বাকি হিসাব
শরৎ চৌধুরী
“আব্বাজান, আপনি নড়বেন না।”
কথাটি কাকে বলেছিলাম, পরে আর নিশ্চিত হতে পারিনি—আব্বাজানকে, তাঁর কবরকে, না কবরের নিচের মাটিকে; যে মাটি তখন পানির ধাক্কায় ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল।
মৃত মানুষ নড়ে না—কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়।
তাদের কবর নড়ে। নামফলক সরে যায়। বহু বছর আগে ফেলে যাওয়া হিসাব বন্যার রাতে ঘরে ফিরে আসে।
আমি তখন উরুসমান পানিতে দাঁড়িয়ে আব্বাজানের কবরের চারপাশে বালুর বস্তা ফেলছিলাম। বস্তা আনা অটোরিকশাটি উঁচু রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। বস্তাগুলোও শেষ হয়ে আসছিল।
রাত তিনটার কাছাকাছি।
টর্চের আলো বৃষ্টির ভেতর কয়েক হাত গিয়ে থেমে যাচ্ছিল। মুহুরী নদীর পূর্বপাড়ের কবরস্থানের বাঁশের বেড়া ভেঙে গেছে। নিচু জায়গার পুরোনো কবরগুলো একবার দেখা যায়, পরক্ষণেই পানির নিচে চলে যায়। মনে হয়, মৃতেরা শ্বাস নিতে উঠে আবার ডুবে যাচ্ছে।
গতকাল পর্যন্ত আব্বাজানের কবরের ওপরের মাটি শুকনো ছিল। চারপাশের বাঁধানো ইটগুলো তখনই খুলে পড়তে শুরু করেছে।
এখন পানি কবরের ঢাল বেয়ে প্রায় অর্ধেক উঠে এসেছে।
স্রোত আর একটু বাড়লে ইটের সঙ্গে মাটিও ধসে যাবে।
কবরের মাথায় গাঁথা বাঁশটি দুই হাতে ধরে ছিলাম। পানির ধাক্কায় বাঁশ কাঁপছিল। আমিও।
উঁচু রাস্তা থেকে আম্মা ডাকলেন—
“সাব্বির, উইঠা আয়।”
আমি আরেকটি বস্তা কবরের দিকে ঠেলে দিলাম।
“পানি বাড়তাছে।”
“আপনি বাড়ি যান। এত রাইতে বাইর হইছেন ক্যান?”
“আমি বাড়ি গেলে তুই উঠবি?”
“উঠব।”
“কবরস্থানে দাঁড়ায়া মিথ্যা কওন ঠিক না।”
বিদ্যুৎ চমকাল।
এক মুহূর্তের জন্য আম্মাকে স্পষ্ট দেখা গেল। মাথায় নীল পলিথিন, ভেজা শাড়ি শরীরে লেগে আছে। এক হাতে আব্বাজানের পুরোনো লাঠি, অন্য হাতে টর্চলাইট।
তিনি বললেন—
“কবর বাঁচাইতে গিয়া তুই মরলে তোরে কই কবর দিমু?”
“আমি মরব না।”
“কথাটা তোর আব্বাও কইত।”
আমি তাঁর দিকে তাকালাম।
আম্মা মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
ঠিক তখন বুকপকেটে ফোনটি কেঁপে উঠল।
দুই স্তর পলিথিনের ভেতর থেকে বের করলাম। স্ক্রিনে লেখা—
আপনি ৮৭,৪৬০ টাকা পেয়েছেন।
প্রেরক—
আবদুল কাদের।
তিনি সৌদি আরবে ছিলেন উনিশ বছর। প্রথমে রাজমিস্ত্রি, পরে ক্রেনের সহকারী, শেষ দিকে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের গুদামে কাজ করতেন। অন্য মানুষের জন্য কত বাড়ি তুলেছিলেন, আমরা জানতাম না। আমাদের ঘরের টিনের চালটি তাঁর জীবদ্দশায় আর বদলানো হয়নি।
দুই-তিন বছর পরপর দেশে আসতেন। আমার শৈশবের স্মৃতিতে তাঁর মুখের চেয়ে স্যুটকেস বেশি স্পষ্ট। স্যুটকেস খুললে বের হতো খেজুর, আতর, সাবান, টর্চলাইট আর এমন সব জামা, যেগুলো হয় আমার গায়ে ছোট, নয় অনেক বড়।
আব্বাজান।
হাতের তালু দিয়ে স্ক্রিনের পানি মুছলাম।
নয় বছর ধরে তাঁর সৌদি নম্বরটি বন্ধ। সিমটি আমাদের কাঠের আলমারির দ্বিতীয় ড্রয়ারে, তাঁর ভাঙা ফোনের ভেতর।
কবরের ডান পাশ থেকে এক খাবলা মাটি খুলে পানিতে পড়ল।
আমি বাঁশটি শক্ত করে ধরলাম।
“আব্বাজান, আপনি কী করছেন?”
