বৃষ্টির জলে এককাপ চা

আলতাফ শেহাব

১.
চিৎকার চেঁচামেচি। ফ্লোরে আছড়ে পড়া পাতিলেরর ঝন্‌ঝনানি। চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে। ঘড়িতে ভোর ছ’টা ত্রিশ। ন’টায় অফিস। নিদেনপক্ষে আরো ত্রিশ মিনিট বিছানায় গড়িয়ে নেয়া যেত। ছুটে গেলাম রান্নাঘরে। রাগে গরগর করছে সে, ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়েছে পাতিলের দুধ। নিশ্চয়ই বিড়ালটার কাজ, চুপচাপ তাকিয়ে থাকলাম।
ও বলে— এ যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না।
বললাম— বাদ দাও। ফেরার পথে নিয়ে আসব এক লিটার।
করুণ চোখে তাকিয়ে রইল। ভাবলাম, এমন মায়াভরা দৃষ্টি যেন চিরকাল আচ্ছন করে রাখে আমাকে।

২.
ফেরার পথে বেমালুম ভুলে গেলাম। আমি এমনই। ভুলে যাই। সব স্বামীরাই ভুলে যায়। আমারতো বাজারে গিয়েও তিন চারবার ফোন দেয়া লাগে। বাসায় ঢুকলাম। খালি হাতের দিকে তাকিয়ে হেঁসে দিল।
শুধু বলল— একদিন দুধ চা না খেলেও চলবে।
একজন আছে। তার আঁচলের ওম, আমার ভুলগুলোকে লুকিয়ে রাখে, নিত্যদিনের। খুব যত্নে।

বাইরে বৃষ্টি। ভোর হবে কিছুক্ষণ পর। ভাবছি, মাথা ব্যথাতো সবারই হয়। আমারও হয়। এক কাপ চা খেলে সেরেও যায়। বৃষ্টির জলে মাখা এককাপ চা। কিন্তু এ রেসিপিতো সে বলে যায়নি। আমাকেও না।

৩.
অন্য একদিন। বৃষ্টির সকাল। ছ’টা পঁয়তাল্লিশ। সে ডেকে গেল একবার। সাতটায় আবার। চুলে বিলি কেটে দিলো। আমি কাঁথা মুড়ি দিতে দিতে বললাম, আর দশ মিনিট প্লিজ, উঠছি।
সে শুধু বলে গেল- বারান্দায় চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
বারান্দায় বসে বৃষ্টির জলে মাখামাখি করে চা খাই আমি। ভিষণ ভালো লাগে। ধরেন, এরকম ছোট খাটো ভালো মন্দের খবর রাখার কেউ যদি থাকে— জীবন ধন্য।

৪.
সেদিন বিকেলে বাসায় ফিরে দরোজায় বেল বাজালাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার বাজালাম। প্রায়দিনই এরকম হয়, দু’বার বেল বাজাই। একসাথে না, একটু পর পর। আমি জানি একসাথে বাজালেও দরোজা খুলবে, কিন্তু তখন সে এরকম নির্ভার থাকবে না। চোখে মুখে এক ধরনের অনিশ্চয়তা নিয়ে দরোজা খুলবে।
ওর চোখ রক্তজবার মতো লাল। কপালে রাখালের মতো শক্ত করে গামছা বাঁধা। এলোমেলো পায়ে শোবার ঘরে চলে গেল। আমি চুপচাপ অপেক্ষা করলাম।
ঘন্টা দুই পরে উঠে এসে বলল— মাথাটা প্রচণ্ড ধরেছিল, এখন ঠিক আছি।
এরপর এমন আরো বহুবার হয়েছে। হতেই থাকলো। সাপ্তাহ-দশদিন পরপর।

৫.
মেডিকেল রিপোর্ট হাতে চুপচাপ বসে আছি। হাসপাতালের বারান্দায়। বাইরে বৃষ্টি। ভোর হবে কিছুক্ষণ পর। ভাবছি, মাথা ব্যথাতো সবারই হয়। আমারও হয়। এককাপ চা খেলে সেরেও যায়। বৃষ্টির জলে মাখা এককাপ চা। কিন্তু এ রেসিপিতো সে বলে যায়নি। আমাকেও না।

২ Comments

  1. মনি মহম্মদ রুহুল আমিন

    বহুকাল পর আপনাকে পড়লাম

    Reply
    • আলতাফ শেহাব

      ধন্যবাদ মনি ভাই। বহুকাল আমি সেভাবে লিখিইনি…

      Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *