পঞ্চম চিঠি

হুনুয এক পরতবে নক্‌শে খায়াল-এ য়ার বাকী হ্যায়,
দিল-এ আফসুরদাহ গোয়া হুজরা হ্যায় ইউসূফ-কে জিন্দান কা ।

হায়, প্রিয়’র সুখ-কল্পনার এক সুন্দর চিহ্ন শুধু বাকী পড়ে আছে,
বিমর্ষ হৃদয়, সে যেনো কারাগারে য়ুসুফের প্রকোষ্ঠ।

জা নে  গা লি ব

দিল মে থা ক্যায়া জো তেরা গম্‌ উসে গর্‌ত করতা,
বো্‌ জো রাখতে থে হাম্‌ এক হাস্‌রত-এ-তামির সো হ্যায়।

কি বাকী ছিলো হৃদয়ে বলো যে তোমার দুঃখ তাকে নস্যাত করবে
সেই যে কিছু গড়ে তোলার বাসনা ছিল শুধু সেই আছে।

চিঠির জবাব না আসায় বোঝা গেল জবাব পরিস্কার -নীরবতায় বোঝা গেলো সামনে আর কোন কথা না বলার সিদ্ধান্ত -বাসনার ক্যারাভান হৃদয়ে থেমেছিল, ডাকের সময় চলে যাবার পর রওনা হয়ে গেল – আমার দূরাশা, দেখতে রইল, সে চলে যাচ্ছে – এক সময় দিগন্তের সাদা পৃষ্ঠায় ছোট একবিন্দু অক্ষর হয়ে হারিয়ে গেল -যে নক্ষত্র হদয়পুরকে আলোর জগৎ বানিয়ে রেখেছিল, লুকিয়ে গেল-

এখানে সবাই কোন এক উপহার নিয়ে আসে আর প্রত্যেক যানেঅলাই কোন না কোন চিহ্ন ফেলে যায় -এই প্রথা মেনে চলা বড় কঠিন – যারা বেঁচে আছে, আর যারা মৃত্যু দেশের পথে পথিক হয়ে রওনা হলো সবাই এই প্রথার সম্মান রাখতে চায় – এই প্রথা যেন প্রকৃতির এক পবিত্র দায়, তাই বিশ্বাস ছিল বাসনার ক্যারাভান নিশ্চয়ই কোন ভালো চিহ্ন ফেলে গেছে – মন এই ভাবনায় যেখানে সে থেমেছিল আরেকবার নজর করল সেখানে -দেখা গেলো আশ্চর্য! কাফেলাঅলা সব কিছুই রেখে গেছে, সাথে কিছুই নিয়ে যায় নি – শত-সহস্র স্মৃতি, কাতারে – কাতারে চিহ্ন, সব দিকে বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আছে – যে সরাইখানায় কাফেলা থেমেছিল, সে নিজেই তার স্মৃতি চিহ্ন হয়ে আছে – বেশুমার সেইসব চিহ্নের মাঝে দৃষ্টি যে কোন একটার দিকে তাকাবে, সে বড় মুশকিল, মনের কাছাকাছি তপ্ত জমি থেমে কবোষ্ণ ঘুর্ণি ওঠে-মিহি বাসনার ধুলো হাওয়ার কাঁধে সওয়ার হয়ে সেই কাফেলা কোন পথে গেল তার খোঁজ করে – কখনো অপটু হাতের অশান্ত ঘুড়ি কোন ঘুমন্ত স্ফুলিঙ্গের জমিনে অস্থিরতা তুলে ছুটে যায়, কখনো হাওয়ার শন্‌শনানিতে মনে হয় কোন প্রিয় বন্ধুকে সে ডাকছে – দিগন্তের কাছে উদীয়মান সুর্যের কিরণকণায় এমন ঝলমল করে ওঠে যেন সেই কাফেলা ছেড়ে আসা হৃদয়ের উপর বাসনা ভরা নজর ফেলছে – হযতো তার আফসোস, উষ্ণ আর আর্দ্র সেই স্মৃতিচিহ্ন সে কেন পিছে ফেলে গেল – হয়তো সে এক বিবর্ণ মরুর মতই তার অতীতকে পিছে ফেলে সামনে যেতে চায় – দুরাশার প্রতিটি বিন্দুই তো সে নিঙ্‌ড়ে নিজের সাথে নিয়ে গেছে – এখন হৃদয়ে ক্ষত ছাড়া সে প্রথম জীবনের আর কোন চিহ্ন বাকি নেই – তাকে দেখেই প্রত্যহের তুচ্ছ বাসনা চোখের সামনে জেগে ওঠে – তাকে দেখেই মনে পড়ে, আগে এখানে বেদনা ছিল, আমি সেই কল্পনায় বিভোর ছিলাম আর নিয়তি অলস কল্পনায় বিঘ্ন দেয়ার জন্য কী সুন্দর সব দূরভিসন্ধি করছিল – আমি প্রতিদিনের দুঃখ থেকে একটু ফুরসৎ নিয়ে ভবিষ্যৎ স্বস্তির বাগানে বীজ বপন করেছিলুম, কত রঙবেরঙের ফুল ফুটেছিল – বিশ্বাসঘাতক প্রতিদিনের তুচ্ছ আবর্তন, প্রথমে তো আমার এই স্বর্গের দিকে যেন কোন সম্পর্কই নেই এমন বেপরোয়া হয়ে দেখছিল কিন্তু শেষ পযর্ন্ত একটামাত্র আড়মোড়ায় অবসরের সেই গন্তব্য আর সেই কল্পনাকে পায়ে পিষে দিল- নদী, যে বহুদিন থেকে বিশ্বস্ত হয়ে বয়ে চলেছিল আচানক দুকুল ভাসিয়ে সব রঙিন ফসল নিয়ে গেল – এখন ছবিতে শুধু বিবর্ণ কিছু দাগ, মিলনপ্রভাত বিরহ সন্ধ্যায় অন্ধকারকে জড়িয়ে ধরেছে- বাসনার এই পরিণতি দেখার পর, বিরান হৃদয়কে আবার সবুজ করার কথা ভাববো এই সাহস কোথায়? আকাশ ছোঁয়ার শখে আবার কি নিজের হাড়ের উপর আকাশ প্রদীপের ভিত্তি বানাবো?

