তৃতীয় চিঠি

আব যফা-সে ভী হ্যাঁয় ম্যাহরুম, আল্লাহ আল্লাহ;
ইস্‌ ক্‌দ্‌র দুশ্‌মন্‌-এ আর্বাব-এ ব্‌ফা হো জানা।

এখন নিষ্ঠুরতা থেকেও বঞ্চিত আমি-হায় ঈশ্বর,
একনিষ্ঠ প্রেমিকের সঙ্গে এতোখানি শক্রতা!

জা নে  গা লি ব

সূর্য শিশিরের অস্থির হৃদয়ের সামনে দাঁড়ালো না, আনন্দের প্রভাত বঞ্চিতের চোখে ঠাঁই নেয়ার অনুভব করলো না প্রয়োজন, প্রার্থনা ব্যাথার দিকে মুখ করলো না – দাক্ষিণ্যের প্রতিশ্রুতি চোখ ধাঁধাঁনো আলোর মত চোখের সীমানা উপচে’ পড়লো -গৌরবের বয়ান উত্তরের উপযুক্ত বলে মানা হল না-

হ্যায়ফ উস পারহা-এ করতাস কি কি্‌সমত গালিব,
জিস কি কি্‌সমত মে হো মকতুব পরিশাঁ হোনা।

হায় সেই টুকরো চিরকুটের ভাগ্য গালিব,
যার কপালে ছিল বিস্রস্ত চিঠি হওয়া।

তোমার ঔদার্যের ভ্রান্তি সে যা গড়ে তুলেছিল, সুন্দরের গর্বের আধ চাহনি তাকে হাওয়াই কেল্লার মত ধ্বসিয়ে দিল -রাতভর কত মনকাড়া গল্প শুনিয়ে গেলাম কিন্তু ভোর তার আসল ভাবনায় আবার প্রেমের হৃদয়ের উপর জিত নিয়ে নিল- প্রেম, অধিকারকে আরেকবার শেষ অস্ত্র বানাতে ব্যর্থ হলো- এবার আশা অস্থির হৃদয়ের হাতে নিজের রঙিন খেলনা দিয়ে কমজোরী ধৈর্য্যকে ভোলাতে চাইলো- প্রেমের আসল রূপ বের হয়ে আসার বিশ্বাস যেন বসন্তের এখনই বিদায় নেয়ার পর আরেক বসন্তের প্রতিশ্রুতি -তার বুদ্ধি-বিবেচনার কাছে বিপর্যন্ত হৃদয়ের অস্থিরতা এতটুকুই শক্তি রাখে যে শক্তি ধুলিকে ঘূর্ণির কাছ থেকে দূরে যেতে দেয় না -একদিকে আমি আশার কল্পনা প্রবণতায় হৃদয়ভর্তি স্ফুলিঙ্গ নিয়ে বসে আছি, অপরদিকে প্রেমের পিঠ চাপড়ানোতে বুকভর্তি আগুন-

হেমন্ত চলে যাবে বসন্ত আসবে -এই আমার স্থির বিশ্বাস -পুরোমাত্রার বিশ্বাস আছে বসন্তের হাওয়া চলবে আর তার পথে ফুল কেশর ছড়িয়ে দেবে – ফুলবাগানে ফুলের পথ সহজ হবে আর শিশির তার বুকের আঁচলে রাজসিক মুক্তো গেঁথে দেবে – ফুল হাসবে, চারপাশ বসন্তের প্রশস্তি গানে বিহবল হবে- কিন্তু তৃষ্ণার্ত মাঠ ক’দিন বৃষ্টির অপেক্ষা করতে পারে, প্রাণ যার ওষ্ঠাগত তার অপেক্ষার সীমা কোথায়?