আম্মা রাস্তা থেকে জিজ্ঞেস করলেন—
“কার লগে কথা কস?”
“আব্বাজান টাকা পাঠাইছেন।”
কিছুক্ষণ শুধু বৃষ্টির শব্দ।
তারপর আম্মা বললেন—
“বাইচা থাকতে সময়মতো পাঠাইত না। এহন পাঠাইছে?”
তাঁর কথায় হাসি ছিল, না কান্না—বৃষ্টির মধ্যে বোঝা গেল না।
জীবিত অবস্থায় আব্বাজান কথা কম বলতেন, টাকা পাঠাতেন।
টাকার সঙ্গে ছোট ছোট নির্দেশ থাকত—
স্কুলের বেতন।
ঈদের বাজার।
টিন কিনো।
বাকি হিসাব।
তিনি সৌদি আরবে ছিলেন উনিশ বছর। প্রথমে রাজমিস্ত্রি, পরে ক্রেনের সহকারী, শেষ দিকে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের গুদামে কাজ করতেন। অন্য মানুষের জন্য কত বাড়ি তুলেছিলেন, আমরা জানতাম না। আমাদের ঘরের টিনের চালটি তাঁর জীবদ্দশায় আর বদলানো হয়নি।
দুই-তিন বছর পরপর দেশে আসতেন। আমার শৈশবের স্মৃতিতে তাঁর মুখের চেয়ে স্যুটকেস বেশি স্পষ্ট। স্যুটকেস খুললে বের হতো খেজুর, আতর, সাবান, টর্চলাইট আর এমন সব জামা, যেগুলো হয় আমার গায়ে ছোট, নয় অনেক বড়।
আম্মা একবার বলেছিলেন—
“নিজের ছেলের মাপ জানেন না?”
আব্বাজান হেসেছিলেন।
“পোলাপান তাড়াতাড়ি বড় হয়।”
“বাপ দূরে থাকলে আরও তাড়াতাড়ি।”
আব্বাজান শুনেছিলেন কি না বোঝা যায়নি। তিনি তখন স্যুটকেসের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে আমার জন্য আনা ঘড়িটি খুঁজছিলেন।
দশ বছর বয়সে একবার আমার খুব জ্বর হয়েছিল। আব্বাজান তখন দেশে। রাতভর বিদ্যুৎ ছিল না। তিনি পাশে বসে হাতপাখায় বাতাস দিয়েছিলেন। ভোরে ঘুম ভেঙে দেখি, দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছেন; পাখাটি হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেছে।
সেদিন ভিসার কাজে তাঁর ঢাকা যাওয়ার কথা ছিল। তিনি যাননি।
কথাটি আব্বাজান কখনো বলেননি। অনেক বছর পর আম্মার কাছে শুনেছিলাম।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম—
“আমাকে বলেননি কেন?”
আম্মা বলেছিলেন—
“ভালো কাজের হিসাব দিলে দাম কইমা যায়।”
দেশে এলে আব্বাজান বেশিদিন স্থির থাকতে পারতেন না। বাজারের দাম, বিদ্যুতের বিল, ক্ষেতের সীমানা—সব ঠিক করতে চাইতেন। যেন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দুই বছরের অনুপস্থিতি গুছিয়ে রেখে যাবেন।
ফিরে যাওয়ার আগে মাথায় হাত রেখে বলতেন—
“আর দুই বছর, বাবা। তারপর একেবারে দেশে।”
প্রবাসীদের দুই বছর কখনো শেষ হয় না।
আব্বাজানেরও হয়নি।
আমি তাঁকে সব সময় “আপনি” বলতাম। সবাই ভাবত, সম্মানের জন্য।
আসলে তাঁর সঙ্গে আমার “তুমি” বলার মতো পরিচয় তৈরি হয়নি।
বৃহস্পতিবার রাতে ফোন করতেন। প্রথমে আম্মার কাছে বাজারের হিসাব নিতেন।
“চালের দাম এত বাড়ল ক্যান?”
