানি করতো, শোনা যায় ভালো মানুষ ছিলো। তবে এমনো শুনেছে বেশ কয়েকটা বিয়েও করেছিলো, অঘাটে-বাঘাটে পড়েও থাকতো। শেষকালে নাকি কোনো এক ডোমনির ঘরে মরেছিলো। ওর মেয়েটাকে বাপের ঘাড়ে চাপিয়েছিলো কিন্তু বাপ চোখ বোজার আগেই ডেমনী হলিদাগাছির নজেল মাছুয়ার সঙ্গে ভেগে যায় কোন চুলোয়। দুর্নামটা আগে থেকেই ছিলো, নজেল নাকি রাত-বিরাতে ফাঁক-ফোঁকর পেলেই গেঁছো বেঁজির মতো ঘরে এসে হাডুডু-ইসকাপনের টেক্কা খেলতো। গোলামালী ওসবে তেমন পাত্তা দিতো না কোনোদিন। কারণ মা মরে যাওয়ার পর বাপ হয়েছিলো তালুই। কোনো ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই উল্টো ঝামেলাটা তার ঘাড়েই ঝেঁড়ে দিতো।
মাঝরাত্রে গোলামালীর মাথায় তাবদ-তাবদ সুন্দরী সধবা-বিধবা মেয়েদের ঝলকানি ধাক্কা দেয়। ওপাশে জরিনা খোলসছাড়া সাপের মতো শুয়ে আছে। ওর মধ্যে না আছে বিষ আর না আছে গন্ধ, শুধু একটা মরা শরীর। অথচ একদিন ভালোবেসেই ঘরে এসেছিলো ইছাপুরের যাবেদালী ঘরামীর মেয়ে। শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে তালগাছ ঝুঁড়োতে গেছিলো ইছাপুরের চেয়ারম্যানবাড়ি। পঁচিশ-ছাব্বিশটা গাছ, ছিলো সুপারীগাছও, গোফর মুন্সী মানুষ ভালো, দিন পাচেক ছিলো গোলামালী ওই বাড়িতে। কতো কাজ করেছে তারপরও। যাবেদালী ঘরামির সঙ্গে তখন পরিচয়, গোবেচারা মানুষ, খুব ভালো লেগে যায় গোলামালীর। একদিন নিয়ে যায় বাড়িতে, জরিনাকে দেখে মন ভরে, মাজা সমান কালো মিসমিসে চুল দেখে মন বড় আকুল হয়। মাস ছয়েক ঘুরতে না ঘুরতেই ঘরে নিয়ে আসে যাবেদালী ঘরামির মেয়েকে। তখন সৎমা ছিলো বাপটাও শয্যাগত অবস্থা।
জরিনাকে দেখে সৎমা বলেছিলো, এ’ আবার এমন কি… আমার ভাইকে বললে এর চেয়ে ঢের সুন্দরী মেয়ে তোমার জন্য এনে দিতো, সঙ্গে নগদ মালামাল, হাভাতে নয় তো…
খুব খারাপ লেগেছিলো সৎমায়ের কথা শুনে। টাকা-পয়সা কি হবে, ভালোবাসাইতো সব একজন মানুষের। জরিনার মতো একটা পানপাতা মুখের মেয়ে তার জীবনটা কানায়-কানায় ভরিয়ে দেবে। সেখানে টাকা নস্যি বৈ তো কিছু নয়!
তার কিছুদিন পর বাপ চোখ বুঁজলে, সৎমা পালিয়ে গেলে বাড়িটা হালকা হয়, ভূতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয় বলা যায়। এর মধ্যে নাকি অজানা অচেনা ভূতের উপদ্রপ বেড়ে যায়। জরিনাকে বেশ কয়েকবার জাপটে ধরে, পেটে বাচ্চা এলে নাকি খেয়ে ফেলে। কবিরাজ বলে, তোমার বউকে সহজে ছাড়বে না, খেতে যখন শুরু করেছে, ওর পেটে যতো বাচ্চা আসবে, অশরীরি ভূত-আত্মা তা খেয়ে উদরের তৃপ্তি মেটাবে। কথাটা সত্য তা গোলামালী অনুধাবণ করেছে ঘটনা পরম্পরা। একদিন নাকি স্বচক্ষে দেখেছেও মস্ত হাত-পা ওয়ালা ভূতটাকে। মুখটা সেভাবে দেখতে না পেলেও পিলে চমকে যায় তাতেই। সেদিন থেকে বিশ্বাস করলেও, ওসব নিয়ে বেশি আর বাড়াবাড়ি করেনি। ভূত নিয়ে কে আর অতো নাড়াচাড়া করতে চায়।
কাকডাকা ভোর হলেই রস সংগ্রহ করা থেকে রসে জ্বাল তারপর গুড় আর গুড়… পরিশ্রমের এতোটুকু কমতি নেই। জরিনাও গতর খাটায় সমানতালে। ওরও কোনো আরাম নেই। মোষের মতো খাটতে জানে জীবনভর। শুধু চোখে-মুখে ক্লান্তি। তারপরও গোলামালীর কদাচিৎ মনে পড়ে সুখ নেই মনে শরীরে তাই চরম ক্লান্তি। শরীরের কিসের টান পড়ে। এরমধ্যে কয়েকবার বেপাড়ায় গেছে শরীরের আগুন দমাতে। কিন্তু আগুন আরো দ্বিগুন বেড়ে গেছে চিমনির ভাটার মতো। রাত্রের দিকে তালের রস খেতে গেছিলো নগেনের ঝুপড়িতে, ওই বললো, চলো আজ ঘুরে আসি কোমরদুলানি সাধনার ঘর থেকে…
