একাদশ চিঠি

বাঁ ব্‌হ গুরুরে ইজ্জো নাজ -য়াঁ য়ে হিজাব-এ পাস ব্‌জহ,
রাহ্‌ মে হাম্‌ মিলে কাহাঁ, বয্‌ম মে বো্‌ বুলায়ে কিয়ুঁ,

ওখানে তার গর্বোদ্ধত চলার মহিমা; আমার আছে লোকভয়, লোকলাজ!
পথে কবে তাঁর সাথে দেখা হলো, সেই বা সভায় ডাকবে কেন?

আ ফ তে  জা নে  গা লি ব

শহরের বাইরে যাওয়ার আর আপনার গলি থেকে দূরে অন্য কোথাও মন ভোলানোর যে নির্দয় পরামর্শ, তার জন্য শুকরিয়া, কিন্তু –

হাম্‌ কাহাঁ কিসমত আযমানে জায়ে,
তুহি জব খনজর আযমা না হুয়া ।

আমি কোথায় যাবো এই ভাগ্য বাজিয়ে দেখতে;
তুমিই যখন হাতের ছুরি গুটিয়ে নিলে।

এই পরামর্শ শুনে আমার নিজের এক শের মনে পড়ছে-

কম নেহি জলবাহগরি-মে তেরে কুচে সে বেহেশত,
য়েহি নকশে হ্যায় বলে ইস্‌ কদর আবাদ নেহি।

তোমার গলির রূপবিভার চাইতে স্বর্গও কম কিছু নয়,
সব একইরকম শুধু পরিপূর্ণ নয় তেমন।

লোকে মৃত মানুষের স্বর্গপ্রাপ্তির প্রার্থনা করে, আপনি জলজ্যান্ত আমাকে আপনার শহর আর গলি থেকে বের করে দিতে চান! মনকে প্রবোধ দিন নতুন কোন শহর আমাদের শহরের মত আবাদ হবে না – হয়তো সেই স্বর্গকোঠায় স্বর্গের সরঞ্জাম যত বাড়াবাড়ি রকম থাকবে প্রিয়ের গলির বাসিন্দাদের বিরহ ব্যাথা ততই বাড়বে – খুদা রক্ষা করুন আমার বন্ধু মোমিন খাঁ কে – চমৎকার মানুষ ছিলেন – এই নশ্বর জগৎ থেকে বিদায় নিলেন পর ফেরেশতারা তার প্রাণপাখিকে বেহেশতের বাগানে পৌছে দিল – দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত অপরূপ গালিচা বিছানো – ভোরের শীতল হাওয়ার ঝোঁক স্বপ্নের সাথে খুনসুটি করছে – সুগন্ধে বাসনার আঁচল ভরে উঠছে চির বসন্তের বৃক্ষে কলিদের চোখ মেলা -উদ্যানের শিয়রে সকাল সন্ধ্যা গলাগলি করছে – মর্মর মেঝেতে অমৃত ধারার নহর বইছে -ঢেউ প্রতি কদমে নতুন রঙে বদলাচ্ছে – সবদিকে হেমন্তহীন বসন্তের আয়োজন – কাতারে কাতারে অপ্সরীরা দাঁড়িয়ে – কন্ঠহীন কবিতা আর বাদ্যহীন সুরযন্ত্র বাজছে – পাতায় পাতায় প্রকৃতির উদারতায় বন্ধুত্বের রহস্য খুলছে – কণায় কণায় সুন্দরের স্বপ্নের সত্যি হওয়া – হাওয়ায় প্রাণের বাড় বাড়ছে – আকাশ যেন স্বর্গ সুন্দরীর মসৃন ত্বক – জমি প্রকৃতির সুন্দর ভাবনার আয়না – এত ফুল,কখনো ভাবছে একাই থাকি, কখনো দলবেঁধে হাসছে – সে ফুলের মুখ কবির কল্পনার চাইতে সুন্দর – কোথাও আঁচলের জন্য কাঁটাহীন ফুল কোথাও দিমাগের জন্য খোয়ারিহীন নেশা – ধৈর্যের আর প্রশান্তির পুরস্কার – বাতাস ধীর সুরে অবকাশের গান গাইছে – কলিদের ফুটে ওঠার অস্থিরতা গুঞ্জন করছে – ফোটা না ফোটা কলিদের দুঃখ ও আনন্দ এক হয়ে আছে – উদার হূদয়ের সৌন্দর্য্য বর্তমানের আয়নার মতো ঝকঝক করছে – জীবন শেষ হবার ভয় কাটিয়ে আনন্দে বুঁদ -পাপী খোদার করুণায় স্তম্ভিত – পূণ্যবান প্রার্থণার ফলাফলে নিমগ্ন –