দূরাগত মেঘের নদীর মতো প্রশস্ত হৃদয়ে বিশ্বাস রাখি, কিন্তু সে বুক উজাড় করে দেবার আগেই নুয়ে পড়া সবুজের ধূসর পাতা ধুলোয় মিশে যাবে হয়তো – বসন্তের বাতাস সুগন্ধের কৌটো খোলার আগেই এই একমুঠো ধুলো, সে কি বিক্ষিপ্ত কণায় ছড়িয়ে পড়বে না? দয়ালু চিকিৎসক পৌছানোর আগেই মৃতপ্রায় রোগীর প্রাণ স্বর্গের কল্পতরু নতুবা নরকের প্রাণসংহারী আগুনের মাঝে পৌছে যাবে -আমি ভাল করেই বুঝি কাল প্রাঙ্গণের এই প্রদীপ তার সফলতায় নিশ্চয়ই পৌছুবে কিন্তু সভায় পতঙ্গের ছাঁইও খুঁজে মিলবে না -বর্ষার ছিটে ক্ষার মাটিতে নিশ্চয়ই প্রভাব ফেলবে কিন্তু তখন প্রথম বিন্দুর টুকরো হাওয়ায় অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে-

আহ্‌ কো চাহিয়ে এক উম্র আসর্‌ হোনে তক্‌
কওন জীতা হ্যায় তেরী জুলফ কে সর হোনে তক।

এক জীবন চাই একটি দীর্ঘশ্বাসের ফল ফলতে,
তোমার কেশ থেকে মূলে পৌছুতে এত জীবন কে বাঁচে বলো!

কখনো ভাবি জবাব লিখে হয়তো ভুলে খামের উপর গলি হাশিম খাঁ লিখে দিয়েছেন – কখনো ম’নে হয় হয়তো তার মনেই নেই গালিব নামে কেউ ছিলো – যদি এমনই হয় তবে মনে রাখুন, গালিব যে গলিতে থাকে সে গলির নাম গলি ক্বাসিম জান গলি, ক্বসম জান নয়- আর যদি খোদা না করুন, আমাকে বিলকুল প্রেমের মাঝে কর্তব্যের মতোই ভুলিয়ে দিয়ে থাকেন তবে শুধু এইটুকুই আর্জি করব-

তুম মুঝে ভুল গ্যায়ে হো তো পাতা বাত্‌লা দুঁ,
কাভি ফিতরক মে তেরে কোয়ী নখ্‌চির ভী থা।

তুমি যদি আমায় ভুলে গিয়েই থাকো তবে বলে দিই ঠিকানা,
কখনো তোমার অদৃষ্টের মাঝে একটা নখের আঁচড়ও তো ছিল।

কেমন করে ঘটলো এটা হঠাৎ? কৃপার এ স্রোত কেন মুখ ফিরিয়ে নিল-

আজ কিউ পরবা নেহী আপনি আসিরো-কে তুঝে,
কাল তলক তেরা-হী দিল ম্যাহর-ব্‌ফা কা বাব থা।

তোমার কাঙ্গাল যারা আজ কেনো তাদের কোনো পরোয়া করো না তুমি,
কাল পর্যন্ত তোমারি হৃদয় বিশ্বাস ও দয়ার আবাস ছিল।

য়াদ করো বো্‌ দিন কে হর্‌ এক হল্‌কা তেরে দাম কা,
ইন্তেজার-এ স্যায়দ মে এক দীদা-এ বে-খোয়াব থা।

স্মরণ করো সে দিনের কথা, তোমার পাতা ফাঁদের প্রতিটি টুকরো,
শিকারের আশায় স্বপ্নহীন দৃষ্টি হয়ে থাকতো।

হায়! এ দূর্ভাগা কি এতটা সৌভাগ্য পাওয়ার যোগ্য নয় যে তার রক্ত কিছুক্ষণের জন্য হলেও কারুর হাতের মেহেদীর নক্‌শা হয়- নয়তো তার গলায় কি কারুর অবিশ্বাসের তরবারীর ধারও পরীক্ষা করা যায় না? গেল চিঠিতে জবাব দেবার কোন পরিস্কার প্রতিশ্রুতি ছিল না বটে তবে আমি এই বলে অভিযোগ শেষ করেছিলুম-

