অভ্যন্তরের লিফট

রওশন রুবী

বন্ধ লিফট মানেই ঢোকার আগে থমকে যাওয়া।
একটা চাপা ঘর, যেখানে দেয়ালগুলো
শ্বাস নিতে ভুলে গেছে।
বোতামটা জ্বলে, তার নিচে শব্দ আছে,
আর সেই শব্দের নিচে আরেকটা শব্দ-
যা নিজেই নিজেকে বলে, “কাকে ধরে রাখো?
যারা নিজেরাই নিজেদের ধরে রাখতে পারে না।”

আমি ভাবি, কতজনকে নিয়ে উঠতে চেয়েছি-
আমি কি কাউকে কখনো পৌঁছে দিতে পেরেছি?
জানতে চাই-“তুমি এত চুপ কেন?”
লিফট নড়ে- “চুপ থাকাটাই আমার ভাষা।”
-“প্রতিদিন এত মানুষ-ক্লান্ত হও না?”
-আমি ক্লান্ত হই না, জমাই।
তখন মেঝে সরে যায়, শরীর ঝুলে থাকে।
দরজার ফাঁক- খোলা-বন্ধের মাঝামাঝি।
কেউ ঢুকে পড়ে, কেউ বের হতে পারে না-
যেখানে ভাঙা ইঙ্গিতগুলো পড়ে থাকে।
এখানে গন্তব্য নেই, শুধু একটা ধারণা,
যা মাথার মধ্যেই ভিজে নষ্ট হয়ে যায়।
সময় থাকে না, শুধু অপেক্ষা থাকে।
আমি ইশারায় থামি-
চামড়ার নিচে অস্বস্তি হাঁটে,
সব জমে থাকে অভ্যান্তরে,
নিজের সীমানা খুঁজে পায় না।

পথ

যে পথে হাঁটছি, তার দিক নির্দিষ্ট না-
মাটি সরে গিয়ে পায়ের নিচে নতুন রেখা আঁকে।
শোনা গেল- এই পথ আগে ছিল না,
কারও সিদ্ধান্তের ভেতর জন্ম নিয়েছে।
থামতে চাইলাম-
দেখি, থামাও এক ধরনের এগিয়ে যাওয়া,
পথ পেছন থেকেও নিজেকে ঠেলে দেয়।
একটা জুতো পড়ে ছিল- কোন আগন্তুক ফেলে গেছে,
নাকি পথই খুলে নিয়েছে চলার প্রমাণ?
জুতো চলছে, ময়দানে পড়ে আছে ভাষা।
উপরে তাকাই, দূরে সাইনবোর্ড-লেখা মুছে গেছে,
তবু সবাই পড়ে নিচ্ছে নিজ নিজ ভাষায়।
আবার হাঁটি, হাঁটতে হাঁটতে বুঝলাম-
পথ কোথাও নিয়ে যায় না, শুধু অবস্থান বদলায়।
হঠাৎ দেখি,
পায়ের ছাপগুলো আমার আগেই পৌঁছে গেছে-
আমি তাদের অনুসরণ করছি।
ফিরে তাকাতে গিয়ে
কিছুই দেখতে পেলাম না-
পথ নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
তবু পায়ের দীর্ঘ দূরত্ব থেকে যায়-
যাকে আমরা নাম দিই “যাত্রা।”

নীরবতা

রাতের গলিতে খুব আলো নেই,
কিছু রাস্তা আরও অন্ধকার।
মানুষ কম কথা বলে-শুধু হেঁটে যায়।
দেয়ালে পুরনো পোস্টারে আধখানা মুখ-
বাকি অংশ উঠে গেছে বৃষ্টিতে,
যেন ইতিহাস মুছে দিতে চেয়ে
কেউ ব্যর্থ হয়েছে।
খোলা বইপাতা উড়ে বিধবার রঙে।
কেউ থামে না, কারও চোখে প্রশ্ন নেই,
শুধু দ্রুত পা ফেলে চলে যায়।
একটা খোলা জানালার আলো পড়ে বাইরে-
তবু কেউ তাকায় না।
এই না-তাকানো মধ্যে গভীরতা ডাকে-
নীরবতা সঙ্গী হবে?

অপেক্ষার ভেতর

বারান্দার চেয়ারে এখনও বিকেল নামে ধীরে।
কেউ বসে না- তবু চেয়ারটা খালি থাকে না।
আবছা ছায়া নড়ে, কাপড় শুকোয় দড়িতে,
হাওয়া এলে দুলে ওঠে-
কী যেন তুলে নেয় আপন গতিতে।
রান্নাঘরে আতপের গন্ধ, বাহিরে বারুদমৌসুম।
খবরের কাগজে প্রতিদিন সংখ্যা বাড়ে,
কিন্তু একটি নাম কোথাও লেখা হয় না।
এই না-লেখা নামে একটি দেশ বেঁচে থাকে।

চোখের ভেতর মানচিত্র

আমার চোখ দুটো ঠিকভাবে খুলছে না-
ভেতর থেকে কেউ যেন বলছে,
দেখা মানে সবকিছু বিশ্বাস করা না।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়াই, চোখের ভেতর দেখি-
একটা মানচিত্র ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
সীমানাগুলো নিজেদের নাম ভুলে গেছে,
দেশগুলো ভেসে যাচ্ছে,
মানুষের চোখ অন্য কারও কাছে বন্ধক রাখা।
শিশুরা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল-
তাদের চোখ থেকে বেরিয়ে এলো ছোট ছোট নদী,
আমি হাত বাড়ালাম, ভিজে উঠল সময়।
চোখের পাতা নামাতে গিয়েও থেমে যাই।
জানি, বন্ধ করলেই দৃশ্য আরও স্পষ্ট হবে।
একটা চোখ হঠাৎ খুলে আমাকে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কি নিশ্চিত, তুমি নিজেকেই দেখছো?”
আমি উত্তর দিতে পারিনি। নির্লিপ্ত চেয়ে থাকি।
তখন দেখি, আমার ডান চোখ আলাদা হয়ে
একটা দেশের দিকে নেমে যাচ্ছে,
আহত মানুষদের হয়ে নদী হচ্ছে, খরস্রােতা নদী।
বাম চোখ যথাস্থানে, সে কিছুই দেখে না,
এমন সময় হঠাৎ ঘোষণা ভেসে এলো-
“দৃষ্টি বিক্রি হবে, অল্প ব্যবহৃত।”
আমি বুঝলাম, চোখ থাকা মানেই দেখা না,
দেখা মানেই সব জানা নয়।
তক্ষুণি দূরে কেউ আয়না ভেঙে ফেলল-
শব্দ এসে ঢুকে গেল আমার অনুভবে,
চোখের কোণে কাঁপতে লাগল কাচের টুকরো।
এখন আমি চোখ বন্ধ করে হাঁটি-
বন্ধ চোখে সবকিছু অস্পষ্ট হয়ে যায় না,
স্পষ্ট জিনিসগুলোই সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলে।

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।