মোমিন খাঁ এসবের মাঝে কেমন যে অস্থির হয়ে চারদিকে তাকিয়ে হতবুদ্ধি হয়ে রয়ে গেলেন – কোথায় শাআদাত খাঁ এর নহর – কোথায় বাজার সীতারামের কোলাহল আর কোথায় এই নিস্তব্ধতা, এ তো মাটিতে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে – কোথায় সেই যমুনা পাড়ের খোলা হাওয়া – মোমিন খাঁ ভাবলেন, এ কোথায় এলাম! জামা মসজিদ, দিল্লির কিল্লা, জমহরি বাজার, এটা কোন জায়গা – কিছুই বোঝা গেল না – একটু আগেই তো সেখানে ছিলেন -তাই কিছুক্ষণ নিজের খবরে বেখবর হয়ে রইলেন – কিন্তু মোমিন তো মোমিনই, একটু পরেই আসল ঘটনা টের পেয়ে গেলেন –

মনে হয় মৃত্যুর কালে তাঁর কানে কেউ এ কথা বলে দিয়েছিলেন যে যদি আপনি এই নশ্বর পৃথিবীকে আনন্দের সাথে উৎসর্গ করতে পারেন তবে আপনার আত্মা পি্রয়র গলিতে পৌঁছে দেয়া হবে, সেই আবাস আপনার জন্য চিরস্থায়ী হবে – হায়! মোমিন কী সরলতায় তার আয়ুর পুঁজি যা সৃষ্টির এক অপূর্ব উপহার ছিল, তাকে সেই মেকি প্রতিজ্ঞার চাতুরীতে নির্দয় মৃতু্যর হাতে সঁপে দিলেন – ভেবেছিলেন আয়ূর কেচ্ছা খতম হতেই পি্রয়ার গলিতে পৌঁছে যাবেন – মৃত্যু অবশ্যই তার জীবনের যন্ত্রণাকে কম করতে পেরেছিল – কিন্তু বিধির চক্র কাকে শান্তি দেয়, কার শান্তি সহ্য হয়েছে এই জগতের?

মৃত্যু নামক স্বপ্নটার পর বাসনা জেগে উঠলো তো মোমিন খাঁ নিজেকে সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গায় দেখতে পেলেন – একটু ভেবে বুঝতে পারলেন এতো সেই ধুলি-মৃত্তিকার জগত নয়, এতো অন্য কোন জায়গা – আমাকে প্রিয়ার গলির বদলে জান্নাতে পাঠানো হয়েছে -যতই হেমন্তহীন স্বর্গোদ্যানের চারদিকে নজর ঘুরতে লাগলো, সন্দেহ বিশ্বাসে বদলাতে লাগলো- এমন কি তার কাছ হতে দূরে আসার বেদনা অসহ্য হয়ে এলো স্বর্গের সরলতায় শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো – বিগত দিনের কথা মনে করে প্রাণ কন্ঠাগত হলো -হাজার চেষ্টা করলেন, নিজেকে সামলাতে পারলেন না – শেষে ঘাবড়ে গিয়ে বললেন –

উস্‌-কি গলি কাঁহা য়ে তো কুছ বাগ-এ খুলদ্‌ হ্যায়,
কিস্‌ জা-এ মওত ছোড় গ্যায়ি মুঝ কো লাকে সাথ।

তার গলি কোথায়, এতো স্বর্গের উদ্যান ,
এ কোথায় সাথে এনে ছেড়ে গেল মৃত্যু আমায়।

মৃত্যু এক ধোঁকা দিল – সে ধোঁকাও প্রাণসংহারী -মোমিন এই ভরসায় মুসিবত সহ্য করেছিলেন যে জীবনের আপদ বিদায় হলেই প্রিয়ার গলিতে তাঁর ঠিকানা হবে -বাসনা এই কথা বলে বিরহের যাতনায় বাসনাকে সাহস দিচ্ছিল যে এই কষ্টের পরেই চির প্রশান্তি পাওয়া যাবে – নব জীবনের সুর্মা আঁকা চোখের সামনে বিছিয়ে থাকবে – নতুন জমিন-নতুন আকাশ – নয়া মেহফিল – সরস বাগানের পাতায় থাকবে তাঁরই ছোঁয়া – তার এক পলকের দেখা পাওয়ায় বেহেশতের সব জাকজমক উৎসর্গ হবে – একটু পরেই যখন নিজের উপর জোর খাটিয়ে সামলে উঠলেন তো ভ্রম হলো যে আমি তাঁর গলির ভাবনা ভাবতে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, স্বপ্নে জান্নাত ঘুরে এসেছি – চোখ কচলে নিয়ে আবার তাকালেন তো সেই একই অমৃত নহর, একই কল্পতরুর ডাল – এবার বিশ্বাস না করে উপায় রইলো না আমার জীবনে গল্প মিথ্যা ছিলো না -হায় সেই বাসনা যা হৃদয় কোঠার প্রদীপ ছিলো আর কিনা এই প্রতিফল!

