আসন্ন নারী ও অন্যান্য কবিতা

আজহার ফরহাদ

১.
বিজয়ের উদ্ভাস চোখে……..
কাজলের উজ্জ্বল কলা, নয়নের সীমা
ঠোঁটের লাবণ্য দিয়ে গড়া বিপুল সময়
নির্ঘুম রাতের চাঁদিয়াল
মোহ নেই তার কোন আজ
একলা শ্রাবণ দূরে যায়
তাঁর বসে থাকা আলোর গতির চেয়ে বেশী
আরোহণ ত্রি্কয়ার বিপরীত কলা
যেন অজস্রকাল ধ’রে একটি বিস্বাদ ঘুর্ণন দিতে দিতে
চিরতরে ডুবে যায় চাঁদ।

২.
বিকেলের জলের রেখা গুণতে যাবার বিমূর্ত সময়টায়
হঠাৎ এক হলুদ সাপের ছোবলে
একটি স্ফিতোতর ঢেউ
শব্দ করে উঠে। যেনো বলে। একটি ঢেউ। ভাঙাচোরা।
সমগ্র জলাঞ্চলে গতির সিঞ্চণ তার। একটি ছোবল।
আমার পায়ের ওঠানামা, ঘন হতে ঘনতর
জলের তরঙ্গ তোলা । বৃত্ত হতে বৃত্তের প্রাকারে জলের ভাসান
অপরূপ চিক্‌চিক্‌ বিতান। ক্রমশ রাত হ’য়ে আসে…।

৩.
মরে যেও, যদি ভেবে থাকো আজ অপূর্ব অমাবশ্যার রাতে
শুধু এক স্বেচ্ছাবতী নদী স্রোতের মগ্নতা ভুলে
                           স্থির নগ্ন হ’য়ে দাঁড়াবে সামনে তোমার
পট্টবস্ত্রের তাবৎ মালিকানা কড়ির দামে বেচে দিয়ে
স্বচ্ছতোয়া নদ হ’য়ে উঠো
আলোকে আহত হ’লে উবু হ’য়ে মুদে নাও চোখ
                  রাত্রির তারকারাজী নম্র আর নত নয় মোটে
দীর্ঘশ্বাসের নীল বুদ্বুদ ফেনিল ববিন
পোড়ো ম্যাশিনের গাঁটে মরচে ধরা
               আলোকে আহত নও; তবে তুমি নির্বিকার বপু
ক্ষিপ্ত বাতাসের গতির চরকায়, বুনট সুতোর প্যাঁচ
খুলবে কি করে?

আসন্ন নারীটি জানে না তার দূর্গম দেহে
সমস্ত মৃত্যুকে বন্ধু করে ব’সে আছে এক কৈলাস মরদ…..।

পুঁজির বাহনে চ’ড়ে উড়ছিলাম চ্যাঁচাচ্ছিলাম…

আমি হেঁটে গেলাম পর্বতের বেহেশত হ’তে বিমুগ্ধ আকাশের নীল উপল-কায়ার
অদ্ভূত জঞ্জালের ভেতর ছিঁড়তে-ছিঁড়তে একেকটি দিন, দিনান্তের
ফুল কাগজের দুনিয়া আর কলমের নিঃশ্বাস হ’তে লুফে নিয়ে
শুকনো স্মৃতি এক পুষ্টিকর ভাবনায় কাতরচক্ষু যেন।
গর্ধবের মতো চলছে এক বাতিল জুতো সমান খুড়তুতো অবয়বটাকে নিয়ে পীঠে
নোঙ্‌রা শিল্পের শানুদেশ বেয়ে জলমর্মরে আমৃত্যু নারগিস
প্রেমে স্রোতের কলকল ডাকা ও আমার আত্মা জঞ্জালের চোখ নিয়ে
ঘষ্‌তে ঘষ্‌তে নিজের বধির আকাঙ্ক্ষার কাছে ঘামছে।
লজ্জা ধ’রে হাতের মুঠোয় দিনান্তের শেষ আলোক হ’তে উঁচিয়ে মস্তক যখন
চোখে লাগলো রাত্রির নেকাব সভ্যতার সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসলো
এক নিখুঁত প্রজাপতি। কী সুন্দর আর সোনালী রোদের
হাম্মামখানায় কত দুপুর যেন কাটিয়ে এসেছে দেহ!
বারবার শুধু অভিশাপের দূরন্ত ঘোড়াকে দমিত করতে গিয়ে প্রজাপতির অদ্ভূত
ডানায় অবশিষ্ট চোখে; কেন যে সব আন্দোলিত হয়, প্রান্তর-ঘাস
সবুজাভ চাঁদের কীনারা, রেলের ফাঁটল ধরা কাঠ-স্লিপার
উন্মত্ত হাঁড়ির তাপে স্ফীত আওয়াজ;
আমি হেঁটে গেলাম আবর্জনার ডাস্টবিন হ’তে দিগন্তব্যাপী
এক মাছির পিঠে চ’ড়ে হাওয়ায়-হাওয়ায়….
অগ্নুৎপাতের দ্যোতনার বিষ নিয়ে চোখে আমূল সূর্যাস্তে দাঁড়িয়ে কত
অজ্ঞতায় মাছির পিঠটিকে ভালোবেসে নিপূণ চ্যাঁচানো….
এশিয়ার মানুষগুলো বিচিত্র ভঙ্গিমায় নীলিমার নীচে চা পান করছেন
আর সেই চায়ের পেয়ালাগুলোয় গেলো রাত নিদ্রা গিয়েছিলাম
আমি আর আমার গরুড় মাছিটি…।