আম্মা বলতেন—
“আড়তদাররে ফোন দেন।”
“গত মাসে কম ছিল।”
“গত মাসে আপনিও কম পাঠাইছিলেন। বাজার কি আপনার বেতনের খবর রাখে?”
তারপর ফোন আসত আমার হাতে।
“বাপজান, কোন ক্লাসে পড়ো এখন?”
একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম—
“আপনি জানেন না?”
তখন আমার এসএসসি পরীক্ষা সামনে।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
“জানি। দেখি তুমি ঠিক বলো কি না।”
আমি বুঝেছিলাম, তিনি জানতেন না।
তবু বলেছিলাম—
“জি, আব্বাজান।”
আমাদের অধিকাংশ কথোপকথন এই দুটি শব্দেই শেষ হতো।
আব্বাজান মারা যান একটি নির্মাণাধীন ভবনে।
কোম্পানির কাগজে লেখা ছিল—হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ। তাঁর সঙ্গে কাজ করা কালাম চাচা বলেছিলেন, দুপুরের রোদে কাজ করতে করতে পড়ে গিয়েছিলেন। হাসপাতালে নেওয়ার গাড়ি আসতে দেরি হয়েছিল।
কোনটি সত্য, আমরা জানতে পারিনি।
মৃত মানুষের বিষয়ে সত্য কখনো কখনো বিদেশে আটকে থাকে।
লাশ ফিরতে সতেরো দিন লেগেছিল।
বিমানবন্দরে কফিনের গায়ে লেখা ছিল—
HUMAN REMAINS
HANDLE WITH CARE
আর তাঁর নামের বানানও ভুল।
আম্মা কফিনের ওপর হাত রেখে বলেছিলেন—
“এত পাতলা জামা পরাইছে কেন? ঠান্ডা লাগবে।”
আমি কিছু বলতে গিয়েও বলিনি।
ফেরার পথে তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিলেন—
“তুই ভাবছস, আমি জানি না?”
“কী?”
“মরা মানুষের ঠান্ডা লাগে না।”
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
দাফনের সময় আমি বারবার বলেছিলাম—
“কবরটা আরেকটু উঁচু করেন। বর্ষায় পানি আসে।”
একজন মুরব্বি বলেছিলেন—
“কবরের যত্ন আল্লাহ পাক করেন।”
চল্লিশ দিনের মাথায় আমি ইট এনে চারপাশ বাঁধিয়ে দিয়েছিলাম।
সেই বছর আমাদের ঘরের চালও চুইয়ে পড়ছিল। আম্মা বালতি বসিয়ে পানি ধরতেন। কবরের ইটের জন্য টাকা দিয়েছিলাম, চাল বদলাইনি।
আম্মা বলেছিলেন—
“তোর আব্বা সারা জীবন ইট-সিমেন্টের মধ্যে ছিল।”
“পানি উঠবে।”
“ঘরেও পানি পড়ে।”
“ঘর পরে ঠিক করব।”
“মরা মানুষের কাজ আগে?”
আমি রেগে বলেছিলাম—
“আপনি চান কবরটা ভাইসা যাক?”
