নদীর জীবন
আশরাফ উদ্দীন আহ্মদ
ঘুঘুডাঙার ঠিক চার মাথা মোড়ের আগায় হাবলের চা-বিড়ি কমদামি বিস্কুট-লেবুনচুষ পাওরুটি জাতীয় জিনিস নিয়ে চায়ের টঙ। বাঁশের চালার ওপর তিন দিকে দরমা বেড়া আর মাথার ওপরে খড়ের ছাউনি। ডোবার নীচে বাঁশগুলো বেশ শক্তপোক্ত ভাবেই গাঁঢ়া হয়েছে, যাতে মানুষজনের ভারে কোনো ঝুকি না থাকে। আট-দশ গাঁয়ের মানুষ এসে বসবে, চা-বিড়ি খাবে, খোশ গল্প করবে দু’চারটে। স্কুলের সময়ও ছোট-ছোট ছেলে মেয়েগুলো তার টঙে ভিড় করবে, চিন্তা করেই টঙের ওপর স্টল দিয়েছে হাবলে।
দুপুরের দিকে খদ্দের তেমন না এলেও প্রাইমারি স্কুল বা ওপাশের মাদ্রাসার কঁচিকাঁচাদের একটা ভিড় দেখা যায়। মাটির চুলো নেভানো থাকে। হয়তো ভেতরে আগুনের উত্তাপ থাকে কিছু। দু’পাঁচটা ঘরছাড়া মানুষ বসে দীর্ঘসময় আড্ডা-ফাড্ডা দেয়। হাবলেকে কেউ- কেউ জোরাজুরি করে, ওই কুসুম-কুসুম পানি দিয়েই চা করতে… তাই খায় সস্তা বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে। এতেই তাদের জীবন কাটে আর কি! এতেও একটা সুক্ষ্ণ ছন্দ বেশ টের পাওয়া যায়। সবাই পায় না, কেউ কেউ তো পেতেই পারে।
স্টলের কোণে বসে ছিলো আলোকদিয়ার আতাউল্লা। চোখ জোড়া লাল টকটকে জবা। কতোদিন যে ঘুমোয়নি কে জানে! আর কতো বোতলই বা সাবড়েছে তাও বা কে খোঁজ রাখে। আতাউল্লা এখন আলোকদিয়া থাকলেও বিষাহরি গ্রামের খাঁটাল তেঁতুলতলা দিকের মানুষ। সাপাহারের রহমান হাজির ট্রাক চালায় আজ বারো বছর। আগে পোরশা-আমনুরার দিকে মোকারম মিয়ার পিকাপভ্যানের আধা ড্রাইভারি করেছে, ফুল ড্রাইভার হয়েছে রহমানের ট্রাকের। এখন বাড়ি বসে আছে, কোথায় যেন একটা বড়সড় দূর্ঘটনা ঘটিয়েছে, আর তাই রহমান ট্রাক দেয়নি। হাবলের কাছে বাকিতে চা খায়, গাল-গল্প করে ইনিয়ে বিনিয়ে। কাকে যে গালমন্দ করে সেই জানে, সেভাবে তাকে কেউ ঘাঁটায়ও না। মাঝে সাঝে ঝাঁঝালো কথাও দু’একটা বলে বৈ কি!
–নাহ আর মনে হয় দেশে থাকবো না গে হাবলে…
–কোন দেশে যাবুরে মিয়ার ব্যাটা।
–এদেশে থেকে অনাহারে মরার কোনো মানে…
–বিদেশ-বিভূয়ে গিয়ে ডলার আনবে তো!
