অর্ধেক কবিতা

রি হোসাইন

বৃক্ষ নয়,
আমাদের মধ্যবিন্দুতে জন্মেছিল অর্ধেক দেয়াল;

অর্ধেক বসন্ত, অর্ধেক প্রেমে—
অর্ধেক আষাঢ়, অর্ধেক পূর্ণিমায়,
অর্ধেক কাম আর অর্ধেক সন্ন্যাসে
এক আকাশে উড়েছে আমাদেরই অর্ধেক ফানুস।

অর্ধেক মৃত্যু দিয়ে দেয়াল ভেঙেছি যখন,
তুমিও অর্ধেক মৃত পড়ে ছিলে দেয়ালের ওপারে;

বাকি অর্ধেক ছিল বিভ্রান্ত শূন্যতার ইতিহাস…

চড়ুই

খুব ইচ্ছে হয়,
চড়ুই পাখির ঝাঁকে হারিয়ে যাই—
তোমার জানালার ওপাশের আমগাছে
দল বেঁধে কিচিরমিচির করি;
ভোরবেলা তোমার ঘুম ভাঙুক আমার ডাকেই।

এরপর দখলবাজের মতো করে
নিজের করে নেব তোমার বারান্দা;
মাঝে মাঝে দেখাব সাহস
দরজা পেরিয়ে ঘরের কোনায় এসে
ঝগড়াও করব…
হয়ে যাব তোমার অভ্যাস।

তারপর টুপ করে দেব নিখোঁজ উড়াল,
তুমি একবার দেখবে—আবার দেখবে না;
যেন সর্বত্র আছি কিন্তু কোথাও নেই!
তোমার উদ্ভ্রান্ত দুপুরের তোলপাড়
অপেক্ষায় থাকবে আমার উঁকিঝুঁকির…

বিকেলের অবসাদ শেষে গোধূলির আয়োজনে—
ভীমপলশ্রীর সুর— তানপুরাটার তারে;
সহস্র চড়ুই পাখির কিচিরমিচিরের মাঝে
কেবল আমারই ডাক খুঁজে যাবে ভেতরে ভেতরে!

একদিন তুমি কবিতা থেকে হারিয়ে গিয়েছিলে

একদিন তুমি কবিতা থেকে হারিয়ে গিয়েছিলে—
আমি সারাদিন খুঁজেছি;
একবার বৃষ্টিতে ভিজে, একবার বিপ্লবী মিছিলে,
বৃষ্টির ছলে ভাসিয়ে দিয়েছি সমস্ত বর্ষাকাল।
টিয়া পাখি উড়ে গেছে যেখানে, সেখানেও…

আগামাসি লেন, মালিটোলার কালো গলি,
ঠাসাঠাসি ঠাঠারি বাজার, মাছের আড়তে;
কাঁচা মাছের গন্ধ গায়ে মেখে, বাতিকগ্রস্তের মতো
খুঁজেছি পুরনো অক্ষরের স্তূপ ঘেঁটে, নীলক্ষেতে—

৩২ তলা সিঁড়ি বেয়ে অফিসের ছাদে,
আত্মহত্যা থেকে ফেরা ব্যাকুল বিকেলে,
মধুমতি সিনেমা হলের অন্ধকার তন্ন তন্ন করে—
ঘাম জবজবে ৮ নম্বর যাত্রাবাড়ীর লোকালে,
দেখেছি লাস্ট ট্রিপ বাসের রিয়ার ভিউ মিররে,
বুড়িগঙ্গার ঘোলা জলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে।

খুঁজতে খুঁজতে চলে গেছি
শহর ছেড়ে গ্রামে— মদিনাদের উঠানে,
বড় নওপাড়া পদ্মার পাড়; হাহাকার ভাঙনে—
ঢেউয়ের সাথে ঢেউয়ে, লুকানো কথোপকথন;
তোলপাড় শ্বাসকষ্টের রাতে, বকুল ফুলের ঘ্রাণে;

একবার, বহুবার…
এমন অযুত-নিযুত খোঁজেও
কোথাও ছিলে না তুমি—।

একদিন তুমি কবিতা থেকে হারিয়ে গিয়েছিলে,
সেদিন কবিতাশূন্য হয়েছিল পৃথিবী;
সেদিন কিছুই লিখতে পারেনি কোনো কবি।

দূরত্ব

খুব কাছাকাছি থাকো,
বারুদ থেকে আগুনের দূরত্ব যত-
প্রতিটা উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে তোমার অস্তিত্ব টের পাই;
নষ্ট ফাল্গুনের দিনে আমাদের এই তো দূরত্ব!

সকাল

দীর্ঘ রাতের পর রাত
আমি নক্ষত্র গুনেছি একা;
তোমাকে ঘুমিয়ে রেখে
কতকাল হয়নি সকাল দেখা।

একটি অন্ধ সমুদ্র নিয়ে
সামলেছি এলোমেলো কত ঝড়;
তোমাকে ঘুমিয়ে রেখে—
জলোচ্ছ্বাস নিয়ে তোলপাড়।

তুমি ঘুম থেকে জাগার পর
আমার পাখিরাও জেগে ওঠে,
ভীমপলশ্রী নয় ভৈরবী রাগে;
শীতার্ত সূর্যের স্নিগ্ধতা চৌকাঠে।

ভুলক্রমে লেখা ইতিহাস শেষে
তুমি ঘুম থেকে জাগার পর,
পৃথিবীর সকালের জন্ম হয়—
ফিরে আসে আনকোরা ভোর।

০ টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ করা হবে না। (*) চিহ্নিত ঘরগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।