তিনি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়েছিলেন।
আমি কবর রক্ষা করতে চাইছিলাম না। আব্বাজানকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে চাইছিলাম। জীবনে তিনি সব সময় আমাদের নাগালের বাইরে ছিলেন। মৃত্যুর পর অন্তত যেন জানি, তিনি কোথায় আছেন।
আব্বাজান মারা যাওয়ার পর বাসস্ট্যান্ডের পাশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকান দিই।
নাম—মায়ের দোয়া টেলিকম।
বন্যার সময় দোকানটি আর শুধু মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকান থাকত না। বাজারে বিদ্যুৎ চলে গেলে মানুষ ফোন চার্জ দিতে আসত, হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়ের খবর জানতে আসত। কারও কাছে জরুরি টাকা পাঠাতে হলে আমার নম্বর দিত। ইউনিয়ন পরিষদের লোকজনও মাঝেমধ্যে খবর পৌঁছানোর জন্য আমার ফোন ব্যবহার করত।
গ্রামের কে কোন চরে থাকে, কার কাছে নৌকা আছে, কোন বাড়িতে বৃদ্ধ মানুষ, কে পোয়াতি—এসব অনেকটাই আমার জানা ছিল। কেউ আমাকে দায়িত্ব দেয়নি; কিন্তু বিপদের খবরগুলো শেষ পর্যন্ত আমার কাছেই এসে জমত।
আলহামদুলিল্লাহ, ব্যবসা ভালোই চলছিল। গত বছর বাড়ির কাজেও হাত দিয়েছিলাম।
দোকানে বসে শিখেছিলাম, টাকার সঙ্গে শুধু টাকা আসে না।
বিদেশে থাকা একজন স্বামী টাকা পাঠিয়ে বলে—
বউকে পুরোটা দিবেন না।
একজন ছেলে মাকে সাত হাজার পাঠিয়ে বলে—
পাঁচ হাজারের কথা বলবেন।
কেউ ওষুধের টাকা দেয়। কেউ জানতে চায়, তার অনুপস্থিতিতে ঘরে কে এসেছিল। কেউ বলে, বাড়িতে সিসি ক্যামেরা লাগাতে।
টাকার সঙ্গে দূরের মানুষের চোখও আসে।
একদিন মালয়েশিয়ায় মারা যাওয়া জয়নাল চাচার নামে তাঁর মেয়ের কলেজে ভর্তির টাকা এল। পরে আরও দু-একজন মৃত মানুষের নামে টাকা এসেছে। পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।
এই টাকাগুলোর জন্য আলাদা একটি খাতা রেখেছিলাম।
আম্মা সেটাকে বলতেন—গায়েবি হিসাব।
খাতার মলাটে আমি লিখেছিলাম—অসমাপ্ত।
রাতে বাড়ি ফিরতে দেরি হতো। মৃত মানুষের পরিবারের খোঁজ নিতাম, কিন্তু আম্মা ওষুধ খেলেন কি না—অনেক দিন জিজ্ঞেস করা হতো না।
তিনি বলতেন—
“মরা মানুষের এত খবর রাখস। জ্যান্ত মানুষগুলার খবর কে রাখব?”
আমি ভাবতাম, কথার কথা।
শুধু আব্বাজানের নামে কোনোদিন কিছু আসেনি।
অনেক রাতে দোকান বন্ধ করে তাঁর নম্বর খুলে বসে থেকেছি।
লিখেছি—
আব্বাজান, আপনি আছেন?
পাঠানো যায়নি।
লিখেছি—
আম্মার ঋণ এখনো শেষ হয়নি।
লিখেছি—
আপনি দুই বছর বলেছিলেন।
কোনো উত্তর আসেনি।
নয় বছর পর তাঁর কবর যেদিন ভেসে যাচ্ছিল, সেদিন তাঁর নামে টাকা এল।
আম্মা কখন ঢাল বেয়ে নেমে হাঁটুপানিতে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, খেয়াল করিনি।
“ফোনটা দে।”
“আপনি নামলেন কেন?”
“তুই একলা থাকবি, আমি শুকনা জায়গায় দাঁড়ায়া দেখব?”
ফোনটি দিলাম।
আব্বাজানের নাম দেখে তাঁর মুখ শক্ত হলো। বিস্মিত হলেন না।
“কত?”
“সাতাশি হাজার চারশো ষাট।”
তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন—
“হিসাব ঠিক।”
“কোন হিসাব?”
“তোর আব্বারে বিদেশ পাঠাইতে আমার গয়না বেচছিলাম।”
“এই টাকাই?”
“হ।”
“এত বছর পরও মনে আছে?”
“রসিদটা আছে। টিনের বাক্সে। নাকফুলটা আলাদা গলাইছিল। ওইটার মজুরি ছিল চারশো ষাট টাকা।”
“আপনি বলেননি কেন?”
“তুই জিগাইছস?”
“আমি কীভাবে জানব?”