–বাহরাইন বা কাতার লোক নেবে, ভাবছি সেদিকেই উড়ে যাবো…
হাবলে তাকিয়ে থাকে আতাউল্লার দিকে একভাবে। নেশার ঝোঁকে বলছে নাকি সত্যিই কথা বলছে আন্দাজ করার চেষ্টা করে। বিদেশ যাবে ঠিক আছে, কিন্তু কি কাজই বা করবে। কোনো প্রশ্ন করার ইচ্ছে থাকলেও এই মুহূর্তে করে না। আতাউল্লার বাপে ছিলো রঘুনাথপুরের দেওয়ান আজমুতুল্লার খাস সাগরেদ। আলকাপ দলের লোক বটে। হাবলেও কিছুদিন সঙ্গে ছিলো, তো ওয়াকিল্লা মিয়া মানুষ ভালো বলেই আজমুতুল্লার সঙ্গে দীর্ঘসময় থেকেছে। কতো-কতো জায়গায় আলকাপ নিয়ে গেছে… একটা সময় ওয়াকিল্লা মিয়াও আলকাপের গান বাঁধতো আজমুতুল্লার দেখাদেখি। রহনপুর- আড্ডা ভোলাহাট-শিবগঞ্জ আমনুরা- নাচোল-পোরশা ওদিকে শিবরামবাজার- সিন্ধীবাজার মালদাহ-মুর্শিদাবাদ-বহরমপুর তামাম তল্লাটে ছড়িয়ে পড়ে তারা বছরের প্রায় সাত-আট মাস। আলকাপের গানে মূগ্ধ হয়ে মানুষজন মাথায় তুলে নিতো ওদের। হাবলেও পায়ে বিশাল তামার ঘুঙুর বেঁধে নাচতো ষ্টেজে। আহা সে কি নাচের মূদ্রা! ঘেঁটু গানের কথা স্মরণ হয়ে যায়। ঘেঁটু পুত্রদের গেঁটুয়া বলতো, তাদের দেখে কতো যুবক পাগল হতো, সে কি যেই সেই পাগল, অনেকে তো বিয়ে করতেও উদগ্রীব হতো!
আতাউল্লা আর কোনো কথা বলে না। হাবলে নিজের খোলসে ঢুকে যায়। আলকাপের প্রতি অনেককালের ভালোবাসা-টান দিনে দিন কেমন ফিকে হয়ে গেছে। অথচ একটা সময় সে আলকাপের সঙ্গেই থেকেছে, কি সে মোহ! কি সে টান! দেশ বিভূয়ে পাড়ি দিয়েছে, চোখে স্বপ্ন আর ভালোবাসার কাজল মেখে মানুষকে শুনিয়েছে জীবনের গল্প, সুখ আর আনন্দের গল্প। নিজেরা নীলকন্ঠ হয়ে বিষটুকু চুষে খেয়ে ভালোবাসাটুকু নিংড়ে দিয়েছে মানুষের জন্য… মানুষ তার কতোটুকু মূল্য দিয়েছে অথবা দেইনি, তার কোনো খবরই রাখেনি।
আজ সে সমস্ত দিনের কথা ভাবলে মনটা কোথায় হারিয়ে যায় হাবলের। সে’বার তো চককৃত্তির মানুষেরা বলেছিলো, হাবলের আসল যন্ত্র সাবড়ে দিছে ওয়াকিল্লা মিয়া, এখন তো হিজড়ে-মদনা! কথাটা সঠিক নয় একবিন্দু, আবার ভুলও বলা যাবে না। ওয়াকিল্লা মিয়া বড়বাড়ির ছেলে কথাটা সঠিক। আলকাপে আসার কারণে বাড়ি থেকে চিরকালের মতো বিতাড়িত করেছে ওর বাপ। বিয়ে করা বউয়ের সঙ্গেও দেখা করা বন্ধ হয় একটা সময়। তখন তো মাঝে-সাঝে হাবলেকে নিয়েই শুয়েছে, আর হাবলেও অনেকবারই মিয়ার সাথে…
সে সমস্ত দিনের ছবিগুলো আজো মনের স্মৃতিপটে জ্বলজ্বলিয়ে ভাসে। কতোকালের ছবি সব, কতো শতাব্দি যেন হয়ে গেলো। কোনোভাবেই সরাতে পারে না, সরানো যায় না। হয়তো কিছু কিছু স্মৃতি ভালোবাসায় রয়ে যায় জীবনভর। থাকলে দোষ দেবে কি করে!