হু তেরে বা্‌দা না করনে পে ভী রাজি কে কভী,
গোশ্‌ মিন্নত-কশ্‌ গুলবাগ-এ তসল্লী না হুয়া।

তুমি প্রতিজ্ঞা না করলেও আমি রুষ্ট হই না,
ফুল বাগানের মিনতিতে আমার কান কখনো বিশ্বাস আনেনি

সে সময় তো একথা মনেও ছিল না যে এই পরিচয়ের আবরণ এমন অবহেলায় রূপ নেবে আর দ্বিতীয় চিঠির জবাবে আপনি অখণ্ড নিরবতা উপহার পাঠাবেন -কখনো মনে হয়, আমার কোন কথা কি আপনার অসন্ত্তষ্টি বাড়ালো, পরে আবার সে ভাবনাকে একথা বলে বিদায় করি-

হায় হায়, খুদা না খোয়াস্তা বো অওর দুশমনি,
এ্যায় শওক-এ মুনফাইল-য়ে তুঝে ক্যায়া খায়াল হ্যায়

হায় হায়,খোদা না করুক! সে আর শত্রুতা?
হে বিপ্রতিপ বাসনা, এ তোমার কেমন কল্পনা!

শুনুন, সবই ভালো এই চুপ করে থাকার অত্যাচার ছাড়া…. খোদা তো এর জন্যই মানুষকে জিভ দিলেন – মানুষ অন্তঃত এদিক দিয়ে ফুলের থেকে ভালো যে, ফুলের এত জিভ থেকে ও সে কথা বলতে পারে না আর মানুষ এক জিভ্‌ দিয়ে কত গল্পই না বলে -যদি একজন মর্মর মুর্তির মতো স্তদ্ধ থাকে তবে অপরজনের গল্প বলায় কী আনন্দ-

হ্যায় বজম-এ বুতাঁ-মে সুখ্‌ন আজুরদা লবোসে,
তংগ্‌ আয়ে হ্যায় হম্‌ আ্যায়সে খুশামদ তলবো সে।

সেই পাষাণ প্রতিমার সভায় কাব্য তো শুধু বাসনার রসনায় কথা বলে
এমন খোশামোদ পরস্তিতে বড্ড বিরক্ত হয়ে আছি।

যা হোক, আপাতত-

কাতাহ্‌ কিজিয়ে না তালুক হমসে,
কুছ নহী হ্যায় তো আদাব্‌তহী সহী।

সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না আমার সাথে,
যদি কিছুই না থাকে তবে শক্রতাটাই থাক।

শক্রতাও তো এক ধরনের সম্পর্ক, মনকে এই কথা বলেও তো প্রবোধ দিতে পারব – হোক না শক্রতার দৃষ্টি তবু আমার দিকে তাকায় তো – খোদার শুকর্‌ যদি কারুর দৃষ্টিতে নীরবতার কারণও থাকে তবে বাসনার কারবার করার চাইতে ভালো কারবার আর কী হয় – প্রেমের চাইতে এত সুন্দর দুর্যোগ আর কী হতে পারে ? যদি পৃথিবীর ধ্বংসস্তুপের থেকে দূরে আরেক নতুন পৃথিবী বানাতে চায় -না ভুল হলো, সে তো নিজেই এক ভরপুর পৃথিবী -তার সাথেই মিলে থাকে, কিন্তু তার সমস্ত অন্ধকার থেকে দুরে- আপনার প্রতিজ্ঞায় বিশ্বাস করি, তবে আপনার দয়া আমার খবর নেয়ার প্রত্যাশা জাগিয়েছিল সে আজ বলছে-

খাক হো যায়েঙ্গে হম্‌ তুম কো খবর হোনে তক।

তোমার খবর হওয়ার আগেই আমি ধুলোয় মিশে যাব।

                                                                       -গালিব

২ বর্ষ. ৫ সংখ্যা. আশ্বিন ১৪০৮. অক্টোবর ২০০১

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।