আম্মা একটি বস্তা টেনে কবরের দিকে দিলেন।
“তোর আব্বার কবর কত ইঞ্চি উঁচু, কোন ইট নড়ছে—সব জানস। ঘরের মানুষ কী হারাইছে, ওইটা জানার সময় হইল না?”
আমি চুপ করলাম।
“আব্বাজানের মনে ছিল?”
“ছিল।”
“শোধ করেন নাই?”
“প্রথমে কইল দোকান হইলে দিব। তারপর ঘর ঠিক করলে। তারপর তোর পড়াশোনা। তারপর তার নিজের ঋণ।”
“আপনি চাইতেন না?”
“চাইছি।”
“তিনি কী বলতেন?”
আম্মা হালকা হাসলেন।
“কইত, তুমি তো আমার বউ। তোমার আলাদা হিসাব কী?”
বৃষ্টির মধ্যে তাঁর হাসিটা শুনে শরীর আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।
“দেখছস? মরার পরে আলাদা হিসাব মনে পড়ছে।”
“টাকাটা আপনার।”
“আমার না।”
“আপনার গয়নার দাম।”
“গয়না কি আছে?”
“না।”
“আমার বয়স?”
আমি উত্তর দিলাম না।
“উনিশ বছর মানুষটার ফেরার অপেক্ষা করছি। ওই টাকায় এইগুলা ফেরত আসব?”
“আম্মা—”
“ভয় পাইস না। তোর আব্বারে খারাপ বলতেছি না।”
“আমি তা বলি নাই।”
“তোর মুখ বলছে।”
তিনি ফোনটি ফেরত দিলেন।
“মানুষ খারাপ না হইয়াও অন্যায় করে। তোরা এইটা মানতে চাস না।”
“আপনি তাঁর ওপর রাগ করেন?”
“করি।”
“এখনো?”
“মানুষটা মরছে। আমার রাগ তো মরে নাই।”
“তাহলে ভালোবাসেন?”
“রাগ আছে। ভালোবাসাও আছে।”
তিনি কবরের দিকে তাকালেন।
“তোর আব্বা ভালোবাসার আর কোনো ভাষা জানত না। টাকা পাঠাইত।”
“যথেষ্ট ছিল?”
“না।”
“তবু অপেক্ষা করেছেন।”
“হ।”
“কেন?”
“সব প্রশ্নের উত্তর এই পানির মধ্যে দাঁড়ায়া দিতে হবে?”
ভোরের আগে মুহুরীর পূর্বপাড়ের বাঁধ ভেঙে গেল।
প্রথমে মাটি ভাঙার শব্দ। তারপর মানুষের চিৎকার।
পূর্বচরের স্কুলঘরটিকে আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়েছিল। নারী, শিশু, বৃদ্ধ মিলিয়ে আশির বেশি মানুষ সেখানে উঠেছিল। নৌপথে জায়গাটি প্রায় আঠারো কিলোমিটার দূরে। স্রোত এড়িয়ে গেলে পথ আরও বাড়ে।
চেয়ারম্যানের ফোন বন্ধ। মেম্বার উপজেলা সদরে আটকা।
স্কুল থেকে ফোন দিলেন জাহাঙ্গীর স্যার। রিচার্জ আর পরীক্ষার ফরমের টাকা প্রায়ই আমার দোকান দিয়ে পাঠাতেন।
“সাব্বির, কারও লগে যোগাযোগ করতে পারতেছি না,” তিনি বললেন। “পানি দোতলায় উঠতেছে। লতিফের নৌকাটা যদি পাঠাইতে পারো—”
সংযোগ কেটে গেল।
লতিফ মিয়ার নম্বর আমার ফোনে ছিল। তাঁর নৌকার ডিজেলের টাকা মাঝেমধ্যে আমার দোকান থেকেই তোলা হতো। আধঘণ্টার মধ্যে তিনি বড় নৌকাটি নিয়ে পুরোনো বাঁধের কাছে এলেন। সঙ্গে দুজন মাঝি।
“চারবার যাওয়া-আসা লাগব,” তিনি বললেন। “দুইজন মাঝি, ডিজেল, ইঞ্জিন তেল—সব মিলাইয়া তিরিশ হাজার। নৌকা নষ্ট হইলে এই টাকায়ও কুলাব না।”
বাঁধের ওপর তখন আটকে থাকা মানুষগুলোর আত্মীয়স্বজন জড়ো হয়েছে। কেউ স্ত্রীকে খুঁজছিল, কেউ বৃদ্ধ বাবাকে। লতিফ মিয়া টাকা ছাড়া নৌকা ছাড়বেন না শুনে তারা চেঁচিয়ে উঠল—
“মানুষ মরতেছে, আপনে টাকার হিসাব করেন!”