ঘুঘুডাঙার মানুষেরা দিনে দিন কেমন পালটে যাচ্ছে, কারো মধ্যে আর আগের মতো তেমন মায়া মহাব্বত নেই। সবাই কেমন পর-পর। অনেক দূরের মানুষ। মানুষ সত্যি সত্যিই বদলে যাচ্ছে, বদলে যাওয়া মানুষ দেখলে ভয় করে, ভয়ে বুক শুকিয়ে যায়।
–তা মিয়ার ব্যাটা তোমার দাদাও চোখ বুঁজলো আর বাপটাও ঘরে ফিরলো…
–কি লাভ হলো! আলকাপ ছেড়ে তোমাদের প্রেম-ভালোবাসা ছেড়ে বাড়ি ফিরে কি আর শান্তিতে ছিলো বাপজান, বছর না ঘুরতেই গোরে সিঁধিয়ে গেলো, আসলে কি জানো প্রবহমান নদীকে বাঁধতে নেই, ফল উল্টে যায়…
–খাঁটি একখান কথা বলেছো ব্যাটা! চলন্ত কোনো কিছুকেই থামানো উচিৎ নয়, বিপরীত হবেই…
–তা তোমাদের ওস্তাদ দেওয়ান আজমুতুল্লা চোখ বুঁজতেই তোমরাইবা আলকাপ ছাড়লে কেনো…
বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে চুলোতে শুকনো কয়েকটি কাঠ ঠেঁসে তালপাখা দিয়ে বাতাস করতে-করতে হাবলে জানায়, দেওয়ানজির অনেক বয়স হয়েছিলো, বলা যায় মহীরুহ, একশত ষোল বছর বয়স, তার মৃত্যু আমাদের মনকে ভেঙে দিয়েছিলো, তোমার বাপও বললো, আর নয়, এসব পাপ কাজ। অনেক পাপ কুড়ালাম এবার বাড়িমুখো মানে সংসারমুখি…
–কিন্তু কাজটা নেহাৎ অন্যায়! একটা শিল্পকে ধ্বংস করে দিলে গো…
–আর শিল্প! যাত্রা শিল্প, ঘেঁটু গান শিল্প, আলকাপ শিল্প, গম্ভীরা শিল্প- এসবতো বলে সমাজের ওপরওয়ালারা… কিন্তু একবারও কি তাদের হাঁড়ির খবর নেয়, তারা খেতে পায় কি পায় না…
–কেনো রোজগারপাতি কি ছিলো না…
–ওই রোজগারে মন ভরলেও পেট ভরে না ব্যাটা! শুধু নেশায় পড়ে দলের পেছনে ছুটতে হয়, ওখানে জীবন নেই, আছে হাহাকার আর অন্ধকার।
–আর মানুষের সম্মান-ভালোবাসার কথা বলছো না যে…
–সম্মানের কথা বলো, আধুনিক সমাজের মানুষেরা ওই ঘেঁটু পুত্র অর্থাৎ ঘেঁটুয়াদের মতো আমাদেরকেও ছি-ঘৃণা করে, দূর-দূর বলে তাড়িয়ে দেয়…
–তোমাদের জগৎ রঙের…
–রঙের! সে রঙ ওপরে দেখা যায়, সংসার চালাতে আলকাপ শিল্পীরা নছিমন-ভটভটি টানে, কেউ শবজি বেচে, কেউ কামলা খাটে, অনেকে চুল-দাড়ি কাটে, কেউ ফেরি করে সওদা বেচে… এই তো জীবন!