চিন্তার ঘামে এক বিদগ্ধ সম্রাট

(বিপ্লবী চে’ গ্যেভারার প্রতি)

আপনার অপুষ্ট গোঁফের কাছে একটি জাগ্রত মৌমাছি পূর্ণিমার রোদের ভেতর
ছায়া ফেলে কালো ঢেলে গেল; সুঠাম গালের তনু বেয়ে
চারুকর্মের প্রতিধ্বনি তুলে তখন ঝ’রছে পরিণত ঘাম, শ্মশ্রুর গামছায়
মুছে দেহজ দূষণ, যেন চিকচিক ক’রছে চাঁদের গুঁড়ো-
এমন কিছু আশ্চর্য কবিতার মতো বিদগ্ধ ক্ষণের সম্রাট ছিলেন আপনি
আপনার রাজ্য ছিল প্রকট; আলোর খাঁচায় বন্দী এক নাজুক সুন্দর
প্যাঁচানো তারের লাগোয়া বাতিটার কেন্দ্রীয় নরোম তীর্থ ছিলেন আপনি।
ব্যয়সাধ্য আলাপের ক্ষণে আমরা ক্রমশ নেচে উঠছি। আমাদের বিশ্বাসে দোল
খাচ্ছে অর্বুদ পৃথিবী। যেমন কাঁচের স্বচ্ছ কায়া, যেমন চোত মাসের শুকনো মাঠ
গরম চায়ের উপর এক ইঞ্চি পুরু সর্পিল আচরণ, টেবিলের কালচে সেলুনে
রকমারী ঠাট্টা–

স্যালুট স্যালুট চে’, আর্নেস্তো গ্যেভারা
আপনাকে দিলাম সব আমাদের দিনরাত আমাদের চিন্তার ঘাম।

বসন্তের কৃষ্ণচূড়ারা বেগবান লাল নিয়ে ফোটে। জলের শেওলা তুলে
পা ফেলে কাদার গভীরে, নিঃশ্বাস নিয়েছি এই দেহে; সজীব জেগেছি আমি চে’
এই বিলের জলের কালো গহীণ অন্ধকারে আপনি চিন্তার ঘ্রাণ ছেড়ে যান।
কৃষ্ণচূড়ার গালে লাল মগডালে আঁছড়ে পড়েন যেনো, মাভৈঃ বিপ্লব।

স্বপ্নের গোলাঘরে উপচানো ধানের ভেতর আরেক স্বপ্ন নিয়ে কৃষকের অমার্জিত
হাসি– হাসিতে বের হওয়া অপুস্ট মাড়ির ছোঁড়া দুর্গন্ধের পাশে
আপনার স্বাক্ষর দেখে কবে সেই নিষিদ্ধ মানুষেরা জড়ো হবে এসে?
আপনার অপুষ্ট গোঁফের কাছে একটি জাগ্রত মৌমাছি পূর্ণিমার রোদের ভেতর
যেন ছায়া ফেলে যেতে যেতে তিল হ’য়ে গাঁথে গালের চামড়ায়।

চে’ গতিশীল মৌমাছিটি ছিলেন আপনি, ছায়াটিও আপনারই ছিলো
আর সেই কালো তিলক মৌমাছির ছায়ায় ছায়ায় গতিশীল ছিল যা– আমরা
এই আমি…এই তিনি; পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসে
আপনার বিশ্বাসকে ক্ষত হতে দেখে যিনি চোখের দরোজা খুলে ভিজিয়ে
ফেললেন চোখ– হাতে একটি খবরের কাগজ………

২ বর্ষ. ৪ সংখ্যা. আষাঢ় ১৪০৮. জুন ২০০১

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।