লতিফ মিয়া বললেন—
“মানুষ বাঁচাইতে যামু। কিন্তু আমার নৌকা ডুবলে আমার ঘরের মানুষরে কে বাঁচাইব?”
কেউ উত্তর দিল না।
স্বজনেরা যে যার কাছে যা ছিল জড়ো করল। সব মিলিয়ে তিন হাজার টাকা।
ঠিক তখন জাহাঙ্গীর স্যার আবার ফোন দিলেন।
লাইন ধরতেই চিৎকার শোনা গেল।
“সাব্বির, আর সময় নাই।”
সংযোগ কেটে গেল।
আমি ফোনের ব্যালান্স দেখলাম।
৮৭,৪৬০ টাকা।
কবরের পাশ থেকে আরেক খাবলা মাটি খুলে পানিতে পড়ল।
লতিফ মিয়া বললেন—
“আর সাতাশ হাজার পাইলে নৌকা ছাড়ি।”
সাতাশ হাজার দিলেও কবরের জন্য টাকা থাকবে।
কিন্তু নৌকা ফিরে আসা পর্যন্ত কবরটা থাকবে কি না, জানতাম না।
আমি কবরের দিকে তাকালাম।
“আব্বাজান,” বললাম, “আপনি বলেন।”
আম্মা জিজ্ঞেস করলেন—
“কার কাছে জিগাস?”
“টাকাটা আব্বাজানের।”
“মরার পরও?”
“তিনি পাঠিয়েছেন।”
“টাকা পাঠাইছে। এহন কী করতে হইব, সেইটাও পাঠাইছে?”
আমি চুপ করে রইলাম।
“জীবিত থাকতে দূর থেইকা সংসার চালাইছে। এখন কবর থেইকাও চালাইব?”
“আমি ভুল করতে চাই না।”
“এই জন্য মরা মানুষের অনুমতি চাস?”
“কী করব?”
“সিদ্ধান্ত নিবি।”
“আপনি বলেন।”
“ক্যান?”
“হিসাব আপনার।”
“টাকা তোর ফোনে আইছে।”
“সব আমার ওপর ছাইড়া দিচ্ছেন?”
আম্মা পুরো শরীর ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন।
“সব তোর ওপর?”
তাঁর কণ্ঠ নিচু, কিন্তু বৃষ্টির মধ্যেও স্পষ্ট।
“তোর আব্বা যখন বিদেশ গেল, তুই আমার পেটে। সে ঠিক করল যাবে। আমি ঠিক করলাম থাকবে। সে টাকা পাঠাইছে। আমি তোরে মানুষ করছি। এখন একবার তোরে সিদ্ধান্ত নিতে কইছি—এইটাই সব তোর ওপর?”
আমি মাথা নামালাম।
কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন—
“তুই তোর আব্বার মতো হইস না।”
“কীভাবে?”
“টাকা দিয়া ভাবিস না, দায়িত্ব শেষ। মরা মানুষের পিছে লুকাইস না।”
“কবরটা চলে যাবে।”
“জানি।”
“আপনি এমনভাবে বলতেছেন—”
“কীভাবে বলব? চিৎকার কইরা?”
তিনি কবরের দিকে তাকালেন।
“উনিশ বছর মানুষটার ফেরার অপেক্ষা করছি। তুই ভাবস, এই মাটি ভাসলে আমার কিছু হইব না?”
“তাইলে?”
“ওই মানুষগুলার অপেক্ষা এখনো শেষ হয় নাই। তোর বাপের হইছে।”
“এইখানেই তো অন্তত ছিলেন।”
“সারা জীবন মানুষটা কোথাও থির হইতে পারে নাই। মরার পর তারে এক জায়গায় বাইন্ধা রাখবি?”