আতাউল্লা আর কোনো কথা বলে না। হাবলে নিজের খোলসে ঢুকে যায়। আলকাপের প্রতি অনেককালের ভালোবাসা-টান দিনে দিন কেমন ফিকে হয়ে গেছে। অথচ একটা সময় সে আলকাপের সঙ্গেই থেকেছে, কি সে মোহ! কি সে টান! দেশ বিভূয়ে পাড়ি দিয়েছে, চোখে স্বপ্ন আর ভালোবাসার কাজল মেখে মানুষকে শুনিয়েছে জীবনের গল্প, সুখ আর আনন্দের গল্প। নিজেরা নীলকন্ঠ হয়ে বিষটুকু চুষে খেয়ে ভালোবাসাটুকু নিংড়ে দিয়েছে মানুষের জন্য… মানুষ তার কতোটুকু মূল্য দিয়েছে অথবা দেইনি, তার কোনো খবরই রাখেনি।
হাবলে নিজেকে মাজা ভাঙা সাপের মতো একটা ঝোঁপের ভেতর কদাচিৎ আবিস্কার করে, আর তখন বুকের মধ্যে অন্যরকম অপরাধবোধ ঘনীভূত হয়। তারপরও নিজেকে মানিয়ে নিতে আকাশের দিকে উদাস তাকিয়ে থাকে, জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়। নিরন্তর তার ভিতর যে আগুন জ্বলে, তার বিস্ফোরণ একদিন এই সমাজকেও বহন করতে হতে পারে। কিন্তু তারতো কোনো কিছু করার নেই। বাতাস এসে চুলোর আগুনটাকে আরো প্রজ্জ্বলিত করে তোলে। তাল পাখার হাওয়া কোথায় উবে যায়, কিন্তু হাবলে তাকিয়ে দেখে আগুনের হলকা ছড়িয়ে পড়েছে চুলোর ভেতর।
কিন্তু শেষ জীবনে এসে শুধুই অন্ধকার ছাড়া তো কিছুই দেখে না চোখের সামনে। এমন একটা জীবন তো আশা করেনি সে। আতাউল্লার মতো ছেলেদের চোখে হাবলেরা নষ্ট কীট। মুখোমুখি যতোই মিষ্টি মধুর কথা বলুক না কেনো, আড়ালে-আবডালে বলে বেড়ায়,ওয়াকিল্লা মিয়ার ডেমনি হাবলে হিজড়ে। কথাটা শুনতে ভালো লাগে না, তারপরও শুনতে হয়। এ’যেন ভবিতব্য, কপালের লিখন। একটা সময় সাতগাঁয়ে রটে যায় ওয়াকিল্লার সাথে হাবলে কেনো আলকাপ ছাড়লো। মাখা-মাখা শারীরিক সম্পর্ক যে কোথায় ঠেকেছে তারই নিদর্শন হাবলের আলকাপ ত্যাগ। কান গরম হলেও দাঁত-মুখ শক্ত রেখে শুনেছে নিন্দুকের যাবতীয় অশ্রাব্য কথামালা। দিনেদিন সবই সহৃ হয়ে গেছে, আজো কানে আসে বাতাসের সঙ্গে সে সমস্ত ব্যঙ্গাত্মক কথা। কিন্তু পাত্তা দেয় না হাবলে। কারণ সে বিয়ে-শাদী করেছে, ঘরে দু’ দুটো সন্তান তার এসেছে। পাখিডাঙার মেয়ে টিয়া, তার জীবনটাকে ভরিয়ে দিয়েছে আনন্দে-স্বপ্নে ভালোবাসায়। তারপরও মানুষের মুখ বন্ধ করবে কে? টিয়া মুখ টিপে হাসে আর বলে, ওরা বলুক না তাতে কি, তুমি কি আমি তো জানি…
মাঝে-মাঝে দেওয়ান আজমুতুল্লার কথা মনে হয়। কি চমৎকার মানুষ ছিলেন তিনি। আর তখনই ওয়াকিল্লার মুখছবি চোখে ভেসে ওঠে। মানুষ মরে যায় কিন্তু তার স্মৃতি, তার জমানো গল্পগুলোতো মরে না। চোখের তারায় ফুটে থাকে পদ্মফুলের মতো পদ্মদীঘিতে। দর্শকের মুখোমুখি হলে আলকাপকে জীবন্ত করে তুলতো। জীবন এবং সময় আর গতি কেমন প্রবহমান নদীর মতো ভেসে গেলো। এখন মানুষ কতো আধুনিক হয়ে উঠেছে, জীবনকে অন্যভাবে দেখছে অন্যরকম আবহাওয়ায়। কিন্তু একটা সময় বিনোদন বলতে আলকাপ, যাত্রা, গম্ভীরা, সার্কাস, জারিগান, সারিগান, ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালী গানই ছিলো মানুষের মনের খোরাক। মনকে সতেজ সজীব রাখার জন্য এগুলোর প্রয়োজন অনস্বীকার্য। আর আজ এসবের অনুপস্থিতির কারণে সমাজে বিশৃঙ্খলা আর অস্থিরতা প্রতিনিয়ত বিরাজমান।
