বসন্তের জানালায় যমদূত

উম্মে সালমা

নাতিশীতোষ্ণ বসন্তের রাত্রি… দখিনা বাতাস জানালায় দোল খাচ্ছে… আমি আরামে বসে হিসেব কষছি, চূড়ান্তহিসাব; তবে তা ঠিক জীবনের নয়, অংকের….
হঠাৎ জানালার ফাকা অংশটা ভেদ করে একটা কান্না জড়ানো কাঁপা কণ্ঠস্বর আমাকে থামিয়ে দিল…. মূহুর্তেই খুব জোরে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে চাচি…?
তানু আমাদের ঘরে আয় তোর মাকে নিয়ে আয়… আর যেতে যেতে বলছে মীনুকে শেষ করে দিলো রে… কিছু না বুঝেই শূন্য পায়ে ছুটলাম… দরজা খুলতেই আব্বুর চিৎকার, “এতো রাতে যাচ্ছিস কোথায়?”
ঘুটঘুটে অন্ধকার, সম্মুখে কাঁপছে অমোঘ সর্বনাশ, কুকুরের আর্তনাদ।
তাদের ঘরে পৌঁছতেই ঘড়িতে চোখ পড়ে। সময় ২টা বেজে ৩০মিনিট… হঠাৎ একটা করুণ শব্দ কানে আসে…পর্দা সরাতে লোমহর্ষক সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য …
সমস্ত শরীর তার নিস্তেজ, চোখে মুখে সে সেকী বাঁচার আকুলতা, দীর্ঘ নাভিশ্বাস, প্রচণ্ড ভয়ার্ত চেহারা; যেন আতঙ্কের মুখোমুখি কোন মৃগ…
শিথিল শরীর তার ঢেকে আছে ফ্যাকাসে চাদরে, বুকে পুঞ্জিত হয়ে আছে বিধ্বস্ত স্বপ্নসৌন্দর্য…..
মনে হচ্ছে বীভৎস মৃত্যু জানালায় বসে লেজ নাড়ছে, আর অপেক্ষা করছে কখন তার মা শিয়র থেকে সরবে, আর কখন সে তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলবে।
“মৃত্যু অসুন্দর, কিন্তু সত্য”

নিস্তব্ধতায় ঘিরে আছে চারপাশ, টেবিলে দুটি তরুণ কমলালেবু চেয়ে আছে দূরের আকাশে, কাঁচের পাত্রে সরবত কাঁপছে তরল জ্যোৎস্নার মতো; তার সেই মৃতদেহ পৃথিবীকে ধিক্কার জানাচ্ছে অট্টহাসিতে। জানা যায় ৪০টা ঘুমের ঔষধ তরল পানীয়জলে মিশিয়ে পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা।
অস্তিত্বের তন্ময় দেয়ালে গা ঘেসে দাড়িয়ে আছে মৃতের মা(মীনু)….শত চেষ্টা করেও ওনাকে কাঁদাতে পারেনি কেউ..

আমার পেছন থেকে কেউ একজন বলে উঠল “গাড়ি এসে গেছে”, একই সঙ্গে সামনে থেকে “রাসেল তো আর নাই, শেষ, সব শেষ…..”
মৃত দেহখানি শুয়ে আছে নিরিবিলি ভোরের শয্যায় শীত গোধূলির শীর্ণ শব্দহীন নদীর মতোন, অথচ কাল সারারাত ছায়া অন্ধকারে প্রতি পলে পলে মোমের শিখার মতো ইচ্ছেগুলি তার জ্বলছিল।
নিস্তব্ধতায় ঘিরে আছে চারপাশ, টেবিলে দুটি তরুণ কমলালেবু চেয়ে আছে দূরের আকাশে, কাঁচের পাত্রে সরবত কাঁপছে তরল জ্যোৎস্নার মতো; তার সেই মৃতদেহ পৃথিবীকে ধিক্কার জানাচ্ছে অট্টহাসিতে। জানা যায় ৪০টা ঘুমের ঔষধ তরল পানীয়জলে মিশিয়ে পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা।
অস্তিত্বের তন্ময় দেয়ালে গা ঘেসে দাড়িয়ে আছে মৃতের মা(মীনু)….শত চেষ্টা করেও ওনাকে কাঁদাতে পারেনি কেউ..
ছ’মাস আগে তুলিকে ভাললোবেসে পালিয়ে বিয়ে করে রাসেল। মেয়ের বাবা মেনেও নিয়ে ছিল তাদের। একমাত্র মেয়ে, তাই খুব ধুমধাম করে কন্যা সম্প্রদান করতে চান। মেয়েকে কিছুদিন নিজের কাছে রাখার কথা বলে নিয়ে যায়। আর দেখা হয়নি নি দু’জনের। শুনেছি জোর করে ডিভোর্স নিয়েছে।
তার কাপড়ের ব্যাগে ছোট্ট একটি তালা ঝুলছে, কম্পিউটারের প্লে লিস্টে একটাই গান অনর্গল বাজতো ফুল সাউন্ডে “কী জ্বালা দিয়ে গেলা মোরে”, মোবাইলের পাঠানো ক্ষুদে বার্তায় শেষ বার্তা ” ভাললোবাসি তুলি”, টেবিলের এক কোণে বেশ কয়েকটা সিডেক্সিনের পাতা; প্রতি পাতায় একটা করে ঔষধ জমানো…..
তার ব্যাগটার তালা ভাঙা হলো। তাতে পাওয়া গিয়েছিল তাদের একসাথে কাটানো ভালো মুহূর্তের সাক্ষীসরূপ কিছু আলোকচিত্র, অজস্র ছোটখাটো উপহার আর একটা ভালোবাসার নীল খাম। যাতে ছিল একখানা চিঠি। চিঠির শেষ কয়েকটা লাইনে লেখা ছিল, “প্রতিদিন তোমার পাশে বসে সবুজ রঙের সিএনজিতে করে বাসায় ফিরতে আমার বেশ লাগে, জ্যামে পড়লে যখন তুমি পিছন থেকে জড়িয়ে ধরো, আমি কেমন যেনো আস্থার আভাস পাই।
ইতি
তোমার তুলতুলি “

পরদিন মধ্যাহ্নে তার শেষ যাত্রা শুরু। পুররোটা গ্রাম থমথমে হয়ে আছে। কিন্তু রাসেল এ গ্রামের কেউ না। এটা তার নানা বাড়ি। এভাবে চোখের সম্মুখে চলে গেলো একটা প্রাণবন্ত জীবন। কি জানি তুলি এখন কোথায় আছে!

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।