আমি কেন শহরের বাইরে যাবো? বাইরে কি অন্য কোন খোদায়ী আছে – যদি জানতে চাও তো বলি এই শহরের কাঙালপনাও বাদশাহীর থেকে ভালো –

ব্যায়ঠা হ্যায় কে সায়া-এ দীবার য়ার মেঁ
ফরমা নবা্‌-এ কিশবা্‌র -এ হিন্দোসতান হ্যায়।

বসে আছি, প্রিয়র দেয়ালের ছায়ায়,
যেনো তার রূপ হিন্দোসতানের নব কিশলয়।

সুখের স্বপ্ন ছাড়তে পারি – নিজের অস্তিত্বকে অবজ্ঞা করা সহজ – কিন্তু প্রিয়ার মন্দির ছাড়া কঠিন – একটু শান্তি পেলে এর চাইতে ভালো আর কোন জায়গা?

আপনি গেল চিঠিতে অস্থিরতার কথা উল্লেখ করেছেন – কোন অস্থিরতা? আপনারই আহরণ আমার মাঝে যত রঙ্গ ছড়ায়, তা আমার দোষ?

গলত হ্যায় জযবে দিল-কা শিকবা্‌ দেখো জুর্ম কিসকা হ্যায়,
না খিঁচো গর তুম আপনে কো কশাকশ দরমিয়াঁ কিয়ুঁ হো?

হৃদয়াবেগের অনুযোগ তো ভুল, দেখো দোষ কার,
তুমি যদি আমায় নাই টানো, মাঝে এই বাদানুবাদ কেন?

আমি যত কাছে আসতে চেয়েছি, আপনি তত দূরে সরেছেন – আমি আপনাকে কাছে টানার চেষ্টা করেছি, আপনি নিজেকে দুরত্বের উদাহরণ বানিয়েছেন –

খুদায়া জজবা-এ দিল কি মাগার তাসির উলটি হ্যায়,
কে জিতনা খিঁচতা হুঁ অওর খিঁচা জায়ে হ্যায় মুঝ সে।

ঈশ্বর! হৃদয়াবেগের ফলই দেখছি উল্টো,
যতই টেনে চলি, ক্লান্তি আসে না আমার ।

ভাগ্য নিশ্চয়ই শক্র – কিন্তু সে তো আজকে নয়, চিরকালই – একা আমার নয় – সব দুঃখের নিস্পেষিতের কথা স্মরণ করুন – সবাইকে ছেড়ে সে যদি আমাকেই বেশি পছন্দ করে তো নাচার আমি কি করি – হ্যাঁ যদি ভয় পাই তো সেই নির্দয়কে যে এই বৃদ্ধ নিয়তিরও গুরু-

য়ে ফিতনা আদিম কি খানা বিরানী কো ক্যায়া কম হ্যায়,
হোবে্‌ তুম দোস্ত জিসকে দুশমন উস্‌কা আসমাঁ কিয়ূঁ হো?

এ দুর্যোগ মানুষের ঘর নষ্ট করতে কম কীসের,
তুমি যার বন্ধু হলে ভাগ্য তার শক্র হবে কেন?

আপনার চিঠি ওদিকে বন্ধ হয় তো এদিকে আমি ভাবতে থাকি এই নিশ্চুপ জবাবের কী জবার দেবো – প্রায় এমন হয় এদিকে একটা চিঠি খামে বন্ধ করে বার্তাবাহকের হাতে দিলাম, ওদিকে আরেক চিঠির কথা মাথায় এসে বসে থাকে – আগের চিঠি পৌছানোর আগেই আমি আজব খেয়ালে বলি – উত্তরের অপেক্ষা কে করে – এই তো ভালো আমি আমার গল্প বলতে থাকবো আর সে শুনতে থাকবে –

কাসিদ কে আতে আতে খত্‌ ইক অওর লিখ রাখ্‌খু,
ম্যায় জানতা হুঁ জো বো্‌ লিখখেঙ্গে জবাব মে।

পত্রবাহক ফিরে আসতে আসতে আরেকটি চিঠি লিখে রাখি,
আমি তো জানি সে কি লিখবে উত্তরে।

                                                                             – গালিব

২ বর্ষ. ৫ সংখ্যা. আশ্বিন ১৪০৮. অক্টোবর ২০০১

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।