চতুর্থ চিঠি

তেরি বাদে পর জিয়ে হাম তো য়ে জান ঝুটি জানা,
কে খুশি সে মর্‌ না জাতে আগর এ্যায়তবার হোতা

তোমার প্রতিজ্ঞায় বেঁচে আছি জানলে ভুল জেনেছো,
আনন্দে কি মরে যেতুম না সে প্রতিজ্ঞায় বিশ্বাস করলে!

জা নে  গা লি ব

পাগল হয়ে হুঁশিয়ারীর নাম শুনলেই ক্ষেপে যাওয়ার কথা তো শুনেছেন – এবার তার মানেটাও শুনে নিন – প্রত্যেক মানুষই কোন না কোন ভাবে তার মনটাকে ভুলিয়ে নেয়, কখনও উষর মরুতে ঘুরে কখনও নিজের জামা বিদীর্ণ করে – গালিব নামের পাগলটাও নিজের সময়টাকে আনন্দে কাটানোর চেষ্টা করে – কিন্তু আপনার করুণার স্বপ্ন কখনও তার সাথে একরত্তি হাত মেলায়নি, মেলাবেই বা কি করে?

যদি হেমন্তকে বসন্ত -কাঁটার প্রান্তরকে ফুলবাগান – প্রবাসকে স্বদেশ – নিভে যাওয়া প্রদীপের গন্ধকে গোলাপের সুবাস বলা ঠিক হয় – যদি অচেনা ভাবকে পরিচয়ের সাক্ষী – শক্রতাকে প্রেম-ঘৃণাকে ভালোবাসা বলে মানা যায় – যদি ব্যাবধানের দূরত্বকে নৈকট্য আর বিরহকে মিলন বলে কেউ মেনে নেয় তাহলে এও হয়তো সম্ভব যে আমি এই সম্পর্কহীনতাকে সম্পর্ক বলব -তার নিষ্ঠুরতাকে দয়ার নামে মেনে নেব – মামুলি চোখে পড়াকে কল্পনায় সমাদরের মনোহর রঙে রাঙ্গিয়ে নিতে পারে – শিল্পীর খুদিতো এই -নিষ্প্র্রাণ বিবর্ণ পাথর কেটে উষ্ণ আনন্দের আকাশচুম্বী ইমারত যদিও সে তৈরী করতে পারে কিন্তু সবসময়ই শিল্পীর কাছে সেই শিল্প সৃষ্টির উপাদান তো থাকা চাই – প্রেমে দেখা গেল সে এতটুকুই নজরবন্দী করতে পারে যে নিতান্ত ভদ্রতার হালচাল জানতে চাওয়াতেও আবেগ আর সহৃদয়তার বিভ্রম তৈরী হয় – কিন্তু প্রেম আর চাওয়ার সমস্ত শক্তি মিলেও অস্তিত্বহীনকে অস্তিত্ববান, নেই কে আছে করতে পারে না -দৃষ্টি বার বার অন্ধকারের প্রতারণায় ভোর হয়েছে ভেবে ধোঁকা খেলো – চোখ প্রায়শই অস্তগামী চাঁদের আলোকে ঊষার ক্ষীণ আভাস আছে মনে করেছে – এসবের মাঝেই ভুল বোঝার এক কারণ তো ছিল – আমি তো নিশ্চল নদীকে সড়ক আর লোক দেখানোপনাকে আপনজনের পরিচয় ভেবেছি -কেউ মিথ্যে সহানুভূতি দেখালো তো তাকে আমার সত্যিকারের সমব্যাথী ভেবে নিয়েছি –

লাগ হো তো উস্‌-কো হাম সামঝেঁ লাগাও,
যব্‌ না হো কুছ ভি তো ধোকা খায়ে ক্যায়া।

কিছুমাত্র যোগাযোগ থাকলে বুঝতাম হৃদয়ের যোগ আছে তলায়;
যেখানে কিছুই নেই, প্রতারনাও অসম্ভব সেখানে।

একদিন সমস্ত দুঃখ জোট বেঁধে প্রতিকারের করুণা চেয়ে তার কাছে গিয়েও যখন ব্যর্থ হলো, আত্মমর্যাদার বোধ কঠিন দুঃখ পেল – আবেগের অসহায়ত্বে অস্থির হয়ে বললাম-