কবরের পাশ থেকে আরেকটু মাটি খুলে গেল।
আম্মা বললেন—
“আগে মানুষ বাঁচা।”
লতিফ মিয়ার নম্বরে সাতাশ হাজার টাকা পাঠালাম।
প্রথমবার লেনদেনটি আটকে রইল।
প্রক্রিয়াধীন।
লতিফ মিয়া ফোনটি মাথার ওপর তুলে ধরলেন। বৃষ্টির রাতে নেটওয়ার্কও যেন উঁচু জায়গা খুঁজছিল।
কিছুক্ষণ পর তাঁর ফোন কেঁপে উঠল।
“ঢুকছে।”
নৌকার বাঁধন খুলতে খুলতে তিনি বললেন—
“পঁচিশের বেশি নিলে ভারী হইব। চারবার যাইতে হইব।”
“ফেরার সময় কিছু বালুর বস্তা—”
তিনি আমার দিকে তাকালেন।
“আগে মানুষ।”
“জি। আগে মানুষ।”
নৌকায় উঠতে গিয়ে দেখি, আম্মা উঠছেন না।
“আপনি আসবেন না?”
“আমি থাকব।”
“এইখানে?”
“হ।”
“পানি বাড়তেছে।”
“জানি।”
“আপনিই তো কইলেন আগে মানুষ।”
“আগে মানুষ বাঁচা কইছি। কবরটারে একলা ছাড়তে কই নাই।”
তিনি আমার হাতে দড়ি দিলেন।
“ভালো কইরা ধর।”
“কবর গেলে?”
“আমি দেখব।”
“আপনি কী করবেন?”
“কিছুই করতে পারব না।”
তারপর আমাকে নৌকায় ঠেলে দিলেন।
স্কুলঘরের নিচতলা তখন পানির নিচে। মানুষ দোতলার বারান্দা আর ছাদে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে।
একটি শিশু কাঁদছিল—
“আমার ছাগলটা?”
প্রথমে শিশু, নারী ও অসুস্থদের তোলা হলো।
একজন বৃদ্ধ উঠতে চাইছিলেন না। তাঁর স্ত্রী কয়েক বছর আগে স্কুলের পাশের বাড়িতে মারা গেছেন।
“আমি গেলে সে আমারে খুঁইজা পাইব না।”
আমি তাঁর হাত ধরলাম।
“মরা মানুষ জায়গা দেখে খোঁজে না।”
তিনি তাকালেন।
“তুমি ক্যামনে জানো?”
“আমার আম্মা জানে।”
চার দফায় সবাইকে পূর্বচর থেকে সরিয়ে উঁচু আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিলাম।
শেষবার ফেরার সময় লতিফ মিয়া হিসাব মিলিয়ে বললেন—
“তিরাশি।”
তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। বৃষ্টি কিছুটা পাতলা হয়েছে।
দূর থেকে কবরস্থান দেখা যাচ্ছিল না।
শুধু পানি।
হিজলগাছটি উপড়ে পড়েছে। বাঁশের বেড়া নেই। নামফলকগুলোও নেই।
উঁচু রাস্তার পাশে আম্মা বসে ছিলেন। হাতে আব্বাজানের লাঠি। পায়ের কাছে ফেটে যাওয়া একটি বালুর বস্তা।
নৌকা থেকে নেমেই জিজ্ঞেস করলাম—
“কবর?”
আম্মা মাথা নাড়লেন।
আমি পানিতে নেমে গেলাম।
“সাব্বির।”
শুনলাম না।
যেখানে কবর ছিল বলে মনে হলো, সেখানে দুই হাত দিয়ে মাটি খুঁজলাম।
কাদা।
শিকড়।
ভাঙা ইট।
একসময় হাতে কাপড়ের মতো কিছু লাগল।
টেনে তুললাম।
একটি লাল গামছা।
কার, জানি না।
ছেড়ে দিলে স্রোত নিয়ে গেল।
“আব্বাজান!”
জীবনে প্রথমবার এত জোরে তাঁকে ডাকলাম।
বিদেশে থাকা অবস্থায় নয়।
কফিনের পাশে নয়।
দাফনের সময়ও নয়।
“আব্বাজান!” পানি কোনো উত্তর দিল না।








০ টি মন্তব্য