স্বগতোক্তি
অনুপম হোর
তোমাকে এখনো দেখি, করুণ বিস্মরণে একা।
রাত্রি দীর্ঘ হয়, নিদ্রাহীন – চোখে ভাসে
নগরীর নিয়নের রং, এখনো বৃষ্টি ঝরে;
বিছানার চারপাশে মেটে ঘ্রাণে শীতল আবেশ-
তোমায় তখনো দেখি, নীরব প্রশ্ন দুই চোখে।
হৃদয় ফেরারী আজ, স্বপ্নের আদালতে, নীরবে
তোমার অনুগামী; প্রশ্নের উত্তর খোঁজে অর্থহীন
স্থবির অতীত। তোমার মুখের ছবি অভিব্যক্তিহীন
কোন পাথরের মতোন শীতল, চোখের তারায় জ্বলে
ফেলে আসা মধুর সময়, তোমার হৃদয়ে
আজো মহাকাল, আগুনে পোড়ে নি।
আমার মুক্তি নেই, জেনে গেছি বহু আগে, আভরণ মুছে ফেলে
নির্বাক শুন্যতা ভর করে আহত হৃদয়ে-
তবুও আশ্বাস খুঁজি তোমার স্মৃতিতে আজ
অতীতের বিস্মৃত অধ্যায়ে-
তোমার কন্ঠস্বরে একদিন প্রেম ছিল, আজ শুধু দীর্ঘশ্বাস আছে।
অনিদ্রায়
অত:পর সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। নিঝুম হয়ে আসে শহর, আরেকটু পরে ঘরের সব আলো নিভে যায়, সব চুপচাপ, ঠিক যেভাবে ব্যস্ত উচ্চকিত দিনের পরে থিতিয়ে আসে সিড়ির গোড়ার সবজি বাজার, ধীরে ধীরে যেভাবে নিশ্চুপ হয়ে যায় টেরিবাজারের ভীষণ দুর্ভেদ্য বিশৃঙ্খল গলি রাত দশটার পরে। যেভাবে কম্পিউটারের মৃত স্ক্রিনে আটকে থাকা মাইগ্রেনে দায়বদ্ধ নিম্নবিত্ত ব্যাথাতুর চোখ শান্তির ঘুম খোঁজে টাফনিলের আশ্রয়ে, আমার প্রিয়তমা স্ত্রীর প্রশান্ত সুন্দর মুখে নির্লোভ ঘুম, আমার নিউরনে এখনো এলোমেলো বিষণ্নতা, তবুও ঘুম আসে।
কিন্তু কোথাও তো হৃদয়ের গভীর কোন কোনে কিছু নির্জন গল্প জেগে আছে, নাহলে স্বপ্ন কে দেখায়? বন্ধ হয়ে যাওয়া মস্তিষ্কে তবু স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক টুকরো সবুজ আলো, পাশের ফ্ল্যাটের একটি বারান্দায় নিরন্তর জ্বলে থাকা সেই আলো কে দেখে আমি ঘুমিয়ে যাওয়ার পরে?
বিচ্ছিন্ন
আমরা কয়েকজন, কয়েকবছর পরে-
বিচ্ছিন্ন কিছু দু:খ ছুঁয়ে এসে আবার একসাথে দাঁড়িয়েছি।
রাস্তার মোড়ে ধীরে ধীরে দশটা বাজতেই শ্রাবনের আতংক বুকে নিয়ে গাড়িঘোড়া কমে যায়,
আমরা বিক্ষিপ্ত আলোচনায় ছদ্মবেশী জীবনের ল্যান্ডমার্ক খুঁজি।
আমাদের একজনের নতুন জীবন শুরু হবে,
একজন বারবার জীবন শেষ করতে গিয়ে দ্বিধান্বিত আর ক্লান্ত,
আর আমি নক্ষত্র দেখে খাতায় রোমাঞ্চ লিখি।
আমরা তিনজন, এখনো আজাদীর মোড়ে,
স্বতন্ত্র অথচ ক্ষীন সুতোয় জড়িয়ে স্থাবর হয়ে আছি,
আজ এক কোটি বছর হয়ে গেছে যেন।
মাহ ভাদর
এই তো আরেকটা আলস্যমন্থর দিন,
আমার বেড়াল ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্তে রংচটা সোফার উপরে,
মধ্যাহ্ন পার হলে আমার কালান্তক খেয়ালও ঘুমিয়ে পড়ে
চুপচাপ, ক্লান্ত স্বস্তির খোলসে।
দুর্বিনীত যত চিন্তা ছিল, তারা আজ ছুটি পেয়ে গেছে
আজ শুধু অব্যক্ত অতীতের হিসেব মেলানোর ভ্রম,
এর মধ্যে সন্ধ্যা ফিরে এল, অপরাহ্নের আগেই?
অথবা ভাদ্র শুরুর আগে কিছু পরিযায়ী বিবাগী
কিউমুলো নিম্বাস বিদায় নিতে আসে।
আবার দেখা হবে, শ্রাবন-
টানাপোড়েনের সম্পর্ক ছেড়ে তবুও অকস্মাৎ
তোমার অভাব টের পাব,
রৌদ্রস্নাত দিনে হঠাৎ হৃদয় ভেঙে গেলে।


০ টি মন্তব্য