আশা যদি এখন নতুন কোন সবুজ বাগান দেখায়, আমি তার ডালে, পাতায় সাপ বিচ্ছু দেখতে পাই -ফুল পায়ে ছোবল দেয়, পাতার কিনারে শরীর কেটে বসে – সন্ধ্যায় চাঁদনীচকে যাওয়া, ভোরের আলোয় চলাফেরায় বেরোই না কারণ এসবের সাথেই মনের আনন্দের সম্পর্ক –

মুহব্বত থি চমন- সে লেকিন আব্‌ য়ে বে-দিমাগী কাঁহা
কে মওজ-এ-বুঁ-এ গুল-সে নাক মে আতা হ্যায় দম্‌ মেরা।

পুস্পকলিকে ভালোবেসেছিলাম -এখন মনে হয় তা পাগলামো,
ফুলের সুবাস-তরঙ্গ আমার ঘ্রাণে এলে নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে ।

হৃদয় অস্তিত্ব ফুলবাগানের ওপর বিরক্ত, জগতের কোন ছবিতেই বিশ্বাসের রঙ নেই, বসন্তের নেমে আসার পরিণতি হেমন্তের বুকে ঠাঁই নেয়া স্বস্তির ভাবনা বেবুনিয়াদ, সুর্যের প্রদীপ পথের হাওয়ায় নিবুনিবু – প্রেম বেআসর আর সবার চোখে শুধুই প্রবঞ্চনা – জগৎবাসীর থেকে দূরে নতুন বসতি গড়তে চাই – যদি জানতে চাও এখন বাসনার দাবী কতটুকু, তবে বলবো-

র্যহিয়ে আব্‌ এ্যায়সি জাগা চল্‌ কর যাহাঁ কোয়ী না হো,
হাম্‌-সুখন্‌ কোয়ী না হো অওর হাম্‌-যুবাঁ কোয়ী না হো।
বে-দর বো্‌ দীবা্‌র-কা ইক ঘর্‌ বানানা চাহিয়ে
কোয়ী হামসায়া না হো অওর পাসবাঁ কোঈ না হো।
পড়ি-এ গর বিমার তো কোয়ী না হো তীমারদার
অওর আগর মর যাইয়ে তো নওহা -খোবা কোয়ী না হো।

এবার সেই বিজনে হারাই যেখানে নেই কেউ
কেউ রবে না সমদর্শী, সমভাষী কেউ সেখানে।
ইচ্ছে আমার তুলতে বাড়ি দেয়াল এবং দরজা ছাড়াই,
পড়শি সেথা রইবে না কেউ এবং কেউ দ্বার প্রহরায়।
অসুখ হয়ে থাকলে পড়ে কেউ রবে না দেখা- শোনার ,
জীবন গিয়ে ফুরিয়ে গেলে কেউ রবে না কান্না তোলার।

আশা কানাগলিতে পথ হারিয়েছে – দেখার চোখ শ্রান্ত, কথোপকথন আর দেখা পাওয়ার যত সাধ্য সাধনা সব অর্থহীন – সব পথ চলার এই ফল, এখান থেকে আমি এবার যেতে চাই।

                                                                      -গালিব

২ বর্ষ. ৫ সংখ্যা. আশ্বিন ১৪০৮. অক্টোবর ২০০১

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।