কোমরপুরের নগেনের সাথে ভাব সেই কৈশোরবেলা থেকে। সাধনার রূপ-যৌবন শরীর যেন আগুনের মোম। যতো দেখা যায় নেশা ততই বাড়ে। সাধনার চোখ আর হাসি দিনরাত্রি উন্মাদ করছে গোলামালীকে।
সপ্তাহখানিক যেতেই নগেনের কাছে আবার যায়, চলো সাধনা না রমনা কে যেন আছে…
—আহা যাবে, যখন তখন যাবে, আমার সাইকেল তো আছেই…
শীতের কনকনে ভাবটা বেশ জমাট আজ। নগেনের মার্ডগার্ডহীন সাইকেলের পেছনে বসে আছে গোলামালী। এবড়োথেবড়ো মাটির সড়কে, পাকা সড়কও বেশ ভাঙাচোরা। সরকার গাঁ-গ্রামের সড়কগুলোকে সেভাবে লক্ষ্য করেই না। কি বা দরকার আর, তাই ভাবে! অকস্মাৎ নগেন বলে ওঠে, এই মিয়া ঘরে বউ রেখে রাত্রের ভিজিট এতো বাড়ালে হবে…
নগেন বিয়ে-শাদি এখনো করেনি। তবে রাত্রের ভিজিট বেশ বাড়ে। কেউই বলার নেই। তাড়ি-ধেঁনো-পঁচানি যা বিক্রি করে সবই ওর পয়সা। সংসারে তেমন কেউ নেই। আছে বলতে এক বিধবা বয়স্ক পিসি। তো সেও দিনরাত্রি বিছানাগত, একটু ভাতে ভাত শাক-পাতা রেঁধে দেয়, তাই দুজনে খাই।এতেই আছে, লম্ফের মতো জ্বলে একটু-আধটু।
—না মানে এই একটু নতুন কিছু আর কি?
—এই তো গুরু আমার পথে এলে…
—মানে বুঝলাম না তোমার পথ আবার কি?
নগেন বললো, দেখো আমারও কি ইচ্ছে করে না এই শীতে বউকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকি, ইচ্ছে করলে একটা বিয়েও করতে…
—কেনো করছো না তাহলে…
—ওই তো বললে, শোনো একই জিনিস জীবনভর না খেয়ে নতুন-নতুন খাওয়া কি…
—হ্যাঁ সঠিকই বলেছো ভায়া…
—তুমি বিয়ে করেছো একটা, ঠিক আছে করেছো, বেশ করেছো কিন্তু খবরদার আর দ্বিতীয়টা এনো না…
—না মানে তুমি জানলে…
—আরে মিয়া গাঁয়ের খবর চাপা থাকে, মরিচ শেখ বলো আর আতাবুর মামা বলো সব শালাই ধান্ধাবাজ, বিয়ে দিয়ে ফাঁসাবে…
—হুম তুমি তো আমার বাল্যবন্ধু, তুমি বলো কি করবো তা’লে।
—আমি আবার কি বলবো, রসের গুড় তৈরী করে বেশ পয়সা তুমি কামিয়েছো, এখন একটার জায়গায় দশটা কচিঁ বউ ঘরে আনতে…
—কথা বলেছো বটে, কিন্তু জরিনার বাধা…
—কি দরকার ঝামেলা বাড়ানো, বরং এই তো ভালো যখন খায়েস জাগলো ভরা নদীতে ডুব দিয়ে এলাম…
—ভরা নদীতে ডুব, আহা কি কথা শোনালে গো!
—কেনো তুমি যা করছো, তাই তো বলে নাকি!
—আহা নগেন তুমি কবি হয়ে গেলে দেখছি…
— দেখো দেখো ওই আকাশের তারার মতো আমরাও ছুটে যাচ্ছি দূরে-দূরে কোথায় অজানায়…
গোলামালী খুব স্থির হয়ে ভাবতে লাগলো। সত্যিই মানুষও আকাশের তারা, শুধু ছুটে যায়, ছুটে-ছুটে কোথায় যেন যেতে চায়। রাত্রি অনেক এখন। শেষ প্রহর। শিশিরে ভরে আছে চারদিক। নগেনের সাইকেলের সামনে রডে বসে গুটিসুটি মেরে সব কথা শুনে যাচ্ছে সে। বাংলামদের দারুণ গুণ, যে খায় সে বোঝে, তুমুল উত্তেজনার মতো তুমুল বুদ্ধি বের হয়। নগেনের কথা শুনে গোলামালী কাস্তেতে ধার না দিয়ে সাপ মারবে কিন্তু লাঠি ভাঙবে না। জীবন ভোগ করে যাবে অথচ শরীরে কোনো দাগ থাকবে না। সংসার যেভাবে চলছে প্রবহমান নদীর মতো চলতে থাকবে। খেঁজুরের গুড়ের সুঘ্রাণে তামাম তল্লাটে নেমে আসবে মোহনীয় আদ্রতা।








০ টি মন্তব্য