হাবলে নিজেকে মাজা ভাঙা সাপের মতো একটা ঝোঁপের ভেতর কদাচিৎ আবিস্কার করে, আর তখন বুকের মধ্যে অন্যরকম অপরাধবোধ ঘনীভূত হয়। তারপরও নিজেকে মানিয়ে নিতে আকাশের দিকে উদাস তাকিয়ে থাকে, জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়। নিরন্তর তার ভিতর যে আগুন জ্বলে, তার বিস্ফোরণ একদিন এই সমাজকেও বহন করতে হতে পারে। কিন্তু তারতো কোনো কিছু করার নেই। বাতাস এসে চুলোর আগুনটাকে আরো প্রজ্জ্বলিত করে তোলে। তাল পাখার হাওয়া কোথায় উবে যায়, কিন্তু হাবলে তাকিয়ে দেখে আগুনের হলকা ছড়িয়ে পড়েছে চুলোর ভেতর।
বিষাবলীর বিলের ওদিক থেকে আবুল্লা তালডোঙা বেয়ে ঘুঘুডাঙার পাড়ে নামে। বেলা শেষে যেটুকু মাছ ধরেছে বাজারে বিক্রি করে বাড়ি ফিরবে। হাবলে একবার ডাকতে গিয়ে থেমে যায়, কারণ সে আগের দামটা এখনো পাবে। আবার ধার করে মাছ খাওয়ার চিন্তা ছেড়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়।
অকস্মাৎ একটা লম্বা সালামের বহর শুনে ঘাড় কাত করতেই দেখে ফুলিয়াহাটের মকরম। একেবারে নতুন কেনা সাইকেলে চেপে বাম পা খানা মাটিতে ফেলে দাঁড়িয়ে। মুখে চাপ দাঁড়ি রেখেছে আবার।
–আরে হাবলে ভাই, সারাজীবন গরুর মতো খাটলে হবে, আল্লাহ সুবান্নাতালা রাসুল সাল্লেয়ালার নামও করতে হবে, নাকি বলো…
হাবলে কিছু বলে না। নতুন নামাজি হয়েছে মকরম। চিল্লা-ফিল্লা করে বেড়ায়। শুনেছে এবার নাকি তিন চিল্লাও দিয়ে ফেলেছে। সমাজের নষ্ট লোকেদের এবার সুপথে ফিরিয়ে আনার জন্য পথে নেমেছে বেশ জোরেশোরে। হাবলেও যে তার প্রথম টার্গেট, তা হাবলেও বেশ অনুমান করে।
–তা মকরম মিয়া তুমি আমাকে সুপথে আনবে তাহলে…
–কেনো তা কি খারাপ, জীবন আর ক’দিনের বলো, একজীবনে কতো কিছু করলে শুধু ফরজ-সুন্নত…
–কথা সঠিক, তবে মানুষকে দেখিয়ে করলেই কি!
–তুমি তো যাত্রাদল না ওই আলকাপে খেমটা নাচ নাচতে, আর কি কি সব যা-তা করতে…
–মকরম তুমি নতুন নামাজি হয়েছো বলেই মানুষকে ছোট জ্ঞান করতে শিখেছো, এটা কিন্তু অবশ্য অন্যায়…
–ন্যায়-অন্যায় বোধ তোমার আছে তাহলে…
–কেনো তুমি কি আমাকে মানুষ…
মুহূর্তে টঙের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে রঘুনাথপুরের দয়াল বয়াতির বড় ছেলে রামায়ণ। মস্ত একটা বিবাদ হওয়ার আগে বাতাসটিকে ঘুরিয়ে দিতে না পারলে পরিবেশ নষ্ট হবে।
রামায়ণ বলে ওঠে, মকরম তুমি ভাই চিল্লা-ফিল্লা যা দাও দিয়ে যাও, কেউ কি বাঁধা…
–এটা কি ধরণের কথা রামায়ণদা।
–কথা তো কিছুই বলেনি, সব জায়গায় তোমার ওই চিল্লা মার্কা চেহারা না দেখালেই কি নয়!