ফেক দেঙ্গে উসে হাম্‌ চির-কে প্যাহলু আপনা,
উন্‌পে কাবু নেহি দিলপর তো হ্যায় কাবু আপনা।

ছুঁড়ে ফেলবো কোথাও তাকে বক্ষ চিরে নিজের,
তার ওপর না হোক আপন হৃদয়ের ওপর তো জোর চলে আমার ।

মনে হলো কানের পাশে কেউ মিহি -নরমভাবে খুব দরদভরে বলে গেল-মির্জা সাহেব, হৃদয় নিশ্চয়ই আপনার নিজেরই; যা চান করুন, কিন্তু তাকে আলাদা করার পর আপনার তো বলার অধিকার থাকবে না যে-

কোয়ী মেরে দিল সে পুছে তেরি তীর-এ -নিমকশ্‌ কো,
য়ে খালিস্‌ কাঁহা সে হোতি যো জিগার-কে পার হোতা।

তোমার অর্ধবিদ্ধ বানের কথা কেউ তো জিগ্যেষ করুক আমার হৃদয় কে,
এই উদ্বেগ কোথায় পেতাম যদি বুক ফুঁড়েই তা বেরিয়ে যেত।

এই কথা নিজেকে সামলানো আর নিজের শক্তিকে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলল -কাছে ছিল নিজের জামার হৃদয়, ইচ্ছে হলো একেই তার আঁচল ভেবে চিৎকার করে বলি-

যালিম মার ডাল-না হি মন্‌যুর হ্যায় তো য়ুঁ না তড়পা
ইস আযাব-এ আলম কো তোল না দে;
মাহাবা কিয়া হ্যায় ম্যাঁয় যামিন ইধার দেখ
শহীদান-এ নিগাহ-কা খুঁ বাহা কিয়া ?

নির্দয়, ইচ্ছে যদি হত্যার তবে এমন করে অস্থির করে রেখো না;
এই ভয়াবহ শাস্তির কতটুকু ওজন করবে তুমি,
আমি শুধু বলছি একটু এদিক তাকাও
দৃষ্টিতেই শহীদ যারা তাদের খুন ঝরালে তুমি !

কিছুদিন আগে একটা গজল লিখেছিলাম, তার কিছু আশ্‌আর পেশ করছি, ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন-

গ্যায়ি বে্‌া বাত কি হো গুফতগু তো কিঁউকর হো;
ক্যাঁহে মে কুছ না হুয়া-পর না কহুঁ তো কিঁউকর হো।
তুমহি কহো কে গুজারা সনম-পরস্তো কা,
বুঁতোকি হো আগর এ্যায়সি-হি খুঁ তো কিঁউকর হো ।

সেই সুযোগ কোথায়, কথা যে হবে- কেমন করে,
বলেও কিছু হলো না-না বললেই বা কেমন করে হবে?
তুমি বলো এই পাষাণ প্রতিমা- পূজারীদের দিনগত ক্ষয়,
যদি পাষাণ প্রতিমাদেরই হয় এমন স্বভাব, কী করে হবে?

আজকাল উত্তরের আশায় বিমর্ষতার ব্যথা সীমা ছাড়িয়ে আজব জায়গায় পৌঁছেছে – তোমার ছবি দেখলে চিনতে পারিনা, তোমার ধ্যান আমাকে ছেড়ে তোমার খোঁজেই গেছে -ধৈর্য্য অস্থিরতার দ্বীপে আবাস গড়ে তুলেছে – অশ্রুরা উত্তরীয়র সব দাগ মুছে দিয়েছে কিন্তু…. হৃদয়ের একটা দাগ -সে তো গেল না – তার চিহ্ন মোছা গেল না-

দিল্‌ সে মিটনা তেরি অঙ্গুশত হিনায়ি কা খা্‌য়াল,
হো গ্যায়া গোশ্‌ত-সে নাখুন কা জুদা হো জানা।

আঙ্গুল থেকে নোখ উপড়ানো যেমন কঠিন,
তেমনি কঠিন তোমার মেহেদী-মাখা হাতের সাজ ভুলে থাকা।

                                                                                 -গালিব

২ বর্ষ. ৫ সংখ্যা. আশ্বিন ১৪০৮. অক্টোবর ২০০১

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।