মাইলস্টোন

(মাইলস্টোন স্কুলে ঝলসে যাওয়া শিশুদের স্মরণে)

আলতাফ শেহাব

ছোট পাখি, ঘাসফুল
ঝরে যাওয়া ছোট্ট বকুল—
ছুটির ঘন্টায় তোমাদের মাইলস্টোন
ইস্কুল হয়ে গেল মানুষের যুদ্ধবিমান।

ছোট পাখির লেখার খাতায়
কতো শত স্বপ্ন ঝলসে যায়।
ছুটছে দেখো ওরা ঝলসানো তারা
মায়ের বুকের খোঁজে দিশেহারা।
আমাদের বুকে, মানুষের বুকে—
তোমাদের ঠাঁই নাই সোনা ঘাসফুল,
আমাদের কফিন তোমাদের ইস্কুল
মানুষের কফিন তোমাদের ইস্কুল।

ছোট পাখি, ঘাসফুল
ঝরে যাওয়া ছোট্ট বকুল
ভালো থেকো তোমরা—
দূর আকাশের নব নব তারা।

তুমি তাঁর চোখে তাকাও

তুমি তাঁর চোখে তাকাও পুরুষ—
বুকের বিভাজিকায় কী দেখো?
স্তনাগ্রে বইছে দেখো দুধের নহর।
ভুলে গেছ নাভিমূলে মাতৃগর্ভের দুয়ার?
যে পথে কোন এক কৃষ্ণচূড়া দিনে
মায়ের জরায়ু চিরে তুমি রক্তাক্ত চিৎকার।

তুমি তাঁর চোখে তাকাও পুরুষ—
এ নদী নিষ্প্রান স্রোতধারা নয়,
তোমার আমার জানের যোগান।
শাসন করে সরিয়ে দিবে অন্য পথে?
ভেঙ্গে দিয়ে উজানের চরাচর
শোধ নিবে তার গতির আগুন।

তুমি তাঁর চোখে তাকাও পুরুষ—
দূর দিগন্তে তোমার চলে যাওয়ার পথ
সে চেয়ে রয় প্রেমের পরাগ মেখে
ফিরে যদি নাও আস আর কোনদিন
দৃষ্টিজুড়ে প্রতিক্ষা শর্তহীন মাতৃস্নেহে
তোমার ঘরে ফেরার আমৃত্যু খোঁজ।

তুমি তাঁর চোখে তাকাও পুরুষ—
অপ্রাপ্ত যে শরীরে খুঁজে ফের নিষিদ্ধ বকুল
তোমারই বীর্যরসে তৈরী সে ফুল,
রক্ত-মাংসে তোমরই শরীরের ঘ্রাণ।
হায়েনার মুখোমুখি বিপন্ন এক প্রাণ,
সুরক্ষাচক্র তার তোমারই প্রশারিত বুক
আশ্রয়ের খোঁজ, সবচে নিরাপদ স্থান।

তুমি তাঁর চোখে তাকাও পুরুষ—
মগজে শিশ্নের খবরদারি?
কাপুরুষ তুমি, পুরুষ নামধারী।

অবন্তিকার কথা

(ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকা’র স্মরণে)

অবন্তিকা, পোস্টমর্টেমের আগে
ঝুলন্ত আপনার মুখোমুখি একবার
কয়েক ঘন্টার জন্য দাঁড় করিয়ে রাখতে চাই—
আপনার সেই জল্লাদ শিক্ষক আর নিপীড়ক সহপাঠিকে।

কোঠর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসা
আপনার চোখে চোখ রেখে
তারা পাঠ করে শোনাবে সেই দুর্বিষহ যন্ত্রণার গল্প—
কী ভয়ানক রোষে তারা হত্যা করেছে
জীবনীশক্তিতে ভরপুর এক অমিত সম্ভাবনাকে,
দিনের পর দিন পদেপদে বিদ্রূপ
কিভাবে টুঁটি চেপে ধরেছিল আপনার স্বপ্নের।
পাঠ করবে তারা—
আপনার ভিতরের প্রতিটি অন্তর্দাহের গল্প,
আঘাতে আঘাতে জর্জরিত
অতিক্রান্ত জীবনের প্রতিটি বিভীষিকাময় দিন রাত।
কি সুচতুর ষড়যন্ত্রে বান্ধবহীন করে দিয়েছিল
আপনার চলাচলের প্রতিটি পথ,
আপনাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল
হতবিহ্বল সহায়হীন, আপনারই জীবনের মুখোমুখি।

আপনার সেই জল্লাদ শিক্ষক আর নিপীড়ক সহপাঠি—
এসব পাঠ করে শোনাবে তার কন্যা সন্তানকে
শোনাবে তার মাকে, প্রিয়তমা স্ত্রীকে।
বোন, বান্ধবী, প্রেমিকা, সহকর্মী এবং সহপাঠিদেরও
শোনার প্রয়োজন আছে—
এসকল বেদনার প্রতিটি পাঠ।

কান খুলে শুনুক—
বিপ্লবী, সমাজপতি, রাজনীতিবীদ, কুলি-মজুর
কৃষক, শ্রমিক, বেশ্যার দালাল, পুরুত-পাদ্রি-হুজুর।
অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শুনুক—
নীতি নির্ধারক ও মাননীয় রাষ্ট্রনেতা।

সর্বোপরি শুনতে চাই আমি নিজে,
শোনাতে চাই আমার পুত্র সন্তানকে।
সংবেদনশীল হয়ে বেড়ে উঠুক সে—
সম্মান করতে শিখুক তার বোনকে,
মাকে অথবা অনাত্মীয় কোন নারীকে।

জবান আমার দেশ

এইযে তোমরা বারবার কণ্ঠ চেপে ধর
সেলাই করতে আস ঠোঁট
টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চাও জিভ
জবান আমার দেশ।

চতুর্দিক ঘিরে দিচ্ছ লালসার দেয়ালে
শেকল পরাতে চাও হাতে ও পায়ে
ভাত-কাপড়ের জোগান এরা
চাষের জমিন, পাটের কল আমার দেশ।

পিঠের উপর মোহর মেরে
আঁকা আছে যে দগদগে ঘা— রাষ্ট্র তার নাম।
ক্ষুদার জ্বালায়—
ভাতের জিকির করতে আসি রাস্তায়,
দিনের পর দিন লাত্থি মারছ পেটে ও পিঠে
পেটের ভেতর দেখো— মানচিত্র আঁকা।

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।