–আমি কি মন্দ কথা বলেছি…
–না ভাই মন্দ নয়। তবে আমরা মন্দ মানুষ কি না। হাবলে বা আমার বাপও তো সমাজের চোখে খারাপ মানুষ, তোমরাই ফতেয়া দাও তো…
–মন্দকে তো মন্দ বলবেই, তুমি কিন্তু হাবলের পক্ষ নিলে।
–কেনো নেবো না বলো, এখন হাবলেকে বলছো একটু পরে আমার বাপকেও টানবে…
–তোমরা সবাই একই লাটাইয়ের সুতো।
–যদি তাই মনে করো তো তাই…
–কাজটা কি ঠিক করলে।
–তুমি একটা বেয়াদপ, নতুন নামাজি হয়ে মানুষকে কি ভাবো।
অবস্থা বেগতিক দেখে আর বিলম্ব না করে নতুন কেনা সাইকেলে পা তুলে মকরম গজগজ করতে-করতে ধুপদীয়ার দিকে এগুতে থাকে। তখনো বিকেলের শেষ সূর্যটা হাসি ছড়িয়ে আকাশের কোণে দাঁড়িয়ে আছে। আর কিছুক্ষণ পরেই ডুব দেবে অন্তরালে। কোথায় যাবে কেউ জানে না। কিন্তু সে হারিয়ে যাবে।
রামায়ণ চুপচাপ বসে থাকে হাবলের টঙের ভেতর। মানুষ ক্রমে-ক্রমে আরো ভিড় করে। হাবলের ছেলেটা এখনো ফিরলো না দেখে চিন্তার ভাঁজ পড়ে ওর মুখে। তেঁতলের মায়ের আবার কি জ¦রটা বাড়লো। একদৌঁড়ে যে বাড়িতে যাবে তারও কোনো সুযোগ নেই, পাক্কা ছয় মাইলের পথ। আজকাল যেভাবে মানুষ মরছে তেঁতলের মাকে বাঁচানো কঠিন হবে। কিন্তু এ’সময় যদি কোনো বিপদ চলে আসে সামলাবে কিভাবে বুঝে পায় না হাবলে। দিনে দিন কতো কতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় মানুষকে। কোনো সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একটা দোটানার মধ্যে মানুষ বেঁচে থাকে। কেনো যে মানুষ এভাবে বেঁচে থাকে বোঝে না হাবলে। বোঝে না মানুষ। তারপরও মানুষ বাঁচার জন্য হাপিত্যেশ করে মরে।
চুলোর কাঠগুলো পুড়তে থাকে। আগুনের মাতামে কেঁতলির পানি ফুটতে থাকে টগবগিয়ে। লাল আগুনের শিখা দেখে হাবলের মনে হয় পায়ে গোছা-গোছা ঘুঙুর পড়ে আলকাপে নাচছে সে। নাচ কি থামবে, পা তার কেমন নাচের মুদ্রায় টলমলো। তারপর ও ওয়াকিল্লা মিয়ার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে, কেউই বাঁধা দেবে না। বাঁধা দেওয়ার তো কেউ নেই। কেনোই বা সে বাঁধা মানবে। সেখানে কতো তৃপ্তি, কতো আনন্দ। শুধু বয়ে যায় সামনের দিকে, আগামীর পথে। জীবন তো একটা নদী… নদীর মতো বয়ে যায় সময়। সেখানে দাঁড়িয়ে মন উদাস করার কি দরকার? চলছে চলুক যেভাবে যাচ্ছে নদীর স্রোত দিক-বিদিক।








০ টি মন্তব্য